স্ট্রিম ডেস্ক

ইরান যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এখনই নানা শিক্ষা খোঁজার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন। অনেক প্রতিবেদনে মার্কিন অভিযানের বিভিন্ন রসদ ও কৌশলগত ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে। প্রতিবেদনগুলোতে জ্বালানি তেল ও সারের জাহাজে হামলার ঝুঁকি ঠিকমতো বুঝতে না পারা এবং পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টরের অভাবের তথ্য জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি সস্তা আত্মঘাতী ড্রোন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির ঘাটতিকেও সামনে আনা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য এই শিক্ষাগুলো কাজে লাগতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। হরমুজ প্রণালিতে আমেরিকার মূল ব্যর্থতার আসল কারণ অবশ্যই এসব নয়। যুদ্ধ শুরুর আগেই এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা হলেও ফলাফলে বড় কোনো পরিবর্তন আসত না। ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সরকার পরিবর্তন, দেশটির দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা। এসব লক্ষ্যের কোনোটিই অর্জিত হয়নি।
গোলাবারুদের মজুত বাড়িয়ে বিমান হামলা হয়তো আরও দীর্ঘ করা যেত। ছয় মাসের ব্যর্থ হামলাকে আরও এক মাস বাড়ালেই যে সাফল্য আসত, এমন ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এই সামরিক বিপর্যয়ের চূড়ান্ত পরিণতি এখন স্পষ্ট। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর আগের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নিজেদের প্রভাব আরও বাড়িয়ে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পেশাদার সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ভুল পরিকল্পনার এই যুদ্ধেও মার্কিন সেনারা উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেখিয়েছে। নিজ দেশের উপকূল থেকে সাত হাজার মাইল দূরে গিয়ে শক্তি প্রদর্শন করেছে। ইরানের আকাশসীমা খুব সহজেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানে এই শক্তির পার্থক্য স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মার্কিন পক্ষে অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ইরানের পক্ষে প্রাণহানি কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পরিকল্পনার ভুল থাকা সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বমঞ্চে কতটা বিপজ্জনক, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।
প্রযুক্তির বিপুল শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েও ভুল কৌশলের খেসারত মেটানো যায় না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাহিনীকে দিয়ে অসম্ভব কাজ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। একটি নয়, তিনটি অসম্ভব লক্ষ্য পূরণের নির্দেশ দিয়েছেন। লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থলবাহিনী ছাড়া শুধু বিমান হামলা চালিয়ে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখেছিলেন ট্রাম্প। ১৯২১ সালে ইতালীয় তাত্ত্বিক জিউলিও দুহেত প্রথম দাবি করেছিলেন, শুধু বোমারু বিমান দিয়েই যুদ্ধ জেতা সম্ভব। ১৯২৮ সালে তিনি বলেছিলেন মাঝারি আকারের কোনো দেশে মাত্র ৩০০ টন বোমা ফেললেই এক মাসের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হবে।
আধুনিক শিল্প যুদ্ধের ইতিহাসে এই ধারণা বহুবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনে জার্মানির ৪০ হাজার টন বোমাবর্ষণে ব্রিটিশদের মনোবল ভাঙেনি। যুদ্ধের সময় হিটলারের জার্মানির ওপর মিত্রবাহিনী ২৫ লাখ টন বোমা ফেলেছিল। জার্মান প্রশাসনের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলেও সাধারণ মানুষের যুদ্ধের সংকল্প ভেঙে পড়েনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা ৮০ লাখ টন বোমা ফেলেছিল। বিপুল বোমাবর্ষণেও লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। আমেরিকানদের ক্ষোভ বেড়েছে এবং ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ সমাজতন্ত্রের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
পারমাণবিক বোমা ব্যবহার না করে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কোনো দেশের সরকার পতন ঘটানো প্রায় অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচের বিরুদ্ধে ন্যাটোর বোমাবর্ষণ এর কাছাকাছি উদাহরণ হতে পারত। ন্যাটোর বোমা ফেলা বন্ধ হয়েছিল জুন মাসে। মিলোশেভিচ সরকারের পতন ঘটেছিল গণবিক্ষোভের মুখে, ২০০০ সালের অক্টোবর মাসে।
ইরান সরকারের পতন শুধু বিমান হামলা দিয়ে ঘটানোর সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি ছিল।
দ্বিতীয় অসম্ভব কাজ ছিল বিমান হামলা দিয়ে ইরানের সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া। কোনো স্থলসেনা ছাড়া মোবাইল লঞ্চার ধ্বংসের চেষ্টাও অতীতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা ও ব্রিটেনের বিমানবাহিনী জার্মানির ভি-১ ও ভি-২ রকেট কারখানা ধ্বংস করতে বড় অভিযান চালিয়েছিল। গোপন গুহা ও পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে রাখা এই রকেট লঞ্চারগুলো বিমান হামলা দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
আধুনিক নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র (প্রিসিশন মিউনিশনস) এনেও এই সমীকরণ বদলানো যায়নি। কারণ লঞ্চারগুলো যেকোনো জায়গা থেকে দ্রুত ছুড়ে অন্যত্র সরে যাওয়া যায়। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বিমান হামলা চালিয়ে ইরাকের স্কাড মিসাইল লঞ্চারগুলোর একটিও নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। হামাস ও হিজবুল্লাহর রকেট হামলা বন্ধ করতে ইসরায়েল গাজা ও লেবাননে দুই দশক ধরে বিমান হামলা চালিয়েও লাভবান হতে পারেনি।
ইয়েমেনের হুথিদের ড্রোন ও মিসাইল বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক জোট বছরের পর বছর চেষ্টা করেছে। এখনও তাদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। লুকিয়ে থেকে দ্রুত সরে যেতে সক্ষম মোবাইল লঞ্চারগুলো বিমান হামলা দিয়ে পুরোপুরি ধ্বংস করা যায় না। আকাশে বোমা ফেলে ড্রোন বা রকেট থামানো সম্ভব নয়। এর জন্য পদাতিক বাহিনীর সরাসরি অভিযান প্রয়োজন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সুরক্ষায় শতভাগ নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এসব দেশের সামরিক ঘাঁটির ওপরই মার্কিন অভিযান পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল। ইউক্রেনের মতো কম খরচে ড্রোন ধ্বংসের ব্যবস্থা এবং স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে হয়তো কয়েকটি হামলা বেশি ঠেকানো যেত।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি সস্তা ও দ্রুতগতির। এই অসম লড়াইয়ে একপর্যায়ে ইরানের হামলার পরিমাণ মার্কিন প্রতিরক্ষার ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাবে (স্যাচুরেশন), এটাই ছিল স্বাভাবিক হিসাব। একটি অসম্ভব কাজের ব্যর্থতা ঢাকতে আরেকটি অসম্ভব কৌশল বেছে নেওয়া হয়েছিল।
ড্রোন প্রযুক্তির বিপদ ও রসদের ঘাটতি মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের জন্য বড় সতর্কবার্তা। এই যুদ্ধের ব্যর্থতা পেন্টাগনের তৈরি নয়। পরাজয়ের মূল পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল খোদ হোয়াইট হাউসে।
অসম্ভব সব সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণের ঝুঁকি ট্রাম্প নিজে না বুঝলে সেটি ধরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল প্রতিরক্ষামন্ত্রীর। ট্রাম্প কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়োগ না দিয়ে কেবল অনুগত ও অযোগ্য পিট হেগসেথকে এই পদে বসিয়েছিলেন।
হেগসেথ নিজের ক্ষমতা পাকা করতে পেন্টাগনের শীর্ষ পদগুলো থেকে স্বাধীনচেতা কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেন। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব এমনিতেই রাজনৈতিক নেতাদের অপ্রিয় সত্য জানাতে দ্বিধাবোধ করে। হেগসেথের কারণে পেন্টাগন থেকে ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্তের কোনো জোরালো প্রতিবাদ আসেনি। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সমস্যার কথা হালকাভাবে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। হেগসেথের অন্ধ সমর্থনের সামনে তাঁর আওয়াজ চাপা পড়ে যায়।
এই সামরিক বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক দায় ট্রাম্প এবং তাঁর চাটুকার উপদেষ্টাদের ওপর বর্তায়। মূল দায় আমেরিকার ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর বর্তায়। আমেরিকান ভোটারদের বড় একটি অংশ ট্রাম্পের মতো এক চরম অযোগ্য ও চাটুকারবেষ্টিত ব্যক্তিকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে এনেছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নেতা নির্বাচন আর রিয়ালিটি শোর সঞ্চালক বেছে নেওয়া কখনোই সমান নয়। পেন্টাগন হয়তো এই যুদ্ধ থেকে সামরিক ভুলত্রুটি খোঁজার গবেষণা চালিয়ে যাবে। তবে এর মধ্যেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে এবং আমেরিকার জাতীয় সম্পদের বড় অপচয় ঘটছে।
এই ব্যর্থতা কি আমেরিকান জনগণের বিবেককে নাড়া দিতে পারবে? দেশের সামরিক প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, ভুল মানুষকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসানোর মারাত্মক পরিণতি থেকে দেশকে কিন্তু কেউ বাঁচাতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ফরেইন পলিসির বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এখনই নানা শিক্ষা খোঁজার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন। অনেক প্রতিবেদনে মার্কিন অভিযানের বিভিন্ন রসদ ও কৌশলগত ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে। প্রতিবেদনগুলোতে জ্বালানি তেল ও সারের জাহাজে হামলার ঝুঁকি ঠিকমতো বুঝতে না পারা এবং পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টরের অভাবের তথ্য জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি সস্তা আত্মঘাতী ড্রোন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির ঘাটতিকেও সামনে আনা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য এই শিক্ষাগুলো কাজে লাগতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। হরমুজ প্রণালিতে আমেরিকার মূল ব্যর্থতার আসল কারণ অবশ্যই এসব নয়। যুদ্ধ শুরুর আগেই এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা হলেও ফলাফলে বড় কোনো পরিবর্তন আসত না। ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সরকার পরিবর্তন, দেশটির দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা। এসব লক্ষ্যের কোনোটিই অর্জিত হয়নি।
গোলাবারুদের মজুত বাড়িয়ে বিমান হামলা হয়তো আরও দীর্ঘ করা যেত। ছয় মাসের ব্যর্থ হামলাকে আরও এক মাস বাড়ালেই যে সাফল্য আসত, এমন ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এই সামরিক বিপর্যয়ের চূড়ান্ত পরিণতি এখন স্পষ্ট। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর আগের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নিজেদের প্রভাব আরও বাড়িয়ে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পেশাদার সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ভুল পরিকল্পনার এই যুদ্ধেও মার্কিন সেনারা উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেখিয়েছে। নিজ দেশের উপকূল থেকে সাত হাজার মাইল দূরে গিয়ে শক্তি প্রদর্শন করেছে। ইরানের আকাশসীমা খুব সহজেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানে এই শক্তির পার্থক্য স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মার্কিন পক্ষে অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ইরানের পক্ষে প্রাণহানি কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পরিকল্পনার ভুল থাকা সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বমঞ্চে কতটা বিপজ্জনক, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।
প্রযুক্তির বিপুল শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েও ভুল কৌশলের খেসারত মেটানো যায় না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাহিনীকে দিয়ে অসম্ভব কাজ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। একটি নয়, তিনটি অসম্ভব লক্ষ্য পূরণের নির্দেশ দিয়েছেন। লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থলবাহিনী ছাড়া শুধু বিমান হামলা চালিয়ে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখেছিলেন ট্রাম্প। ১৯২১ সালে ইতালীয় তাত্ত্বিক জিউলিও দুহেত প্রথম দাবি করেছিলেন, শুধু বোমারু বিমান দিয়েই যুদ্ধ জেতা সম্ভব। ১৯২৮ সালে তিনি বলেছিলেন মাঝারি আকারের কোনো দেশে মাত্র ৩০০ টন বোমা ফেললেই এক মাসের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হবে।
আধুনিক শিল্প যুদ্ধের ইতিহাসে এই ধারণা বহুবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনে জার্মানির ৪০ হাজার টন বোমাবর্ষণে ব্রিটিশদের মনোবল ভাঙেনি। যুদ্ধের সময় হিটলারের জার্মানির ওপর মিত্রবাহিনী ২৫ লাখ টন বোমা ফেলেছিল। জার্মান প্রশাসনের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলেও সাধারণ মানুষের যুদ্ধের সংকল্প ভেঙে পড়েনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা ৮০ লাখ টন বোমা ফেলেছিল। বিপুল বোমাবর্ষণেও লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। আমেরিকানদের ক্ষোভ বেড়েছে এবং ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ সমাজতন্ত্রের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
পারমাণবিক বোমা ব্যবহার না করে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কোনো দেশের সরকার পতন ঘটানো প্রায় অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচের বিরুদ্ধে ন্যাটোর বোমাবর্ষণ এর কাছাকাছি উদাহরণ হতে পারত। ন্যাটোর বোমা ফেলা বন্ধ হয়েছিল জুন মাসে। মিলোশেভিচ সরকারের পতন ঘটেছিল গণবিক্ষোভের মুখে, ২০০০ সালের অক্টোবর মাসে।
ইরান সরকারের পতন শুধু বিমান হামলা দিয়ে ঘটানোর সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি ছিল।
দ্বিতীয় অসম্ভব কাজ ছিল বিমান হামলা দিয়ে ইরানের সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া। কোনো স্থলসেনা ছাড়া মোবাইল লঞ্চার ধ্বংসের চেষ্টাও অতীতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা ও ব্রিটেনের বিমানবাহিনী জার্মানির ভি-১ ও ভি-২ রকেট কারখানা ধ্বংস করতে বড় অভিযান চালিয়েছিল। গোপন গুহা ও পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে রাখা এই রকেট লঞ্চারগুলো বিমান হামলা দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
আধুনিক নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র (প্রিসিশন মিউনিশনস) এনেও এই সমীকরণ বদলানো যায়নি। কারণ লঞ্চারগুলো যেকোনো জায়গা থেকে দ্রুত ছুড়ে অন্যত্র সরে যাওয়া যায়। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বিমান হামলা চালিয়ে ইরাকের স্কাড মিসাইল লঞ্চারগুলোর একটিও নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। হামাস ও হিজবুল্লাহর রকেট হামলা বন্ধ করতে ইসরায়েল গাজা ও লেবাননে দুই দশক ধরে বিমান হামলা চালিয়েও লাভবান হতে পারেনি।
ইয়েমেনের হুথিদের ড্রোন ও মিসাইল বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক জোট বছরের পর বছর চেষ্টা করেছে। এখনও তাদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। লুকিয়ে থেকে দ্রুত সরে যেতে সক্ষম মোবাইল লঞ্চারগুলো বিমান হামলা দিয়ে পুরোপুরি ধ্বংস করা যায় না। আকাশে বোমা ফেলে ড্রোন বা রকেট থামানো সম্ভব নয়। এর জন্য পদাতিক বাহিনীর সরাসরি অভিযান প্রয়োজন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সুরক্ষায় শতভাগ নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এসব দেশের সামরিক ঘাঁটির ওপরই মার্কিন অভিযান পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল। ইউক্রেনের মতো কম খরচে ড্রোন ধ্বংসের ব্যবস্থা এবং স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে হয়তো কয়েকটি হামলা বেশি ঠেকানো যেত।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি সস্তা ও দ্রুতগতির। এই অসম লড়াইয়ে একপর্যায়ে ইরানের হামলার পরিমাণ মার্কিন প্রতিরক্ষার ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাবে (স্যাচুরেশন), এটাই ছিল স্বাভাবিক হিসাব। একটি অসম্ভব কাজের ব্যর্থতা ঢাকতে আরেকটি অসম্ভব কৌশল বেছে নেওয়া হয়েছিল।
ড্রোন প্রযুক্তির বিপদ ও রসদের ঘাটতি মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের জন্য বড় সতর্কবার্তা। এই যুদ্ধের ব্যর্থতা পেন্টাগনের তৈরি নয়। পরাজয়ের মূল পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল খোদ হোয়াইট হাউসে।
অসম্ভব সব সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণের ঝুঁকি ট্রাম্প নিজে না বুঝলে সেটি ধরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল প্রতিরক্ষামন্ত্রীর। ট্রাম্প কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়োগ না দিয়ে কেবল অনুগত ও অযোগ্য পিট হেগসেথকে এই পদে বসিয়েছিলেন।
হেগসেথ নিজের ক্ষমতা পাকা করতে পেন্টাগনের শীর্ষ পদগুলো থেকে স্বাধীনচেতা কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেন। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব এমনিতেই রাজনৈতিক নেতাদের অপ্রিয় সত্য জানাতে দ্বিধাবোধ করে। হেগসেথের কারণে পেন্টাগন থেকে ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্তের কোনো জোরালো প্রতিবাদ আসেনি। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সমস্যার কথা হালকাভাবে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। হেগসেথের অন্ধ সমর্থনের সামনে তাঁর আওয়াজ চাপা পড়ে যায়।
এই সামরিক বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক দায় ট্রাম্প এবং তাঁর চাটুকার উপদেষ্টাদের ওপর বর্তায়। মূল দায় আমেরিকার ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর বর্তায়। আমেরিকান ভোটারদের বড় একটি অংশ ট্রাম্পের মতো এক চরম অযোগ্য ও চাটুকারবেষ্টিত ব্যক্তিকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে এনেছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নেতা নির্বাচন আর রিয়ালিটি শোর সঞ্চালক বেছে নেওয়া কখনোই সমান নয়। পেন্টাগন হয়তো এই যুদ্ধ থেকে সামরিক ভুলত্রুটি খোঁজার গবেষণা চালিয়ে যাবে। তবে এর মধ্যেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে এবং আমেরিকার জাতীয় সম্পদের বড় অপচয় ঘটছে।
এই ব্যর্থতা কি আমেরিকান জনগণের বিবেককে নাড়া দিতে পারবে? দেশের সামরিক প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, ভুল মানুষকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসানোর মারাত্মক পরিণতি থেকে দেশকে কিন্তু কেউ বাঁচাতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ফরেইন পলিসির বিশ্লেষণ
.png)

মুসলিমদের অজু এবং এশীয়দের চাল ধোয়ার ক্ষেত্রে পানির ব্যবহার কমাতে বলেছে যুক্তরাজ্যের পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ‘পানি ব্যবহারে দক্ষতা: ধর্মীয় ও বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই পরামর্শ দেওয়া হয়।
১ ঘণ্টা আগে
এবছরের এপ্রিলে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিবিয়ার রাজনীতির প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ১৯০ বিলিয়ন দিনার (প্রায় ৩ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা) বাজেট ভাগ করে দেশ পরিচালনায় একমত হয়েছে। মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পর, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এই বাজেটটি লিবিয়াকে বিভক্ত করে রাখা দুই মেরুকে এক কাতারে আনতে পারে
১ ঘণ্টা আগে
শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে ৪০ কোটি ডলার (প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা) দিতে রাজি হয়েছে সামাজিক মাধ্যম টিকটক। শুক্রবার (২১ আগস্ট) মার্কিন বিচার বিভাগ এই সমঝোতার ঘোষণা দেয়। শিশুদের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনায় এটি অন্যতম বড় আর্থিক সমঝোতা বলে জানিয়েছে বিবিসি।
