ভারতকে মহান বলা হলেও বাস্তবে দেশটি এখনও বহু ক্ষেত্রে প্রান্তিক সাংস্কৃতিক বিভাজন, ধর্মীয় মেরুকরণ ও আঞ্চলিক স্বার্থের রাজনীতির মধ্যে আবদ্ধ। এই বিভাজন সামাজিক অগ্রগতি ও গণতান্ত্রিক চেতনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সামগ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়কে ভয়, বিদ্বেষ কিংবা আবেগের রাজনীতির মাধ্যমে ভোটব্যাঙ্কে পরিণত করার প্রবণতা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নারী নির্যাতন, খুন ও সামাজিক অস্থিরতার ঘটনাও ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা—রাষ্ট্রের এই মৌলিক ব্যবস্থাগুলির গুণগত মান নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে। অবক্ষয় রোধে প্রয়োজন সচেতন ও জাগ্রত যুবসমাজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই জাগরণ কীভাবে সম্ভব?
যে ব্যক্তি আগে দারিদ্র্যের জন্য দুবেলা খেতে পারত না, রেশনের চাল ও বিভিন্ন ভাতায় তার খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে ঠিকই; কিন্তু তার রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা হয়েছে কি? দারিদ্র্য হঠানো ও বছরে দুই কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ক্ষমতাসীন দল তাদের কথা রাখতে পেরেছে কি? নাকি আদৌ রাখার চেষ্টা করছে? আর কত দিন দরকার? ১২ বছর কি একটি সরকারের জন্য যথেষ্ট সময় নয়? কিন্তু তাদের কাঙ্ক্ষিত বিজয় রথের চাকা বিভিন্ন রাজ্য দখলের জন্য দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে!
তৃণমূলী শোষণ ও শাসনের ১৫ বছরের অবসান ঘটল বিভিন্ন দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দেশের সামগ্রিক ছবিটাও কিন্তু স্বচ্ছ নয়। গত ১২ বছরে দেশে প্রায় একশোটি পেপার লিকের (প্রশ্নফাঁস) ঘটনা ঘটেছে। সেন্ট্রাল এসএসসি কিংবা রেলওয়েতেও মাঝে মাঝে দুর্নীতির বিক্ষিপ্ত ঘটনা আমাদের সামনে আসে। সম্প্রতি প্রকাশিত 'কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অব ইন্ডিয়া' (সিএজি)-র তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য (আয়ুষ্মান কার্ড), শিক্ষা (পিএম কৌশল বিকাশ যোজনা), পরিকাঠামো প্রকল্প, রাজস্ব আদায় ও পিএসইউ-এর বিভিন্ন খতিয়ান মিলিয়ে প্রায় হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। এটা কি দুর্নীতি নয়? প্রশ্ন উঠছে, এই টাকা কার? উত্তর সকলেরই জানা। তাহলে রাজ্যের দুর্নীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীও যেন কোথাও গিয়ে দুর্নীতির বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ছে।
জনগণকে কর্মসংস্থান, উন্নত মানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসার কথা প্রায় ভুলতে বসেছে দেশের সব ধরনের রাজনৈতিক দল। এখন বিভিন্ন ভাতা, প্রকল্প আর পারস্পরিক বিদ্বেষই হয়ে উঠেছে ক্ষমতা দখলের মূল হাতিয়ার। অন্যদিকে ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও। কারণ সাধারণ মানুষের চোখে সকলেই যেন এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকা প্রজাতন্ত্রপ্রেমী ভারতের জনগণ হয়তো ভুলতে বসেছে যে আমরা একটি গণতান্ত্রিক দেশের বাসিন্দা। ফলে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এক ভিন্ন যজ্ঞে নেমে পড়েছে দেশের যুবসমাজ। এরই ফল হিসেবে রাজনীতিতে উত্থান ঘটেছে—'ককরোচ জনতা পার্টি'। তবে এই দল গঠনের পিছনে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি তির্যক মন্তব্য বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
এই নতুন ধারার মঞ্চে শুধু যে কিছু বিরোধী দলনেতা যুক্ত হয়েছেন তা নয়, বরং যুক্ত হয়েছে লক্ষ লক্ষ যোগ্য, কর্মনিষ্ঠ ও প্রকৃত সম্মান থেকে বঞ্চিত সেই যুবসমাজ, যারা বারবার সরকারের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের প্রযুক্তি-বিমুখ ছেলেমেয়েদের পক্ষে এককভাবে এমন দল গঠন হয়তো সহজ নয়, তবে তারা তাদের সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ ও অভিব্যক্তি স্পষ্ট করছে।
নিজেদের ইশতেহারে ৫০ শতাংশ নারী সংরক্ষণ, দলবদল নীতিতে ২০ বছরের প্রতিবন্ধকতা, নির্বাচন কমিশনকে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হতে বাধা দেওয়া এবং সর্বভারতীয় নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস দুর্নীতির মতো বড় বড় বিষয় নিয়ে এই দল সরব হয়েছে। তবে দলের মুখ্য প্রতিনিধিদের উচিত নিজেদের এজেন্ডা আরও স্পষ্ট করে জনগণের সামনে তুলে ধরা। স্কুল, কলেজ, শিক্ষক-শিক্ষিকা, রাস্তাঘাট, পুলিশি ব্যবস্থার গুণগত মান, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সর্বোপরি কর্মসংস্থানের স্থায়ী সমাধান তারা কীভাবে করতে চায়—তা নির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করা দরকার। এটি করতে পারলে তাদের বিরুদ্ধে বিরোধীদের তৈরি করা নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি যেমন মুছে যাবে, তেমনই সাধারণ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।
বাস্তব ক্ষেত্র আর সামাজিক মাধ্যমের মধ্যে তফাত অনেক। তবুও বছরের পর বছর ধরে শোষণ, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর বৈষম্যের শিকার হওয়া যুবসমাজের সমস্যা মেটাতে দীর্ঘ ৭৭ বছরেও ব্যর্থ হয়েছে দেশের প্রবীণ ও চেনা রাজনৈতিক মহল। সেই ব্যর্থতাকে ছুড়ে ফেলে আজ যদি নতুন, শিক্ষিত ও যুগোপযোগী যুবসমাজ দেশের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসে, তবে ক্ষতি কোথায়? নাকি দেশপ্রেমের সংজ্ঞা ও প্রকৃতিও একেকটি রাজনৈতিক দলের গায়ের রঙ অনুযায়ী আলাদা হবে?