পৃথিবীর ইতিহাসে সংক্রামক ব্যাধির সঙ্গে মানুষের লড়াই অনেক পুরোনো। বিভিন্ন যুগে নানা রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব রোগে প্রাণহানি ঘটেছে কোটি কোটি মানুষের। চতুর্দশ শতাব্দীতে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা প্লেগ রোগে ইউরোপের বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা যায়। এরপর গুটিবসন্ত, কলেরা ও স্প্যানিশ ফ্লু পৃথিবীতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
‘হাম’ বা মিজেলস চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনই একটি প্রাচীন রোগ। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। একসময় বিশ্বজুড়ে হামে আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণায় এর টিকা আবিষ্কৃত হলে রোগটির ভয়াবহতা ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করে।
হাম আবিষ্কার হয়েছিল যেভাবে
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে হামের প্রথম লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় নবম শতাব্দীতে। বিখ্যাত ফারসি চিকিৎসক ও পণ্ডিত আবু বকর মুহাম্মদ জাকারিয়া আল-রাজি প্রথমবারের মতো এই রোগটিকে আলাদাভাবে শনাক্ত করেন। ইউরোপে তিনি ‘রাজেস’ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। আল-রাজির আগে প্রাচীন যুগের চিকিৎসকরা মনে করতেন হাম ও গুটিবসন্ত আসলে একই রোগ। কিন্তু আল-রাজি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব ফি আল-জাদারি ওয়া-আল-হাসবাহ’-তে এই দুটি রোগের পার্থক্য খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। ইংরেজিতে এই বিখ্যাত বইটিকে ‘দ্য বুক অব স্মলপক্স অ্যান্ড মিজেলস’ বলা হয়।
আল-রাজি তাঁর বইটিতে হামের ফুসকুড়ি বা র্যাশ এবং গুটিবসন্তের দাগের মধ্যকার পার্থক্যগুলো নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেন। পাশাপাশি হাম হলে রোগীর শরীরে কেমন উপসর্গ দেখা দেয়, তারও ব্যাখ্যা দেন। আল-রাজির এই বইটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে আজও স্বীকৃত।
এই ঘটনার বহু শতক পর ১৭৫৭ সালে স্কটিশ চিকিৎসক ফ্রান্সিস হোম প্রমাণ করেন, হাম মূলত রক্তে থাকা একটি সংক্রামক জীবাণুর কারণে ছড়ায়। সেসময় হাম কীভাবে একজন থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায়, তা নিয়ে চিকিৎসকদের কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। ফ্রান্সিস প্রথম সন্দেহ করেন, হামের কারণটি মূলত রোগীর রক্তেই লুকিয়ে আছে। এটি প্রমাণ করার জন্য তিনি একটি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেন।
ফ্রান্সিস হামে আক্রান্ত রোগীর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর সেই রক্ত তিনি সুস্থ মানুষের ত্বকে সামান্য আঁচড় কেটে বা ক্ষত তৈরি করে সেখানে লাগিয়ে দেন। বিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতিটিকে ‘ইনোক্যুলেশন’ বা টিকাদানের আদি রূপ বলা হয়।
ফ্রান্সিসের এই পরীক্ষার পর দেখা যায়, যাদের শরীরে ওই রক্ত দেওয়া হয়েছিল, তাদেরও হামের হালকা লক্ষণ দেখা দিচ্ছে।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, হাম কোনো বাতাস বা দূষিত পরিবেশের কারণে নয়, বরং রক্তে থাকা একটি নির্দিষ্ট সংক্রামক জীবাণু বা এজেন্টের কারণেই ছড়ায়। তাঁর এই আবিষ্কারই পরবর্তীতে বিজ্ঞানীদের হামের টিকা তৈরির গবেষণায় একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।
হামের ভয়াল থাবা
ষোড়শ শতাব্দীতে প্রয়োজনের তাগিদে পৃথিবীজুড়ে মানুষের যাতায়াত বাড়তে থাকে। ইউরোপীয় নাবিক ও অভিযাত্রীদের মাধ্যমে হামের জীবাণু এমন সব নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছাতে শুরু করে, যেখানে আগে কখনো এই রোগ ছিল না। ওই এলাকার মানুষের শরীরে এই নতুন ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো এন্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। ফলে হাম সেখানে সাক্ষাৎ মৃত্যুর দূত হয়ে হাজির হয়।
উনিশ শতকের দিকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব ছিল রীতিমতো ভয়ংকর ও হৃদয়বিদারক। ১৮৪৬ সালে ফারো দ্বীপপুঞ্জে হামের একটি বড় মহামারি আঘাত হানে। সেখানে ডেনিশ চিকিৎসক পিটার প্যানাম গবেষণার জন্য গিয়েছিলেন। তিনি দেখতে পান, পুরো দ্বীপের প্রায় প্রতিটি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক কষ্ট পাচ্ছে। তবে তিনি সেখানে একটি যুগান্তকারী বিষয় লক্ষ্য করেন। যাঁরা ৬৫ বছর আগের একটি মহামারি হামে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন, তারা এই নতুন মহামারিতে আর দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হননি। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয় যে, হাম থেকে বেঁচে ফিরলে মানুষের শরীরে এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়।
মা-বাবা ও একজন চিকিৎসকের সঙ্গে হামে আক্রান্ত এক শিশু। ১৮২৪ সালের একটি ইলাস্ট্রেশন। ছবি: ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মডিসিনএরপর ১৮৪৮ সালে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে একটি জাহাজের মাধ্যমে হাম রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। হামের সঙ্গে যুক্ত হয় হুপিং কাশি। এই দুটি রোগ স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
তবে ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি ঘটে ১৮৭৫ সালে ফিজি দ্বীপে। ফিজির রাজা ককোবাউ অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে হাম ভাইরাসে আক্রান্ত হন। তিনি যখন তাঁর দেশে ফিরে আসেন, তখন রাজার মাধ্যমে পুরো ফিজিতে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফিজির মানুষের শরীরে হামের কোনো ইমিউনিটি না থাকায় মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দ্বীপটির প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর এই সংখ্যাটি ছিল ফিজির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
টিকা আবিষ্কারের আগে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও হাম বিশ্বজুড়ে দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ ছিল। উন্নত দেশগুলোতে সেসময় চিকিৎসার কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য হাম ছিল এক বিরাট আতঙ্কের নাম। হামের কারণে শিশুদের মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস হতো। এর ফলে হাজার হাজার শিশু চিরতরে অন্ধ হয়ে যেত বা মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি নিয়ে বেঁচে থাকত। কানের সংক্রমণ, ডায়রিয়া কিংবা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ শিশু ভর্তি হতো হাসপাতালে।
এই রোগের ভয়াবহতা থেকে মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্যই বিজ্ঞানীরা ১৯৫৪ সালে হামের টিকা আবিষ্কারের মিশন শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই যাত্রা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বড় সাফল্যের জন্ম দেয়।
আবার কেন ফিরছে হাম
১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনে একটি স্কুলে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ড. জন এন্ডারস ও ড. থমাস পিবলস ১১ বছরের এক কিশোরের রক্ত থেকে প্রথমবারের মতো হামের ভাইরাস আলাদা করেন। তাঁর নাম ‘ডেভিড এডমনস্টন’।
ডেভিডের নামানুসারে হামের ভাইরাসের নাম দেওয়া হয় ‘এডমনস্টন স্ট্রেইন’।
এরপর বিজ্ঞানী এন্ডারস ও তাঁর দল ভাইরাসটিকে দুর্বল করে ১৯৬৩ সালে হামের প্রথম টিকা আবিষ্কার করেন। পরে বিজ্ঞানী ড. মরিস হিলেম্যান এই টিকাকে আরও নিরাপদ ও উন্নত করতে ১৯৭১ সালে হাম, মাম্পস এবং রুবেলা রোগের জন্য একটিমাত্র ‘এমএমআর’ টিকা তৈরি করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই টিকার কারণে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।
তবে হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় থাকতে হয়। ১৯৯৮ সালে একটি ভুয়া গবেষণায় দাবি করা হয়, এমএমআর টিকার কারণে শিশুদের অটিজম হয়। এই গুজবটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও এর কারণে অনেকেই টিকা নেওয়া বন্ধ করে দেন। ফলে উন্নত দেশগুলোতে হাম আবারও ফিরে আসে।
এছাড়া অতি সম্প্রতি বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই হামের আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যর খবর আসছে। এই সংকট মোকাবিলায় শিশুদের সঠিক সময়ে টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চিন্তিত না হয়ে কী করে হামের জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, সেই ব্যাপারে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ল্যানসেট