স্ট্রিম ডেস্ক

বাংলাদেশকে বলা হয় ‘বারো আউলিয়ার দেশ’। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে সুফি সাধকরা এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। তাঁদের প্রয়াণের পর তাঁদের সমাধিস্থল বা মাজারগুলো কেন্দ্র করে এক ধরনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। মূলত আধ্যাত্মিক সাধনা, মানসিক শান্তি এবং লৌকিক মানত পূরণের আশায় মানুষ এসব মাজারে ভিড় করে।
ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম ইটন তাঁর দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার বইয়ে বলেছেন, বাংলাদেশে সাধারণত চার তরিকার মাজার পন্থীদের দেখা যায়। কাদিরিয়া, চশিতিয়া, নকশবন্দিয়া ও মুজাদ্দিদিয়া। এর মধ্যে কাদিরিয়াপন্থীরা বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানীর (র.) অনুসারী। মূলত দিল্লি ও দাক্ষিণাত্যের মাধ্যমে বাংলায় এই তরিকা প্রবেশ করে ১৫–১৭শ শতকে। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে এদের দেখা যায়।
খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর (র.) অনুসারীদের বলা হয় চিশতিয়া। এই তরিকায় সংগীত বা সেমার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চর্চার আধিক্য দেখা যায়। দিল্লি সালতানাতের সময় (১৩–১৪শ শতক) চিশতিয়া তরিকা বাংলায় আসে। ব্রিটিশ লেখক ও গবেষক সাইমন এভারার্ড ডিগবি তাঁর দ্য সুফি শেখ অ্যাজ আ সোর্স অব অথরিটি বইয়ে বলেছেন, সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকার আশপাশে চিশতিয়াদের বহু দরগা দেখা যায়।
নকশালবন্দিয়াদের ব্যাপারে রিচার্ড এম ইটন বলেছেন, এরা বাহাউদ্দিন নকশবন্দের (র.) অনুসারী। এই তরিকার মানুষেরা মূলত নিরব জিকিরে (জিকিরে কলবি) বিশ্বাসী। ১৬–১৭শ শতকে মুঘল প্রশাসনের সঙ্গে বাংলায় এই তরিকার আগমন ঘটে। এই তরিকার মাজার তুলনামূলক কম আড়ম্বরপূর্ণ। নিরব জিকিরই এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
অন্যদিকে মুজাদ্দিদিয়ারা ইমাম রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানির (র.) অনুসারী। এটিকে নকশবন্দিয়া তরিকারই একটি সংস্কারবাদী শাখা বলে উল্লেখ করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাস বিষয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক বারবারা দালি মেটকাফ। এই খ্যাতিমান গবেষক তাঁর ইসলামিক রিভাইভাল ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া বইয়ে বলেছেন, মুঘল আমলে আলেম ও সুফিদের মাধ্যমে ১৭–১৮শ শতকে এই তরিকা বাংলায় প্রবেশ করে।
মাজারে যাওয়ার পেছনে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। চীনের আনহুই ইউনিভার্সিটির তিন গবেষক ইফতিখার আহমেদ চরণ, বাংগু ওয়াং ও দেউই ওয়া তাঁদের কালচারাল অ্যান্ড রিলিজিয়াস পার্সপেক্টিভ অন সুফি শ্রাইনস শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছেন, সরাসরি স্রষ্টার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার চেয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের (ওলি) মাধ্যমে চাইলে তা দ্রুত কবুল হয় বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিশ্বাস রয়েছে। এই বিশ্বাস থেকেই তারা মাজারে যায়।
এছাড়া দৈনন্দিন জীবনের জটিলতা, অভাব-অনটন বা মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত মানুষ মাজারের শান্ত পরিবেশে এক ধরণের নিরাপত্তা খুঁজে পায়। কান্নাকাটি বা প্রার্থনার মাধ্যমে তাদের মনের ভার লাঘব হয়।
পাকিস্তানি গবেষক তাহমিনা ইকবাল তাঁর সুফি প্র্যাকটিসেস অ্যাজ দ্য কজ অব স্পিরিচুয়াল, মেন্টাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল হিলিং নামের গবেষণায় বলেছেন, সন্তান লাভ, কঠিন রোগ থেকে মুক্তি, ব্যবসায় উন্নতি বা মামলার রায়ের মতো পার্থিব প্রয়োজনে মানুষ মাজারে মানত করে। এটি একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা।
ফাতিমা জিন্নাহ কলেজ ফর উইমেনের এই গবেষক আরও বলেছেন, উরস বা বিশেষ দিনে মাজারে খিচুড়ি বা তবারক বিতরণ করা হয়। এখানে ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকে না, যা সাধারণ মানুষকে একটি সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার অনুভূতি দেয়। মাজারে সমবেত হওয়ার এটিও একটি কারণ।
বাংলাদেশে মাজারের সংখ্যার কোনো একক বা নিখুঁত সরকারি পরিসংখ্যান নেই। কারণ, দেশজুড়ে অনেক গ্রামে বা মহল্লায় ছোট ছোট মাজার বা পীরের আস্তানা রয়েছে যা কোথাও নিবন্ধিত নয়।
বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসন কিছু মাজার পরিচালনা করে। অনেক মাজার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ট্রাস্টের অধীনে। ওয়াকফ প্রশাসন বলছে, সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে কয়েক হাজার নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেট রয়েছে যার একটি বড় অংশ মাজার ও তৎসংলগ্ন মসজিদ। তবে এটি মোট সংখ্যার সামান্য অংশ মাত্র।
বেসরকারি উপাত্ত সংগ্রহ প্ল্যাটফর্ম রেনটেক ডিজিটাল বলছে, দেশে বড় ও মাঝারি পর্যায়ের মাজারের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার থেকে ৭ হাজারের মতো। তবে ছোট আস্তানা ও স্থানীয় মাজার যোগ করলে এই সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে বেশি মাজার রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ও সিলেট বিভাগে। মাজারগুলো একদিকে যেমন লোকজ সংস্কৃতি, গান (মারফতি, মুর্শিদি) এবং মানবিক ভ্রাতৃত্বের মিলনস্থল। অন্যদিকে অনেক সময় এখানে ‘ব্যবসা’ বা ‘শিরক’-এর অভিযোগও ওঠে। তবে সাধারণ গ্রামীণ মানুষের কাছে মাজার এখনো এক বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল।

বাংলাদেশকে বলা হয় ‘বারো আউলিয়ার দেশ’। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে সুফি সাধকরা এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। তাঁদের প্রয়াণের পর তাঁদের সমাধিস্থল বা মাজারগুলো কেন্দ্র করে এক ধরনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। মূলত আধ্যাত্মিক সাধনা, মানসিক শান্তি এবং লৌকিক মানত পূরণের আশায় মানুষ এসব মাজারে ভিড় করে।
ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম ইটন তাঁর দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার বইয়ে বলেছেন, বাংলাদেশে সাধারণত চার তরিকার মাজার পন্থীদের দেখা যায়। কাদিরিয়া, চশিতিয়া, নকশবন্দিয়া ও মুজাদ্দিদিয়া। এর মধ্যে কাদিরিয়াপন্থীরা বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানীর (র.) অনুসারী। মূলত দিল্লি ও দাক্ষিণাত্যের মাধ্যমে বাংলায় এই তরিকা প্রবেশ করে ১৫–১৭শ শতকে। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে এদের দেখা যায়।
খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর (র.) অনুসারীদের বলা হয় চিশতিয়া। এই তরিকায় সংগীত বা সেমার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চর্চার আধিক্য দেখা যায়। দিল্লি সালতানাতের সময় (১৩–১৪শ শতক) চিশতিয়া তরিকা বাংলায় আসে। ব্রিটিশ লেখক ও গবেষক সাইমন এভারার্ড ডিগবি তাঁর দ্য সুফি শেখ অ্যাজ আ সোর্স অব অথরিটি বইয়ে বলেছেন, সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকার আশপাশে চিশতিয়াদের বহু দরগা দেখা যায়।
নকশালবন্দিয়াদের ব্যাপারে রিচার্ড এম ইটন বলেছেন, এরা বাহাউদ্দিন নকশবন্দের (র.) অনুসারী। এই তরিকার মানুষেরা মূলত নিরব জিকিরে (জিকিরে কলবি) বিশ্বাসী। ১৬–১৭শ শতকে মুঘল প্রশাসনের সঙ্গে বাংলায় এই তরিকার আগমন ঘটে। এই তরিকার মাজার তুলনামূলক কম আড়ম্বরপূর্ণ। নিরব জিকিরই এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
অন্যদিকে মুজাদ্দিদিয়ারা ইমাম রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানির (র.) অনুসারী। এটিকে নকশবন্দিয়া তরিকারই একটি সংস্কারবাদী শাখা বলে উল্লেখ করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাস বিষয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক বারবারা দালি মেটকাফ। এই খ্যাতিমান গবেষক তাঁর ইসলামিক রিভাইভাল ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া বইয়ে বলেছেন, মুঘল আমলে আলেম ও সুফিদের মাধ্যমে ১৭–১৮শ শতকে এই তরিকা বাংলায় প্রবেশ করে।
মাজারে যাওয়ার পেছনে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। চীনের আনহুই ইউনিভার্সিটির তিন গবেষক ইফতিখার আহমেদ চরণ, বাংগু ওয়াং ও দেউই ওয়া তাঁদের কালচারাল অ্যান্ড রিলিজিয়াস পার্সপেক্টিভ অন সুফি শ্রাইনস শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছেন, সরাসরি স্রষ্টার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার চেয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের (ওলি) মাধ্যমে চাইলে তা দ্রুত কবুল হয় বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিশ্বাস রয়েছে। এই বিশ্বাস থেকেই তারা মাজারে যায়।
এছাড়া দৈনন্দিন জীবনের জটিলতা, অভাব-অনটন বা মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত মানুষ মাজারের শান্ত পরিবেশে এক ধরণের নিরাপত্তা খুঁজে পায়। কান্নাকাটি বা প্রার্থনার মাধ্যমে তাদের মনের ভার লাঘব হয়।
পাকিস্তানি গবেষক তাহমিনা ইকবাল তাঁর সুফি প্র্যাকটিসেস অ্যাজ দ্য কজ অব স্পিরিচুয়াল, মেন্টাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল হিলিং নামের গবেষণায় বলেছেন, সন্তান লাভ, কঠিন রোগ থেকে মুক্তি, ব্যবসায় উন্নতি বা মামলার রায়ের মতো পার্থিব প্রয়োজনে মানুষ মাজারে মানত করে। এটি একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা।
ফাতিমা জিন্নাহ কলেজ ফর উইমেনের এই গবেষক আরও বলেছেন, উরস বা বিশেষ দিনে মাজারে খিচুড়ি বা তবারক বিতরণ করা হয়। এখানে ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকে না, যা সাধারণ মানুষকে একটি সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার অনুভূতি দেয়। মাজারে সমবেত হওয়ার এটিও একটি কারণ।
বাংলাদেশে মাজারের সংখ্যার কোনো একক বা নিখুঁত সরকারি পরিসংখ্যান নেই। কারণ, দেশজুড়ে অনেক গ্রামে বা মহল্লায় ছোট ছোট মাজার বা পীরের আস্তানা রয়েছে যা কোথাও নিবন্ধিত নয়।
বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসন কিছু মাজার পরিচালনা করে। অনেক মাজার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ট্রাস্টের অধীনে। ওয়াকফ প্রশাসন বলছে, সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে কয়েক হাজার নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেট রয়েছে যার একটি বড় অংশ মাজার ও তৎসংলগ্ন মসজিদ। তবে এটি মোট সংখ্যার সামান্য অংশ মাত্র।
বেসরকারি উপাত্ত সংগ্রহ প্ল্যাটফর্ম রেনটেক ডিজিটাল বলছে, দেশে বড় ও মাঝারি পর্যায়ের মাজারের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার থেকে ৭ হাজারের মতো। তবে ছোট আস্তানা ও স্থানীয় মাজার যোগ করলে এই সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে বেশি মাজার রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ও সিলেট বিভাগে। মাজারগুলো একদিকে যেমন লোকজ সংস্কৃতি, গান (মারফতি, মুর্শিদি) এবং মানবিক ভ্রাতৃত্বের মিলনস্থল। অন্যদিকে অনেক সময় এখানে ‘ব্যবসা’ বা ‘শিরক’-এর অভিযোগও ওঠে। তবে সাধারণ গ্রামীণ মানুষের কাছে মাজার এখনো এক বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল।
.png)

মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যা
৩ ঘণ্টা আগে
পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবারা থেকে বের হয়েছেন শত শত মানুষ। তাদের গায়ে কালো পোশাক। মুখে ধ্বণি—ইয়া হোসেন… ইয়া হোসেন। কাঁধে কারবালার প্রতীকী সমাধি। তারা হেঁটে যাচ্ছেন রাস্তা দিয়ে।
৪ ঘণ্টা আগে
ইসলাম ধর্মে হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এই মাসের ১০ তারিখ বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা পালন করেন—আশুরা। বিশেষ করে শিয়া মুসলিমদের কাছে এটি খুবই তাতপর্যপূর্ণ ও উৎসবমুখর একটি দিন। তবে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটি সব দেশে একইভাবে পালিত হয় না। অঞ্চল, ইতিহাস, এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাবে আশুরা এ
৫ ঘণ্টা আগে
আশুরা এলেই পুরান ঢাকার হোসেনি দালান আবারও প্রাণ ফিরে পায়। কালো পোশাকে শোকযাত্রা, ‘ইয়া হোসেন’ ধ্বনি, তাজিয়া মিছিল—সব মিলিয়ে এটি শুধু শিয়া মুসলমানদের ধর্মীয় আচার নয়, বরং ঢাকার শতাব্দীপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। অনেকেই ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে এটিকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শোকের এক সম্মিল
৫ ঘণ্টা আগে