মাইক্রোসফট মানেই কি শুধু বিল গেটস? পল অ্যালেন না থাকলে যা হতো!

আজ ৪ এপ্রিল। ১৯৭৫ সালের ঠিক এই দিনেই জন্ম নিয়েছিল প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম বিশাল সাম্রাজ্য ‘মাইক্রোসফট’। এই টেক জায়ান্টের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে সবার আগে ভেসে ওঠে চশমা পরা হাসিখুশি মানুষ বিল গেটসের ছবি। কিন্তু সব কৃতিত্ব কি শুধুই বিল গেটসের?

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ০০
বিল গেটস ও পল অ্যালেন। মাইক্রোসফটের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি

আজ ৪ এপ্রিল। ১৯৭৫ সালের ঠিক এই দিনেই জন্ম নিয়েছিল প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম বিশাল সাম্রাজ্য ‘মাইক্রোসফট’। এই টেক জায়ান্টের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে সবার আগে ভেসে ওঠে চশমা পরা হাসিখুশি মানুষ বিল গেটসের ছবি। বছরের পর বছর ধরে আমরা জানি মাইক্রোসফট মানেই বিল গেটস।

কিন্তু সব কৃতিত্ব কি শুধুই বিল গেটসের? আড়ালে থাকা আরেকজন মানুষ, পল অ্যালেন না থাকলে কি আজকের এই মাইক্রোসফটের জন্ম হতো? এর উত্তর কঠিন নয়; ইতিহাস বলছে পল অ্যালেনের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য।

কম্পিউটার ল্যাব থেকে বের করে দেওয়া সেই দুই কিশোর

সিয়াটলে বেড়ে ওঠা বিল গেটস এবং পল অ্যালেন ছিলেন বাল্যবন্ধু। স্কুল জীবন থেকেই কম্পিউটিং নামের নতুন এই প্রযুক্তির প্রতি তাঁদের নেশা ছিল পাগলের মতো। পল অ্যালেন ছিলেন বিল গেটসের চেয়ে প্রায় তিন বছরের বড়। তখন তো আর ঘরে ঘরে কম্পিউটার ছিল না। তাই দুই কিশোরের সারাদিনের ঠিকানা ছিল ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন’-এর কম্পিউটার ল্যাব। এ ছাড়া তাঁরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ল্যাব ব্যবহার করতেন।

স্কুলপড়ুয়া দুই কিশোর বিল গেটস ও পল অ্যালেন। বিল গেটসের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি
স্কুলপড়ুয়া দুই কিশোর বিল গেটস ও পল অ্যালেন। বিল গেটসের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি

‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন’-এর ল্যাবে তাঁরা যন্ত্রপাতি নিয়ে এতটা ঘাঁটাঘাঁটি করতেন যে ১৯৭১ সালে ল্যাবের ডিরেক্টর চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে পল অ্যালেনকে কড়া চিঠি পাঠান। শোনা যায়, চিঠিতে তাঁকে ল্যাবের চাবি ফেরত দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়। কিশোর পল অ্যালেন সেদিন হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, ঠিক ৪৬ বছর পর ২০১৭ সালে এই ইউনিভার্সিটিতে তাঁর নামেই ‘কম্পিউটার সায়েন্স’ বিভাগের নতুন নামকরণ হবে। আর সেই স্কুল উদ্বোধনের দিন সবার সামনে দাঁড়িয়ে চাবি কেড়ে নেওয়ার সেই পুরোনো চিঠিটি তিনি হাসতে হাসতে পড়ে শোনাবেন।

সেখান থেকেই গেটস এবং অ্যালেন একটি পাগলাটে স্বপ্ন দেখেছিলেন, ‘সবার ডেস্কে এবং প্রতিটি ঘরে একটি করে কম্পিউটার থাকবে।’

একটি ম্যাগাজিন ও বদলে যাওয়ার গল্প

সময়টা ১৯৭৫ সাল। দুজনের বয়সই তখন বিশের কোঠায়। বিল গেটস তখন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্র। আর পল অ্যালেন ততদিনে কলেজ থেকে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে একটি কোম্পানিতে চাকরি করছেন।

একদিন হঠাৎ একটি ঘটনা তাঁদের দুজনের, বলতে গেলে পুরো পৃথিবীর ভাগ্য বদলে দেয়। একটি ম্যাগাজিনের স্ট্যান্ডে ‘পপুলার ইলেকট্রনিক্স’-এর প্রচ্ছদে পল অ্যালেনের চোখ আটকে যায়। সেখানে ‘এমআইটিএস’ নামের একটি কোম্পানির তৈরি ‘অলটেয়ার ৮৮০০’ নামের একটি কম্পিউটারের বিজ্ঞাপন দেওয়া ছিল।

১৯৭০ সালে লেকসাইড স্কুলের ল্যাবে। উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া ছবি
১৯৭০ সালে লেকসাইড স্কুলের ল্যাবে। উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া ছবি

আজকের দিনে শুনলে অবাক লাগতে পারে, সেই অলটেয়ার কম্পিউটারটি দেখতে ছিল ঠিক আপেল রাখার কাঠের বাক্সের মতো। এর কোনো স্ক্রিন বা মনিটর ছিল না, সামনে ছিল শুধু কিছু লাইট আর সুইচ। কাগজে ফুটো করে (পাঞ্চ কার্ড) এটাতে নির্দেশ দিতে হতো। পল অ্যালেন এটা দেখেই ভাবলেন, তাঁরা যদি এর জন্য একটি প্রোগ্রামিং ভাষা তৈরি করতে পারেন, তবে কেমন হয়?

পল অ্যালেন ম্যাগাজিনটি নিয়ে সোজা দৌড়ে চলে যান বিল গেটসের কাছে। ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের কম্পিউটার সায়েন্সের প্রফেসর এড লাজাওস্কার মতে, সেদিন অ্যালেন বিল গেটসকে বলেছিলেন, ‘এই ট্রেন আমাদের ধরতেই হবে!’ (We have to catch this train)।

যদি পল অ্যালেন না থাকতেন

পল অ্যালেন যদি সেদিন ওই ম্যাগাজিনটি দেখে বিল গেটসকে জোর না করতেন, তবে হয়তো গেটসের পথ ভিন্ন হতে পারত। অ্যালেনের কথায় রাজি হয়ে দুজন মিলে অলটেয়ারের জন্য একটি ‘ইন্টারপ্রেটার’ তৈরি করলেন, যা ব্যবহারকারীর দেওয়া কমান্ড কম্পিউটারকে বুঝিয়ে দিত। কোম্পানিটি তাদের সফটওয়্যার কিনতে রাজি হয়ে যায়।

এরপর দুজনে মিলে নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্ক শহরে একটি ছোট কোম্পানির জন্ম দেন। কোম্পানির কী নাম হবে, তা নিয়ে পল অ্যালেন বুদ্ধি করে ‘মাইক্রোকম্পিউটার’ এবং ‘সফটওয়্যার’ শব্দ দুটোকে জোড়া লাগিয়ে একটি নাম প্রস্তাব করেন। নাম রাখা হয় ‘মাইক্রো-সফট’ (Micro-Soft)। অর্থাৎ, যে কোম্পানির নাম আজ দুনিয়ার সবার মুখে মুখে, সেই নামটি বিল গেটসের নয়, পল অ্যালেনেরই দেওয়া।

‘পপুলার ইলেকট্রনিক্স’-এর সেই প্রচ্ছদ। সংগৃহীত ছবি
‘পপুলার ইলেকট্রনিক্স’-এর সেই প্রচ্ছদ। সংগৃহীত ছবি

দুজনের কাজের ধরন ছিল একদম আলাদা। পল অ্যালেন ছিলেন ভিশনারি বা স্বপ্নদ্রষ্টা, নতুন নতুন আইডিয়া আসত তাঁর মাথায়। আর বিল গেটস ছিলেন চরম বাস্তববাদী ও তুখোড় ব্যবসায়ী। তিনি জেদ আর পরিশ্রম দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু ১৯৮২ সালে পল অ্যালেন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার জন্য তিনি ১৯৮৩ সালে কোম্পানি থেকে পদত্যাগ করে আড়ালে চলে যান।

এরপর উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের আকাশচুম্বী সাফল্য বিল গেটসকে লাইমলাইটে নিয়ে আসে। মানুষ আস্তে আস্তে ভুলেই যায় যে মাইক্রোসফটের পেছনে আরেকজন রূপকার ছিলেন।

বিল গেটস বহুবার স্বীকার করেছেন, পল অ্যালেন না থাকলে মাইক্রোসফট কখনোই জন্ম নিত না। ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর ক্যানসারের সাথে দীর্ঘ লড়াই শেষে চিরবিদায় নেন পল অ্যালেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর বিপুল সম্পদ সমাজসেবা ও গবেষণায় দান করে গেছেন।

আজ মাইক্রোসফটের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের তাই স্মরণ করা উচিত সেই মানুষটিকেও, যিনি এক শীতের সকালে একটি ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে বন্ধুর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। সত্যি বলতে, পল অ্যালেন না থাকলে হয়তো আমাদের টেবিলের ওপর আজ এত সহজে কম্পিউটার পৌঁছাত না, আর বিল গেটসও হয়তো আজকের এই বিল গেটস হতে পারতেন না।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত