তুফায়েল আহমদ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধের এক মাস গড়িয়ে গেছে। চুক্তি, আলোচনা, প্রস্তাব—বিভিন্ন ইস্যু বারবার আলোচনায় এলেও যুদ্ধবিরতির কোনো দৃশ্যত পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য, সামরিক ক্লান্তি এবং বিশ্বব্যাপী সমুদ্রবাণিজ্যে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা—সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে দাবি উঠেছে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার। রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির একটি রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের দাবি হলো—আগ্রাসনের সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত অবসান, যুদ্ধ পুনরায় না ঘটার গ্যারান্টি, বস্তুগত ও নৈতিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একচ্ছত্র অধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় না খোলা পর্যন্ত সামরিক অভিযান চলবে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপটে এই শর্তগুলো আদৌ কি বাস্তবে রূপ নেবে কিংবা রূপ না নিলে যুদ্ধ পরিস্থিতি কোনো দিকে যাবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকেরা নিশ্চিত নন। ইরানের এই চার শর্ত পূরণ করা সম্ভব কি না, তা বুঝতে হলে শর্তগুলোর গভীরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এগুলো মেনে নেবে কি না, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
কূটনৈতিক ভাষায় ‘আগ্রাসনের অবসান’ মানে যুদ্ধের সব ধরনের কার্যকলাপ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। ইরানের কাছে এই সংজ্ঞার পরিধি কেবল প্রচলিত সামরিক হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তেহরানের দৃষ্টিতে ‘আগ্রাসন’ বলতে বোঝায় ইরানের অবকাঠামোয় ইসরায়েলি বিমান হামলা, মার্কিন নৌবাহিনীর গোলাবর্ষণ, গোপন গোয়েন্দা অভিযান ও সাইবার হামলা।
এই শর্ত বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান তাদের সব সক্রিয় সামরিক তৎপরতা স্থগিত করবে। এরপর পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন স্ট্রাইক গ্রুপগুলো প্রত্যাহার করতে হবে এবং ইসরায়েলি বিমান হামলা বন্ধ করতে হবে। চুক্তি মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার জন্য নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ বা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা দরকার হবে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি এই দাবি মানবে? একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়তো সম্ভব। কিন্তু ইরানের ‘সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত অবসান’ মানা ওয়াশিংটন বা তেল আবিবের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ইসরায়েল ‘বিগিন ডকট্রিন’ বা বিগিন নীতি মেনে চলে। এই নীতি অনুযায়ী, তারা যেকোনো অস্তিত্বের হুমকির বিরুদ্ধে আগেভাগেই হামলা চালাবে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার প্রতি ইসরায়েল সরকার এই নীতি প্রয়োগ করে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক অভিযান বন্ধের ইঙ্গিত দিলেও তা হরমুজ প্রণালি খোলার শর্তে বেঁধে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি হবে, কিন্তু ভবিষ্যতে নিজেদের বা মিত্রদের সুরক্ষার আইনি অধিকার তারা কখনোই ছাড়বে না।
ইরানের এই দাবির পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক ট্রমা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম অবিশ্বাস। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র যখন ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (জেসিপিওএ) বা পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, তখন ইরানি নীতিনির্ধারকরা বুঝেছিলেন আমেরিকান নির্বাহীদের চুক্তির কোনো দাম নেই। ইরান চায় এমন ব্যবস্থা যাতে ভবিষ্যতের কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হুট করে আবার যুদ্ধ শুরু করতে বা ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগ করতে না পারেন।
তাত্ত্বিকভাবে এই দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে শান্তি চুক্তিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সপ্তম অধ্যায়ের রেজুলেশনের আওতায় আনতে হবে। অথবা ইরান তাদের কৌশলগত মিত্র রাশিয়া বা চীনকে চুক্তির গ্যারান্টর বা জামিনদার হিসেবে চাইতে পারে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ইরানের কৌশলগত স্থানে রুশ বা চীনা সামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের বিষয়ও থাকতে পারে।
এই শর্ত রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে সবচেয়ে কঠিন। ইসরায়েলও এমন কোনো আন্তর্জাতিক কাঠামো মানবে না যা তাদের হাত বেঁধে দেয়। তাছাড়া, ইরানে রুশ বা চীনা সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি পাল্টে দেবে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কখনোই মেনে নেবে না। ইরানকে হয়তো শেষ পর্যন্ত ‘ব্যবহারিক গ্যারান্টি’ বা এশীয় বাজারের সঙ্গে অর্থনৈতিক একীভূতকরণের মতো কোনো ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
চলমান এই সংঘাতে ইরানের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বোমা হামলায় ধ্বংস হওয়া সামরিক স্থাপনা, তেলের শোধনাগার এবং বেসামরিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য ইরান যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। ‘নৈতিক ক্ষতি’ বলতে ইরানিদের প্রাণহানি এবং মানসিক বিপর্যয়ের কথা বোঝানো হয়েছে। এই শর্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্পষ্ট আগ্রাসনকারী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে এ ধরনের দাবি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। ১৯৮১ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ক্লেইমস ট্রাইব্যুনাল বা ইরাক-কুয়েত ক্ষতিপূরণ কমিশনের মতো কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। একটি স্বাধীন নিরীক্ষক সংস্থা ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেই অর্থ একটি পুনর্নির্মাণ তহবিলে জমা দেবে।
তবে আমেরিকান বা ইসরায়েলি করদাতাদের টাকায় ইরান সরকারকে সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। ওয়াশিংটনে একে মুক্তিপণ বা সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন হিসেবে দেখা হবে। কূটনীতির দুনিয়ায় মুখ রক্ষার নানা উপায় থাকে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেবে না, কিন্তু বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করতে পারে। পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে ইরানকে খোলা বাজারে তেল বিক্রির সুযোগ দিতে পারে। ইরানি নেতারা একেই পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে আদায় করা ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে প্রচার করে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বিজয় দাবি করতে পারবেন।
ইরানের এই দাবি সবচেয়ে বেশি বৈশ্বিক প্রভাব ফেলা শর্ত। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের চোকপয়েন্ট। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পার হয়। এই প্রণালির ওপর ‘অধিকার’ দাবি করে ইরান মূলত সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে।

এই শর্ত বাস্তবায়ন করতে হলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিয়মনীতি নতুন করে লিখতে হবে। বর্তমানে এই প্রণালি জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদের (আনক্লস) অধীনে পরিচালিত হয়। সেখানে সব দেশের সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের বাধাহীন চলাচলের অধিকার রয়েছে। ইরানের শর্ত মানতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এমন চুক্তিতে সই করতে হবে যেখানে ইরানের নজরদারি ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এর ফলে বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ট্রানজিট ফি দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই শর্ত মানা একেবারেই অসম্ভব। ১৯৮০ সালের কার্টার ডকট্রিন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, বিশেষ করে তেলের অবাধ প্রবাহ রক্ষায় সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে বদ্ধপরিকর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নিয়মে উন্মুক্ত ও নিরাপদ হলেই কেবল যুদ্ধবিরতি বিবেচনা করা হবে। ইরানকে এই অধিকার দেওয়া মানে তাদের হাতে বিশ্ব অর্থনীতির গলা চেপে ধরার ক্ষমতা তুলে দেওয়া। এর ফলে উপসাগরীয় মিত্ররা পুরোপুরি ইরানের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র এটি কখনোই মানবে না। একমাত্র সম্ভাব্য আপস হতে পারে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের নৌবাহিনীই ওই অঞ্চলে থাকবে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে যৌথ আক্রমণ শুরু করে, তখন তাঁদের লক্ষ্য ছিল আকাশচুম্বী। তাঁদের প্রধান তিন উদ্দেশ্য ছিল—ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বকে উৎখাত করে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয় গুঁড়িয়ে দেওয়া; ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা চিরতরে ধ্বংস করা; এবং হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরানের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া।
এক মাস পেরোনোর পর দেখা যাচ্ছে, অর্জনের খাতা বেশ মিশ্র। বিমান হামলায় নিহত ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি। এই ঘটনাকে পুঁজি করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ‘নতুন সরকারের প্রেসিডেন্ট’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সফলভাবে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে। তিনি দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ইরানের ইসলামি শাসন ব্যবস্থা পুরোদমেই টিকে আছে।
ব্যর্থতার পাল্লাও হালকা নয়। হরমুজ প্রণালি এখনো অবরুদ্ধ। ইরান বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ ব্যাহত করে রেখেছে। তারা এখন চীনা ইউয়ান ও স্টেবলকয়েনে ট্রানজিট ফি দাবি করছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্যগুলো হোঁচট খাচ্ছে। ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রগুলো স্বীকার করেছে যে স্থলযুদ্ধ পরিকল্পনার চেয়ে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়েছে তারা ইরানের ভেতরে কোনো মার্কিন স্থল অভিযানে অংশ নেবে না, কারণ তাদের সেনাবাহিনী ক্লান্ত এবং রিজার্ভিস্টরা মানসিক অবসাদে ভুগছে। এদিকে মার্কিন সেনাবাহিনী আঞ্চলিক সম্পদ ধ্বংস হওয়ার কারণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই পরিমাণ অর্থের সম্ভাবনা যুদ্ধের আগেও ইরানের ছিল না।
এত বোমাবর্ষণের মধ্যেও ট্রাম্প কেন বারবার শান্তির কথা বলছেন? গত ১ এপ্রিল তিনি ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেন যে ইরানের ‘নতুন প্রেসিডেন্ট’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতি চেয়েছেন। যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দিয়েছে। ট্রাম্পের এই শান্তি বয়ান তৈরির পেছনে তিনটি প্রধান সংকট কাজ করছে।
প্রথমত, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা আমেরিকার জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়।
দ্বিতীয়ত, মার্কিন ভোটারদের বিপুল অংশ চায় যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক এবং তারা কোনোভাবেই মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের পক্ষে নয়।
তৃতীয়ত, ট্রাম্প প্রশাসন সম্মানজনক প্রস্থানের উপায় খুঁজছে। তারা এখন ‘রেজিম চেঞ্জ’ থেকে সরে এসে ‘সীমিত লক্ষ্যের’ দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ১৫ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা দিয়েছে। এই ১৫ দফার পুরো পাঠ্য গোপন থাকলেও ট্রাম্পের বক্তব্য ও হোয়াইট হাউসের ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে কিছু মূল মার্কিন দাবি জানা যায়। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি শর্তহীনভাবে খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ গুটিয়ে ফেলা এবং ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয় থেকে সরে এসে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রক্সি হামলা বন্ধ করা। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ইরানকে বোমাবর্ষণ করে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তবে তিনি একটি পরস্পরবিরোধী মন্তব্যও করেছেন। তিনি বলেছেন, ফ্রান্স বা অন্য দেশগুলো তেল চাইলে তারা নিজেরা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এর মানে দাঁড়ায়, ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধ শেষ করার জন্য ওই জলপথের নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি সরে আসতেও রাজি।
২০২৬ সালের এই যুদ্ধ সব পক্ষকেই খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। শান্তি এখন কোনো নৈতিক পছন্দ নয়, বরং কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। ইরানের দেওয়া চার শর্ত তাদের জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে যৌক্তিক হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অলঙ্ঘনীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে তা সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই শর্তগুলো হুবহু পূরণ করা অসম্ভব বলে মনে হয়। ওয়াশিংটন বা জেরুজালেম কেউ সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেবে না বা বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তবে এই সর্বোচ্চ দাবিগুলো কিছুটা কমিয়ে বাস্তবসম্মত সমঝোতায় আসা সম্ভব।
কোনো পক্ষেরই সম্পূর্ণ বিজয় বা আত্মসমর্পণের মাধ্যমে এই শান্তি আসবে না। শান্তি আসবে সূক্ষ্ম কূটনীতির মাধ্যমে, যেখানে উভয় পক্ষই ভাববে তারা যা চেয়েছিল তা পেয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, মিডিল ইস্ট মনিটর এবং দ্য ডিপ্লোম্যাট

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধের এক মাস গড়িয়ে গেছে। চুক্তি, আলোচনা, প্রস্তাব—বিভিন্ন ইস্যু বারবার আলোচনায় এলেও যুদ্ধবিরতির কোনো দৃশ্যত পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য, সামরিক ক্লান্তি এবং বিশ্বব্যাপী সমুদ্রবাণিজ্যে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা—সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে দাবি উঠেছে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার। রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির একটি রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের দাবি হলো—আগ্রাসনের সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত অবসান, যুদ্ধ পুনরায় না ঘটার গ্যারান্টি, বস্তুগত ও নৈতিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একচ্ছত্র অধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় না খোলা পর্যন্ত সামরিক অভিযান চলবে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপটে এই শর্তগুলো আদৌ কি বাস্তবে রূপ নেবে কিংবা রূপ না নিলে যুদ্ধ পরিস্থিতি কোনো দিকে যাবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকেরা নিশ্চিত নন। ইরানের এই চার শর্ত পূরণ করা সম্ভব কি না, তা বুঝতে হলে শর্তগুলোর গভীরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এগুলো মেনে নেবে কি না, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
কূটনৈতিক ভাষায় ‘আগ্রাসনের অবসান’ মানে যুদ্ধের সব ধরনের কার্যকলাপ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। ইরানের কাছে এই সংজ্ঞার পরিধি কেবল প্রচলিত সামরিক হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তেহরানের দৃষ্টিতে ‘আগ্রাসন’ বলতে বোঝায় ইরানের অবকাঠামোয় ইসরায়েলি বিমান হামলা, মার্কিন নৌবাহিনীর গোলাবর্ষণ, গোপন গোয়েন্দা অভিযান ও সাইবার হামলা।
এই শর্ত বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান তাদের সব সক্রিয় সামরিক তৎপরতা স্থগিত করবে। এরপর পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন স্ট্রাইক গ্রুপগুলো প্রত্যাহার করতে হবে এবং ইসরায়েলি বিমান হামলা বন্ধ করতে হবে। চুক্তি মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার জন্য নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ বা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা দরকার হবে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি এই দাবি মানবে? একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়তো সম্ভব। কিন্তু ইরানের ‘সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত অবসান’ মানা ওয়াশিংটন বা তেল আবিবের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ইসরায়েল ‘বিগিন ডকট্রিন’ বা বিগিন নীতি মেনে চলে। এই নীতি অনুযায়ী, তারা যেকোনো অস্তিত্বের হুমকির বিরুদ্ধে আগেভাগেই হামলা চালাবে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার প্রতি ইসরায়েল সরকার এই নীতি প্রয়োগ করে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক অভিযান বন্ধের ইঙ্গিত দিলেও তা হরমুজ প্রণালি খোলার শর্তে বেঁধে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি হবে, কিন্তু ভবিষ্যতে নিজেদের বা মিত্রদের সুরক্ষার আইনি অধিকার তারা কখনোই ছাড়বে না।
ইরানের এই দাবির পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক ট্রমা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম অবিশ্বাস। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র যখন ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (জেসিপিওএ) বা পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, তখন ইরানি নীতিনির্ধারকরা বুঝেছিলেন আমেরিকান নির্বাহীদের চুক্তির কোনো দাম নেই। ইরান চায় এমন ব্যবস্থা যাতে ভবিষ্যতের কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হুট করে আবার যুদ্ধ শুরু করতে বা ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগ করতে না পারেন।
তাত্ত্বিকভাবে এই দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে শান্তি চুক্তিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সপ্তম অধ্যায়ের রেজুলেশনের আওতায় আনতে হবে। অথবা ইরান তাদের কৌশলগত মিত্র রাশিয়া বা চীনকে চুক্তির গ্যারান্টর বা জামিনদার হিসেবে চাইতে পারে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ইরানের কৌশলগত স্থানে রুশ বা চীনা সামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের বিষয়ও থাকতে পারে।
এই শর্ত রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে সবচেয়ে কঠিন। ইসরায়েলও এমন কোনো আন্তর্জাতিক কাঠামো মানবে না যা তাদের হাত বেঁধে দেয়। তাছাড়া, ইরানে রুশ বা চীনা সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি পাল্টে দেবে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কখনোই মেনে নেবে না। ইরানকে হয়তো শেষ পর্যন্ত ‘ব্যবহারিক গ্যারান্টি’ বা এশীয় বাজারের সঙ্গে অর্থনৈতিক একীভূতকরণের মতো কোনো ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
চলমান এই সংঘাতে ইরানের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বোমা হামলায় ধ্বংস হওয়া সামরিক স্থাপনা, তেলের শোধনাগার এবং বেসামরিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য ইরান যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। ‘নৈতিক ক্ষতি’ বলতে ইরানিদের প্রাণহানি এবং মানসিক বিপর্যয়ের কথা বোঝানো হয়েছে। এই শর্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্পষ্ট আগ্রাসনকারী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে এ ধরনের দাবি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। ১৯৮১ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ক্লেইমস ট্রাইব্যুনাল বা ইরাক-কুয়েত ক্ষতিপূরণ কমিশনের মতো কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। একটি স্বাধীন নিরীক্ষক সংস্থা ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেই অর্থ একটি পুনর্নির্মাণ তহবিলে জমা দেবে।
তবে আমেরিকান বা ইসরায়েলি করদাতাদের টাকায় ইরান সরকারকে সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। ওয়াশিংটনে একে মুক্তিপণ বা সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন হিসেবে দেখা হবে। কূটনীতির দুনিয়ায় মুখ রক্ষার নানা উপায় থাকে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেবে না, কিন্তু বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করতে পারে। পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে ইরানকে খোলা বাজারে তেল বিক্রির সুযোগ দিতে পারে। ইরানি নেতারা একেই পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে আদায় করা ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে প্রচার করে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বিজয় দাবি করতে পারবেন।
ইরানের এই দাবি সবচেয়ে বেশি বৈশ্বিক প্রভাব ফেলা শর্ত। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের চোকপয়েন্ট। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পার হয়। এই প্রণালির ওপর ‘অধিকার’ দাবি করে ইরান মূলত সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে।

এই শর্ত বাস্তবায়ন করতে হলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিয়মনীতি নতুন করে লিখতে হবে। বর্তমানে এই প্রণালি জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদের (আনক্লস) অধীনে পরিচালিত হয়। সেখানে সব দেশের সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের বাধাহীন চলাচলের অধিকার রয়েছে। ইরানের শর্ত মানতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এমন চুক্তিতে সই করতে হবে যেখানে ইরানের নজরদারি ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এর ফলে বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ট্রানজিট ফি দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই শর্ত মানা একেবারেই অসম্ভব। ১৯৮০ সালের কার্টার ডকট্রিন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, বিশেষ করে তেলের অবাধ প্রবাহ রক্ষায় সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে বদ্ধপরিকর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নিয়মে উন্মুক্ত ও নিরাপদ হলেই কেবল যুদ্ধবিরতি বিবেচনা করা হবে। ইরানকে এই অধিকার দেওয়া মানে তাদের হাতে বিশ্ব অর্থনীতির গলা চেপে ধরার ক্ষমতা তুলে দেওয়া। এর ফলে উপসাগরীয় মিত্ররা পুরোপুরি ইরানের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র এটি কখনোই মানবে না। একমাত্র সম্ভাব্য আপস হতে পারে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের নৌবাহিনীই ওই অঞ্চলে থাকবে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে যৌথ আক্রমণ শুরু করে, তখন তাঁদের লক্ষ্য ছিল আকাশচুম্বী। তাঁদের প্রধান তিন উদ্দেশ্য ছিল—ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বকে উৎখাত করে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয় গুঁড়িয়ে দেওয়া; ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা চিরতরে ধ্বংস করা; এবং হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরানের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া।
এক মাস পেরোনোর পর দেখা যাচ্ছে, অর্জনের খাতা বেশ মিশ্র। বিমান হামলায় নিহত ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি। এই ঘটনাকে পুঁজি করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ‘নতুন সরকারের প্রেসিডেন্ট’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সফলভাবে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে। তিনি দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ইরানের ইসলামি শাসন ব্যবস্থা পুরোদমেই টিকে আছে।
ব্যর্থতার পাল্লাও হালকা নয়। হরমুজ প্রণালি এখনো অবরুদ্ধ। ইরান বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ ব্যাহত করে রেখেছে। তারা এখন চীনা ইউয়ান ও স্টেবলকয়েনে ট্রানজিট ফি দাবি করছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্যগুলো হোঁচট খাচ্ছে। ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রগুলো স্বীকার করেছে যে স্থলযুদ্ধ পরিকল্পনার চেয়ে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়েছে তারা ইরানের ভেতরে কোনো মার্কিন স্থল অভিযানে অংশ নেবে না, কারণ তাদের সেনাবাহিনী ক্লান্ত এবং রিজার্ভিস্টরা মানসিক অবসাদে ভুগছে। এদিকে মার্কিন সেনাবাহিনী আঞ্চলিক সম্পদ ধ্বংস হওয়ার কারণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই পরিমাণ অর্থের সম্ভাবনা যুদ্ধের আগেও ইরানের ছিল না।
এত বোমাবর্ষণের মধ্যেও ট্রাম্প কেন বারবার শান্তির কথা বলছেন? গত ১ এপ্রিল তিনি ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেন যে ইরানের ‘নতুন প্রেসিডেন্ট’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতি চেয়েছেন। যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দিয়েছে। ট্রাম্পের এই শান্তি বয়ান তৈরির পেছনে তিনটি প্রধান সংকট কাজ করছে।
প্রথমত, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা আমেরিকার জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়।
দ্বিতীয়ত, মার্কিন ভোটারদের বিপুল অংশ চায় যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক এবং তারা কোনোভাবেই মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের পক্ষে নয়।
তৃতীয়ত, ট্রাম্প প্রশাসন সম্মানজনক প্রস্থানের উপায় খুঁজছে। তারা এখন ‘রেজিম চেঞ্জ’ থেকে সরে এসে ‘সীমিত লক্ষ্যের’ দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ১৫ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা দিয়েছে। এই ১৫ দফার পুরো পাঠ্য গোপন থাকলেও ট্রাম্পের বক্তব্য ও হোয়াইট হাউসের ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে কিছু মূল মার্কিন দাবি জানা যায়। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি শর্তহীনভাবে খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ গুটিয়ে ফেলা এবং ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয় থেকে সরে এসে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রক্সি হামলা বন্ধ করা। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ইরানকে বোমাবর্ষণ করে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তবে তিনি একটি পরস্পরবিরোধী মন্তব্যও করেছেন। তিনি বলেছেন, ফ্রান্স বা অন্য দেশগুলো তেল চাইলে তারা নিজেরা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এর মানে দাঁড়ায়, ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধ শেষ করার জন্য ওই জলপথের নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি সরে আসতেও রাজি।
২০২৬ সালের এই যুদ্ধ সব পক্ষকেই খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। শান্তি এখন কোনো নৈতিক পছন্দ নয়, বরং কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। ইরানের দেওয়া চার শর্ত তাদের জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে যৌক্তিক হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অলঙ্ঘনীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে তা সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই শর্তগুলো হুবহু পূরণ করা অসম্ভব বলে মনে হয়। ওয়াশিংটন বা জেরুজালেম কেউ সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেবে না বা বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তবে এই সর্বোচ্চ দাবিগুলো কিছুটা কমিয়ে বাস্তবসম্মত সমঝোতায় আসা সম্ভব।
কোনো পক্ষেরই সম্পূর্ণ বিজয় বা আত্মসমর্পণের মাধ্যমে এই শান্তি আসবে না। শান্তি আসবে সূক্ষ্ম কূটনীতির মাধ্যমে, যেখানে উভয় পক্ষই ভাববে তারা যা চেয়েছিল তা পেয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, মিডিল ইস্ট মনিটর এবং দ্য ডিপ্লোম্যাট

এই বিপ্লব কেবল আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায়নি, বরং বিশ্বকে এক সম্পূর্ণ নতুন এবং অনন্য শাসনকাঠামোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ২০২৬ সালে এসে যখন এই প্রজাতন্ত্র ৪৭ বছরে পদার্পণ করছে, তখন এর সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ান অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক
২ দিন আগে
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ ৩২তম দিনে গড়িয়েছে। ইরানজুড়ে ইসরায়েল ও আমেরিকার বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। তেহরান ও ইসফাহানে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
৩ দিন আগে
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ বছর অন্তত ৩৮ জন শিশু হাম ও এর জটিলতায় মারা গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু মার্চ মাসেই ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে (আইডিএইচ) ২১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে ।
৪ দিন আগে
২০২৫ সালের শুরু থেকে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা চলছে। এই সময়ে স্বর্ণের দাম নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। জেপি মরগ্যান, ব্ল্যাকরক, গোল্ডম্যান স্যাকস, ওয়েলস ফার্গো, ইউবিএস, ডয়েচে ব্যাংকসহ বড় বড় বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো স্বর্ণে বিনিয়োগে ব্যাপকভাবে আশাবাদী। জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস
৫ দিন আগে