স্যাটায়ার থেকে ‘বাস্তব দাবি’: ফেসবুকে ভুয়া প্রচারণা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্যাটায়ার থেকে বাস্তব দাবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
স্যাটায়ার থেকে বাস্তব দাবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

চলতি বছর স্যাটায়ার বা প্যারোডি পেজে প্রকাশিত একাধিক ভুয়া দাবি পরে সত্য হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। এভাবে প্রচারের সময় মূল পোস্টের পরিচয় ও প্রেক্ষাপট না দেওয়ায় অনেক ব্যবহারকারী সেগুলোকে বাস্তব সংবাদ মনে করেছেন। যেমন একটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে।

ভুয়া বক্তব্য, সিইসির নামে প্রচার

ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য হওয়ার পর নতুন সংসদ সদস্য কীভাবে নির্বাচিত হবেন, তা নিয়ে ফেসবুকে ভুয়া একটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে (, )। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের ছবি ব্যবহার করে এতে বলা হয়, নির্বাচনী ব্যয় কমাতে আসনটিতে আর ভোট নেওয়া হবে না। পরিবর্তে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া জামায়াত প্রার্থীকে সংসদ সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হবে।

তবে স্ট্রিমের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ফটোকার্ডটির দাবিটি ভুয়া।

ফটোকার্ডটির সূত্র মেলে ‘Gujob Tv-গুজব টিভি’ পেজের ২১ আগস্ট সকাল ৮টার একটি পোস্টে। পেজটিতে সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্ড, কাল্পনিক বক্তব্য ও প্রমাণহীন দাবি নিয়মিত প্রকাশিত হয়।

কিন্তু ঠাকুরগাঁও-১ সংক্রান্ত ফটোকার্ডে থাকা দাবিগুলো পরে একাধিক ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচার করা হয় (, , )। এসব পোস্টে বলা হয়, নির্বাচনী খরচ বাঁচাতে আসনটিতে উপনির্বাচন হবে না। আগের নির্বাচনে দ্বিতীয় হওয়া জামায়াত প্রার্থীই এমপি হবেন। তবে কোথাও দাবিগুলোকে স্যাটায়ার বা প্যারোডি বলে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে মূল পেজের ব্যঙ্গাত্মক বিষয়টি বাদ পড়েছে এবং দাবিগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য হিসেবে ছড়িয়েছে।

স্যাটায়ার ও প্যারোডি পোস্ট থেকে ছড়ানো তিনটি ভুয়া দাবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
স্যাটায়ার ও প্যারোডি পোস্ট থেকে ছড়ানো তিনটি ভুয়া দাবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

এভাবে দাবিগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা হলেও এর সমর্থনে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যে বরং ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী সেখানে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন আয়োজনের কথা জানিয়েছে কমিশন। ফলে ফটোকার্ডে উপনির্বাচন বাতিল এবং দ্বিতীয় প্রার্থীকে সংসদ সদস্য করার যে দাবি করা হয়েছে, তার কোনো বাস্তব বা আইনি ভিত্তি নেই।

তাসনিম জারার নামে ভুয়া প্রচারণা

স্যাটায়ার পেজের কাল্পনিক বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মন্তব্য হিসেবে প্রচারের আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় তাসনিম জারাকে ঘিরে। ২০ জানুয়ারি ‘My Bangla.tv’ পেজের একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, তিনি জামায়াতকে ভোট না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পেজটির পরিচিতিতে এটি বিনোদনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত বলে উল্লেখ রয়েছে।

পরে একই দাবি স্যাটায়ারের পরিচয় ছাড়াই একাধিক ফেসবুক পোস্টে প্রচার করা হয় (, )। যাচাইয়ে দাবিটির সমর্থনে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র বা গণমাধ্যমে তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলেও এমন কোনো বক্তব্যের সন্ধান মেলেনি।

প্রধান উপদেষ্টার নামে ‘গুলির নির্দেশ’

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নামেও স্যাটায়ার ফটোকার্ডকে বাস্তব খবর হিসেবে প্রচার করা হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি যমুনা টিভির আদলে তৈরি ‘জানিনা টিভি’ নামের একটি পেজের ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ভোটকেন্দ্রে কেউ বিশৃঙ্খলা করলে সেনাবাহিনীকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। পেজটির পরিচিতিতে নিজেদের বিনোদনমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করে পোস্টগুলো সিরিয়াসভাবে না নেওয়ার কথাও বলা রয়েছে। মূল ফটোকার্ডটিতে ১৫ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়ে।

পরে একই বক্তব্যসংবলিত ফটোকার্ড ‘প্রজাপতি টিভি’সহ একাধিক পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়। তবে প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ কিংবা নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমে এমন কোনো নির্দেশের তথ্য পাওয়া যায়নি। ডিসমিসল্যাবরিউমর স্ক্যানার-এর পৃথক যাচাইয়েও দাবিটিকে সত্য নয় বলে নিশ্চিত করা হয়।

এ ছাড়া স্যাটায়ার বা প্যারোডি পোস্টকে সত্য হিসেবে প্রচারের আরও কয়েকটি উদাহরণ দেখুন এখানে, এখানে, ও এখানে

ভুয়া উদ্ধৃতির ৪৪ শতাংশের উৎস স্যাটায়ার পেজ

ডিসমিসল্যাবের এপ্রিল থেকে জুন ২০২৬ সময়ের পর্যালোচনায় বানানো উদ্ধৃতি-সংক্রান্ত ৩৩২টি ফ্যাক্টচেকের মধ্যে অন্তত ১৪৬টির উৎস পাওয়া গেছে স্যাটায়ার ও প্যারোডি ফেসবুক পেজে। অর্থাৎ ৪৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রকৃত খবর হিসেবে ছড়িয়েছে। Gupto Television, Daily Mollar Desh, Bengali Steam ও GojobVision ছিল এই প্রবাহের বড় অংশের উৎস।

আরেক গবেষণায় ডিসমিসল্যাব সংবাদমাধ্যমের পরিচয় অনুকরণকারী পাঁচটি পেজের সাড়ে চার মাসের ৪ হাজার ২৪৩টি পোস্ট বিশ্লেষণ করেছে। গবেষণায় বলা হয়, এসব পোস্টে পরিচিত সংবাদমাধ্যমের মতো লোগো, আনুষ্ঠানিক বিন্যাস ও দৃঢ় ভাষা ব্যবহার করা হয়। ফলে অনেক ব্যবহারকারীর কাছে সেগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। মিডিয়া সাক্ষরতার ঘাটতির কারণে অনেকে স্যাটায়ার ও প্রকৃত সংবাদের পার্থক্যও বুঝতে পারেন না।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত