মিনহাজুল ইসলাম

‘কিন্তু মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে তুর্কীরা রাজনৈতিক সেকিউলারিযম গ্রহণ করিতেছে; পোশাক-পাতিতে ইউরোপীয় সাজিবার চেষ্টা করিতেছে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠান উঠাইয়া দিতে পারে বলিয়া গুজব রটিতেছে। স্বয়ং তুর্কীরা খিলাফত উঠাইয়া দিলে আমরা ভারতীয়রা কিরূপে আন্দোলন চালাইব, প্রধানতঃ এই কথাটার আলোচনার জন্যই মওলানা সাহেব কলিকাতা আসিয়াছেন। তাঁর মতে কামাল খিলাফত উচ্ছেদ করিতে পারেন না। আইনতঃ সে অধিকারও তাঁর নাই। খিলাফত কোন দেশ-রাষ্ট্রের অনুষ্ঠান নয়; এটা বিশ্ব-মুসলিমের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। অতএব কামাল পাশা ওটা উঠাইয়া দিলেও আমরা তা মানিব না। মওলানা সাহেবের এই বিস্ময়কর আশাবাদে পুরাপুরি শরিক হইতে না পারিলেও আমরা খিলাফত-কর্মীরা নৈরাশ্যের মধ্যে আলোর ছটা দেখিতে পাইলাম। পরম উৎসাহের মধ্যেই খিলাফত কমিটির কাজ শেষ হইল’। (আবুল মনসুর আহমেদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর)
আবুল মনসুর ১৯২২ সালের সেই সময়ের কথা বলছিলেন যখন তুর্কি খিলাফতের সূর্য অস্তমিত হচ্ছে, স্বরাজের আদর্শে উজ্জীবিত অসহযোগ আন্দোলন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে এবং বাংলার রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা অত্যন্ত অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। খিলাফতের পতন বাংলার রাজনীতিকে এক বিশাল গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল। সেই সময়ে চিত্তরঞ্জন দাশের ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ বাংলার অধিকারভিত্তিক রাজনীতির একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছিল। কিন্তু চিত্তরঞ্জনের অকাল প্রয়াণের ফলে সেই আশার শেষ আশ্রয়টিও ভেঙে যায়। কৃষক প্রজা পার্টি গঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত বাংলার শ্রমজীবী মানুষের গণ-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের আর কোনো মাধ্যম ছিল না। তবে এই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উপনিবেশ-বিরোধী ধারার মধ্যেই এক নতুন প্রজন্মের তরুণ বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং লেখকদের আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা খিলাফত-উত্তর বাংলার রাজনীতির এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের ভাষা বলিষ্ঠভাবে নির্ধারণ করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সেই অল্পসংখ্যক বিপ্লবীদের একজন, যিনি অন্যান্য তরুণ বিপ্লবীদের মতো জিহাদি প্রশিক্ষণের জন্য ভারত ত্যাগ করেননি, আবার কোনো গোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ড উপনিবেশ-বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনেও যোগ দেননি।
১৯২০ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নজরুল তাঁর শাণিত কবিতা এবং রাজনৈতিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবী সমাজে স্পষ্টভাবে এক প্রভাবশালী স্থান করে নিয়েছিলেন। একজন তীক্ষ্ণ ও আপসহীন উপনিবেশ-বিরোধী সমালোচক হিসেবে নজরুলের রাজনৈতিক চিন্তাধারা কোনো কাল্পনিক সমাজতন্ত্র বা প্যান-ইসলামিস্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের দ্বারা গড়ে ওঠেনি। তিনি রুশ বিপ্লবের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন, যা তাঁর ‘নবযুগ’ পত্রিকায় কাজ শুরু করার মাত্র দুই বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল। তাঁর শ্রমজীবী-বান্ধব লেখা এবং ব্রিটিশ শোষণের প্রকাশ্য সমালোচনা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে উন্মোচিত করেছিল। তৎকালীন বৈশ্বিক নিপীড়নমূলক কাঠামো সম্পর্কে তিনি কখনোই অসচেতন ছিলেন না।
স্বরাজের দর্শনের পক্ষে দাঁড়ালেও নজরুল কেবল বৈপ্লবিক সংগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং তাঁর মনে তিনি এমন এক শাসন ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রের ধারণা লালন করতেন, যা তৎকালীন তুরস্কের কামাল পাশার প্রজাতন্ত্রের আলোকে গঠিত হতে পারে। একটি আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তি হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক প্রজাতন্ত্রবাদ। নজরুল এই মতাদর্শ ধারণ করতেন এবং এটিই তাঁকে দলীয় রাজনীতিতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নজরুলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং নজরুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু মুজফ্ফর আহমদ নজরুলের রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং নির্বাচনী আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি নজরুলকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিকথায় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।
১৯২৫ সালের ১লা নভেম্বর নজরুল আরও তিন ব্যক্তির (শামসুদ্দিন হোসেন, কুতুবউদ্দিন আহমেদ এবং হেমন্তকুমার সরকার) সাথে মিলে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট নাম পরিবর্তিত হয়ে 'গণবাণী' হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত 'লাঙল' ছিল এই দলের মুখপত্র। দলটির প্রাথমিক নাম ছিল ‘লেবার অ্যান্ড স্বরাজ পার্টি’, যা পরে ‘ওয়ার্কার অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’তে রূপান্তরিত হয়। মুজফ্ফর আহমদ তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘১৯২৪ সালে হুগলীতেই প্রথম গান্ধীজীর সঙ্গে নজরুলের মুখোমুখি পরিচয় হয়েছিল। তাঁর আগমন উপলক্ষে সে গান ও কবিতা রচনা করেছিল। পরে তাঁর মুখে শুনেছি যে গান্ধীজী এই গান ও কবিতার আবৃত্তি শুনে খুবই খুশী হয়েছিলেন। তিনি নাকি তাকে বলেছিলেন যে রাতে তিনি কবিকে স্বপ্নেও দেখেছেন। গান্ধীজীর আগমনে যদিও নজরুল চর্খার কবিতা লিখেছিল তবুও সে স্থির নিশ্চিত হয়েছিল যে চর্খা ও খদ্দরের মারফতে দেশে স্বাধীনতা কোনো দিন আসবে না। তাই তার মন জনগণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই বিষয়টি নিয়ে সে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে, বিশেষ করে কুতুবুদ্দীন আহমদ, হেমন্তকুমার সরকার ও শামসুদ্দীন হুসাইনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে। স্থির হয় যে তাঁদের চারজন উদ্যোক্তা হয়ে একটি দল গঠন করবেন। ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাসে এই দলটি কলকাতায় গঠিত হয়। প্রথমে তার নাম হয়—ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত লেবর স্বরাজ পার্টি—(The Labour Swaraj Party of the Indian National Congress) এই দলের প্রথম ইশতিহার কাজী নজরুল ইসলামের দস্তখতে প্রকাশিত হয়েছিল।’
এই সময়ে ময়মনসিংহের কৃষক সম্মেলনের উদ্দেশ্যে একটি বার্তা লিখে নজরুল আরও বেশি মূলধারার রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলেন; বার্তাটি পাঠ করেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার এবং এটি ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ‘লাঙল’-এর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২৬ সালে তিনি কৃষকদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং ফেনী, যশোর, খুলনা, দৌলতপুর ও সিলেটে কংগ্রেসের সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি ১৯২৫ সালে ফরিদপুরে (পূর্ববঙ্গ) বঙ্গীয় সম্মেলনে এবং চট্টগ্রাম ও ঢাকায় মুসলিম সমাজের সম্মেলনগুলোতেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুজফ্ফর আহমদ আরও বলেন, ‘নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনের একটি আলোচ্য বিষয় ছিল ‘কৃষক শ্রমিক দল’ গঠন। সম্মিলনের এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলো এবং ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল’ (The Bengal Peasants' and Workers' Party) গঠন করা স্থির হলো। আগে যে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত লেবার স্বরাজ পার্টি’ নাম হয়েছিল সে নাম আর থাকল না। অর্থাৎ, সম্পূর্ণভাবে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের বাইরেই পার্টি গঠিত হলো। সম্মিলনের চেষ্টা করা হয়েছিল যে পার্টি’র নাম ‘বঙ্গীয় শ্রমিক ও কৃষক দল: করা হোক। কিন্তু মূলত কৃষক প্রতিনিধিদের আধিক্যে তা সম্ভব হয়নি। পরে অবশ্য, ইংরেজিতে নাম ওয়ার্কার্স এন্ড পেজান্টস পার্টি (The Workers' and Peasants' Party of Bengal) নাম হয়েছিল। বর্তমান শতাব্দীর উনিশ শ বিশের দশকে যে ভারতের নানা প্রদেশে ওয়ার্কার্স এন্ড পেজান্টস পার্টিসমূহ গড়ে উঠেছিল তার শুরু হয়েছিল বাংলায়। পরে বাংলা দেখাদেখি চেন্নাই, বোম্বে, মাদ্রাজ ও যুক্ত প্রদেশেও (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) পার্টিসমূহ গড়ে উঠেছিল। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কলকাতায় সারা-ভারত মজুর ও কৃষক দলসমূহের যুক্ত সম্মেলন হয় এবং এই সম্মেলনে সারা-ভারত মজুর ও কৃষক দল (The All-India Workers' and Peasants' Party) গঠিত হয়। মীরাত কমিউনিস্ট পার্টির ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় ভারত গবর্নমেন্ট প্রমাণ করতে চেয়েছে যে ওয়ার্কার্স এন্ড পেজান্টস পার্টি ছদ্মবরণে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া কিছুই নয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তো ছিলই। তাই, মোকদ্দমায় আসামীরা তা মেনে নেননি। কিন্তু দায়রা জজ গবর্নমেন্টের কথাই মেনে নিয়েছিলেন।
১৯২৬ সালে আমি দেখেছি যে নজরুল ইসলাম বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির একজন সভ্য। আমি অবশ্য ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রথম কংগ্রেসের চার আনার সভ্য শ্রেণিভুক্ত হই। কৃষ্ণনগরে নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনের যে অধিবেশন হয়ে গেল তার কর্মকর্তাদের একজন যে নজরুল ইসলামও ছিল সে কথা বলাই বাহুল্য। মে মাসে কৃষ্ণনগরে প্রাদেশিক সম্মেলন (বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলন) হবে স্থির হয়েছিল। সেই সময় কৃষ্ণনগরে যুব সম্মেলন ও ছাত্র সম্মেলনও হতে যাচ্ছিল। এই সবের প্রস্তুতি চলছিল। নজরুলের নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই।’
অবশেষে ১৯২৬ সালে নজরুল কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯২৪ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে নজরুল অসংখ্য সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজের দল এবং সহকর্মীদের সম্মেলনের জন্য বিশাল রাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর নির্বাচনী প্রার্থিতার বিষয়ে মুজফ্ফর আহমদ মন্তব্য করেছেন, ‘১৯২৬ সালে এই বাড়ীতে আসার পরে নজরুল ইসলাম আরও একটি কাজ করে বসল। সে প্রার্থী হলো কেন্দ্রীয় আইন সভার নির্বাচনে। তার জীবনে অনেক অবিবেচনার কাজের মধ্যে এটাও ছিল একটি। সমস্ত ঢাকা বিভাগ (ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ জেলাকে নিয়ে ছিল এই বিভাগ) হতে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের জন্যে দুইটি আসন রক্ষিত ছিল। শুধু মুসলিম ভোটাররা ভোট দেওয়ার অধিকারী। প্রত্যেক ভোটার দুইটি করে ভোট দিতে পারতেন। ভোটারদের মোট সংখ্যা ছিল ১৮,১১৬ জন। সম্পত্তির ভিত্তিতেই তখন শুধু লোক ভোটার হতে পারতেন। এই জাতীয় সংরক্ষিত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কংগ্রেসের, অর্থাৎ স্বরাজ পার্টির তেমন মন ছিল না। তবুও তাঁরা তাঁদের তরফের নাম এই সঙ্গে জড়িয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁরা কাঁঠাল ভাঙলেন কাজী নজরুল ইস্লামের মাথায়। প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন পাঁচ জন : মুহম্মদ ইস্মাইল চৌধুরী (বরিশালের জমীদার), আবদুল হালীম গজনবী (তখনও নাইট হননি), খাজা আবদুল করীম (ঢাকা নওয়াব বাড়ীর), কাজী নজরুল ইসলাম, মফীজউদ্দীন আহমদ।’
নজরুল নির্বাচনে জয়লাভের কথা কল্পনাও করতে পারেননি, কারণ তিনি ছিলেন উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সততা এবং প্রবল গণসম্পৃক্ততাসম্পন্ন একজন তরুণ মাত্র। তবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি যে বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছিলেন, তাদের আসলে ভোট দেওয়ার অধিকারই ছিল না। ফলে সেই নির্বাচন থেকে তিনি এক গভীর শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু সেই পরাজয় এবং পরাজয়ের কারণগুলো তাঁকে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা কিংবা নির্বাচনী রাজনীতির প্রতি আস্থাহীন করে তোলেনি। বরং এটি তাঁকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল যে, বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে বাংলার মুসলিম বুদ্ধিজীবী সমাজের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর প্রভাব বিস্তার করা কতটা জরুরি। ১৯২৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তবে তিনি হতাশ হয়ে পড়ার মতো মানুষ ছিলেন না। স্বল্পকালীন কিন্তু নিবিড় দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং দলকেন্দ্রিক সক্রিয়তার পর নজরুল এক পর্যায়ে দলীয় রাজনীতি ত্যাগ করেন, কিন্তু তিনি কখনোই ‘অরাজনৈতিক’ হয়ে পড়েননি।
নজরুলের লালিত রাজনৈতিক সক্রিয়তা ছিল তাঁর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক। তাঁকে এমন এক বিদ্রোহী কবি হিসেবে বিবেচনা করা হতো যিনি সর্বদা বিদ্রোহের জয়গান গাইতেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিক্রমায় আমরা তাঁকে একজন গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল এবং জনমুখী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে পাই, যিনি সুসংগঠিত উপায়ে উপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে জনগণের মুক্তির পথ খুঁজেছিলেন। তিনি গণতান্ত্রিক সুসংহতির পক্ষে ছিলেন। তাঁর সময়ে সংস্কৃতি এবং রাজনীতির মধ্যকার সীমারেখা ছিল অস্পষ্ট। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বাস্তবতা অনুধাবন করে তিনি বাংলা ভাষা গণতন্ত্রায়নের মধ্যেই নিজের প্রকৃত শক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন—যা সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য তাদের মানসগঠনে সহায়ক হয়েছিল।
যদিও নজরুলকে কোনো ধরনের রাষ্ট্রতত্ত্বের প্রবক্তা হিসেবে দেখা যায় না, তবে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টা এক বৃহত্তর গণচেতনার ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা বাংলায় রাজনৈতিক জনসমষ্টির উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছিল। পণ্ডিত ও সাংস্কৃতিক সমালোচকরা নজরুলকে সচরাচর ‘নিপীড়িতদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। তবে কেবল এই উপাধি তাঁর সামগ্রিক অবদানকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না। আমাদের বুঝতে হবে তৎকালীন বাংলায় নিপীড়িত কারা ছিলেন এবং কৃষক-শ্রমিক শ্রেণি বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হতো। রাজনৈতিক অর্থে ‘জনগণ’ বা ‘পিপল’ ধারণার কথা বলতে গেলে, সেই বৃহত্তর কৃষক ও শ্রমিকরাই ছিলেন সেই জনগণ, যাদের প্রয়োজন ছিল উপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্তি এবং প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। নজরুলের রাজনৈতিক দর্শন সেই লক্ষ্যেই ধাবিত হয়েছিল।
এ কে ফজলুল হকের কথা বলতে গেলে—যিনি কৃষক প্রজা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন—তিনি ধর্মীয় ও শ্রেণি পরিচয় নির্বিশেষে বাংলার কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন এবং নজরুলের সাথে তাঁর চিন্তাধারার ব্যাপক সাদৃশ্য ছিল। নজরুল বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রকৃতপক্ষে কাদের মুক্তি প্রয়োজন। খিলাফত আন্দোলন তাঁকে খুব একটা আকর্ষণ করেনি; ফজলুল হকের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই ছিল। মুসলিম ঐক্য এবং একটি বৃহত্তর মুসলিম রাজনৈতিক সত্তার ধারণাটি রাজনৈতিক ফ্রন্টে বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। সে কারণেই ফজলুল হক নিজস্ব পথ বেছে নিয়েছিলেন এবং গণমুখী রাজনৈতিক দর্শনের সূচনা করেছিলেন।
হকের মতোই নজরুলও সেই সব মানুষের পক্ষ নিয়েছিলেন যাদের ফজলুল হক প্রতিনিধিত্ব করতেন। সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক—নিজেদের স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে তাঁদের উভয়কেই তীব্র নেতিবাচক তকমা এবং নানারকম পদ্ধতিগত বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। হকের মতো নজরুলও উচ্চবিত্ত মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং এমনকি তাঁর সমসাময়িকদের কাছ থেকেও বিভিন্ন নেতিবাচক বিশেষণের দ্বারা কঠোরভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো তাঁর সংকল্পকে টলাতে পারেনি। তিনি কৃষক ও শ্রমিকদের মুক্তির জন্য নিরন্তর লিখে গেছেন, যারা ছিল সেকালের একটি উদীয়মান রাজনৈতিক জনসমষ্টির মূল ভিত্তি।
রুশ বিপ্লবের দ্বারা বিস্ময়াভিভূত, কামাল পাশার নব-তুরস্কের আদর্শে অনুপ্রাণিত, বিচিত্র সাহিত্যিক ঐতিহ্যের আলোকে উদ্ভাসিত, সংস্কারবাদী বুদ্ধিজীবীদের সংস্পর্শ, বিপ্লবী সহযোদ্ধাদের দ্বারা উৎসাহিত এবং সাধারণ মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ততার মধ্যে দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রায়নের এক অনন্য অনুঘটক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম এই মাটির মানুষের সংগ্রামের ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ হয়ে টিকে আছে। তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা ছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার এক শাণিত ইঙ্গিত। তাঁর সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং দলীয় রাজনীতিতে আপাত ব্যর্থতাই তাঁকে এই জাতির এক সময়ের সেরা কণ্ঠস্বরে পরিণত হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল। সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নজরুল একটি প্রতিনিধিত্বহীন নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম তাঁকে বাংলার সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রায়নের ইতিহাসে এক কালজয়ী বিজয় এনে দিয়েছিল। বাংলার গণতান্ত্রিক রাজনীতির সূচনার পূর্বে নজরুল গড়ে তুলেছিলেন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পাটাতন। ইতিহাসের গতিপথ বিচার করলে এই-ই ছিল বোধ করি নজরুলের রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা। যে প্রতিজ্ঞার ভাষা একটি নির্দিষ্ট জনপদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অভিব্যক্তিকে ধারণ করতে পেরেছিলো।
• মিনহাজুল ইসলাম: লেখক ও গবেষক

‘কিন্তু মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে তুর্কীরা রাজনৈতিক সেকিউলারিযম গ্রহণ করিতেছে; পোশাক-পাতিতে ইউরোপীয় সাজিবার চেষ্টা করিতেছে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠান উঠাইয়া দিতে পারে বলিয়া গুজব রটিতেছে। স্বয়ং তুর্কীরা খিলাফত উঠাইয়া দিলে আমরা ভারতীয়রা কিরূপে আন্দোলন চালাইব, প্রধানতঃ এই কথাটার আলোচনার জন্যই মওলানা সাহেব কলিকাতা আসিয়াছেন। তাঁর মতে কামাল খিলাফত উচ্ছেদ করিতে পারেন না। আইনতঃ সে অধিকারও তাঁর নাই। খিলাফত কোন দেশ-রাষ্ট্রের অনুষ্ঠান নয়; এটা বিশ্ব-মুসলিমের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। অতএব কামাল পাশা ওটা উঠাইয়া দিলেও আমরা তা মানিব না। মওলানা সাহেবের এই বিস্ময়কর আশাবাদে পুরাপুরি শরিক হইতে না পারিলেও আমরা খিলাফত-কর্মীরা নৈরাশ্যের মধ্যে আলোর ছটা দেখিতে পাইলাম। পরম উৎসাহের মধ্যেই খিলাফত কমিটির কাজ শেষ হইল’। (আবুল মনসুর আহমেদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর)
আবুল মনসুর ১৯২২ সালের সেই সময়ের কথা বলছিলেন যখন তুর্কি খিলাফতের সূর্য অস্তমিত হচ্ছে, স্বরাজের আদর্শে উজ্জীবিত অসহযোগ আন্দোলন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে এবং বাংলার রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা অত্যন্ত অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। খিলাফতের পতন বাংলার রাজনীতিকে এক বিশাল গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল। সেই সময়ে চিত্তরঞ্জন দাশের ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ বাংলার অধিকারভিত্তিক রাজনীতির একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছিল। কিন্তু চিত্তরঞ্জনের অকাল প্রয়াণের ফলে সেই আশার শেষ আশ্রয়টিও ভেঙে যায়। কৃষক প্রজা পার্টি গঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত বাংলার শ্রমজীবী মানুষের গণ-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের আর কোনো মাধ্যম ছিল না। তবে এই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উপনিবেশ-বিরোধী ধারার মধ্যেই এক নতুন প্রজন্মের তরুণ বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং লেখকদের আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা খিলাফত-উত্তর বাংলার রাজনীতির এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের ভাষা বলিষ্ঠভাবে নির্ধারণ করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সেই অল্পসংখ্যক বিপ্লবীদের একজন, যিনি অন্যান্য তরুণ বিপ্লবীদের মতো জিহাদি প্রশিক্ষণের জন্য ভারত ত্যাগ করেননি, আবার কোনো গোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ড উপনিবেশ-বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনেও যোগ দেননি।
১৯২০ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নজরুল তাঁর শাণিত কবিতা এবং রাজনৈতিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবী সমাজে স্পষ্টভাবে এক প্রভাবশালী স্থান করে নিয়েছিলেন। একজন তীক্ষ্ণ ও আপসহীন উপনিবেশ-বিরোধী সমালোচক হিসেবে নজরুলের রাজনৈতিক চিন্তাধারা কোনো কাল্পনিক সমাজতন্ত্র বা প্যান-ইসলামিস্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের দ্বারা গড়ে ওঠেনি। তিনি রুশ বিপ্লবের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন, যা তাঁর ‘নবযুগ’ পত্রিকায় কাজ শুরু করার মাত্র দুই বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল। তাঁর শ্রমজীবী-বান্ধব লেখা এবং ব্রিটিশ শোষণের প্রকাশ্য সমালোচনা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে উন্মোচিত করেছিল। তৎকালীন বৈশ্বিক নিপীড়নমূলক কাঠামো সম্পর্কে তিনি কখনোই অসচেতন ছিলেন না।
স্বরাজের দর্শনের পক্ষে দাঁড়ালেও নজরুল কেবল বৈপ্লবিক সংগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং তাঁর মনে তিনি এমন এক শাসন ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রের ধারণা লালন করতেন, যা তৎকালীন তুরস্কের কামাল পাশার প্রজাতন্ত্রের আলোকে গঠিত হতে পারে। একটি আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তি হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক প্রজাতন্ত্রবাদ। নজরুল এই মতাদর্শ ধারণ করতেন এবং এটিই তাঁকে দলীয় রাজনীতিতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নজরুলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং নজরুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু মুজফ্ফর আহমদ নজরুলের রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং নির্বাচনী আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি নজরুলকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিকথায় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।
১৯২৫ সালের ১লা নভেম্বর নজরুল আরও তিন ব্যক্তির (শামসুদ্দিন হোসেন, কুতুবউদ্দিন আহমেদ এবং হেমন্তকুমার সরকার) সাথে মিলে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট নাম পরিবর্তিত হয়ে 'গণবাণী' হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত 'লাঙল' ছিল এই দলের মুখপত্র। দলটির প্রাথমিক নাম ছিল ‘লেবার অ্যান্ড স্বরাজ পার্টি’, যা পরে ‘ওয়ার্কার অ্যান্ড পেজেন্ট পার্টি’তে রূপান্তরিত হয়। মুজফ্ফর আহমদ তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘১৯২৪ সালে হুগলীতেই প্রথম গান্ধীজীর সঙ্গে নজরুলের মুখোমুখি পরিচয় হয়েছিল। তাঁর আগমন উপলক্ষে সে গান ও কবিতা রচনা করেছিল। পরে তাঁর মুখে শুনেছি যে গান্ধীজী এই গান ও কবিতার আবৃত্তি শুনে খুবই খুশী হয়েছিলেন। তিনি নাকি তাকে বলেছিলেন যে রাতে তিনি কবিকে স্বপ্নেও দেখেছেন। গান্ধীজীর আগমনে যদিও নজরুল চর্খার কবিতা লিখেছিল তবুও সে স্থির নিশ্চিত হয়েছিল যে চর্খা ও খদ্দরের মারফতে দেশে স্বাধীনতা কোনো দিন আসবে না। তাই তার মন জনগণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই বিষয়টি নিয়ে সে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে, বিশেষ করে কুতুবুদ্দীন আহমদ, হেমন্তকুমার সরকার ও শামসুদ্দীন হুসাইনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে। স্থির হয় যে তাঁদের চারজন উদ্যোক্তা হয়ে একটি দল গঠন করবেন। ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাসে এই দলটি কলকাতায় গঠিত হয়। প্রথমে তার নাম হয়—ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত লেবর স্বরাজ পার্টি—(The Labour Swaraj Party of the Indian National Congress) এই দলের প্রথম ইশতিহার কাজী নজরুল ইসলামের দস্তখতে প্রকাশিত হয়েছিল।’
এই সময়ে ময়মনসিংহের কৃষক সম্মেলনের উদ্দেশ্যে একটি বার্তা লিখে নজরুল আরও বেশি মূলধারার রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলেন; বার্তাটি পাঠ করেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার এবং এটি ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ‘লাঙল’-এর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২৬ সালে তিনি কৃষকদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং ফেনী, যশোর, খুলনা, দৌলতপুর ও সিলেটে কংগ্রেসের সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি ১৯২৫ সালে ফরিদপুরে (পূর্ববঙ্গ) বঙ্গীয় সম্মেলনে এবং চট্টগ্রাম ও ঢাকায় মুসলিম সমাজের সম্মেলনগুলোতেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুজফ্ফর আহমদ আরও বলেন, ‘নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনের একটি আলোচ্য বিষয় ছিল ‘কৃষক শ্রমিক দল’ গঠন। সম্মিলনের এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলো এবং ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল’ (The Bengal Peasants' and Workers' Party) গঠন করা স্থির হলো। আগে যে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত লেবার স্বরাজ পার্টি’ নাম হয়েছিল সে নাম আর থাকল না। অর্থাৎ, সম্পূর্ণভাবে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের বাইরেই পার্টি গঠিত হলো। সম্মিলনের চেষ্টা করা হয়েছিল যে পার্টি’র নাম ‘বঙ্গীয় শ্রমিক ও কৃষক দল: করা হোক। কিন্তু মূলত কৃষক প্রতিনিধিদের আধিক্যে তা সম্ভব হয়নি। পরে অবশ্য, ইংরেজিতে নাম ওয়ার্কার্স এন্ড পেজান্টস পার্টি (The Workers' and Peasants' Party of Bengal) নাম হয়েছিল। বর্তমান শতাব্দীর উনিশ শ বিশের দশকে যে ভারতের নানা প্রদেশে ওয়ার্কার্স এন্ড পেজান্টস পার্টিসমূহ গড়ে উঠেছিল তার শুরু হয়েছিল বাংলায়। পরে বাংলা দেখাদেখি চেন্নাই, বোম্বে, মাদ্রাজ ও যুক্ত প্রদেশেও (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) পার্টিসমূহ গড়ে উঠেছিল। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কলকাতায় সারা-ভারত মজুর ও কৃষক দলসমূহের যুক্ত সম্মেলন হয় এবং এই সম্মেলনে সারা-ভারত মজুর ও কৃষক দল (The All-India Workers' and Peasants' Party) গঠিত হয়। মীরাত কমিউনিস্ট পার্টির ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় ভারত গবর্নমেন্ট প্রমাণ করতে চেয়েছে যে ওয়ার্কার্স এন্ড পেজান্টস পার্টি ছদ্মবরণে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া কিছুই নয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তো ছিলই। তাই, মোকদ্দমায় আসামীরা তা মেনে নেননি। কিন্তু দায়রা জজ গবর্নমেন্টের কথাই মেনে নিয়েছিলেন।
১৯২৬ সালে আমি দেখেছি যে নজরুল ইসলাম বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির একজন সভ্য। আমি অবশ্য ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রথম কংগ্রেসের চার আনার সভ্য শ্রেণিভুক্ত হই। কৃষ্ণনগরে নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনের যে অধিবেশন হয়ে গেল তার কর্মকর্তাদের একজন যে নজরুল ইসলামও ছিল সে কথা বলাই বাহুল্য। মে মাসে কৃষ্ণনগরে প্রাদেশিক সম্মেলন (বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলন) হবে স্থির হয়েছিল। সেই সময় কৃষ্ণনগরে যুব সম্মেলন ও ছাত্র সম্মেলনও হতে যাচ্ছিল। এই সবের প্রস্তুতি চলছিল। নজরুলের নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই।’
অবশেষে ১৯২৬ সালে নজরুল কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯২৪ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে নজরুল অসংখ্য সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজের দল এবং সহকর্মীদের সম্মেলনের জন্য বিশাল রাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর নির্বাচনী প্রার্থিতার বিষয়ে মুজফ্ফর আহমদ মন্তব্য করেছেন, ‘১৯২৬ সালে এই বাড়ীতে আসার পরে নজরুল ইসলাম আরও একটি কাজ করে বসল। সে প্রার্থী হলো কেন্দ্রীয় আইন সভার নির্বাচনে। তার জীবনে অনেক অবিবেচনার কাজের মধ্যে এটাও ছিল একটি। সমস্ত ঢাকা বিভাগ (ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ জেলাকে নিয়ে ছিল এই বিভাগ) হতে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের জন্যে দুইটি আসন রক্ষিত ছিল। শুধু মুসলিম ভোটাররা ভোট দেওয়ার অধিকারী। প্রত্যেক ভোটার দুইটি করে ভোট দিতে পারতেন। ভোটারদের মোট সংখ্যা ছিল ১৮,১১৬ জন। সম্পত্তির ভিত্তিতেই তখন শুধু লোক ভোটার হতে পারতেন। এই জাতীয় সংরক্ষিত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কংগ্রেসের, অর্থাৎ স্বরাজ পার্টির তেমন মন ছিল না। তবুও তাঁরা তাঁদের তরফের নাম এই সঙ্গে জড়িয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁরা কাঁঠাল ভাঙলেন কাজী নজরুল ইস্লামের মাথায়। প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন পাঁচ জন : মুহম্মদ ইস্মাইল চৌধুরী (বরিশালের জমীদার), আবদুল হালীম গজনবী (তখনও নাইট হননি), খাজা আবদুল করীম (ঢাকা নওয়াব বাড়ীর), কাজী নজরুল ইসলাম, মফীজউদ্দীন আহমদ।’
নজরুল নির্বাচনে জয়লাভের কথা কল্পনাও করতে পারেননি, কারণ তিনি ছিলেন উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সততা এবং প্রবল গণসম্পৃক্ততাসম্পন্ন একজন তরুণ মাত্র। তবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি যে বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছিলেন, তাদের আসলে ভোট দেওয়ার অধিকারই ছিল না। ফলে সেই নির্বাচন থেকে তিনি এক গভীর শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু সেই পরাজয় এবং পরাজয়ের কারণগুলো তাঁকে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা কিংবা নির্বাচনী রাজনীতির প্রতি আস্থাহীন করে তোলেনি। বরং এটি তাঁকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল যে, বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে বাংলার মুসলিম বুদ্ধিজীবী সমাজের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর প্রভাব বিস্তার করা কতটা জরুরি। ১৯২৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তবে তিনি হতাশ হয়ে পড়ার মতো মানুষ ছিলেন না। স্বল্পকালীন কিন্তু নিবিড় দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং দলকেন্দ্রিক সক্রিয়তার পর নজরুল এক পর্যায়ে দলীয় রাজনীতি ত্যাগ করেন, কিন্তু তিনি কখনোই ‘অরাজনৈতিক’ হয়ে পড়েননি।
নজরুলের লালিত রাজনৈতিক সক্রিয়তা ছিল তাঁর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক। তাঁকে এমন এক বিদ্রোহী কবি হিসেবে বিবেচনা করা হতো যিনি সর্বদা বিদ্রোহের জয়গান গাইতেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিক্রমায় আমরা তাঁকে একজন গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল এবং জনমুখী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে পাই, যিনি সুসংগঠিত উপায়ে উপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে জনগণের মুক্তির পথ খুঁজেছিলেন। তিনি গণতান্ত্রিক সুসংহতির পক্ষে ছিলেন। তাঁর সময়ে সংস্কৃতি এবং রাজনীতির মধ্যকার সীমারেখা ছিল অস্পষ্ট। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বাস্তবতা অনুধাবন করে তিনি বাংলা ভাষা গণতন্ত্রায়নের মধ্যেই নিজের প্রকৃত শক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন—যা সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য তাদের মানসগঠনে সহায়ক হয়েছিল।
যদিও নজরুলকে কোনো ধরনের রাষ্ট্রতত্ত্বের প্রবক্তা হিসেবে দেখা যায় না, তবে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টা এক বৃহত্তর গণচেতনার ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা বাংলায় রাজনৈতিক জনসমষ্টির উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছিল। পণ্ডিত ও সাংস্কৃতিক সমালোচকরা নজরুলকে সচরাচর ‘নিপীড়িতদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। তবে কেবল এই উপাধি তাঁর সামগ্রিক অবদানকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না। আমাদের বুঝতে হবে তৎকালীন বাংলায় নিপীড়িত কারা ছিলেন এবং কৃষক-শ্রমিক শ্রেণি বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হতো। রাজনৈতিক অর্থে ‘জনগণ’ বা ‘পিপল’ ধারণার কথা বলতে গেলে, সেই বৃহত্তর কৃষক ও শ্রমিকরাই ছিলেন সেই জনগণ, যাদের প্রয়োজন ছিল উপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্তি এবং প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। নজরুলের রাজনৈতিক দর্শন সেই লক্ষ্যেই ধাবিত হয়েছিল।
এ কে ফজলুল হকের কথা বলতে গেলে—যিনি কৃষক প্রজা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন—তিনি ধর্মীয় ও শ্রেণি পরিচয় নির্বিশেষে বাংলার কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন এবং নজরুলের সাথে তাঁর চিন্তাধারার ব্যাপক সাদৃশ্য ছিল। নজরুল বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রকৃতপক্ষে কাদের মুক্তি প্রয়োজন। খিলাফত আন্দোলন তাঁকে খুব একটা আকর্ষণ করেনি; ফজলুল হকের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই ছিল। মুসলিম ঐক্য এবং একটি বৃহত্তর মুসলিম রাজনৈতিক সত্তার ধারণাটি রাজনৈতিক ফ্রন্টে বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। সে কারণেই ফজলুল হক নিজস্ব পথ বেছে নিয়েছিলেন এবং গণমুখী রাজনৈতিক দর্শনের সূচনা করেছিলেন।
হকের মতোই নজরুলও সেই সব মানুষের পক্ষ নিয়েছিলেন যাদের ফজলুল হক প্রতিনিধিত্ব করতেন। সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক—নিজেদের স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে তাঁদের উভয়কেই তীব্র নেতিবাচক তকমা এবং নানারকম পদ্ধতিগত বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। হকের মতো নজরুলও উচ্চবিত্ত মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং এমনকি তাঁর সমসাময়িকদের কাছ থেকেও বিভিন্ন নেতিবাচক বিশেষণের দ্বারা কঠোরভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো তাঁর সংকল্পকে টলাতে পারেনি। তিনি কৃষক ও শ্রমিকদের মুক্তির জন্য নিরন্তর লিখে গেছেন, যারা ছিল সেকালের একটি উদীয়মান রাজনৈতিক জনসমষ্টির মূল ভিত্তি।
রুশ বিপ্লবের দ্বারা বিস্ময়াভিভূত, কামাল পাশার নব-তুরস্কের আদর্শে অনুপ্রাণিত, বিচিত্র সাহিত্যিক ঐতিহ্যের আলোকে উদ্ভাসিত, সংস্কারবাদী বুদ্ধিজীবীদের সংস্পর্শ, বিপ্লবী সহযোদ্ধাদের দ্বারা উৎসাহিত এবং সাধারণ মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ততার মধ্যে দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রায়নের এক অনন্য অনুঘটক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম এই মাটির মানুষের সংগ্রামের ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ হয়ে টিকে আছে। তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা ছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার এক শাণিত ইঙ্গিত। তাঁর সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং দলীয় রাজনীতিতে আপাত ব্যর্থতাই তাঁকে এই জাতির এক সময়ের সেরা কণ্ঠস্বরে পরিণত হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল। সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নজরুল একটি প্রতিনিধিত্বহীন নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম তাঁকে বাংলার সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রায়নের ইতিহাসে এক কালজয়ী বিজয় এনে দিয়েছিল। বাংলার গণতান্ত্রিক রাজনীতির সূচনার পূর্বে নজরুল গড়ে তুলেছিলেন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পাটাতন। ইতিহাসের গতিপথ বিচার করলে এই-ই ছিল বোধ করি নজরুলের রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা। যে প্রতিজ্ঞার ভাষা একটি নির্দিষ্ট জনপদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অভিব্যক্তিকে ধারণ করতে পেরেছিলো।
• মিনহাজুল ইসলাম: লেখক ও গবেষক
.png)

‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নেতিবাচক শব্দ। শুধু বাংলাদেশ কেন, বিশ শতকীয় ‘আধুনিক’বৈশ্বিক মূল্যবোধে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ গৃহীত হয়েছে ‘প্রগতিশীলতা’র বিপরীত ধারণা হিসেবে, রক্ষণশীলতার অনুগামী অর্থে। কিন্তু সামাজিক প্রাণী হিসেবে মানুষ কোনো না কোনো সম্প্রদায়ের আওতায় বসবাস করে।
৩৯ মিনিট আগে
১৯২২ সালের নভেম্বরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যে তরুণ কবিটিকে কলকাতার জেলে এনে তোলা হয়েছিল, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাঁকে চিনেছিল কেবল একটি মামলার নম্বর হিসেবে—‘রাজবন্দি’। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে জবানবন্দিটি লিখে দিলেন, সেটি আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না; সেটি ছিল বিচারকের আসনটিকেই উল্ট
৩ ঘণ্টা আগে-207c16-256x144.webp)
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবিনশ্বর রচনা তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। বিখ্যাত এই কবিতা নজরুলকে এনে দিয়েছে ‘বিদ্রোহী কবি’ খেতাব। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বয়স একশ বছর অতিক্রান্ত। কবিতার জন্ম থেকে আজ অবধি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও ‘বিদ্রোহী’ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অতিক্রান্ত শত বছরেও এই কবি
৩ ঘণ্টা আগে
একদিকে দিল্লি, অন্যদিকে কলকাতা। পশ্চিমবঙ্গের তামাম অধিবাসীর জীবন এখন এই দুটি কেন্দ্রের জাঁতাকলে পিষ্ট। বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে দিল্লির কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে আছে আরএসএস-বিজেপি। আর তার জেরে ভারতব্যাপী প্রান্তিক, কর্মজীবী জনতা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের প্রাণ এমনিতেই ওষ্ঠাগত। আর তার ওপর ছাব
৪ ঘণ্টা আগে