স্ট্রিম ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজলেই লেবাননের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। বর্তমান মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধেও সেই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। লেবানন আবারও জ্বলছে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। চোখের পলকে ধ্বংস হচ্ছে বাড়িঘর, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ সেতু।
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংঘাত শুরু হলেই লেবানন কেন বারবার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে? ইসরায়েলের এত আক্রোশ কেন এই ছোট দেশটির ওপর? পশ্চিমা প্রচারণায় সব দোষ কেবল হিজবুল্লাহর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। ইতিহাস এবং ভূ-রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প বলে।
লেবাননের ভৌগোলিক অবস্থানই তার সবচেয়ে বড় কাল। দেশটির দক্ষিণে ইসরায়েল এবং পূর্বে ও উত্তরে সিরিয়ার অবস্থান। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল এবং খণ্ডিত। সেখানে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করা আছে। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নেয় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো।
মার্কিন সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে লেবানন দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক শক্তির দড়ি টানাটানির খোলা ময়দান। যখনই ইরান, ইসরায়েল, সৌদি আরব বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে তার প্রথম আঁচ এসে লাগে লেবাননের গায়ে। পরাশক্তিগুলো অনেক সময় সরাসরি নিজেদের ভূখণ্ডে যুদ্ধ করতে চায় না। তারা লেবাননের মাটিতে প্রক্সি যুদ্ধ বা ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে নিজেদের শক্তি পরীক্ষা করে। দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারের কারণে লেবানন কখনোই বাইরের এই হস্তক্ষেপ শক্ত হাতে রুখে দিতে পারে না।
লেবাননের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনকে কেবল নিরাপত্তা বা আত্মরক্ষার অজুহাত দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সত্যকে আড়াল করা হয়। এর পেছনে রয়েছে গভীর আদর্শিক এবং সম্প্রসারণবাদী লালসা। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন ইসরায়েলের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েল পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হলো দক্ষিণ লেবানন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের বিভিন্ন নিবন্ধে এই বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে।
জায়নবাদী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্জল থেকে শুরু করে অনেক কট্টরপন্থী ইসরায়েলি নেতার আঁকা মানচিত্রে বৃহত্তর ইসরায়েলের সীমানা লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষিণ লেবানন পানি সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ইসরায়েলের মতো পানিশূন্য ও শুষ্ক অঞ্চলের দেশের জন্য লিতানি নদীর পানি সবসময়ই তীব্র লোভের বিষয়। ঐতিহাসিক নথি ঘেঁটলে দেখা যায় ১৯১৯ সালে প্যারিস শান্তি সম্মেলনে জায়নবাদী নেতারা দক্ষিণ লেবাননকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছিলেন।
সুতরাং লেবাননে বারবার হামলা চালানো ইসরায়েলের একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কৌশল। তারা চায় লাগাতার বোমাবর্ষণ করে ওই অঞ্চলকে জনশূন্য করে দিতে। স্থানীয়দের তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই তেল আবিবের আসল উদ্দেশ্য।
পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমগুলো লেবাননের ধ্বংসের জন্য একচেটিয়াভাবে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে দায়ী করে। তারা দিনরাত প্রচার করে হিজবুল্লাহর উসকানিতেই ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ভিন্ন কথা বলে।
১৯৮২ সালে ইসরায়েল যখন লেবাননে ভয়াবহ আগ্রাসন চালায় এবং রাজধানী বৈরুত দখল করে নেয় তখনো হিজবুল্লাহর জন্ম হয়নি। ফিলিস্তিনি লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) দমনের নামে ইসরায়েল ওই সময়ে লেবাননে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ইসরায়েলি দখলদারিত্ব এবং সাধারণ লেবানিজদের ওপর নির্মম নির্যাতনের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই হিজবুল্লাহর মতো প্রতিরোধ বাহিনীর উত্থান ঘটে।
রয়টার্স ও বিবিসির মতো সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায় হিজবুল্লাহ বর্তমানে লেবাননের অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি। তারা ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবাননকে ইসরায়েলি দখলমুক্ত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ইরান তাদের সামরিক ও আর্থিক সমর্থন দেয় সেই কথা সত্য। কিন্তু হিজবুল্লাহকে কেবল ইরানের হাতের পুতুল ভাবা চরম ভুল। তারা লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং দেশের শিয়া জনগোষ্ঠীর বিশাল সমর্থন তাদের পেছনে রয়েছে। ইসরায়েল হিজবুল্লাহ দমনের নাম করে মূলত পুরো লেবাননের বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। এর মাধ্যমে তারা লেবানিজ জনগণের মনে চিরস্থায়ী আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিতে চায়।
লেবাননের ওপর ইসরায়েলের হামলার ধরন হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এই সামরিক কৌশল একটি সুনির্দিষ্ট ইসরায়েলি নীতি দ্বারা পরিচালিত। সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘দাহিয়া ডকট্রিন’। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি জেনারেল গাদি আইজেনকোট এই নির্মম নীতির কথা প্রথম প্রকাশ্যে আনেন। দাহিয়া হলো বৈরুতের একটি দক্ষিণ শহরতলি। ২০০৬ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল সেই এলাকাকে বোমাবর্ষণ করে পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল।
এই নীতির মূল কথা হলো শত্রুর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অতিরিক্ত মাত্রায় শক্তি প্রয়োগ করা। ইসরায়েলি বাহিনী শুধু সামরিক ঘাঁটি বা যোদ্ধাদের ওপর হামলা করে না। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক এলাকা, সেতু, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের আসল উদ্দেশ্য হলো লেবাননের অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া। সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ওপর মানসিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করাই তাদের কৌশল। বর্তমান যুদ্ধেও ইসরায়েল লেবাননের ওপর ঠিক একই ধ্বংসাত্মক কৌশল প্রয়োগ করছে।
লেবানন শুধু ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনেরই শিকার নয়। দেশটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক নিষ্ঠুর দাবার বোর্ড হয়ে আছে কয়েক দশক ধরে। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা শক্তিগুলো লেবাননের রাজনীতিতে সবসময় নাক গলিয়ে আসছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো লেবাননের অর্থনীতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যেন দেশটি কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে।
গত কয়েক বছর ধরে লেবানন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছেছে এবং ব্যাংকিং খাত পুরোপুরি ধসে পড়েছে। এই দুর্বল অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে পরাশক্তিগুলো নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেয়। এখন যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ চলছে তখন লেবাননকে আবারও একটি ফ্রন্টলাইন বা প্রথম সারির যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমেরিকা ও ইসরায়েল খুব ভালো করেই জানে সরাসরি ইরানে হামলা করার পাশাপাশি লেবাননে আঘাত হানলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বলয়কে খুব সহজে দুর্বল করা যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যখনই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর চেষ্টা হয় লেবাননকে বাধ্য হয়ে সেই মাশুল গুনতে হয়। ইসরায়েলের আগ্রাসী মানসিকতা এবং বৃহত্তর ইসরায়েল গড়ার স্বপ্ন লেবাননের স্বাধীনতাকে সবসময় খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে রাখে। পশ্চিমা বিশ্ব সবসময় হিজবুল্লাহর দিকে আঙুল তুলে ইসরায়েলের ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা করে।
প্রকৃত সত্য হলো লেবাননের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং সম্পদের প্রতি বিদেশিদের লোভই দেশটির প্রধান শত্রু। পরাশক্তিদের আগ্রাসন এবং ইসরায়েলের উগ্র নীতির কারণে ভূমধ্যসাগরের তীরের সুন্দর এই দেশ বারবার কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। লেবাননের সাধারণ মানুষের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার বারবার কেড়ে নেওয়া হয় বোমার আঘাতে। বিশ্ব মোড়লদের ক্ষমতার লালসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত লেবাননের এই ট্র্যাজেডির কোনো সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজলেই লেবাননের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। বর্তমান মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধেও সেই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। লেবানন আবারও জ্বলছে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। চোখের পলকে ধ্বংস হচ্ছে বাড়িঘর, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ সেতু।
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংঘাত শুরু হলেই লেবানন কেন বারবার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে? ইসরায়েলের এত আক্রোশ কেন এই ছোট দেশটির ওপর? পশ্চিমা প্রচারণায় সব দোষ কেবল হিজবুল্লাহর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। ইতিহাস এবং ভূ-রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প বলে।
লেবাননের ভৌগোলিক অবস্থানই তার সবচেয়ে বড় কাল। দেশটির দক্ষিণে ইসরায়েল এবং পূর্বে ও উত্তরে সিরিয়ার অবস্থান। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল এবং খণ্ডিত। সেখানে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করা আছে। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নেয় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো।
মার্কিন সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে লেবানন দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক শক্তির দড়ি টানাটানির খোলা ময়দান। যখনই ইরান, ইসরায়েল, সৌদি আরব বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে তার প্রথম আঁচ এসে লাগে লেবাননের গায়ে। পরাশক্তিগুলো অনেক সময় সরাসরি নিজেদের ভূখণ্ডে যুদ্ধ করতে চায় না। তারা লেবাননের মাটিতে প্রক্সি যুদ্ধ বা ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে নিজেদের শক্তি পরীক্ষা করে। দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারের কারণে লেবানন কখনোই বাইরের এই হস্তক্ষেপ শক্ত হাতে রুখে দিতে পারে না।
লেবাননের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনকে কেবল নিরাপত্তা বা আত্মরক্ষার অজুহাত দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সত্যকে আড়াল করা হয়। এর পেছনে রয়েছে গভীর আদর্শিক এবং সম্প্রসারণবাদী লালসা। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন ইসরায়েলের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েল পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হলো দক্ষিণ লেবানন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের বিভিন্ন নিবন্ধে এই বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে।
জায়নবাদী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্জল থেকে শুরু করে অনেক কট্টরপন্থী ইসরায়েলি নেতার আঁকা মানচিত্রে বৃহত্তর ইসরায়েলের সীমানা লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষিণ লেবানন পানি সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ইসরায়েলের মতো পানিশূন্য ও শুষ্ক অঞ্চলের দেশের জন্য লিতানি নদীর পানি সবসময়ই তীব্র লোভের বিষয়। ঐতিহাসিক নথি ঘেঁটলে দেখা যায় ১৯১৯ সালে প্যারিস শান্তি সম্মেলনে জায়নবাদী নেতারা দক্ষিণ লেবাননকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছিলেন।
সুতরাং লেবাননে বারবার হামলা চালানো ইসরায়েলের একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কৌশল। তারা চায় লাগাতার বোমাবর্ষণ করে ওই অঞ্চলকে জনশূন্য করে দিতে। স্থানীয়দের তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই তেল আবিবের আসল উদ্দেশ্য।
পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমগুলো লেবাননের ধ্বংসের জন্য একচেটিয়াভাবে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে দায়ী করে। তারা দিনরাত প্রচার করে হিজবুল্লাহর উসকানিতেই ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ভিন্ন কথা বলে।
১৯৮২ সালে ইসরায়েল যখন লেবাননে ভয়াবহ আগ্রাসন চালায় এবং রাজধানী বৈরুত দখল করে নেয় তখনো হিজবুল্লাহর জন্ম হয়নি। ফিলিস্তিনি লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) দমনের নামে ইসরায়েল ওই সময়ে লেবাননে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ইসরায়েলি দখলদারিত্ব এবং সাধারণ লেবানিজদের ওপর নির্মম নির্যাতনের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই হিজবুল্লাহর মতো প্রতিরোধ বাহিনীর উত্থান ঘটে।
রয়টার্স ও বিবিসির মতো সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায় হিজবুল্লাহ বর্তমানে লেবাননের অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি। তারা ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবাননকে ইসরায়েলি দখলমুক্ত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ইরান তাদের সামরিক ও আর্থিক সমর্থন দেয় সেই কথা সত্য। কিন্তু হিজবুল্লাহকে কেবল ইরানের হাতের পুতুল ভাবা চরম ভুল। তারা লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং দেশের শিয়া জনগোষ্ঠীর বিশাল সমর্থন তাদের পেছনে রয়েছে। ইসরায়েল হিজবুল্লাহ দমনের নাম করে মূলত পুরো লেবাননের বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। এর মাধ্যমে তারা লেবানিজ জনগণের মনে চিরস্থায়ী আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিতে চায়।
লেবাননের ওপর ইসরায়েলের হামলার ধরন হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এই সামরিক কৌশল একটি সুনির্দিষ্ট ইসরায়েলি নীতি দ্বারা পরিচালিত। সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘দাহিয়া ডকট্রিন’। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি জেনারেল গাদি আইজেনকোট এই নির্মম নীতির কথা প্রথম প্রকাশ্যে আনেন। দাহিয়া হলো বৈরুতের একটি দক্ষিণ শহরতলি। ২০০৬ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল সেই এলাকাকে বোমাবর্ষণ করে পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল।
এই নীতির মূল কথা হলো শত্রুর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অতিরিক্ত মাত্রায় শক্তি প্রয়োগ করা। ইসরায়েলি বাহিনী শুধু সামরিক ঘাঁটি বা যোদ্ধাদের ওপর হামলা করে না। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক এলাকা, সেতু, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের আসল উদ্দেশ্য হলো লেবাননের অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া। সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ওপর মানসিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করাই তাদের কৌশল। বর্তমান যুদ্ধেও ইসরায়েল লেবাননের ওপর ঠিক একই ধ্বংসাত্মক কৌশল প্রয়োগ করছে।
লেবানন শুধু ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনেরই শিকার নয়। দেশটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক নিষ্ঠুর দাবার বোর্ড হয়ে আছে কয়েক দশক ধরে। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা শক্তিগুলো লেবাননের রাজনীতিতে সবসময় নাক গলিয়ে আসছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো লেবাননের অর্থনীতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যেন দেশটি কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে।
গত কয়েক বছর ধরে লেবানন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছেছে এবং ব্যাংকিং খাত পুরোপুরি ধসে পড়েছে। এই দুর্বল অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে পরাশক্তিগুলো নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেয়। এখন যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ চলছে তখন লেবাননকে আবারও একটি ফ্রন্টলাইন বা প্রথম সারির যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমেরিকা ও ইসরায়েল খুব ভালো করেই জানে সরাসরি ইরানে হামলা করার পাশাপাশি লেবাননে আঘাত হানলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বলয়কে খুব সহজে দুর্বল করা যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যখনই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর চেষ্টা হয় লেবাননকে বাধ্য হয়ে সেই মাশুল গুনতে হয়। ইসরায়েলের আগ্রাসী মানসিকতা এবং বৃহত্তর ইসরায়েল গড়ার স্বপ্ন লেবাননের স্বাধীনতাকে সবসময় খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে রাখে। পশ্চিমা বিশ্ব সবসময় হিজবুল্লাহর দিকে আঙুল তুলে ইসরায়েলের ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা করে।
প্রকৃত সত্য হলো লেবাননের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং সম্পদের প্রতি বিদেশিদের লোভই দেশটির প্রধান শত্রু। পরাশক্তিদের আগ্রাসন এবং ইসরায়েলের উগ্র নীতির কারণে ভূমধ্যসাগরের তীরের সুন্দর এই দেশ বারবার কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। লেবাননের সাধারণ মানুষের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার বারবার কেড়ে নেওয়া হয় বোমার আঘাতে। বিশ্ব মোড়লদের ক্ষমতার লালসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত লেবাননের এই ট্র্যাজেডির কোনো সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না।

ইরান ভীত হয়নি। তারা সময় চায়নি বা আপসের জন্য তড়িঘড়ি করেনি। তারা প্রতিরোধ দেখিয়েছে এবং আরও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। কোনো হামলা সীমিত পর্যায়ে থাকবে না, তা কোনো নিখুঁত বা নিয়ন্ত্রিত আকারে থাকবে না, বরং পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।
৪ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় চার সপ্তাহ পার হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে। তবে ইরান এ ধরনের কোনো আলোচনা চলার কথা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে।
১ দিন আগে
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। ওই রাতের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞকে কেবল সামরিক অভিযানের নিক্তিতে দেখলে হবে না। এর উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে চিরতরে মুছে ফেলা।
১ দিন আগে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে ঘিরে ইরান কী চায় এবং কীভাবে তার কৌশল পুনর্গঠন করছে, তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লেও তেহরান এটিকে কেবল সামরিক লড়াই হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অংশ হি
২ দিন আগে