মান্টোর গল্প / জাভেদ হুসেনের অনুবাদ
জাভেদ হুসেন

প্রথমে ছুরি মারার দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছিল। এখন দুই পক্ষের মধ্যে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হওয়ার খবর আসতে লাগল। সেই লড়াইয়ে দেদার ব্যবহার হচ্ছিল চাকু-ছুরির পাশাপাশি কৃপাণ, তলোয়ার আর বন্দুক। মাঝে মাঝে দেশে তৈরি বোমা ফাটার খবরও আসছিল।
অমৃতসরের প্রায় সবারই ধারণা ছিল যে এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেশিদিন চলবে না। মানুষের উত্তেজনা উবে গেলেই পরিবেশ আবার আগের মতো শান্ত হয়ে যাবে। এর আগেও অমৃতসরে এমন অনেক দাঙ্গা হয়েছে। কোনটাই বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বড়জোর দশ থেকে পনেরো দিন কাটাকাটি-মারামারি চলত। তারপর নিজে থেকেই সব ঠান্ডা হয়ে যেত। পুরনো অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই লোকে ভাবছিল, এই আগুনও কিছুক্ষণের মধ্যে জোর হারিয়ে নিভে যাবে। কিন্তু তেমনটা হলো না। দাঙ্গাকারীদের তাণ্ডব দিনে দিনে আরও বাড়তে লাগল।
হিন্দুপাড়ায় যেসব মুসলমান থাকত, তারা পালাতে লাগল। একইভাবে মুসলমানদের মহল্লায় যেসব হিন্দু ছিল, তারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ জায়গার দিকে রওনা দিল। তবে এই ব্যবস্থা সবার কাছেই সাময়িক মনে হয়েছিল। তারা ভাবছিল, দাঙ্গার এই কালো মেঘ কেটে যাওয়া পর্যন্তই যা একটু ধকল।
অবসরপ্রাপ্ত সাব-জাজ মিয়াঁ আব্দুল হাইয়ের তো একশ ভাগ বিশ্বাস ছিল যে পরিস্থিতি খুব দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তাই তিনি খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। তাঁর এগারো বছরের একটা ছেলে ছিল। সতেরো বছরের একটা মেয়ে। আর ছিল সত্তরের কাছাকাছি বুড়ো এক পুরনো গৃহকর্মী। ছোট্ট একটা পরিবার। দাঙ্গা শুরু হতেই মিয়াঁ সাহেব আগাম সতর্কতা হিসেবে ঘরে প্রচুর রেশন জমিয়ে নিয়েছিলেন।
তাই তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ছিলেন। ভাবছিলেন, খোদা না করুন যদি পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয় আর দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলেও খাওয়া-পরা নিয়ে অন্তত দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না। কিন্তু তাঁর যুবতি মেয়ে সুগরা ভীষণ উদ্বেগের মধ্যে ছিল। তাদের বাড়িটা তিনতলা। আশেপাশের অন্য সব বাড়ির চেয়ে উঁচু। ছাদের চিলেকোঠা থেকে শহরের তিন-চতুর্থাংশ অংশ খুব ভালোভাবে দেখা যেত। সুগরা বেশ কয়েকদিন ধরেই দেখছিল, কাছে কিংবা দূরে কোথাও না কোথাও আগুন জ্বলছেই। প্রথম প্রথম ফায়ার ব্রিগেডের ঘণ্টার আওয়াজ শোনা যেত। এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। চারদিকে একসঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল। কোনটা নেভাবে?
রাতে পরিস্থিতি একদম বদলে যেত। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আগুনের উঁচু শিখা যেন আকাশ ছুঁতে চাইত। মনে হতো বিশাল কোনো দানব মুখ দিয়ে আগুনের ফোয়ারা ছোটাচ্ছে। তারপর অদ্ভুত সব আওয়াজ আসত। ‘হর হর মহাদেব’ আর ‘আল্লাহু আকবর’ স্লোগানের সঙ্গে মিশে সেই শব্দগুলো পরিবেশকে আরও ভয়ানক করে তুলত।
সুগরা বাবার কাছে নিজের ভয়ের কথা মুখে আনত না। কারণ বাবা একবার ঘরে বলে দিয়েছিলেন, ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। মিয়াঁ সাহেবের অনুমান সাধারণত মিছে হতো না। সুগরা এই ভেবে কিছুটা সান্ত্বনা পেত। কিন্তু যখন বিদ্যুৎ চলে গেল আর সেই সঙ্গে কলের পানি আসাও বন্ধ হয়ে গেল, তখন সে মিয়াঁ সাহেবের কাছে নিজের উৎকণ্ঠা প্রকাশ না করে পারল না। খুব ভয়ে ভয়ে পরামর্শ দিল, কিছুদিনের জন্য তারা যেন শরিফপুরায় চলে যায়। আশেপাশের সব মুসলমান ধীরে ধীরে ওখানেই চলে যাচ্ছিল।
মিয়াঁ সাহেব নিজের সিদ্ধান্ত বদলালেন না। বললেন, ‘বেকার ঘাবড়ানোর কোনো দরকার নেই। পরিস্থিতি খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে।’
কিন্তু পরিস্থিতি খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হলো না। উলটো দিনে দিনে আরও বিগড়ে গেল। মিয়াঁ আব্দুল হাইয়ের মহল্লা সম্পূর্ণ মুসলমান-শূন্য হয়ে গেল। আর খোদার কী ইচ্ছে, একদিন হঠাৎ মিয়াঁ সাহেবের প্যারালাইসিস হয়ে গেল। স্ট্রোকের কারণে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। তাঁর ছেলে বাশারত আগে একা একা ঘরে ওপরে-নিচে নানা খেলায় মগ্ন থাকত। সে-ও এখন কী ভেবে বাবার খাটের পাশে চুপচাপ বসে থাকত। যেন পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারছিল।
তাদের বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া বাজারটা একদম সুনসান হয়ে গেছে। ডাক্তার গোলাম মুস্তফার ডিসপেনসারি বহু আগে থেকেই বন্ধ। তার থেকে একটু দূরে ছিল ডাক্তার গৌর মলের চেম্বার। সুগরা বারান্দা থেকে দেখে সেখানেও তালা ঝুলছে। মিয়াঁ সাহেবের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। সুগরা বিচলিত হয়ে পড়েছিল। বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পাওয়ার দশা। সে বাশারতকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, ‘খোদার দোহাই, তুই কিছু একটা কর। আমি জানি বাইরে বের হলে বিপদ হতে পারে। কিন্তু ... যেমনি করে হক কাউকে ডেকে নিয়ে আয়। আব্বা জির অবস্থা খুবই খারাপ।’
বাশারত গেল। কিন্তু পরক্ষণেই ফিরে এলো। তার চেহারা ফ্যাকাশে। মোড়ের চকে সে একটা লাশ দেখে এসেছে। রক্তে ভেজা... আর কাছেই একদল মানুষ জটলা পাকিয়ে একটা দোকান লুটপাট করছিল।
সুগরা তার আতঙ্কিত ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরল। সবকিছু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে সবুর করে বসে থাকা ছাড়া কিছু করবার নেই। কিন্তু বাবার এই অবস্থা আর সহ্য হচ্ছিল না। মিয়াঁ সাহেবের শরীরের ডান দিকটা সম্পূর্ণ অবশ। যেন শরীরে প্রাণই নেই। কণ্ঠস্বরও জড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি এখন বেশির ভাগ সময় ইশারায় কথা বলতেন। কথা অবশ্য একটাই—‘সুগরা, ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। খোদার রহমতে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
কিন্তু কিছুই ঠিক হলো না। রোজা শেষ হয়ে আসছিল। আর মাত্র দুটো বাকি। মিয়াঁ সাহেবের ধারণা ছিল ঈদের আগেই পরিস্থিতি একদম সামলে যাবে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে, হয়তো ঈদের দিনটাই কেয়ামতের দিন হবে। ছাদের চিলেকোঠা থেকে এখন শহরের প্রায় প্রতিটা অংশ থেকেই ধোঁয়ার মেঘ উড়তে দেখা যাচ্ছিল। রাতে বোমা ফাটার ভয়ানক আওয়াজ আসত। সুগরা আর বাশারত এক মুহূর্তের জন্যও দুই চোখের পাতা এক করতে পারত না।
সুগরাকে এমনিতেও বাবার সেবার জন্য জেগে থাকতে হতো। নির্ঘুম চোখে এখন মনে হচ্ছিল এই বোমাগুলো তার মাথার ভেতরেই ফাটছে। একবার সে তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবার দিকে তাকাত, আরেকবার তার আতঙ্কগ্রস্ত ভাইয়ের দিকে...। আর ছিল সত্তর বছরের বুড়ো গৃহকর্মী আকবর। ওর থাকা না-থাকা সমান। সে সারা দিন আর সারা রাত নিজের কুঠুরিতে বসে শুধু কাশত, গলা খাঁকারি দিত আর শব্দ করে কফ ফেলত।
একদিন অতিষ্ঠ হয়ে সুগরা তার ওপর খেপে গেল, ‘তুমি কী করছ শুনি? দেখছ না মিয়াঁ সাহেবের কী দশা! আসলে তুমি এক নম্বরের নিমকহারাম। এখন সেবার সময় এসেছে, আর তুমি হাফানির বাহানা করে এখানে পড়ে আছ... লোকেরা নাকি মুনিবের জন্য নিজের জান পর্যন্ত বাজি রাখে।’
সুগরা মনের ঝাল মিটিয়ে চলে গেল। পরে অবশ্য তার আফসোস হলো যে অযথা গরিব লোকটাকে এত বকাঝকা করল। রাতের খাবার থালায় সাজিয়ে সে বুড়োর কুঠুরিতে গিয়ে দেখল ঘর খালি। বাশারত বাড়ির এদিক-ওদিক খুঁজল। কিন্তু আকবরকে পাওয়া গেল না। বাইরের দরজার ছিটকিনি খোলা ছিল। যার মানে সে মিয়াঁ সাহেবের জন্য কিছু একটা করতেই বাইরে গেছে। সুগরা অনেক দোয়া করল…খোদা! আকবর যেন কিছু একটা করতে পারে। কিন্তু দুই দিন কেটে গেল, সে আর ফিরল না।
সন্ধ্যার সময়। রোজার শেষের এমন অনেক সন্ধ্যা সুগরা আর বাশারত আগে দেখেছে। তখন ঈদের আগমনী উল্লাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। ঈদের চাঁদ দেখার জন্য তাদের চোখ আকাশের গায়ে আটকে থাকত। পরের দিনই ঈদ। শুধু চাঁদ দেখার অপেক্ষা। দুজন কতই না ব্যাকুল হয়ে থাকত!
আকাশে চাঁদ ওঠার জায়গায় যদি মেঘের কোনো জেদি টুকরো জমে থাকত, তাদের খুব বিরক্ত লাগত! কিন্তু এখন চারদিকে শুধু ধোঁয়ার মেঘ। সুগরা আর বাশারত দুজনেই চিলেকোঠায় উঠল। দূরে কোথাও কোথাও ছাদের ওপর মানুষের ছায়া দিগন্তে কালো দাগের মতো দেখা যাচ্ছিল। ওই মানুষগুলো চাঁদ দেখছিল, নাকি জায়গায় জায়গায় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন দেখছিল? কে জানে!
কিন্তু চাঁদটাও কেমন নাছোড়বান্দা! ধোঁয়ার চাদর ভেদ করেও ঠিকই দেখা দিল। সুগরা হাত তুলে দোয়া করল—খোদা… তুমি বাবাকে সুস্থ করে দাও। বাশারত মনে মনে খুব বিরক্ত হচ্ছিল। এই গোলমালের কারণে এত সুন্দর একটা ঈদ মাটি হয়ে গেল।
দিন তখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সন্ধ্যার কালো রঙ তখনো ফ্যাকাশে। পানি ছিটানো উঠোনে মিয়াঁ সাহেবের খাট পাতা। তিনি তার ওপর নিস্পন্দ আর নিশ্চল হয়ে শুয়ে ছিলেন। দূরে আকাশের দিকে চোখ মেলে তিনি যে কী ভাবছিলেন, কে জানে!
ঈদের চাঁদ দেখে সুগরা তাঁকে সালাম করল। তিনি ইশারায় জবাব দিলেন। সুগরা মাথা নোয়ালে তিনি তাঁর ভালো হাতটা তুলে পরম স্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
সুগরার চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। মিয়াঁ সাহেবের চোখ দুটিও ছলছল করে উঠল। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তিনি অনেক কায়দা করে তাঁর আধ-অবশ জবান দিয়ে এই শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন, ‘আল্লাহ সব ঠিক করে দেবেন।‘
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। সুগরার বুকটা ধক করে উঠল। সে বাশারতের দিকে তাকাল। বাশারতের চেহারা কাগজের মতো সাদা।
দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল। মিয়াঁ সাহেব সুগরার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন, ‘দেখো, কে এসেছে!’
সুগরা ভাবল, বুড়ো আকবর না তো? এই ভাবনায় ওর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বাশারতের হাত ধরে সে বলল, ‘যা, দেখ তো... হয়তো আকবর এসেছে।’
একথা শুনে মিয়াঁ সাহেব না-সূচক মাথা নাড়লেন। যেন তিনি বলছেন, ‘না... এ আকবর নয়।’
সুগরা বলল, ‘তাহলে আর কে হতে পারে আব্বা জি?’
মিয়াঁ আব্দুল হাই নিজের অবশ জিভের ওপর জোর দিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন, এমন সময় বাশারত ফিরে এলো। সে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। রীতিমত হাফাচ্ছে। সুগরাকে মিয়াঁ সাহেবের খাটের একপাশে সরিয়ে নিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, ‘একজন শিখ!’
সুগরারর মুখ থেকে একটা অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে এল, ‘শিখ...? কী বলছে সে?’
বাশারত জবাব দিল, ‘বলছে দরজা খোলো।’
সুগরা কাঁপতে কাঁপতে বাশারতকে কাছে টেনে নিল। বাবার খাটের কিনারে বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাতে লাগল।
মিয়াঁ আব্দুল হাইয়ের পাতলা, প্রাণহীন ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল, ‘যাও... গুরমুখ সিং এসেছে!’
বাশারত না-সূচক মাথা নাড়ল, ‘না, অন্য কেউ।’
মিয়াঁ সাহেব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভঙ্গিতে বললেন, ‘যাও সুগরা, ওই-ই এসেছে!’
সুগরা উঠল। সে গুরমুখ সিংকে চেনে। পেনশন নেওয়ার কিছুকাল আগে তার বাবা এই নামের এক শিখ লোকের একটা উপকার করেছিলেন। সুগরার ঠিকঠাক মনে নেই। কী একটা মিথ্যা মামলা থেকে খালাস পাইয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে সে প্রতি ছোট ঈদের আগের দিন সেমাইয়ের একটা থালা নিয়ে আসত।
বাবা কতবার তাকে বলেছিলেন, ‘সর্দারজি, আপনি এই কষ্ট কেন করতে যান?’ কিন্তু সে হাত জোড় করে জবাব দিত, ‘মিয়াঁ সাহেব, ওয়াহেগুরু জির কৃপায় আপনার কাছে সব আছে। আমি প্রতি বছর জনাবের খিদমতে এই সামান্য উপহার নিয়ে আসি। আমার ওপর আপনি যে এহসান করেছেন, তার ঋণ তো আমার শত পুরুষেও শোধ করতে পারবে না... খোদা আপনাকে খুশ রাখুন।’
সর্দার গুরমুখ সিংয়ের প্রতি বছর ঈদের আগের দিন সেমাইয়ের থালা নিয়ে আসার এই ধারা দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে। সুগরা নিজেই অবাক হলো… কড়া নাড়ার শব্দ শুনে কেন তার মাথায় এলো না যে সে-ই হবে! কিন্তু বাশারতও তো তাকে শত শত বার দেখেছে। তাহলে সে কেন বলল অন্য কেউ এসেছে? আর কে-ই বা হতে পারে? এসব ভাবতে ভাবতে সুগরা সদর দরজার বারান্দায় পৌঁছাল।
দরজা খুলবে নাকি ভেতর থেকেই জিজ্ঞেস করবে? সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তখনই দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো। সুগরার বুক দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। অতি কষ্টে সে গলা থেকে আওয়াজ বের করল, ‘কে?’
বাশারত পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে দরজার একটা ফাঁকের দিকে ইশারা করে ফিসফিস করে সুগরাকে বলল, ‘এখান দিয়ে দেখো।‘
সুগরা ফাঁক দিয়ে দেখল। লোকটা গুরমুখ সিং না। সে তো ছিল ভীষণ বুড়ো। আর বাইরে চাতালে দাঁড়িয়ে এক যুবক। সুগরা যখন দরজার ফাঁকে চোখ রেখে তাকে পরখ করছে, তখন সে আবারও দরজায় কড়া নাড়ল। সুগরা দেখল, তার হাতে একটা কাগজের থলি—ঠিক যেমনটা গুরমুখ সিং নিয়ে আসত।
সুগরা ফাঁক থেকে চোখ সরিয়ে নিল এবং একটু উঁচু গলায় কড়া নাড়তে থাকা লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে?’
বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, ‘জি আমি... আমি সর্দার গুরমুখ সিংয়ের ছেলে... সন্তোষ!’
সুগরার ভয় অনেকটাই কেটে গেল। বেশ ভদ্রতার সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করল, ‘জি, বলুন।’
বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, ‘জজ সাহেব আছেন?’
সুগরা জবাব দিল, ‘উনি অসুস্থ।’
সর্দার সন্তোষ সিং আফসোসের সুরে বলল, ‘ওহ্...’। তারপর সে কাগজের থলিটা নাড়িয়ে খড়খড় শব্দ করল।
‘জি, এই যে সেমাই... আমার বাবা আনতেন। উনি মারা গেছেন!’
সুগরা অবাক হয়ে বলল, ‘মারা গেছেন?’
বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, ‘জি হ্যাঁ... এক মাস হলো... মারা যাওয়ার আগে উনি আমাকে কড়া নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন যে—দেখো বাবা, আমি জজ সাহেবের খিদমতে পুরো দশ বছর ধরে প্রতি ছোট ঈদে সেমাই নিয়ে গেছি... আমার মরার পর এই কাজ এখন তোমাকেই করতে হবে। আমি বাবাকে কথা দিয়েছিলাম... সেমাইটা নিন।’
সুগরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল। তার চোখে জল এলো। সে দরজাটা সামান্য একটু খুলল। সর্দার গুরমুখ সিংয়ের ছেলে সেমাইয়ের থলিটা এগিয়ে দিল। সুগরা সেটা হাতে নিয়ে বলল, ‘খোদা সর্দার জিকে বেহেশত নসিব করুন।’
গুরমুখ সিংয়ের ছেলে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘জজ সাহেব অসুস্থ?’
সুগরা জবাব দিল, ‘জি হ্যাঁ!’
‘কী অসুখ?’
‘স্ট্রোক করেছে। প্যারালাইসিস!’
‘আহা... বাবা বেঁচে থাকলে একথা শুনে খুব কষ্ট পেতেন... মরার আগ পর্যন্ত তাঁর জজ সাহেবের এহসানের কথা মনে ছিল। বলতেন, তিনি মানুষ নন, দেবতা... আল্লাহ মিয়াঁ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখুন। আচ্ছা, তাঁকে আমার সালাম জানাবেন।’
এই বলে সে চাতাল থেকে নেমে গেল। সুগরা ভাবল তাকে ডেকে বলে যেন জজ সাহেবের জন্য কোনো ডাক্তারের ব্যবস্থা করে দেয়।
সর্দার গুরমুখ সিংয়ের ছেলে সন্তোষ জজ সাহেবের বাড়ির চাতাল থেকে নেমে গজ কয়েক এগোতেই চারজন ওঁত পেতে থাকা লোক তার কাছে এল। দুজনের হাতে ছিল জ্বলন্ত মশাল। আর দুজনের কাছে কেরোসিনের কন্টেইনার। একজন সন্তোষকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী সর্দার জি, কাজ সেরে এলে?’
সন্তোষ মাথা নেড়ে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, সেরে এসেছি।’
লোকটি দলের, হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে জজ সাহেবের মামলাটা শেষ করে আসি?’
‘যাও... যেমন তোমাদের মর্জি!’ এটুকু বলে সর্দার গুরমুখ সিংয়ের ছেলে হাঁটা দিল।
উৎস: মান্টোনামা

প্রথমে ছুরি মারার দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছিল। এখন দুই পক্ষের মধ্যে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হওয়ার খবর আসতে লাগল। সেই লড়াইয়ে দেদার ব্যবহার হচ্ছিল চাকু-ছুরির পাশাপাশি কৃপাণ, তলোয়ার আর বন্দুক। মাঝে মাঝে দেশে তৈরি বোমা ফাটার খবরও আসছিল।
অমৃতসরের প্রায় সবারই ধারণা ছিল যে এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেশিদিন চলবে না। মানুষের উত্তেজনা উবে গেলেই পরিবেশ আবার আগের মতো শান্ত হয়ে যাবে। এর আগেও অমৃতসরে এমন অনেক দাঙ্গা হয়েছে। কোনটাই বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বড়জোর দশ থেকে পনেরো দিন কাটাকাটি-মারামারি চলত। তারপর নিজে থেকেই সব ঠান্ডা হয়ে যেত। পুরনো অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই লোকে ভাবছিল, এই আগুনও কিছুক্ষণের মধ্যে জোর হারিয়ে নিভে যাবে। কিন্তু তেমনটা হলো না। দাঙ্গাকারীদের তাণ্ডব দিনে দিনে আরও বাড়তে লাগল।
হিন্দুপাড়ায় যেসব মুসলমান থাকত, তারা পালাতে লাগল। একইভাবে মুসলমানদের মহল্লায় যেসব হিন্দু ছিল, তারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ জায়গার দিকে রওনা দিল। তবে এই ব্যবস্থা সবার কাছেই সাময়িক মনে হয়েছিল। তারা ভাবছিল, দাঙ্গার এই কালো মেঘ কেটে যাওয়া পর্যন্তই যা একটু ধকল।
অবসরপ্রাপ্ত সাব-জাজ মিয়াঁ আব্দুল হাইয়ের তো একশ ভাগ বিশ্বাস ছিল যে পরিস্থিতি খুব দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তাই তিনি খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। তাঁর এগারো বছরের একটা ছেলে ছিল। সতেরো বছরের একটা মেয়ে। আর ছিল সত্তরের কাছাকাছি বুড়ো এক পুরনো গৃহকর্মী। ছোট্ট একটা পরিবার। দাঙ্গা শুরু হতেই মিয়াঁ সাহেব আগাম সতর্কতা হিসেবে ঘরে প্রচুর রেশন জমিয়ে নিয়েছিলেন।
তাই তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ছিলেন। ভাবছিলেন, খোদা না করুন যদি পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয় আর দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলেও খাওয়া-পরা নিয়ে অন্তত দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না। কিন্তু তাঁর যুবতি মেয়ে সুগরা ভীষণ উদ্বেগের মধ্যে ছিল। তাদের বাড়িটা তিনতলা। আশেপাশের অন্য সব বাড়ির চেয়ে উঁচু। ছাদের চিলেকোঠা থেকে শহরের তিন-চতুর্থাংশ অংশ খুব ভালোভাবে দেখা যেত। সুগরা বেশ কয়েকদিন ধরেই দেখছিল, কাছে কিংবা দূরে কোথাও না কোথাও আগুন জ্বলছেই। প্রথম প্রথম ফায়ার ব্রিগেডের ঘণ্টার আওয়াজ শোনা যেত। এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। চারদিকে একসঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল। কোনটা নেভাবে?
রাতে পরিস্থিতি একদম বদলে যেত। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আগুনের উঁচু শিখা যেন আকাশ ছুঁতে চাইত। মনে হতো বিশাল কোনো দানব মুখ দিয়ে আগুনের ফোয়ারা ছোটাচ্ছে। তারপর অদ্ভুত সব আওয়াজ আসত। ‘হর হর মহাদেব’ আর ‘আল্লাহু আকবর’ স্লোগানের সঙ্গে মিশে সেই শব্দগুলো পরিবেশকে আরও ভয়ানক করে তুলত।
সুগরা বাবার কাছে নিজের ভয়ের কথা মুখে আনত না। কারণ বাবা একবার ঘরে বলে দিয়েছিলেন, ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। মিয়াঁ সাহেবের অনুমান সাধারণত মিছে হতো না। সুগরা এই ভেবে কিছুটা সান্ত্বনা পেত। কিন্তু যখন বিদ্যুৎ চলে গেল আর সেই সঙ্গে কলের পানি আসাও বন্ধ হয়ে গেল, তখন সে মিয়াঁ সাহেবের কাছে নিজের উৎকণ্ঠা প্রকাশ না করে পারল না। খুব ভয়ে ভয়ে পরামর্শ দিল, কিছুদিনের জন্য তারা যেন শরিফপুরায় চলে যায়। আশেপাশের সব মুসলমান ধীরে ধীরে ওখানেই চলে যাচ্ছিল।
মিয়াঁ সাহেব নিজের সিদ্ধান্ত বদলালেন না। বললেন, ‘বেকার ঘাবড়ানোর কোনো দরকার নেই। পরিস্থিতি খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে।’
কিন্তু পরিস্থিতি খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হলো না। উলটো দিনে দিনে আরও বিগড়ে গেল। মিয়াঁ আব্দুল হাইয়ের মহল্লা সম্পূর্ণ মুসলমান-শূন্য হয়ে গেল। আর খোদার কী ইচ্ছে, একদিন হঠাৎ মিয়াঁ সাহেবের প্যারালাইসিস হয়ে গেল। স্ট্রোকের কারণে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। তাঁর ছেলে বাশারত আগে একা একা ঘরে ওপরে-নিচে নানা খেলায় মগ্ন থাকত। সে-ও এখন কী ভেবে বাবার খাটের পাশে চুপচাপ বসে থাকত। যেন পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারছিল।
তাদের বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া বাজারটা একদম সুনসান হয়ে গেছে। ডাক্তার গোলাম মুস্তফার ডিসপেনসারি বহু আগে থেকেই বন্ধ। তার থেকে একটু দূরে ছিল ডাক্তার গৌর মলের চেম্বার। সুগরা বারান্দা থেকে দেখে সেখানেও তালা ঝুলছে। মিয়াঁ সাহেবের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। সুগরা বিচলিত হয়ে পড়েছিল। বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পাওয়ার দশা। সে বাশারতকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, ‘খোদার দোহাই, তুই কিছু একটা কর। আমি জানি বাইরে বের হলে বিপদ হতে পারে। কিন্তু ... যেমনি করে হক কাউকে ডেকে নিয়ে আয়। আব্বা জির অবস্থা খুবই খারাপ।’
বাশারত গেল। কিন্তু পরক্ষণেই ফিরে এলো। তার চেহারা ফ্যাকাশে। মোড়ের চকে সে একটা লাশ দেখে এসেছে। রক্তে ভেজা... আর কাছেই একদল মানুষ জটলা পাকিয়ে একটা দোকান লুটপাট করছিল।
সুগরা তার আতঙ্কিত ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরল। সবকিছু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে সবুর করে বসে থাকা ছাড়া কিছু করবার নেই। কিন্তু বাবার এই অবস্থা আর সহ্য হচ্ছিল না। মিয়াঁ সাহেবের শরীরের ডান দিকটা সম্পূর্ণ অবশ। যেন শরীরে প্রাণই নেই। কণ্ঠস্বরও জড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি এখন বেশির ভাগ সময় ইশারায় কথা বলতেন। কথা অবশ্য একটাই—‘সুগরা, ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। খোদার রহমতে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
কিন্তু কিছুই ঠিক হলো না। রোজা শেষ হয়ে আসছিল। আর মাত্র দুটো বাকি। মিয়াঁ সাহেবের ধারণা ছিল ঈদের আগেই পরিস্থিতি একদম সামলে যাবে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে, হয়তো ঈদের দিনটাই কেয়ামতের দিন হবে। ছাদের চিলেকোঠা থেকে এখন শহরের প্রায় প্রতিটা অংশ থেকেই ধোঁয়ার মেঘ উড়তে দেখা যাচ্ছিল। রাতে বোমা ফাটার ভয়ানক আওয়াজ আসত। সুগরা আর বাশারত এক মুহূর্তের জন্যও দুই চোখের পাতা এক করতে পারত না।
সুগরাকে এমনিতেও বাবার সেবার জন্য জেগে থাকতে হতো। নির্ঘুম চোখে এখন মনে হচ্ছিল এই বোমাগুলো তার মাথার ভেতরেই ফাটছে। একবার সে তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবার দিকে তাকাত, আরেকবার তার আতঙ্কগ্রস্ত ভাইয়ের দিকে...। আর ছিল সত্তর বছরের বুড়ো গৃহকর্মী আকবর। ওর থাকা না-থাকা সমান। সে সারা দিন আর সারা রাত নিজের কুঠুরিতে বসে শুধু কাশত, গলা খাঁকারি দিত আর শব্দ করে কফ ফেলত।
একদিন অতিষ্ঠ হয়ে সুগরা তার ওপর খেপে গেল, ‘তুমি কী করছ শুনি? দেখছ না মিয়াঁ সাহেবের কী দশা! আসলে তুমি এক নম্বরের নিমকহারাম। এখন সেবার সময় এসেছে, আর তুমি হাফানির বাহানা করে এখানে পড়ে আছ... লোকেরা নাকি মুনিবের জন্য নিজের জান পর্যন্ত বাজি রাখে।’
সুগরা মনের ঝাল মিটিয়ে চলে গেল। পরে অবশ্য তার আফসোস হলো যে অযথা গরিব লোকটাকে এত বকাঝকা করল। রাতের খাবার থালায় সাজিয়ে সে বুড়োর কুঠুরিতে গিয়ে দেখল ঘর খালি। বাশারত বাড়ির এদিক-ওদিক খুঁজল। কিন্তু আকবরকে পাওয়া গেল না। বাইরের দরজার ছিটকিনি খোলা ছিল। যার মানে সে মিয়াঁ সাহেবের জন্য কিছু একটা করতেই বাইরে গেছে। সুগরা অনেক দোয়া করল…খোদা! আকবর যেন কিছু একটা করতে পারে। কিন্তু দুই দিন কেটে গেল, সে আর ফিরল না।
সন্ধ্যার সময়। রোজার শেষের এমন অনেক সন্ধ্যা সুগরা আর বাশারত আগে দেখেছে। তখন ঈদের আগমনী উল্লাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। ঈদের চাঁদ দেখার জন্য তাদের চোখ আকাশের গায়ে আটকে থাকত। পরের দিনই ঈদ। শুধু চাঁদ দেখার অপেক্ষা। দুজন কতই না ব্যাকুল হয়ে থাকত!
আকাশে চাঁদ ওঠার জায়গায় যদি মেঘের কোনো জেদি টুকরো জমে থাকত, তাদের খুব বিরক্ত লাগত! কিন্তু এখন চারদিকে শুধু ধোঁয়ার মেঘ। সুগরা আর বাশারত দুজনেই চিলেকোঠায় উঠল। দূরে কোথাও কোথাও ছাদের ওপর মানুষের ছায়া দিগন্তে কালো দাগের মতো দেখা যাচ্ছিল। ওই মানুষগুলো চাঁদ দেখছিল, নাকি জায়গায় জায়গায় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন দেখছিল? কে জানে!
কিন্তু চাঁদটাও কেমন নাছোড়বান্দা! ধোঁয়ার চাদর ভেদ করেও ঠিকই দেখা দিল। সুগরা হাত তুলে দোয়া করল—খোদা… তুমি বাবাকে সুস্থ করে দাও। বাশারত মনে মনে খুব বিরক্ত হচ্ছিল। এই গোলমালের কারণে এত সুন্দর একটা ঈদ মাটি হয়ে গেল।
দিন তখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সন্ধ্যার কালো রঙ তখনো ফ্যাকাশে। পানি ছিটানো উঠোনে মিয়াঁ সাহেবের খাট পাতা। তিনি তার ওপর নিস্পন্দ আর নিশ্চল হয়ে শুয়ে ছিলেন। দূরে আকাশের দিকে চোখ মেলে তিনি যে কী ভাবছিলেন, কে জানে!
ঈদের চাঁদ দেখে সুগরা তাঁকে সালাম করল। তিনি ইশারায় জবাব দিলেন। সুগরা মাথা নোয়ালে তিনি তাঁর ভালো হাতটা তুলে পরম স্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
সুগরার চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। মিয়াঁ সাহেবের চোখ দুটিও ছলছল করে উঠল। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তিনি অনেক কায়দা করে তাঁর আধ-অবশ জবান দিয়ে এই শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন, ‘আল্লাহ সব ঠিক করে দেবেন।‘
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। সুগরার বুকটা ধক করে উঠল। সে বাশারতের দিকে তাকাল। বাশারতের চেহারা কাগজের মতো সাদা।
দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল। মিয়াঁ সাহেব সুগরার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন, ‘দেখো, কে এসেছে!’
সুগরা ভাবল, বুড়ো আকবর না তো? এই ভাবনায় ওর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বাশারতের হাত ধরে সে বলল, ‘যা, দেখ তো... হয়তো আকবর এসেছে।’
একথা শুনে মিয়াঁ সাহেব না-সূচক মাথা নাড়লেন। যেন তিনি বলছেন, ‘না... এ আকবর নয়।’
সুগরা বলল, ‘তাহলে আর কে হতে পারে আব্বা জি?’
মিয়াঁ আব্দুল হাই নিজের অবশ জিভের ওপর জোর দিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন, এমন সময় বাশারত ফিরে এলো। সে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। রীতিমত হাফাচ্ছে। সুগরাকে মিয়াঁ সাহেবের খাটের একপাশে সরিয়ে নিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, ‘একজন শিখ!’
সুগরারর মুখ থেকে একটা অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে এল, ‘শিখ...? কী বলছে সে?’
বাশারত জবাব দিল, ‘বলছে দরজা খোলো।’
সুগরা কাঁপতে কাঁপতে বাশারতকে কাছে টেনে নিল। বাবার খাটের কিনারে বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাতে লাগল।
মিয়াঁ আব্দুল হাইয়ের পাতলা, প্রাণহীন ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল, ‘যাও... গুরমুখ সিং এসেছে!’
বাশারত না-সূচক মাথা নাড়ল, ‘না, অন্য কেউ।’
মিয়াঁ সাহেব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভঙ্গিতে বললেন, ‘যাও সুগরা, ওই-ই এসেছে!’
সুগরা উঠল। সে গুরমুখ সিংকে চেনে। পেনশন নেওয়ার কিছুকাল আগে তার বাবা এই নামের এক শিখ লোকের একটা উপকার করেছিলেন। সুগরার ঠিকঠাক মনে নেই। কী একটা মিথ্যা মামলা থেকে খালাস পাইয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে সে প্রতি ছোট ঈদের আগের দিন সেমাইয়ের একটা থালা নিয়ে আসত।
বাবা কতবার তাকে বলেছিলেন, ‘সর্দারজি, আপনি এই কষ্ট কেন করতে যান?’ কিন্তু সে হাত জোড় করে জবাব দিত, ‘মিয়াঁ সাহেব, ওয়াহেগুরু জির কৃপায় আপনার কাছে সব আছে। আমি প্রতি বছর জনাবের খিদমতে এই সামান্য উপহার নিয়ে আসি। আমার ওপর আপনি যে এহসান করেছেন, তার ঋণ তো আমার শত পুরুষেও শোধ করতে পারবে না... খোদা আপনাকে খুশ রাখুন।’
সর্দার গুরমুখ সিংয়ের প্রতি বছর ঈদের আগের দিন সেমাইয়ের থালা নিয়ে আসার এই ধারা দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে। সুগরা নিজেই অবাক হলো… কড়া নাড়ার শব্দ শুনে কেন তার মাথায় এলো না যে সে-ই হবে! কিন্তু বাশারতও তো তাকে শত শত বার দেখেছে। তাহলে সে কেন বলল অন্য কেউ এসেছে? আর কে-ই বা হতে পারে? এসব ভাবতে ভাবতে সুগরা সদর দরজার বারান্দায় পৌঁছাল।
দরজা খুলবে নাকি ভেতর থেকেই জিজ্ঞেস করবে? সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তখনই দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো। সুগরার বুক দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। অতি কষ্টে সে গলা থেকে আওয়াজ বের করল, ‘কে?’
বাশারত পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে দরজার একটা ফাঁকের দিকে ইশারা করে ফিসফিস করে সুগরাকে বলল, ‘এখান দিয়ে দেখো।‘
সুগরা ফাঁক দিয়ে দেখল। লোকটা গুরমুখ সিং না। সে তো ছিল ভীষণ বুড়ো। আর বাইরে চাতালে দাঁড়িয়ে এক যুবক। সুগরা যখন দরজার ফাঁকে চোখ রেখে তাকে পরখ করছে, তখন সে আবারও দরজায় কড়া নাড়ল। সুগরা দেখল, তার হাতে একটা কাগজের থলি—ঠিক যেমনটা গুরমুখ সিং নিয়ে আসত।
সুগরা ফাঁক থেকে চোখ সরিয়ে নিল এবং একটু উঁচু গলায় কড়া নাড়তে থাকা লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে?’
বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, ‘জি আমি... আমি সর্দার গুরমুখ সিংয়ের ছেলে... সন্তোষ!’
সুগরার ভয় অনেকটাই কেটে গেল। বেশ ভদ্রতার সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করল, ‘জি, বলুন।’
বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, ‘জজ সাহেব আছেন?’
সুগরা জবাব দিল, ‘উনি অসুস্থ।’
সর্দার সন্তোষ সিং আফসোসের সুরে বলল, ‘ওহ্...’। তারপর সে কাগজের থলিটা নাড়িয়ে খড়খড় শব্দ করল।
‘জি, এই যে সেমাই... আমার বাবা আনতেন। উনি মারা গেছেন!’
সুগরা অবাক হয়ে বলল, ‘মারা গেছেন?’
বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, ‘জি হ্যাঁ... এক মাস হলো... মারা যাওয়ার আগে উনি আমাকে কড়া নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন যে—দেখো বাবা, আমি জজ সাহেবের খিদমতে পুরো দশ বছর ধরে প্রতি ছোট ঈদে সেমাই নিয়ে গেছি... আমার মরার পর এই কাজ এখন তোমাকেই করতে হবে। আমি বাবাকে কথা দিয়েছিলাম... সেমাইটা নিন।’
সুগরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল। তার চোখে জল এলো। সে দরজাটা সামান্য একটু খুলল। সর্দার গুরমুখ সিংয়ের ছেলে সেমাইয়ের থলিটা এগিয়ে দিল। সুগরা সেটা হাতে নিয়ে বলল, ‘খোদা সর্দার জিকে বেহেশত নসিব করুন।’
গুরমুখ সিংয়ের ছেলে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘জজ সাহেব অসুস্থ?’
সুগরা জবাব দিল, ‘জি হ্যাঁ!’
‘কী অসুখ?’
‘স্ট্রোক করেছে। প্যারালাইসিস!’
‘আহা... বাবা বেঁচে থাকলে একথা শুনে খুব কষ্ট পেতেন... মরার আগ পর্যন্ত তাঁর জজ সাহেবের এহসানের কথা মনে ছিল। বলতেন, তিনি মানুষ নন, দেবতা... আল্লাহ মিয়াঁ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখুন। আচ্ছা, তাঁকে আমার সালাম জানাবেন।’
এই বলে সে চাতাল থেকে নেমে গেল। সুগরা ভাবল তাকে ডেকে বলে যেন জজ সাহেবের জন্য কোনো ডাক্তারের ব্যবস্থা করে দেয়।
সর্দার গুরমুখ সিংয়ের ছেলে সন্তোষ জজ সাহেবের বাড়ির চাতাল থেকে নেমে গজ কয়েক এগোতেই চারজন ওঁত পেতে থাকা লোক তার কাছে এল। দুজনের হাতে ছিল জ্বলন্ত মশাল। আর দুজনের কাছে কেরোসিনের কন্টেইনার। একজন সন্তোষকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী সর্দার জি, কাজ সেরে এলে?’
সন্তোষ মাথা নেড়ে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, সেরে এসেছি।’
লোকটি দলের, হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে জজ সাহেবের মামলাটা শেষ করে আসি?’
‘যাও... যেমন তোমাদের মর্জি!’ এটুকু বলে সর্দার গুরমুখ সিংয়ের ছেলে হাঁটা দিল।
উৎস: মান্টোনামা

কোরবানির ঈদে বাড়িতে বানানো হয় মাংসের বিভিন্ন পদ। সকালে মাংস-রুটি, দুপুরে কালাভুনা বা মেজবানি গরুর মাংস আর রাতে পোলাও-কোরমা কিংবা বিরিয়ানি। ঈদের সময়টায় কখনও নিজের ঘরে, কখনও দাওয়াতে মাংস খাওয়ার ধুম চলতেই থাকে। তবে উৎসবের আনন্দে অনেকেই হিসাব ছাড়া মাংস খেয়ে ফেলেন। এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
২৪ মিনিট আগে
কলম আমার বয়সী মানুষের কাছে খুব পছন্দ আর শখের বস্তু। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মই চক বা পেন্সিল থেকে শুরু করে বলপেন হয়ে স্মার্টপেনের বিবর্তন দেখতে পেয়েছে। এর আগে ঘড়ি নিয়ে আমার একটা লেখা সম্পর্কে অনেকেই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কলম নিয়ে লেখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। সে সূত্রে আজ বলা যাক কলমের গল্প।
১ ঘণ্টা আগে
বারিধারার এই ডুপলেক্স ভবনের দক্ষিণের মাস্টার বেডরুমটা বুড়ো আমজাদ সাহেবের এখন স্থায়ী ঠিকানা। পাশের ঝকঝকে টয়লেট আর লেক ভিউ বারান্দাটাও তার। শরীর আর মনের যে অবস্থা, তাতে জুম্মার নামাজে মসজিদে যাওয়ার সামর্থ্যটুকুও হারিয়েছেন তিনি। জায়নামাজে বসে তসবিহ গোনা আর শেলফের উপরে রাখা পবিত্র কোরআনের ক্যালিগ্রাফি
১ ঘণ্টা আগে
জীবিত অবস্থায় অন্ধকার ঘরে গিয়ে তাঁর পাশে বসা কঠিন ছিল। এখন সেই ঘরে গিয়ে বসা আর সম্ভব নয়। এখন তাঁর দরজায় আর কড়া নাড়া যাবে হয়তো; কিন্তু ভেতর থেকে ছিটকিনি খুলে কেউ মুখোমুখি দাঁড়াবে না। কেউ বলবে না, ঘরে সাপ আসে।
২ ঘণ্টা আগে