জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মুক্তিযুদ্ধে বাউল

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১০: ২১
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রান্তিক বাউল সম্প্রদায়ের অবদান ছিল একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক এবং সামরিক। এই সময় বাউলরা তাঁদের একতারা ও কণ্ঠকে কেবল সাধনার মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার করেননি, বরং যুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে তাঁরা সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন নিরলসভাবে।

মুক্তিযুদ্ধে এই বাউলেরা সরাসরি রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে লড়াই করতে পিছপা হননি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ধর্মীয় কট্টরপন্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাউলদের অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী দর্শন ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাউলেরা বিশ্বাস করতেন ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’। তাঁদের এই বিশ্বাস তৎকালীন শোষক শ্রেণির বিভাজনের রাজনীতির মূলে আঘাত করেছিল। এই আদর্শিক দ্বন্দ্বে পড়ে অনেক বাউলকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে এবং জীবন দিতে হয়েছে।

যশোরের বাউল শিল্পী কমরউদ্দিন ছিলেন এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের এক মহান শহীদ। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে ‘মুক্তির গান’ গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতেন এবং সাধারণ মানুষের মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করতেন। ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে বন্দি করে এবং অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে। একইভাবে সুনামগঞ্জের বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমকে হত্যার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি বাহিনী হানা দিলে তাঁর একনিষ্ঠ শিষ্য রহমান মিয়া গুরুর অবস্থান গোপন রেখে নিজের জীবন বিসর্জন দেন।

রহমান মিয়ার এই অকুতোভয় আত্মত্যাগ শাহ আব্দুল করিমকে বাঁচিয়ে দেয়, যিনি পরে ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধি ও জনমত গঠনের কাজ চালিয়ে যান।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাউলদের ভূমিকা কেবল গায়ক হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অনেকে সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ভোলার বোরহানউদ্দিনের কাঞ্চন বাউল ছিলেন একজন অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা, যিনি উপকূলীয় অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন এবং যাঁর নাম গেজেটভুক্ত রয়েছে। আবার উত্তরবঙ্গের নওগাঁ জেলার বাউল মণ্ডলও একইভাবে ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন এবং ভারতে ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। টাঙ্গাইলের মিয়া বাউলও কাদেরিয়া বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যমুনা নদীর অববাহিকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর সফল আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন।

বাউলদের এই অবদান সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে এসেও জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাঁদের গানের সুর ও বাণী গ্রামীণ জনপদে এমনভাবে স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারণার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রেও আমরা দেখেছি কীভাবে শিল্পীরা ট্রাকে ট্রাকে ঘুরে গান গেয়ে যুদ্ধের ময়দানকে প্রাণবন্ত রেখেছিলেন।

মূলত বাউলদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল একটি প্রকৃত গণযুদ্ধ, যেখানে একতারা আর রাইফেল একীভূত হয়ে বাঙালির বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল।

সম্পর্কিত