ইরান যুদ্ধ নিয়ে কেন চিন্তিত তাইওয়ান

তথ্যসূত্র:
তথ্যসূত্র:
দ্য কনভার্সেশন এবং সিএনএন

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৮: ০৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা পুরো বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব নিয়ে সবাই চিন্তিত। তবে ভৌগোলিক দিক থেকে এর থেকে দূরে থেকেও এশিয়ার দেশ তাইওয়ানের এই সংঘাত নিয়ে চিন্তাটা একটু ভিন্ন।

দেশটির রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষকেরা এই যুদ্ধকে দূরের কোনো ঘটনা নয়, বরং 'রিয়েল-টাইম ইন্ডিকেটর' হিসেবে দেখছেন। তাঁরা পর্যবেক্ষণ করছেন কৌশলগত চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কীভাবে কাজ করে। চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের যুদ্ধ বাধলে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসবে কি না—এমন প্রশ্নের চেয়ে একসঙ্গে একাধিক সংকট দেখা দিলে আমেরিকা কীভাবে সেই চাপ সামলাবে, সেই প্রশ্ন বেশি ভাবিয়ে তুলছে তাইওয়ানের বিশেষজ্ঞদের।

সীমার পরীক্ষা, উদ্দেশ্যের নয়

তাইওয়ান পরিষ্কার বুঝতে পারছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ বা ক্ষমতা অসীম নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। খোদ আমেরিকায় মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার গ্রাফ নিচের দিকে নামছে। তাঁর নিজের দলের লোকেরাই এখন যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরক্ষী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বাধ্য হয়ে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে 'থাড' ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিতে হয়েছে। ইরানের অসম বা 'অ্যাসাইমেট্রিক' যুদ্ধকৌশল সামলাতেও যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক মহড়া
তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক মহড়া

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক প্রভাব বা 'ডেটারেন্স'-এর ওপর। এই প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ করার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। চাপের মুখেও সেই ক্ষমতা অটুট থাকবে কি না, সেই বিশ্বাসের ওপরও নির্ভর করে। অন্য জায়গায় সংঘাত চললে হয়তো তাইওয়ান রক্ষায় আমেরিকার সদিচ্ছা কমবে না, কিন্তু এতে আমেরিকার সম্পদ এবং মনোযোগ অবশ্যই ভাগ হয়ে যাবে।

শক্তি প্রয়োগের নিয়মে বদল

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানে হামলা মূলত 'প্রতিরোধমূলক' বা প্রিভেন্টিভ। তারা বলছে আসন্ন কোনো হামলার জবাব দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং ভবিষ্যতের হুমকি কমানোই তাদের লক্ষ্য। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একই যুক্তিতে চীন নতুন পদক্ষেপ নিতে পারে—এই ভয় এখন তাইওয়ানে জেঁকে বসেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে যে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কাজ করেছে, তা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আঞ্চলিক মিত্রদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তারা এখন ভাবছে চীনকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কখন এবং কীভাবে কাজ করবে। ইরানে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ন্যাটো মিত্রদের কিছু জানায়নি। এতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মনেও শঙ্কা জাগতে পারে। তাইওয়ান ইস্যুতেও হয়তো যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে কোনো আগাম আলোচনা করবে না।

যুদ্ধ ছক মানে না

ইরান যুদ্ধ আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে মানিয়ে নেয়? তাইওয়ান নিয়ে আলোচনায় সাধারণত চীনের বড় আকারের আগ্রাসনের কথাই বেশি বলা হয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে সংঘাত হয়তো এতটা সোজা পথে এগোবে না। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, শত্রুর ভুল সংকেত বা দ্রুত বদলাতে থাকা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সংঘাত অন্য রূপ নিতে পারে।

এসব কারণে তাইওয়ানের কৌশলগত আলোচনায় পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা নীতি বিতর্ক এবং নিরাপত্তা ফোরামগুলোতে এখন কেবল সর্বাত্মক আগ্রাসনের কথা ভাবা হচ্ছে না। বরং চীন যদি 'গ্রে-জোন' কৌশল, অবরোধ বা ধাপে ধাপে চাপ বাড়ানোর নীতি নেয়, তবে কী হবে তা নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। সাইবার হামলা, সমুদ্রে বিধিনিষেধ বা সীমিত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এই চাপ কীভাবে বাড়তে পারে এবং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে কি না, সেদিকেই এখন সবার নজর।

একটি কৌশলগত চেকপয়েন্ট বা গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হলে তা কীভাবে পুরো বিশ্বকে দ্রুত প্রভাবিত করে, হরমুজ প্রণালির বর্তমান সংকট থেকে সেই শিক্ষা পাওয়া যাচ্ছে। তাইওয়ান প্রণালিতেও এমন কিছু ঘটতে পারে কি না এবং তখন যুক্তরাষ্ট্রসহ বাইরের শক্তিগুলো কীভাবে সাড়া দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পারেনি। তাহলে তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধ কি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে রাখা যাবে? নাকি তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে?

ভুল বোঝার ঝুঁকি

তাইওয়ানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চীন কীভাবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে মূল্যায়ন করে। বেইজিং যদি মনে করে সামরিক সম্পদের ঘাটতি বা দেশীয় চাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালাতে পারবে না, তবে তারা তাইওয়ানের ওপর চাপ প্রয়োগের ঝুঁকি নতুন করে হিসাব করতে পারে।

এর মানে এই নয় যে তাইওয়ান নিয়ে এখনই যুদ্ধ বেধে যাবে। তবে চীন হয়তো সর্বাত্মক যুদ্ধের ঠিক আগের ধাপ পর্যন্ত তাইওয়ানের ওপর চাপ বা জবরদস্তি চালানোর চেষ্টা করবে।

ইতিহাস বলে ক্ষমতার পরিষ্কার পরিবর্তনের চেয়ে শত্রুরা পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করে, তার ওপরই সংঘাত বেশি নির্ভর করে। রাষ্ট্রগুলো যখন মনে করে পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে, অথচ বাস্তবে তা নয়, তখনই ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়ে। তাই তাইওয়ানের কাজ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা নয়; নিজেদের অবস্থান যেন ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা না হয়, সেদিকেও তাদের নজর রাখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখা, সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ঐক্য মজবুত করা এবং জবরদস্তির যেকোনো চেষ্টায় শক্ত প্রতিরোধ গড়ার সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া।

প্রভাব বা ডেটারেন্স কেবল একটি দেশ কী করতে পারে তার ওপর নির্ভর করে না; অন্যরা কী বিশ্বাস করে এবং সেই বিশ্বাস তাদের ঝুঁকি নেওয়া থেকে বিরত রাখে কি না, তার ওপরও নির্ভর করে।

চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক আগ্রাসনের মুখে তাইওয়ান তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ বাড়িয়েছে। রণকৌশল নতুন করে সাজিয়েছে। সম্ভাব্য আগ্রাসন রুখে দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প দেখাচ্ছে তারা।

চীনের এখনই সামরিক অভিযান চালানোর কোনো ইঙ্গিত নেই। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তাইওয়ান দখলের হুমকি দিলেও, এমন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা জবাব আসতে পারে। এতে এমন এক ব্যয়বহুল সংঘাত শুরু হবে যা বিশ্ব বাণিজ্যকে ধ্বংস করে দেবে।

তবু তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে ৪০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার কোটি ডলারের একটি বিল প্রস্তাব করেছেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের মধ্যে ইতিহাসের অন্যতম বড় অস্ত্র চুক্তির কথা রয়েছে। বিলটি স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং বেইজিংয়ের প্রতিবাদের মুখে পড়েছে। চুক্তিটি সম্পন্ন করতে উৎসাহ দিতে মার্কিন সিনেটররা এই সপ্তাহে তাইওয়ান সফর করেছেন।

ব্যাংককে কর্মরত তাইওয়ানিজ রিয়েল এস্টেট এজেন্ট এডওয়ার্ড লাই বলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে হতাশার কারণে অনেক তাইওয়ানিজ থাইল্যান্ডে সম্পত্তি কিনছেন। তিনি জানান, তাঁর কোম্পানি খোঁজখবর নিতে আসা মানুষদের সামলাতে কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে। তাঁর ধারণা এর ৭০ শতাংশই ভূ-রাজনীতি নিয়ে চিন্তিত তাইওয়ানিজ।

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত দেখে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাইওয়ানের নিরাপত্তার জন্য বেসামরিক প্রতিরোধ অত্যন্ত জরুরি। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আলাবামার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক চার্লস উ বলেন, 'এটি শুধু কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এর আন্তর্জাতিক পরিণতিও আছে। চীন যদি দেখে তাইওয়ানের মানুষ মূলত তাদের লড়াইয়ের ইচ্ছা ছেড়ে দিচ্ছে, তবে হয়তো আগ্রাসনের দরকারই হবে না। তারা হয়তো দেশটিই কিনে নিতে পারবে।'

উ আরও বলেন, তাইওয়ানের মানুষের লড়াই করা বা পালানোর ইচ্ছার ওপর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু কত শতাংশ মানুষ তাইওয়ান থেকে জীবন বাজি রেখে লড়াই করবে, তা নির্ধারণ করা জটিল। কতজন মানুষ দ্বিতীয় পাসপোর্ট নিচ্ছেন বা বিদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলছেন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

সম্পর্কিত