জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রম্যগল্প

ট্রুথ ফিল্টার মাস্ক

অলাত এহ্‌সান
অলাত এহ্‌সান

স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রকৃতিতে কী খেয়াল চলছে কে জানে। মাটি অনুর্বর, পানি-বাতাস দূষিত। গ্রীষ্মের দেশে হঠাৎ করেই তুষারপাতের মতো শহরে ‘সত্যযুগ’ নেমে এল যেন। চারপাশের সবকিছু আগের মতোই আছে, ভৌত-অবকাঠামোর কোনো বদল চোখে পড়ে না। শুধু সবাই যা বলছে, নীরবেই তা ফলে যাচ্ছে, নয়তো উল্টো শোনা যাচ্ছে। সত্য বলা নিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছিল না। তবে মিথ্যা যা বলা হচ্ছিল, তাতেই সবকিছু ভেঙে পড়ার জন্য যথেষ্ট।

ব্যক্তি থেকে জাতি, সংসার থেকে রাষ্ট্রের অনেকের বিস্তর সমস্যা হচ্ছিল। বিশেষ করে মিথ্যে বলাকে যারা শিল্পে পরিণত করেছেন তাদের জন্য তো বটেই। নিদেনপক্ষে কৌশল হিসেবে সীমিত পরিসরে মিথ্যে বলাকে যারা অনুমোদন করেছেন, তাদেরও কম ভোগান্তি হচ্ছিল না। অনেকের প্রেম ভেঙে যাচ্ছিল, সংসারে অশান্তি, বন্ধুত্বে ফাটল, অফিসে গোলমাল তো লেগেই আছে। ধর্মবক্তা, রাজনীতিকরা তো কথাই বলতে পারছিলেন না। একের পর এক বাতিল হচ্ছিল সভা। আয়োজকরাও বিব্রত। টিভি চ্যানেল, সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিপুল বিনিয়োগে তৈরি স্টুডিওতে যে টকশো চলছে এতদিন ধরে, তা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। বক্তাই পাওয়া যাচ্ছিল না— এমন। থানা-পুলিশের ব্যাপারটা তবু বোঝাই যাচ্ছে, আইনজীবীদের পেশায় ভাটা। এতদিন সমাজে যে লোকটাকে সবচেয়ে পূজনীয় মনে হতো, তিনি এখন ঢপবাজ বলে ধিক্কৃত হচ্ছেন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স হ্যান্ডলে পোস্টগুলো পড়া যাচ্ছিল না! এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দেখে যারা পরিচিত ছিল, আসলে প্রেমে পড়েছিল, বাস্তবে তারা পরস্পরকে চিনতেই পারছিল না, এতটা বদল!

সমস্যাটা হলো, এই যেমন বুথ থেকে টাকা তুলে বাসায় ফিরছিলেন একজন। রাস্তায় এক বন্ধু তাঁর কাছে কয়েক হাজার টাকা ধার চাওয়ায় বলেছিলেন— একদমই টাকা নেই বন্ধু, পকেটে কয়েক শ টাকাই সম্বল! যারা মিথ্যে বলে তাদের মনেও ভয় থাকে, সব সময় দেখা যায় না হয়তো। মনের ভেতর ক্যু গেয়ে ওঠে। ও কথা বলতেই সব টাকা উধাও হয়ে গেল! তিনি দ্রুতই অ্যাপ খুলে অনলাইনে ব্যাংক ব্যালেন্স চেক করে দেখেন— হায়! মোটে কয়েক শ টাকা আছে সেখানে!

বাহারি কাণ্ড ঘটল যখন শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পরিচিত এক নেতা দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। গলার ওপর জোর দিয়ে ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বক্তৃতার জন্য তিনি পরিচিত। তিনি বলতে চাইলেন— আমরা বীরের জাতি, আমরা আজন্ম যোদ্ধা, কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। কিন্তু শ্রোতারা শুনছিলেন— আমরা ভীরু জাতি, আমরা আমৃত্যু বোগ্দা (বোকা), কাজে নয় কথার রাজা। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের ব্যাপারটা তো শহরের হাল দেখে বোঝার উপায় ছিল না কখনো, একটা পরিত্যক্ত নগরী যেন। ফলে শ্রোতারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দোল খেতে লাগলেন— হঠাৎ করেই লোকটা সবাই সত্যি বলা শুরু করলেন কেন! কাঙ্ক্ষিত আত্মসমীক্ষা শুরু করলেন কবে! কোথাও গড়বড় হচ্ছে! বক্তা বুঝতে পেরে দ্রুত হাইকমান্ডে যোগাযোগ করতে লাগলেন।

ডাহা মিথ্যে বলার কারণেই যদি এমনটা ঘটে থাকে, তাহলে অন্যের কাছে বলবে কী করে! কিন্তু সব কিছুরই একটা সমগোত্র থাকে। লোক থই থই শহরে ঘোর অন্ধকার গলিতেও দুজনকে পাওয়া যায়। প্রেম ভেঙে গেলেও পরস্পর যেমন চায় বিপরীতজনের বিয়ে না হোক। অথচ নিজে দিব্যি সংসার-সন্তান করে জীবন পার করবে আর ওই অবিবাহিত প্রেমিক বা প্রেমিকাকে দেখে নিজের প্রতি আস্থা আনার চেষ্টা করে— নাও, এবার বুঝলে তো!

প্রেমের জুটি ভেঙে যাচ্ছিল ওই মিথ্যে বলার কারণে। প্রেমিক-প্রেমিকা বলতে চাইছে বটে ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচব না’, কিন্তু শোনাচ্ছে ‘তোমার সঙ্গে (ঘর) বাঁধব না’। খুব করে বলছে ‘তোমাকে ভালোবাসি’, শোনাচ্ছে ‘তোমার ভালো পয়সার জন্য আসি’। ‘তোমাকে দেখেই প্রেমে পড়ে গেছি’ লিখে মেসেজ পাঠানোর পর দেখে, ‘তোমার দেহের লোভে পড়ে গেছি’। ‘তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই’ কথাটা তো বলতেই পারছিল না। এমন হলে কি জেনেবুঝে প্রেমে পড়ে কেউ আর! চোখের দিকে তাকালেই ভেতরটা পড়ে ফেলা যায়!

কয়েক দিনের মধ্যেই সংসার বিচ্ছেদের পরিসংখ্যান প্রায় আকাশে উঠল। স্ত্রী এলেন তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ জানাতে। বিচ্ছেদ চান তিনি। অভিযোগনামায় এও লেখা রইল— তিনিও পরকীয়ায় মজেছেন, তাঁর সঙ্গে গাঁট বাঁধতে চান। একই সময় সেখানে উপস্থিত তাঁর স্বামীর অভিযোগপত্র থেকেই তা পরিষ্কার। যে চাকরিজীবী দেরিতে বাসায় ফেরার কারণ হিসেবে রোজ অফিসে কাজের চাপের কথা বলতেন, তিনিই বেখেয়ালে বলে ফেললেন— অফিস শেষে কলিগের সঙ্গে কফিশপে বসার কথা। কোনো পুরুষই যে স্ত্রীর কাছে সঠিক বেতনের কথা বলেন না, সেটা আর অবিদিত থাকল না। বিপদ হলো তখনই, যখন অফিসের বড় কর্তারা ব্যক্তিগত সহকারীর সঙ্গে আপত্তিকর সম্পর্কের কথা বলে দিলেন নিজেই। এসব কারণে মুখ দেখাবেন কী করে ভেবে অনেকে বাড়িই ফিরলেন না। দিনের পর দিন থেকে গেলেন কোনো হোটেল বা রিসোর্টে।

সরকারি আমলারা পড়লেন বিরাট মুশকিলে। নামকাওয়াস্তে প্রকল্প দেখিয়ে বিদেশে যাওয়া আটকে যেতে লাগল। ঘাস চাষ বা ছাগল পালন শেখার জন্য যে নিউজিল্যান্ড-সুইজারল্যান্ড যাওয়া লাগে না, সেটা প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। কী করে ঘুষ চাওয়া যায়, তার জন্য মনোহরি বাক্য তৈরি করতেই গলদঘর্ম অবস্থা। দুটি কথা বলতে গিয়ে মুখ দিয়ে যা বের হচ্ছে, তাতে নিজেরই নাক কাটা যায় আরকি।

এক আমলা বিদেশে টাকা পাচারের বিষয়টি আড়াল করতে গিয়ে বলেই ফেললেন— তাঁর ছেলেটা একেবারেই নিকম্মা। প্রতি মাসে কারি কারি টাকা পাঠান বলেই বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করতে পারছে। টাকা না পাঠালে বেগম পল্লিতে জায়গা কিনে শেষ বয়সে তিনি যাবেন কোন মুখে! দেশপ্রেমের কথা নিতান্তই ঢপ! আইনপ্রণেতারা আরেকটু সরেস। ধরা পড়লে হেসেই বলে দিতেন— গত রাতে ভুলে জামাটা উল্টো করে পরে ফেলেছেন, এমন কিছু নয়।

ভোটের পর নির্বাচন প্রার্থীদের শপথ পড়ানোই হয়ে পড়ল সব চেয়ে ঝুঁকির কাজ। কারণ সেখানে দেশের ব্যাপারে সৎ কথা লেখা ছিল। আদালতগুলো সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হলো। কেননা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অপরাধী স্বীকার করছেন সব। ওকালতি পেশার লোকদের তো বেজায় সমস্যা। থানার বড় বাবুদের অনেকেই ছুটি নিয়ে ঘরে অবস্থান করতে লাগলেন। অধস্তন যারা রইলেন তারা নিতান্তই থানা পাহারা আর চাকরি বাঁচানোর জন্য। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, কেউ প্রায় এজাহার নিয়ে থানায় আসছিলও না। কারণ শহরজুড়ে ঘরে ঘরে যখন বিপদ চলছে, কে আসবে বাইরে মামলা পোহাতে।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল থেকে এত পরিমাণ শিক্ষা সনদ জালিয়াতির নজির বের হচ্ছিল, তা আতঙ্কিত হওয়ার মতো। সেসব রটে যাওয়ার পর কেউ কেউ তো চিকিৎসকের কাছে যেতে পর্যন্ত ভয় পাচ্ছিল। গবেষণার নামে যা হচ্ছিল তা এর-ওর বই থেকে পাতা মেরে দেওয়া। দেশ-বিদেশ থেকে সেই থিসিসগুলো ফেরত আসছিল বদনাম নিয়েই। শিক্ষার্থীরাও ক্লাসরুমে যাচ্ছিল না। কারণ তারা কেউ আর পড়তে চায় না, বিষয়টি পরিষ্কার। একটা সনদ আর আজাইরা থাকার জন্য যা যাতায়াত। এসব প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেটের দু-পয়সা মূল্য বিশ্বের কোথাও না থাকলেও, দেশের ভেতর পরস্পর গর্বে ফেটে পড়ত।

পণ্য নিয়ে ব্যবসায়ীদের মুখরোচক গল্প বন্ধ। ফলে শৌখিন পণ্যের বাজার তলানিতে নেমে গেল। বিজ্ঞাপন দিলে পণ্যের বিক্রি আরও কমে যায়। পত্রিকার বান্ডিলগুলো পড়ে থাকছিল রাস্তার মোড়ে মোড়ে। কে দেখে সেসব খুলে।

এই দুর্দিনে যে কেউ বইয়ে মুখ গুঁজে থাকবে, সেই উপায়ও ছিল না। পড়ার অভ্যাস তো কত আগেই উঠে গেছে। সাহিত্যেও সত্য ভাষণ বলতে কিছু ছিল না। অবশ্য কবি-সাহিত্যিকরা দাবি করছিলেন, তাঁদের সত্য বলার কোনো দায় নেই। তা বটে। প্রকারান্তরে সাহিত্যের ভেতর দিয়ে সম্ভাবনা, সত্য উপলব্ধি তৈরির যে দায় থাকে তা এড়াতে চাইছিলেন তাঁরা। নিতান্তই স্বল্প মেধায় আর মুখরোচক যা-তা লেখা হচ্ছিল। তার ওপর তাঁরা এতটাই রাজনীতিঘেঁষা হয়ে উঠেছিলেন যা দলের কর্মীকেও হার মানায়। সাহিত্য পাড়ায় কান পাতা যাচ্ছিল না, তাঁদের গ্রুপিং আর পরস্পর বিদ্বেষী কথার কারণে। এর মধ্যেও কবিতায় ফেল মারা এক কবি বেনামে লিখে ফেললেন অস্বস্তিকর কিছু লাইন—

‘প্রিয়তমা—

তোমার ভালবাসা সরকারি প্রেস নো‌টের ম‌তো মি‌থ্যে,

তোমার কথাগু‌লো সরকা‌রের সংবাদ স‌ম্মেল‌ন ম‌নে হয়,

দয়া ক‌রে গোপন বা‌হিনীর চা‌পে পরার ম‌তো

প‌রিবা‌রের কথায় তুমি কিছু ব‌লো না

তু‌মি তো শিরদাঁড়াওয়ালা, প্র‌তিবাদ স্পৃহ জনগ‌ণ ছি‌লে

এই হুজু‌গের দি‌নে, এই ভয়ের দিনে

গড্ডলিকা প্রবা‌হে সবাই সরকার দলীয় হ‌য়ে যাক,

তু‌মি অন্তত সরকার হ‌ইয়ো না।’

কেউ কেউ তো এটাকে দুনিয়া ধ্বংসের আলামত হিসেবেই মনে করল। ফলে ভিড় বাড়ল উপাসনালয়গুলোতে। দান-দাক্ষিণ্যও বাড়ল যথারীতি। ধর্মভিত্তিক দলগুলোরও উত্থান ঘটেছিল সেই সঙ্গে। কিন্তু মিথ্যে ভাঙার সময়ে সব স্পষ্ট হয়ে গেল— উপাসনালয়গুলোর পরিচালনা কমিটিগুলো দুর্নীতিতে ডুবে আছে। হাটে হাঁড়ি ভাঙল তখনই এটা যে দুনিয়া ধ্বংসের আলামতই না, সেটা ঘোষণাকারীরা না চাইলেও তাদের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। দ্রুতই সেই কারবারেও ভাটা পড়ে গেল। সংকট কিন্তু শক্ত হয়ে এল ক্রমে।

শহরের জরুরি অবস্থা জারি করার মতো অবস্থা। বিজ্ঞ-বিব্রত লোকগুলো একের পর এক সভা করেই গেলেন। কিছুতেই বিপর্যয় ঠেকানো যাচ্ছে না। কারণ পুরো ব্যাপারটাই ঘটছিল অবচেতন আর মজ্জাগত বিষয় থেকে। মনোবিজ্ঞানীদের ডাকা হলো। তাদের কয়েকজনকে ফিরিয়ে দিতে হলো ভুয়া ডিগ্রি আর মূর্খতার কারণে।

এসব নিয়ে যে টকশোতে তুখোড় আলোচনা করবে, সেই উপায়ও ছিল না। কেউ আর ‘সততা’, ‘দেশপ্রেমিক’, ‘যোদ্ধা’, ‘দক্ষ’, ‘পরিশ্রমী’, ‘সম্প্রীতি’ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে পারছিলেন না। কয়েকটা শব্দ আটকা পড়েছিল অভিধানের ভেতর। এত লোক বেকার হয়ে পড়েছিল যে, গোটা শহর অচল হওয়ার দশা।

সবচেয়ে বিপদ হলো, দেশের ইতিহাসের বয়ান নির্ধারণ করা নিয়ে। অন্তত কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট মীমাংসার তো প্রয়োজন ছিলই। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আগে থেকেই বিস্তর বিবাদ চলছিল। এবার কোনো পক্ষই কারও কথায় পাত্তা না দিয়ে নিজেদের মতো মিথ্যা তথ্যের পাহাড় বাড়িয়ে তুলছিল। ভিনদেশের মানুষ এসব দেখে রীতিমতো হাসাহাসি করছিল।

দেশটা উন্নত বিশ্বের কাতারে উঠে যাওয়ার যে ঘোষণা ছিল, সেটা নেহাতই জারিজুরি তা বেরিয়ে পড়তে সময় লাগল না। ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বুদবুদ ফেটে গিয়ে একটা ইমেজ সংকট তৈরি হলো। সঙ্গে ক্ষতের মতো শহরের দগদগে অবস্থা তো আছেই। ফলে প্রমাণও মিলছিল হাতেনাতে।

ওদিকে বিশ্ব যেন এই শহরকে ‘আত্মপ্রতারিত নাগরিকের শহর’ বলে ঘোষণা দিয়ে না দেয়, তলে তলে তার জন্য চলছিল নানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। সেও চলছিল লবি নিয়োগের মাধ্যমে, কেননা বিদেশে মুখোশ ব্যবহারের অনুমতি ছিল না।

শহরের জরুরি অবস্থা জারি করার মতো অবস্থা। বিজ্ঞ-বিব্রত লোকগুলো একের পর এক সভা করেই গেলেন। কিছুতেই বিপর্যয় ঠেকানো যাচ্ছে না। কারণ পুরো ব্যাপারটাই ঘটছিল অবচেতন আর মজ্জাগত বিষয় থেকে। মনোবিজ্ঞানীদের ডাকা হলো। তাদের কয়েকজনকে ফিরিয়ে দিতে হলো ভুয়া ডিগ্রি আর মূর্খতার কারণে। মন্দের ভালো এক-দুজনের ওপর যাও আস্থা রাখতে হলো, তাঁরা সবাইকে শান্ত থাকা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের কথা বলছিলেন। আর বলছিলেন, স্বভাব বদলের কথা। সত্য বলা আর ন্যায়ানুগ কাজ করা। নগর কর্তারা কথাটা শুনল বটে, কিন্তু মানার কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না। সহজ সমাধান পেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) প্রশ্ন করা হলো— ‘শহরের সবাই মিথ্যে বলে ধরা পড়ে যাচ্ছে, কী করব?’ বিগত দিনে এই বাক্যটা লিখে এতবার খোঁজ করা হয়েছে যে, একটা ট্রেন্ড দাঁড়িয়ে গেছে। এআই উত্তর দিল— মিথ্যে বলা যদি সবার সাধারণ প্রবণতা হয়, তাহলে কারও একা কিছুই করার নেই। তা ছাড়া মিথ্যে বলেও ধরা না পড়ার ব্যাপারে সে কোনো সহযোগিতা করতে পারবে না।

শিশুরা যেহেতু তখনো কলুষিত হয়ে যায়নি, তাই বাছাই করাও কঠিন হলো না। তারা প্রথমেই বড়দের ধুলোবালি দিয়ে খেলতে আর এখানে-সেখানে গজানো গাছের চারা রক্ষা করতে বলল। দৃশ্যটা হলো দেখার মতো, রাস্তার পাড়ে বুড়োরা বালু দিয়ে খেলছে, আর শিশুরা তার তদারকি করছে।

একজন ইতালির মধ্যযুগের ‘বোকা দেলা ভেরিতা’ (সত্যের মুখ) মার্বেল মাস্কের কথা বললেন। রোমের বাসিন্দারা বিশ্বাস করতেন, যদি কেউ ওই পাথরের মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে মিথ্যে বলে, তবে তার হাত কামড়ে ধরতে পারে। আগে থেকে শহরে তেমন একটা মুখ স্থাপন করা থাকলে সবার মধ্যে মিথ্যে বলার প্রবণতা কমত। যেহেতু ব্যবস্থা করা হয়নি, তাই সবাইকে বিকল্প কিছু ভাবতে হলো। যেমন ঘুষকে ‘স্পিড মানি’, চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’, ধর্মের নামে ডাহা মিথ্যে বলাও জায়েজ দাবি করল কেউ কেউ। একটা আত্মপ্রতারণা অবস্থা।

আগুন নেভানোর সময়ের অভিজ্ঞতা লাগিয়ে দমকল বাহিনী থেকে একটা প্রস্তাব এল। কিন্তু সহসায় সবার স্বভাব বদলানো সহজ না। নাগরিকদের এমন একটা মাস্ক দরকার যেখানে তারা সত্য বললেই তা মিথ্যায় বদলে যাবে। মেশিনের অন্তত অবচেতন বলে কিছু নেই। এতে সংসারে আগের মতো সম্পর্ক বজায় থাকবে।

সেই মতো একটা মাস্ক ডিজাইনও করা হলো। তাতে লাগানো হলো স্পিচ সিন্থেসাইজার, মানে শব্দ প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্র। যা-ই লেখা থাকুক, নির্ধারিত শব্দই উচ্চারিত হবে। কতগুলো শব্দের স্থলে বিপরীত শব্দ শোনা যেত। দুটি শব্দের কোনো ফারাক রইল না, একই মানে দাঁড়াল। মিথ্যে বললে সত্যি, আর অসৎ বললে সৎ উচ্চারিত হতো। এতে আপাত একটা সমাধান হলো। নগরে ঘোষণা করে দেওয়া হলো, চৌদ্দ বছর পেরোনো থেকে শুরু করে বড় সবাইকে ঘরে-বাইরে কারও সঙ্গে কথা বলার সময় বিশেষ মাস্ক পরতে হবে। অফিস-আদালতে তা বাধ্যতামূলক। যন্ত্রটার নাম দেওয়া হলো বাহারি— ট্রুথ ফিল্টার মাস্ক।

কেউ কেউ দারুণ ডিজাইন করা মাস্ক ব্যবহার শুরু করলেন। ভেনিস কার্নিভ্যালে যেমন জানুয়ারির শেষ দিন থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধ বর্ণিল মাস্ক পরে সবাই শহরময় ঘুরে বেড়ায়। শিশুরাও বায়না ধরল তাদেরও রঙিন মুখোশ কিনে দিতে হবে। রাস্তাঘাটে, স্যুভেনিয়ার শপে আড়ম্বরে বিক্রি হতে লাগল রঙিন মুখোশ। শহরের রাস্তায় তখন বাহারি ব্যাপার। কেউ কেউ মুখোশ ব্যবহার নিয়ে ধর্মের দোহাই দিলেও বাস্তবতার কারণে তা ধোপে টিকল না। কে কত দামি মাস্ক পরেন, তা নিয়ে ধনাঢ্যপাড়ায় নতুন করে দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতাও লেগে রইল।

কিন্তু মাস্ক পরা তো আরামের কিছু নয়। যন্ত্রের প্রভাবে মুখে নানা রোগ দেখা দিতে লাগল। তার ওপর সেই সমস্যা রয়েই গেল, মুখে মাস্ক থাকা মানেই লোকটা মিথ্যের সুযোগ নিচ্ছেন। তখন হরহামেশাই একজন আরেকজনকে চ্যালেঞ্জ করে ফেলত— কথাটা মাস্ক খুলে বলতে পারবি ব্যাটা? তাতেই বাধত গোলমাল। এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য বিদেশ থেকে সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিক এনে সমাধান বের করার কথা বলা হলো। কেউ কেউ তাতে আপত্তি তুলল। সেই যেমন, ক্ষমতাবান সব সময় জ্ঞানীকে সন্দেহের চোখে দেখেন। ইতিমধ্যে যেহেতু সবার ভেতর সমস্যা ধরা পড়েছে, তাই বুকে পাথর চাপা দিয়ে সিদ্ধান্ত হলো, তাঁর কাছ থেকে কেবল পরামর্শ নেওয়া হবে। দেশের যেসব সমাজবিজ্ঞানী মাস্ক কম পরেও কথা বলতে পারেন, তাঁরাও সঙ্গে থাকবেন।

তাঁরা এসে আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান নীতি অনুসরণ করলেন। মানে নদীকে গুরুত্ব দিলেন। বঙ্গেও বদ্বীপ হিসেবে এটা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা শহরের পাশের নদীতে ঘুরে বেড়ালেন, বৃক্ষশোভিত এলাকাও ঘুরলেন। এত সব দেখে তো নিয়োগকর্তারা বেজায় ক্ষিপ্ত। তবে বিজ্ঞানীরা একটা আশ্চর্য জিনিস লক্ষ্য করলেন, শিশুদের মুখোশে স্পিচ সিন্থেসাইজার নেই। কথা বলতে অসুবিধাও হচ্ছে না। সমাজবিজ্ঞানীরা বললেন, পৃথিবীতে আদিম নগরের পত্তন হয়েছে নদীর পাড়ে। শহর নষ্ট শুরুও হয় নদী ধ্বংসের মধ্য দিয়ে। মুখোশ পরা দেশের কর্তারা বুঝলেন না কথাটা। নৃতাত্ত্বিকরা বললেন, ঢাকার শহর ও আশপাশ দিয়ে এক সময় ১৫টি নদী ও প্রায় পৌনে দুই শ খাল ছিল। এখন আছে মাত্র ৪টি নদী। অর্ধশত খাল থাকলেও অর্ধেক মৃত। যে শহরের বিষ প্রতি বর্ষায় নদী-খাল ধুয়ে নিতে পারে না, সেখানকার মানুষের হৃদয় বর্জ্যে ভরে উঠতে পারে। বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিলেন, শহরটাকে ধুয়ে যেতে দিতে হবে, আর মানুষকে শিশুতোষ করে তুলতে হবে। শিশুদের থেকেই শুরু করুন।

নগর কর্তারা তো মস্ত খেপে গেলেন— হাজার বছরের একটা শহর চালানো কোনো ছেলেখেলা নাকি? সমাজবিজ্ঞানীরা তাঁদের শান্ত করলেন। তার মানে শহরটা শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া নয়। বরং প্রতিটা কাজ করার আগে চিন্তা করুন এটা শিশুদের জন্য কতটা ভালো হবে, তাহলেই সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু নগর কর্তারা তো বুঝতেই পারছিলেন না, শিশুতোষ ব্যাপারটা কেমন? তখন অনন্যোপায় হয়ে শিশুদের হাতেই কিছুদিন নগরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেওয়া হলো। সমাজবিজ্ঞানীরা আগেই সাবধান করেছিলেন যে, সত্যিকারের সংকট শুরু হবে তখনই, যখন মিথ্যায় অভ্যস্ত লোকজন সত্য শোনার পর সন্দেহ করতে শুরু করবে।

শিশুরা যেহেতু তখনো কলুষিত হয়ে যায়নি, তাই বাছাই করাও কঠিন হলো না। তারা প্রথমেই বড়দের ধুলোবালি দিয়ে খেলতে আর এখানে-সেখানে গজানো গাছের চারা রক্ষা করতে বলল। দৃশ্যটা হলো দেখার মতো, রাস্তার পাড়ে বুড়োরা বালু দিয়ে খেলছে, আর শিশুরা তার তদারকি করছে। দ্রুতই শহরে সবুজের আভাস ফিরে এল, প্রচুর গাছ বাড়তে থাকায় বাড়ছিল বৃষ্টির সম্ভাবনাও। এজন্য নদী-খাল পুনরুদ্ধার চলছিল পুরোদমে।

যেহেতু বড়দের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ করতে মানা ছিল, তাই তাদের মিথ্যে বলার পরিমাণও কমতে শুরু করল। তারা ছোটদের দেখে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলে।

সম্পর্কিত