ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির আশায় গুড়ে বালি, কী হলো ৪৪তম দিনে

তথ্যসূত্র:
তথ্যসূত্র:
আল-জাজিরা ও নিউজউইক

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৫৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ৪৪তম দিন চলছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে দুই দেশের বৈঠক। ২১ ঘণ্টার টানা দরকষাকষি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনা শেষেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। এখন এক পক্ষ অন্য পক্ষের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছে। এর ফলে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হুমকির মুখে পড়েছে।

এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে। যুদ্ধে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গেছে। নিহতদের বেশিরভাগই ইরানের নাগরিক। যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ছে।

বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের প্রধান ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইসলামাবাদ ছাড়ার ঠিক আগে তিনি বলেন, ‘খারাপ খবর হলো আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি। আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই খবরটা বেশি খারাপ।’

অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে লিখেছেন, ইরানের আস্থা অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘদিনের দুই শত্রুর মধ্যে শান্তি আলোচনায় পাকিস্তান সহায়তা চালিয়ে যাবে।

ইরানের ভেতরের চিত্র

আলোচনার পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘায়ি জানান, এক বৈঠকেই চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে বলে কেউ আশা করেনি।

ইরানের নাগরিকরা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, তাঁরা এই চুক্তির বিষয়ে সন্দিহান হলেও আশায় বুক বেঁধে আছেন। কয়েক সপ্তাহের বিমান হামলায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলায় দুই হাজারেরও বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন।

তেহরানের একটি নিউজস্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ৪৩ বছর বয়সী ফরহাদ সামিয়া অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধের বিপক্ষে। আমি মনে করি সংঘাত বন্ধের জন্য আলোচনাই সবচেয়ে ভালো পথ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবির কারণেই আজ কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হলো না।’

একই বয়সের মেহেদি হোসেইনি মনে করেন, ইরান এই যুদ্ধে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধে আমাদের অর্জন আলোচনার টেবিলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। আলোচনা সফল না হলেও ইরান যে নতি স্বীকার বা আত্মসমর্পণ করেনি, এটিই আমাদের বড় আশা।’

ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ বাঘের বলেন, ‘আমাদের স্বার্থের প্রতি সম্মান জানানো হলে আমরা সবসময়ই আলোচনার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু আমরা এক ইঞ্চি মাটিও ছাড় দেব না এবং দেশের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত আছি।’

বর্তমানে তেহরানের রাস্তাগুলো জাতীয় পতাকায় ছেয়ে গেছে এবং বড় বড় বিলবোর্ডের মাধ্যমে সামরিক সাফল্য উদযাপন করা হচ্ছে। একটি বিশাল ইলাস্ট্রেশনে দেখা গেছে—ইরানিরা সমুদ্র থেকে মাছ ধরার জাল তুলছেন, যেখানে মাছের বদলে জালে আটকা পড়েছে ছোট ছোট মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমান। ওই বিলবোর্ডের নিচে বড় অক্ষরে লেখা—‘হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে’

যুক্তরাষ্ট্রের অনড় অবস্থান

পাকিস্তান ছাড়ার আগে ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা এখানে খুব সাধারণ একটি প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি। আমাদের হিসাবে এই প্রস্তাবই চূড়ান্ত ও সেরা। ইরানিরা তা গ্রহণ করে কি না, সেটাই দেখব।’

ভ্যান্স জানান, গত ২১ ঘণ্টায় তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। এছাড়া তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপারের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে।

আলোচনা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আগেই জয়ী হয়েছে। তাঁরা ইরানি নেতাদের হত্যা করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা চুক্তি করলাম কি করলাম না, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ আমরাই জিতেছি।’

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মাইন অপসারণের কাজের প্রস্তুতি হিসেবে দুটি ডেস্ট্রয়ার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এমন ঘটনা এবারই প্রথম। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম খবরটি নাকচ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের থায়ার মার্শাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেস আল জাজিরাকে জানান, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। তবে তারা নিজেদের জায়গা থেকে একচুলও সরে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য মূলত একটাই—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়া।

শনিবার (১১ এপ্রিল) রাতে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন শেয়ার করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘জাস্ট দ্য নিউজ ডটকমে’ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, ইরানের সামুদ্রিক আমদানি ও রপ্তানি সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র তার পুরোনো কৌশল প্রয়োগ করতে পারে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের আগে দেশটির অর্থনৈতিক ধস এবং সামাজিক ক্ষোভ সৃষ্টির লক্ষ্যে নৌ-অবরোধ পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানের ক্ষেত্রে এই অবরোধের লক্ষ্য হবে দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুরোপুরি শ্বাসরোধ করে দেওয়া।

বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের বাড়তি ধাক্কা

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এছাড়া লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশের ভেতরেও বেশ চাপে আছেন। বিরোধীরা এই সংঘাতকে অপ্রয়োজনীয় এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধ বলে কড়া সমালোচনা করছেন।

ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধ পরিস্থিতি

এদিকে লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তারা রাতে দক্ষিণাঞ্চলীয় জুয়াইয়া এলাকায় একটি রকেট লঞ্চারে হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লেবাননে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। বৈরুতে এক বিক্ষোভে ইসরায়েল ও লেবাননের আলোচনার বিরোধিতা করা হয়।

আল জাজিরার সাংবাদিক হেইডি পেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের ওপর মার্কিন চাপের কারণে বৈরুতে সাময়িক বিরতি দেখা গেছে। তবে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা বদলায়নি।

লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ মার্চের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত দুই হাজার ২০ জন লেবানিজ নিহত ও ছয় হাজার ৪৩৬ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে ইসরায়েলের সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভ জানিয়েছে, লেবানন থেকে ইসরায়েলের আপার গ্যালিলি অঞ্চলে একটি ড্রোন ছোড়া হয়েছিল। তবে ড্রোনটি মাঝপথেই ধ্বংস করা হয়েছে।

সম্পর্কিত