মুজাহিদুল ইসলাম

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এটি ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিত। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগ নেতারা এই সিদ্ধান্ত নেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) এই সরকার শপথ গ্রহণ করে।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে এই সরকারের ভূমিকা ছিল অনন্য। তবে সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, কৌশল এবং ভেতরের কোন্দল নিয়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মহলে কিছু বিতর্ক রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে না জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি গোপন আপস বা ‘কনফেডারেশন’ করার চেষ্টা করছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতার বদলে স্বায়ত্তশাসন মেনে নেওয়া।
জানাজানি হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমদ ক্ষুব্ধ হন এবং মোশতাককে জাতিসংঘে পাঠানো প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেন। তার স্থলে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সরকার গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেও গভীর বিভাজন ছিল। শেখ ফজলুল হক মণি ও অন্য যুবনেতারা তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব মানতে চাননি। তাদের দাবি ছিল, বঙ্গবন্ধু কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দিয়ে যাননি। তাই একক সিদ্ধান্তে সরকার গঠন ঠিক হয়নি।
এই বিরোধের জের ধরে মূল মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি ভারতের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সহায়তায় পৃথকভাবে ‘মুজিব বাহিনী’ (বিএলএফ) গঠন করা হয়। এটি অনেক সময় মুজিবনগর সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
যুদ্ধ পরিচালনায় জাতীয় ঐক্য গড়া নিয়ে বিতর্ক ছিল। শুরুতে আওয়ামী লীগ এককভাবে সরকার গঠন করে। এতে মওলানা ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মতো প্রবীণ নেতারা অসন্তুষ্ট হন। তারা একটি ‘সর্বদলীয় জাতীয় সরকার’ চেয়েছিলেন। পরে এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ঘোচাতে ৮ সেপ্টেম্বর একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মওলানা ভাসানীকে প্রধান করে ৮ সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় মুজিবনগর সরকার।
সেসময় তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারত সরকারের মধ্যে একটি গোপন চুক্তির গুজব ছড়ায়। অভিযোগ করা হয়, এই ৭-দফা চুক্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়ার মতো শর্ত ছিল। তবে অধিকাংশ মূলধারার ঐতিহাসিক ও নথিপত্র অনুযায়ী, এটি ছিল নিছকই অপপ্রচার। প্রবাসী সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে বিরোধীরা এই গুজব ছড়িয়েছিল।
এই সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয় ভারতের আগরতলায়। শপথ গ্রহণ হয় সীমান্তবর্তী এলাকা বৈদ্যনাথতলায়। সমালোচকদের দাবি, বিপদে ভারতে পালানোর সুবিধার্থেই সীমান্তে শপথের আয়োজন করা হয়। তাছাড়া, সরকারের দাপ্তরিক কাজ মূলত ভারতের কলকাতা থেকে পরিচালিত হতো। এসব কারণে এর কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
কোনো কোনো সমালোচকের দাবি, মুজিবনগর সরকার সম্পূর্ণ ভারতের তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছিল। তাদের মতে, ভারত সরকারই এর সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করত এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল।
যুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কীভাবে হবে, তা নিয়ে মুজিবনগর সরকারের সুস্পষ্ট কোনো আইন বা রূপরেখা ছিল না। প্রাথমিক দলিলপত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। এটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আইনি ও কৌশলগত বিতর্ক তৈরি হয়।
১০ বা ১৭ এপ্রিলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ ঘোষণার দাবি রয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদের পুত্র সোহেল তাজসহ অনেকেই এই দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি।
নানা বিতর্ক ও মতভেদ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকারের অবদান অনস্বীকার্য। এই সরকারের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
তথ্যসূত্র: গেরি জে বাসের বই ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম’, অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বই ‘বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’, রাও ফরমান আলীর বই ‘ইনসাইড পাকিস্তানস মিলিটারি ক্র্যাকডাউন’ জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এটি ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিত। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগ নেতারা এই সিদ্ধান্ত নেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) এই সরকার শপথ গ্রহণ করে।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে এই সরকারের ভূমিকা ছিল অনন্য। তবে সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, কৌশল এবং ভেতরের কোন্দল নিয়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মহলে কিছু বিতর্ক রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে না জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি গোপন আপস বা ‘কনফেডারেশন’ করার চেষ্টা করছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতার বদলে স্বায়ত্তশাসন মেনে নেওয়া।
জানাজানি হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমদ ক্ষুব্ধ হন এবং মোশতাককে জাতিসংঘে পাঠানো প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেন। তার স্থলে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সরকার গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেও গভীর বিভাজন ছিল। শেখ ফজলুল হক মণি ও অন্য যুবনেতারা তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব মানতে চাননি। তাদের দাবি ছিল, বঙ্গবন্ধু কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দিয়ে যাননি। তাই একক সিদ্ধান্তে সরকার গঠন ঠিক হয়নি।
এই বিরোধের জের ধরে মূল মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি ভারতের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সহায়তায় পৃথকভাবে ‘মুজিব বাহিনী’ (বিএলএফ) গঠন করা হয়। এটি অনেক সময় মুজিবনগর সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
যুদ্ধ পরিচালনায় জাতীয় ঐক্য গড়া নিয়ে বিতর্ক ছিল। শুরুতে আওয়ামী লীগ এককভাবে সরকার গঠন করে। এতে মওলানা ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মতো প্রবীণ নেতারা অসন্তুষ্ট হন। তারা একটি ‘সর্বদলীয় জাতীয় সরকার’ চেয়েছিলেন। পরে এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ঘোচাতে ৮ সেপ্টেম্বর একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মওলানা ভাসানীকে প্রধান করে ৮ সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় মুজিবনগর সরকার।
সেসময় তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারত সরকারের মধ্যে একটি গোপন চুক্তির গুজব ছড়ায়। অভিযোগ করা হয়, এই ৭-দফা চুক্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়ার মতো শর্ত ছিল। তবে অধিকাংশ মূলধারার ঐতিহাসিক ও নথিপত্র অনুযায়ী, এটি ছিল নিছকই অপপ্রচার। প্রবাসী সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে বিরোধীরা এই গুজব ছড়িয়েছিল।
এই সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয় ভারতের আগরতলায়। শপথ গ্রহণ হয় সীমান্তবর্তী এলাকা বৈদ্যনাথতলায়। সমালোচকদের দাবি, বিপদে ভারতে পালানোর সুবিধার্থেই সীমান্তে শপথের আয়োজন করা হয়। তাছাড়া, সরকারের দাপ্তরিক কাজ মূলত ভারতের কলকাতা থেকে পরিচালিত হতো। এসব কারণে এর কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
কোনো কোনো সমালোচকের দাবি, মুজিবনগর সরকার সম্পূর্ণ ভারতের তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছিল। তাদের মতে, ভারত সরকারই এর সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করত এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল।
যুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কীভাবে হবে, তা নিয়ে মুজিবনগর সরকারের সুস্পষ্ট কোনো আইন বা রূপরেখা ছিল না। প্রাথমিক দলিলপত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। এটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আইনি ও কৌশলগত বিতর্ক তৈরি হয়।
১০ বা ১৭ এপ্রিলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ ঘোষণার দাবি রয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদের পুত্র সোহেল তাজসহ অনেকেই এই দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি।
নানা বিতর্ক ও মতভেদ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকারের অবদান অনস্বীকার্য। এই সরকারের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
তথ্যসূত্র: গেরি জে বাসের বই ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম’, অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বই ‘বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’, রাও ফরমান আলীর বই ‘ইনসাইড পাকিস্তানস মিলিটারি ক্র্যাকডাউন’ জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’

গ্রীষ্ম এলেই বাজার ভরে ওঠে রসালো ফল তরমুজে। তীব্র গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে এবং পানিশূন্যতা দূর করতে তরমুজের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ভোক্তাদের একটি সাধারণ অভিযোগ, এই ফলটি বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। কয়েকদিনের মধ্যেই তরমুজ তার স্বাদ, গন্ধ ও সতেজতা হারাতে শুরু করে। কখনো আবার বাইরে ঠিকঠাক দেখালেও ভেতরে
১৩ ঘণ্টা আগে
গ্রীষ্ম এসেছে কি না, তা টের পাওয়া যায়—রোদের তীব্রতা, শুষ্ক বাতাস বা ঘেমে নেয়ে ওঠা দেখে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের ছোট্ট শহর করডেলে গ্রীষ্মকে চেনার আলাদা এক উপায় আছে। সেখানে গরম মানেই রসালো মিষ্টি সব তরমুজ। যেন গরমকালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
১৩ ঘণ্টা আগে
বাংলা ভাষায় অনেক শব্দ আছে যেগুলো উচ্চারণে কাছাকাছি হলেও অর্থে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘হরমুজ’, ‘তরমুজ’ ও ‘খরমুজ’— এই তিনটি শব্দ তারই উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দৈনন্দিন কথাবার্তা কিংবা সংবাদ পরিবেশনেও এ শব্দগুলোর ব্যবহার নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়। কোথাও ভৌগোলিক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিকে ফলের নামের সঙ্গ
১৪ ঘণ্টা আগে
গ্রীষ্মকাল মানেই তরমুজের মৌসুম। লাল টুকটুকে মিষ্টি এই ফল খেতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ কমই আছে। তরমুজ খাওয়ার ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস রোগীরা কী করবেন তা নিয়ে অনেকের মনেই দ্বিধা কাজ করে। তরমুজের অনেক পুষ্টিগুণ থাকলেও এটা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাবে কি না, সেই চিন্তায় অনেকে তরমুজ খাওয়া বাদ দেন।
১৫ ঘণ্টা আগে