‘সিটিং ইজ দ্য নিউ স্মোকিং’: সারা দিন বসে থেকে শরীরের ক্ষতি করছেন যেভাবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৪: ২০
ছবি: সংগৃহীত

সকালের নাস্তা শেষে কখনো রিকশা, কখনো বাস কিংবা গাড়ির সিটে বসে অফিসে যাওয়া। অফিসে পৌঁছে ডেস্কে বসে টানা আট-নয় ঘণ্টা কাজ। এরপর ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে হাতে স্মার্টফোন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করি অথবা টিভির পর্দার সামনে বসি। দিনশেষে হিসাব করলে দেখা যায়, আমাদের জেগে থাকার বেশিরভাগ সময় আমরা কাজের মধ্যে থাকলেও পুরোটা সময় কাটে বসে বসে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সেডেন্টারি লাইফস্টাইল’ বা নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন। সহজ কথায়, ঘুমানোর সময়টুকু বাদ দিয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় শুয়ে বা বসে কাটানো। আমরা অনেকেই ভাবি, সারাদিন বসে কাজ করলেও তো সন্ধ্যায় অন্তত আধা ঘণ্টা হাঁটি বা জিমে যাই, তাহলে আর ক্ষতি কী! ক্লিনিক্যাল ফিজিওলজিস্ট ড. এরিক ভ্যান ইটারসন এই ভুল ধারণাটি ভেঙে দিয়েছেন।

এরিক জানান, দিনে ১০ ঘণ্টার বেশি বসে থাকলে হৃদরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। আপনি যদি দিনের কোনো এক সময়ে ব্যায়ামও করেন, তবুও টানা বসে থাকার ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো যায় না। ড. এরিক ভ্যান ইটারসনের মতে, সুস্থ থাকতে হলে একটানা বসে থাকার সময় কমাতে হবে। এর আগে জানতে হবে সেডেন্টারি লাইফস্টাইল বা নিষ্কিয় জীবনযাপন আসলে কী।

নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন বলতে কী বোঝায়

নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন বলতে বোঝায়, ঘুমানোর সময় বাদে দিনের বেশিরভাগ সময় শুয়ে-বসে কাটানো। এ ধরনের অভ্যাসে শারীরিক পরিশ্রম একেবারেই থাকে না। স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার জন্য যে আপনাকে একটানা বসে থাকতে হবে, বিষয়টি তেমন নয়। সারাদিনে থেমে থেমে দীর্ঘসময় বসে থাকলেও তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। সাধারণত দিনে চার থেকে ছয় ঘণ্টা শুয়ে বা বসে কাটানোকে নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন হিসেবে ধরা হয়। অফিসে কম্পিউটারের সামনে কাজ করা, যাতায়াতের সময় গাড়িতে বসে থাকা কিংবা সোফায় বসে টিভি দেখা—এসবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।

টানা বসে থাকার এই ক্ষতিকর দিক নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে আলোচনা শুরু হয় বহু আগে। ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডা. জেরেমি মরিস লন্ডনের বাসের চালক ও কন্ডাক্টরদের ওপর একটি গবেষণা করেন। সেখানে দেখা যায়, সারাদিন বসে থাকা বাস চালকদের হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি, সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করা সচল কন্ডাক্টরদের তুলনায় অনেক বেশি। মূলত তখন থেকেই অলস বা নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকদের মাঝে সচেতনতা তৈরি হয়।

বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা এটিকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসাকেন্দ্র মেয়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ ডা. জেমস লেভিন দীর্ঘ গবেষণার পর জানান, ‘সিটিং ইজ দ্য নিউ স্মোকিং।’

ডা. জেমস লেভিন একটানা বসে থাকাকে ধূমপানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ, ধূমপান যেমন নীরবে শরীরের ক্ষতি করতে থাকে, একটানা বসে থাকার অভ্যাসও আমাদের ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না।

আরেকটি বিষয় হলো, ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব যেমন পুষ্টিকর খাবার খেয়ে পুরোপুরি কাটানো যায় না, ঠিক তেমনি সারাদিন বসে থাকার ক্ষতিও প্রতিদিন অল্প সময় ব্যায়াম করে দূর করা সম্ভব নয়।

নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনের ক্ষতিকর দিক

আপনার শরীর অতিরিক্ত অলস সময় কাটাচ্ছে কি না, তা শরীর নিজেই আপনাকে নানাভাবে বুঝিয়ে দেয়। ধরুন, রাতে আপনি পর্যাপ্ত ঘুমিয়েছেন। কিন্তু সকালে ওঠার পর বা সারাদিনই আপনার বেশ ক্লান্তি লাগছে। এর কারণ হলো, নড়াচড়া কম হয় বলে শরীরের রক্ত চলাচল ধীর হয়ে যায়। নিষ্ক্রিয় পেশিগুলোর খুব বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় না বলে শরীর অলস হয়ে পড়ে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো ওজনের হিসাব না মেলা। আপনি হয়তো পরিমিত খাবারই খাচ্ছেন। কিন্তু সারাদিন বসে থাকার কারণে আপনার শরীর সেই ক্যালরি পোড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে অব্যবহৃত এই শক্তি ফ্যাট বা চর্বি হিসেবে শরীরে জমতে থাকে। ধীরে ধীরে পেটের দিকে মেদ জমতে শুরু করে। সারাদিন একটানা কাজের পর আমাদের অনেকেরই পিঠ, ঘাড় বা কোমরে ব্যথা অনুভূত হয়। আমরা হয়ত বিষয়টিকে সাধারণ অস্বস্তি বলে কাটিয়ে দেই। কিন্তু এই ব্যথা আমাদের নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনের অন্যতম লক্ষণ। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘক্ষণ কুঁজো হয়ে কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকলে পেশির কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টের স্বাভাবিক তরল পদার্থ কমে গিয়ে হাঁটু বা পিঠের নিচের অংশে আড়ষ্টতা দেখা দেয়।

টানা বসে থাকার এই অভ্যাসের কারণে ভেতরে ভেতরে আরও বড় কিছু রোগের ঝুঁকি তৈরি হয় বলেও ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অলস থাকলে অন্য যেকোনো পেশির মতো আমাদের হৃৎপিণ্ডও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওজন বা বিএমআই স্বাভাবিক থাকলেও শুধু দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে আপনার হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এছাড়া নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এতে আমাদের বিপাক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং স্থুলতার ঝুঁকি বাড়ে।

শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব রয়েছে। সারাদিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা আমাদের মনের ওপর চাপ ফেলতে পারে। চিকিৎসকরা জানান, টেলিভিশন বা কম্পিউটারের সামনে একটানা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার সঙ্গে বিষণ্ণতা ও একাকীত্বের সম্পর্ক রয়েছে।

সচল থাকার সহজ উপায়

এতসব বিপদের কথা শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একটু সচেতন হলেই আমাদের জীবন থেকে এই নিষ্ক্রিয়তা কাটানো সম্ভব। এর জন্য আপনাকে ঘাম ঝরিয়ে ম্যারাথন দৌড়াতে হবে না। শুধু একটানা বসে থাকার অভ্যাসটি ছাড়তে হবে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নড়াচড়া করার চেষ্টা করতে হবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে মজা করে ডাকেন ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকস’।

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেই একটু নড়াচড়া করার অনেক সুযোগ ছড়িয়ে আছে। অফিসে হয়তো অফিস সহকারীকে ডেকে এক গ্লাস পানি দিতে বলেন। এর বদলে নিজেই একটু হেঁটে গিয়ে পানিটা নিয়ে আসতে পারেন। কোনো সহকর্মীকে মেসেজ বা ইমেইল করার বদলে তার ডেস্কে হেঁটে গিয়ে কথা বলে আসুন। অফিসে ওঠার সময় এক বা দুই তলার জন্য লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে সিঁড়ি ভেঙে উঠে যান। মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় চেয়ারে বসে না থেকে একটু হাঁটাহাঁটি করুন। অফিসে সম্ভব হলে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে কাজ করার অভ্যাস করুন।

সারাদিনের এই ছোট ছোট নড়াচড়াগুলো শুনতে খুব সামান্য মনে হলেও দিনশেষে এগুলো দারুণ ম্যাজিকের মতো কাজ করে। আট ঘণ্টার কর্মদিবসে প্রতি ঘণ্টায় যদি আপনি মাত্র পাঁচ মিনিট করে হাঁটেন, তবে সারাদিনে আপনার ৪০ মিনিট হাঁটা হয়ে যায়। এর জন্য আপনাকে আলাদা করে ঘড়ি ধরে কোনো সময়ও বের করতে হচ্ছে না।

আপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত একটানা এক ঘণ্টার বেশি যেন চেয়ারে বসে থাকতে না হয়। ধীরে ধীরে এই নড়াচড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে এটিকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। এর পাশাপাশি ছুটির দিনে বা সকালে একটু সময় বের করে নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটার মতো ব্যায়াম করতে পারেন। এই ধরনের ব্যায়াম আমাদের হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে হার্ট সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে।

মূল কথা হলো, সুস্থ সুন্দর জীবনের জন্য নড়াচড়ার কোনো বিকল্প নেই।

সম্পর্কিত