স্ট্রিম ডেস্ক

রসুয়ায় ছোট ভাই প্রবীনকে রেখে গত মঙ্গলবার কাঠমান্ডু এসেছিলেন রাম বুধা। দুজনের কেউই ভাবেননি এই তাঁদের শেষ দেখা। পরের দিন ভোটেকোশি নদী অববাহিকায় আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। হাকুবেশির আপার ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ২০ বছর বয়সী প্রবীন নিখোঁজ হন। সেই থেকে ভাইয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাম।
কাঠমান্ডু থেকে হাকুবেশিতে গিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ঢোকার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। তাঁর আশা, ভাই হয়তো ভেতরে আটকা। বুকসমান কাদা জমে থাকায় ভেতরে ঢুকতে পারেননি রাম বুধা।
রাম বলেন, ‘সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের নাম ধরে চিৎকার করেছিলাম। আশা ছিল ও কোনো জবাব দেবে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো সাড়া পাইনি। সুড়ঙ্গের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে কারও কোনো ধারণা নেই।’
দুই ভাইয়ের বাড়ি জুমলার পাতরাসি গ্রামে। তাঁদের মা-বাবা বাড়িতে বসে ছেলের খবরের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছেন। রাম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘মা-বাবাকে বলেছি সন্ধান চলছে। তাদের এখন কী জবাব দেব?’
রামের মতো হাজার হাজার মানুষ এখন নেপালের বিভিন্ন প্রান্তে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। গত বুধবারের ভোটেকোশি বন্যার পর থেকে এই হাহাকার চলছে।

কর্নালী, সুদূরপশ্চিম ও মধেশ প্রদেশ থেকে স্বজনরা রসুয়া, নুয়াকোট, চিতওয়ান, নাওয়ালপুর, তানাহুন এবং পোখরায় ছুটে আসছেন। নিখোঁজ স্বজনদের ছবি পকেটে নিয়ে কেউ হাসপাতালের মর্গে মর্গে ঘুরছেন। কেউ উদ্ধারকেন্দ্র, পুলিশ স্টেশন এবং সেনাক্যাম্পে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। স্বজনরা পানিতে ভেসে গেছেন, নাকি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন, তা কেউ নিশ্চিত করে জানে না।
সোমবার সকাল পর্যন্ত জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ৯০৩টি মরদেহ উদ্ধারের খবর জানিয়েছে। এখনো ৪ হাজার ২৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন শ্রমিক, প্রকৌশলী ও কর্মচারী রয়েছেন। ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক এবং তাদের সঙ্গে ভ্রমণকারী ১২৭ জন নেপালিরও কোনো সন্ধান মিলছে না। অনিশ্চয়তার এই প্রহর স্বজনদের জন্য চরম যন্ত্রণার রূপ নিয়েছে।
দ্রুত খোঁজার জন্য পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জেলায় ভাগ হয়ে সন্ধান চালাচ্ছেন। অনেকে সামাজিক মাধ্যমে ছবি দিয়ে আকুতি জানাচ্ছেন। গরিব ও যোগাযোগহীন অনেক পরিবারের সদস্যরা ঘরের কোণে বসে কেবল অশ্রু ফেলছেন।
দাং জেলার তুলসীপুরের সরিতা চৌধুরী পোখরায় এসেছেন স্বামী সুনীলের খোঁজে। সুনীল রসুয়ার তিমুরে এলাকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। বন্যার আগের দিন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে সরিতার। সরিতা বলেন, ‘দশাইন উৎসবে বাড়ি ফিরবে বলেছিল। বাচ্চাদের জন্য নতুন কাপড় কিনতে বলেছিল। পরের দিন বিকেলে শুনলাম বন্যায় সবকিছু ভেসে গেছে।’
সরিতার ১৬ বছর বয়সী ছেলে এবং ১০ বছর বয়সী মেয়ে বারবার বাবার কথা জানতে চাইছে।

তিমুরের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ভেসে যাওয়ার পর তুলসীপুর এলাকার ১৮ জন বাসিন্দা নিখোঁজ হন। নিখোঁজদের খুঁজতে স্থানীয় ওয়ার্ড চেয়ারম্যান মোহন পাউডেলের নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের দল গঠন হয়েছে। চিতওয়ানে কারও সন্ধান না পেয়ে দলটি পোখরায় ছুটে আসে।
পোখরা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সেসে অজ্ঞাত মরদেহের ছবিগুলো একে একে যাচাই করেন তাঁরা। প্রতিটি ছবি দেখার সময় স্বজনদের বুক কেঁপে উঠছিল। ১০২টি মরদেহের ছবি পরীক্ষা করার পরও নিখোঁজ ১৮ জনের কারও সন্ধান মেলেনি।
মোহন পাউডেল জানান, ছবির কেউ তাঁদের এলাকার বাসিন্দা নন। কাস্কি জেলা পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজদের সন্ধানে পোখরায় আসছেন।
ষাট বছর বয়সী বিরসিমায়া রৌতাহাট থেকে ভরতপুরে এসেছেন ছেলে শের বাহাদুর মাঝির সন্ধানে। শের বাহাদুর রসুয়া শুল্ক অফিসের কাছে কাজ করতেন। বিরসিমায়া বলেন, ‘এখানে লাশ আনা হয়েছে শুনে ছুটে এসেছি।’
তাঁর স্বামী বয়োবৃদ্ধ এবং অন্য ছেলেরা বিদেশে থাকায় বিরসিমায়া নিজেই পুত্রবধূ ও প্রতিবেশীদের নিয়ে চিতওয়ানের চেম্বার অব কমার্স ভবনে এসেছেন। সেখানে বড় পর্দায় মরদেহের ছবি দেখানো হচ্ছে। প্রদর্শিত ছবিতে ছেলের মুখ দেখতে পাননি তিনি। গাইন্ডাকোট ও পোখরার হাসপাতালেও ছেলেকে খুঁজতে যাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। বিরসিমায়া বলেন, ‘মন বলছে আমার ছেলে বেঁচে আছে।’
অনেকের টাকা ও শরীরের শক্তি দুটোই শেষ হয়ে গেছে। বাঁকে জেলার কোহলপুরের কারিঙ্গা থারু ভাই আশারাম এবং ভাতিজা পৃথ্বী নারায়ণের খোঁজে ভরতপুরে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁরা নুয়াকোটের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন।

একই প্রকল্পে কাজ করা তাঁদের গ্রামের তিনজনের মরদেহ ভরতপুরে পাওয়া গিয়েছিল। কারিঙ্গা আশা করেছিলেন ভাই-ভাতিজাকে হয়তো এখানে পাওয়া যাবে। দুই দিন খোঁজাখুঁজির পরও কোনো তথ্য না পেয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কারিঙ্গা বলেন, ‘বুঝতেই পারছি না, কোথায় খুঁজব ওদের।’
নুয়াকোটের নবরাজ লামা তাঁর ৪২ বছর বয়সী ছোট ভাই রামেশ্বরের সন্ধানে চিতওয়ান, গাইন্ডাকোট ও পোখরা চষে ফেলেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে নুয়াকোটে পৌঁছে কোনো খোঁজ পাননি তিনি। চিতওয়ানে মরদেহের ছবি দেখেছেন। গাইন্ডাকোটের পৌর হাসপাতালে গেছেন। সারারাত গাড়ি চালিয়ে পোখরায় পৌঁছেছেন। কোথাও কোনো হদিস মেলেনি।
রোববার ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরার পথ ধরেন তিনি। নবরাজ প্রশ্ন তোলেন, ‘ভাবিকে গিয়ে কী বলব? একজন মানুষকে খুঁজতে আমাদের আর কত জায়গায় ঘুরতে হবে? সব লাশ এক জায়গায় রাখলে আমাদের মতো পরিবারের কষ্ট কিছুটা কমত।’
বন্যার আগের দিন নবরাজের সাথে ভাইয়ের ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘ও খেয়েদেয়ে ঘুমাতে যাওয়ার কথা বলেছিল। পাঁচ দিন কেটে গেল। জীবনের কোনো সাড়া নেই, লাশেরও কোনো খোঁজ নেই।’
একই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন থাহা পৌরসভার ওম বাহাদুর কার্কি। তাঁর ছেলে প্রশান্তও পণ্য পরিবহনের গাড়ি নিয়ে রসুয়াগাড়ির দিকে গিয়েছিলেন। কার্কি নুয়াকোটের পর হাসপাতালগুলোতে ঘুরেছেন।
কার্কি বলেন, ‘লাশ দেখতে আমি ভরতপুর ছাড়াও নাওয়ালপুরের মধ্যবিন্দু প্রাদেশিক হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কোথাও ছেলেকে না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছি।’
মাকওয়ানপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী এই জেলার ৬৫ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ।
নেপালের সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম অঞ্চলের শত শত মানুষ এই ট্র্যাজেডির শিকার। সালিয়ানের মেনওয়ালাল বুধাথোকি তিমুরেতে থাকা ছোট ভাই গিরিলালের ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন।
মেনওয়ালাল বলেন, ‘ভাই ফোনে আর্তনাদ করে বলেছিল, ভাই আমার সব শেষ হয়ে গেছে। বন্যায় আমি গুরুতর আহত হয়েছি এবং আমার স্ত্রী ও সন্তানরা ভেসে গেছে।’
গিরিলালকে চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডু নেওয়া হয়েছিল। সেখানে ভাইয়ের দেখা পেলেও তাঁর স্ত্রী সুনীতা এবং সন্তান নির্মলা, কেশব ও নিরাজনের কোনো সন্ধান মেলেনি। মেনওয়ালাল বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর জীবিত উদ্ধারের খবর পেয়ে হাসপাতালের পর হাসপাতালে ঘুরেছি। তাদের খুঁজে পাইনি।’
সালিয়ানের অর্জুন রানা তাঁর ৬০ বছর বয়সী বাবা দুর্গা বাহাদুর রানাকে খুঁজতে চিতওয়ান, দামাউলি ও পোখরায় গেছেন। অর্জুন বলেন, ‘বাবা বেঁচে আছেন না মরে গেছেন, কিছুই জানি না। পাঁচ দিন ধরে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না।’
প্রিয়াঙ্কা গাদারিয়ার জন্য দুর্যোগ শুরু হয়েছিল অসমাপ্ত ফোন কলে। তাঁর ২৩ বছর বয়সী স্বামী আশিস রসুয়ার মাইলুং পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন। প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘সকাল সাড়ে আটটায় ওর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম। হঠাৎ কল কেটে যায়। ও আর কল দেয়নি। পরে চেষ্টা করেও ওর ফোন বন্ধ পাই।’
আধা ঘণ্টা পর প্রিয়াঙ্কা বন্যার খবর পান। তিনি বলেন, ‘মনে হলো যেন পাহাড় থেকে নিচে পড়ে গেলাম। পাঁচ দিন ধরে ওর কোনো খবর নেই।’
আশিস ১৭ মাস আগে নেপাল পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন। নয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে মাইলুং ছিল তাঁর প্রথম কর্মস্থল। কপিলবস্তুর হাসপাতালে মরদেহের খবর শুনে তাঁর পরিবার সেখানে গিয়েছিল। সেখানেও আশিসকে পাওয়া যায়নি। আশিসের বাবা খেদু বলেন, ‘ভেড়া পালন করে ছেলেকে বড় করেছি। এখন কেবল ওর ফিরে আসার প্রার্থনা করছি।’
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নেপাল সেনাবাহিনীর ৪৫ সদস্য, পুলিশের ২৫ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১২ সদস্য এখনো নিখোঁজ আছেন।
লুম্বিনী প্রাদেশিক হাসপাতালের মরদেহ শনাক্তকরণ কক্ষে তিন দিন ধরে বসে আছেন হুমনাথ নিউপানে। শার্টের পকেটে রাখা আছে রসুয়ার শুল্ক এজেন্ট হিসেবে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী আত্মীয় প্রকাশ দেবকোটার ছবি। ফেসবুক থেকে প্রিন্ট করা সেই ছবি নিয়ে তিনি পুলিশের কাছে ছুটে যাচ্ছেন।
হুমনাথ পুলিশকে বারবার অনুরোধ করে বলছেন, ‘একটু ভালো করে দেখুন। এই চেহারার সঙ্গে মরদেহের কারও মিল আছে কি না।’
অজ্ঞাত মরদেহগুলো দ্রুত দাফন বা সৎকার করে ফেলার গুঞ্জনে পরিবারের সদস্যরা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। স্বজনের সন্ধানে এসে অনেকে ঋণে জড়িয়ে পড়েছেন। বাঁকে জেলার তিলক ঘারতি মাগার ধার করে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ২৮ বছর বয়সী মেয়ে জানাকির সন্ধানে নেমেছেন।
তিলক বলেন, ‘টাকার অভাবে বাধ্য হয়ে ফিরতে হবে। তবে বাড়ি ফিরে যাওয়া মানে আশা ছাড়া নয়।’
ছোট ভাইয়ের সন্ধানে ঘুরে ক্লান্ত নবরাজ লামা যেমনটি বলেন, ‘নিখোঁজের শ্বাস অথবা লাশ না পাওয়া পর্যন্ত স্বজনের আশা কখনো মরে না।’
নেপালের সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে অনূদিত

রসুয়ায় ছোট ভাই প্রবীনকে রেখে গত মঙ্গলবার কাঠমান্ডু এসেছিলেন রাম বুধা। দুজনের কেউই ভাবেননি এই তাঁদের শেষ দেখা। পরের দিন ভোটেকোশি নদী অববাহিকায় আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। হাকুবেশির আপার ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ২০ বছর বয়সী প্রবীন নিখোঁজ হন। সেই থেকে ভাইয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাম।
কাঠমান্ডু থেকে হাকুবেশিতে গিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ঢোকার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। তাঁর আশা, ভাই হয়তো ভেতরে আটকা। বুকসমান কাদা জমে থাকায় ভেতরে ঢুকতে পারেননি রাম বুধা।
রাম বলেন, ‘সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের নাম ধরে চিৎকার করেছিলাম। আশা ছিল ও কোনো জবাব দেবে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো সাড়া পাইনি। সুড়ঙ্গের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে কারও কোনো ধারণা নেই।’
দুই ভাইয়ের বাড়ি জুমলার পাতরাসি গ্রামে। তাঁদের মা-বাবা বাড়িতে বসে ছেলের খবরের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছেন। রাম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘মা-বাবাকে বলেছি সন্ধান চলছে। তাদের এখন কী জবাব দেব?’
রামের মতো হাজার হাজার মানুষ এখন নেপালের বিভিন্ন প্রান্তে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। গত বুধবারের ভোটেকোশি বন্যার পর থেকে এই হাহাকার চলছে।

কর্নালী, সুদূরপশ্চিম ও মধেশ প্রদেশ থেকে স্বজনরা রসুয়া, নুয়াকোট, চিতওয়ান, নাওয়ালপুর, তানাহুন এবং পোখরায় ছুটে আসছেন। নিখোঁজ স্বজনদের ছবি পকেটে নিয়ে কেউ হাসপাতালের মর্গে মর্গে ঘুরছেন। কেউ উদ্ধারকেন্দ্র, পুলিশ স্টেশন এবং সেনাক্যাম্পে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। স্বজনরা পানিতে ভেসে গেছেন, নাকি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন, তা কেউ নিশ্চিত করে জানে না।
সোমবার সকাল পর্যন্ত জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ৯০৩টি মরদেহ উদ্ধারের খবর জানিয়েছে। এখনো ৪ হাজার ২৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন শ্রমিক, প্রকৌশলী ও কর্মচারী রয়েছেন। ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক এবং তাদের সঙ্গে ভ্রমণকারী ১২৭ জন নেপালিরও কোনো সন্ধান মিলছে না। অনিশ্চয়তার এই প্রহর স্বজনদের জন্য চরম যন্ত্রণার রূপ নিয়েছে।
দ্রুত খোঁজার জন্য পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জেলায় ভাগ হয়ে সন্ধান চালাচ্ছেন। অনেকে সামাজিক মাধ্যমে ছবি দিয়ে আকুতি জানাচ্ছেন। গরিব ও যোগাযোগহীন অনেক পরিবারের সদস্যরা ঘরের কোণে বসে কেবল অশ্রু ফেলছেন।
দাং জেলার তুলসীপুরের সরিতা চৌধুরী পোখরায় এসেছেন স্বামী সুনীলের খোঁজে। সুনীল রসুয়ার তিমুরে এলাকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। বন্যার আগের দিন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে সরিতার। সরিতা বলেন, ‘দশাইন উৎসবে বাড়ি ফিরবে বলেছিল। বাচ্চাদের জন্য নতুন কাপড় কিনতে বলেছিল। পরের দিন বিকেলে শুনলাম বন্যায় সবকিছু ভেসে গেছে।’
সরিতার ১৬ বছর বয়সী ছেলে এবং ১০ বছর বয়সী মেয়ে বারবার বাবার কথা জানতে চাইছে।

তিমুরের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ভেসে যাওয়ার পর তুলসীপুর এলাকার ১৮ জন বাসিন্দা নিখোঁজ হন। নিখোঁজদের খুঁজতে স্থানীয় ওয়ার্ড চেয়ারম্যান মোহন পাউডেলের নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের দল গঠন হয়েছে। চিতওয়ানে কারও সন্ধান না পেয়ে দলটি পোখরায় ছুটে আসে।
পোখরা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সেসে অজ্ঞাত মরদেহের ছবিগুলো একে একে যাচাই করেন তাঁরা। প্রতিটি ছবি দেখার সময় স্বজনদের বুক কেঁপে উঠছিল। ১০২টি মরদেহের ছবি পরীক্ষা করার পরও নিখোঁজ ১৮ জনের কারও সন্ধান মেলেনি।
মোহন পাউডেল জানান, ছবির কেউ তাঁদের এলাকার বাসিন্দা নন। কাস্কি জেলা পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজদের সন্ধানে পোখরায় আসছেন।
ষাট বছর বয়সী বিরসিমায়া রৌতাহাট থেকে ভরতপুরে এসেছেন ছেলে শের বাহাদুর মাঝির সন্ধানে। শের বাহাদুর রসুয়া শুল্ক অফিসের কাছে কাজ করতেন। বিরসিমায়া বলেন, ‘এখানে লাশ আনা হয়েছে শুনে ছুটে এসেছি।’
তাঁর স্বামী বয়োবৃদ্ধ এবং অন্য ছেলেরা বিদেশে থাকায় বিরসিমায়া নিজেই পুত্রবধূ ও প্রতিবেশীদের নিয়ে চিতওয়ানের চেম্বার অব কমার্স ভবনে এসেছেন। সেখানে বড় পর্দায় মরদেহের ছবি দেখানো হচ্ছে। প্রদর্শিত ছবিতে ছেলের মুখ দেখতে পাননি তিনি। গাইন্ডাকোট ও পোখরার হাসপাতালেও ছেলেকে খুঁজতে যাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। বিরসিমায়া বলেন, ‘মন বলছে আমার ছেলে বেঁচে আছে।’
অনেকের টাকা ও শরীরের শক্তি দুটোই শেষ হয়ে গেছে। বাঁকে জেলার কোহলপুরের কারিঙ্গা থারু ভাই আশারাম এবং ভাতিজা পৃথ্বী নারায়ণের খোঁজে ভরতপুরে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁরা নুয়াকোটের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন।

একই প্রকল্পে কাজ করা তাঁদের গ্রামের তিনজনের মরদেহ ভরতপুরে পাওয়া গিয়েছিল। কারিঙ্গা আশা করেছিলেন ভাই-ভাতিজাকে হয়তো এখানে পাওয়া যাবে। দুই দিন খোঁজাখুঁজির পরও কোনো তথ্য না পেয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কারিঙ্গা বলেন, ‘বুঝতেই পারছি না, কোথায় খুঁজব ওদের।’
নুয়াকোটের নবরাজ লামা তাঁর ৪২ বছর বয়সী ছোট ভাই রামেশ্বরের সন্ধানে চিতওয়ান, গাইন্ডাকোট ও পোখরা চষে ফেলেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে নুয়াকোটে পৌঁছে কোনো খোঁজ পাননি তিনি। চিতওয়ানে মরদেহের ছবি দেখেছেন। গাইন্ডাকোটের পৌর হাসপাতালে গেছেন। সারারাত গাড়ি চালিয়ে পোখরায় পৌঁছেছেন। কোথাও কোনো হদিস মেলেনি।
রোববার ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরার পথ ধরেন তিনি। নবরাজ প্রশ্ন তোলেন, ‘ভাবিকে গিয়ে কী বলব? একজন মানুষকে খুঁজতে আমাদের আর কত জায়গায় ঘুরতে হবে? সব লাশ এক জায়গায় রাখলে আমাদের মতো পরিবারের কষ্ট কিছুটা কমত।’
বন্যার আগের দিন নবরাজের সাথে ভাইয়ের ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘ও খেয়েদেয়ে ঘুমাতে যাওয়ার কথা বলেছিল। পাঁচ দিন কেটে গেল। জীবনের কোনো সাড়া নেই, লাশেরও কোনো খোঁজ নেই।’
একই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন থাহা পৌরসভার ওম বাহাদুর কার্কি। তাঁর ছেলে প্রশান্তও পণ্য পরিবহনের গাড়ি নিয়ে রসুয়াগাড়ির দিকে গিয়েছিলেন। কার্কি নুয়াকোটের পর হাসপাতালগুলোতে ঘুরেছেন।
কার্কি বলেন, ‘লাশ দেখতে আমি ভরতপুর ছাড়াও নাওয়ালপুরের মধ্যবিন্দু প্রাদেশিক হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কোথাও ছেলেকে না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছি।’
মাকওয়ানপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী এই জেলার ৬৫ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ।
নেপালের সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম অঞ্চলের শত শত মানুষ এই ট্র্যাজেডির শিকার। সালিয়ানের মেনওয়ালাল বুধাথোকি তিমুরেতে থাকা ছোট ভাই গিরিলালের ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন।
মেনওয়ালাল বলেন, ‘ভাই ফোনে আর্তনাদ করে বলেছিল, ভাই আমার সব শেষ হয়ে গেছে। বন্যায় আমি গুরুতর আহত হয়েছি এবং আমার স্ত্রী ও সন্তানরা ভেসে গেছে।’
গিরিলালকে চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডু নেওয়া হয়েছিল। সেখানে ভাইয়ের দেখা পেলেও তাঁর স্ত্রী সুনীতা এবং সন্তান নির্মলা, কেশব ও নিরাজনের কোনো সন্ধান মেলেনি। মেনওয়ালাল বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর জীবিত উদ্ধারের খবর পেয়ে হাসপাতালের পর হাসপাতালে ঘুরেছি। তাদের খুঁজে পাইনি।’
সালিয়ানের অর্জুন রানা তাঁর ৬০ বছর বয়সী বাবা দুর্গা বাহাদুর রানাকে খুঁজতে চিতওয়ান, দামাউলি ও পোখরায় গেছেন। অর্জুন বলেন, ‘বাবা বেঁচে আছেন না মরে গেছেন, কিছুই জানি না। পাঁচ দিন ধরে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না।’
প্রিয়াঙ্কা গাদারিয়ার জন্য দুর্যোগ শুরু হয়েছিল অসমাপ্ত ফোন কলে। তাঁর ২৩ বছর বয়সী স্বামী আশিস রসুয়ার মাইলুং পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন। প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘সকাল সাড়ে আটটায় ওর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম। হঠাৎ কল কেটে যায়। ও আর কল দেয়নি। পরে চেষ্টা করেও ওর ফোন বন্ধ পাই।’
আধা ঘণ্টা পর প্রিয়াঙ্কা বন্যার খবর পান। তিনি বলেন, ‘মনে হলো যেন পাহাড় থেকে নিচে পড়ে গেলাম। পাঁচ দিন ধরে ওর কোনো খবর নেই।’
আশিস ১৭ মাস আগে নেপাল পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন। নয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে মাইলুং ছিল তাঁর প্রথম কর্মস্থল। কপিলবস্তুর হাসপাতালে মরদেহের খবর শুনে তাঁর পরিবার সেখানে গিয়েছিল। সেখানেও আশিসকে পাওয়া যায়নি। আশিসের বাবা খেদু বলেন, ‘ভেড়া পালন করে ছেলেকে বড় করেছি। এখন কেবল ওর ফিরে আসার প্রার্থনা করছি।’
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নেপাল সেনাবাহিনীর ৪৫ সদস্য, পুলিশের ২৫ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১২ সদস্য এখনো নিখোঁজ আছেন।
লুম্বিনী প্রাদেশিক হাসপাতালের মরদেহ শনাক্তকরণ কক্ষে তিন দিন ধরে বসে আছেন হুমনাথ নিউপানে। শার্টের পকেটে রাখা আছে রসুয়ার শুল্ক এজেন্ট হিসেবে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী আত্মীয় প্রকাশ দেবকোটার ছবি। ফেসবুক থেকে প্রিন্ট করা সেই ছবি নিয়ে তিনি পুলিশের কাছে ছুটে যাচ্ছেন।
হুমনাথ পুলিশকে বারবার অনুরোধ করে বলছেন, ‘একটু ভালো করে দেখুন। এই চেহারার সঙ্গে মরদেহের কারও মিল আছে কি না।’
অজ্ঞাত মরদেহগুলো দ্রুত দাফন বা সৎকার করে ফেলার গুঞ্জনে পরিবারের সদস্যরা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। স্বজনের সন্ধানে এসে অনেকে ঋণে জড়িয়ে পড়েছেন। বাঁকে জেলার তিলক ঘারতি মাগার ধার করে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ২৮ বছর বয়সী মেয়ে জানাকির সন্ধানে নেমেছেন।
তিলক বলেন, ‘টাকার অভাবে বাধ্য হয়ে ফিরতে হবে। তবে বাড়ি ফিরে যাওয়া মানে আশা ছাড়া নয়।’
ছোট ভাইয়ের সন্ধানে ঘুরে ক্লান্ত নবরাজ লামা যেমনটি বলেন, ‘নিখোঁজের শ্বাস অথবা লাশ না পাওয়া পর্যন্ত স্বজনের আশা কখনো মরে না।’
নেপালের সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে অনূদিত
.png)

নেপাল-চীন সীমান্তে বন্যায় নিহত বেড়ে ৯০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। বেড়েছে নিখোঁজও। এতদিন তিন হাজার মানুষ নিখোঁজ বলা হলেও, নতুন করে সংখ্যাটি ৪ হাজার ২৪৭ বলেছে নেপোলের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, চীনের তিব্বত অংশে ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
৩ ঘণ্টা আগে
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানিকারক খার্গ দ্বীপ বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (৩১ আগস্ট) ট্রুথ সোশ্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) তৈরি একটি ভিডিও শেয়ার করে ট্রাম্প লেখেন, ‘খার্গ দ্বীপ পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে!!!’ যুদ্ধের আগে ইরানের মোট
৩ ঘণ্টা আগে
হরমুজ প্রণালির কাছে লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং জবাবে ইরানের পাল্টা হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
৪ ঘণ্টা আগে
হরমুজ প্রণালির কাছে লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের রকেট আক্রমণের জবাবে জর্ডানে মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। জুলাইয়ের শেষ দিকে মার্কিন সামরিক অভিযান স্থগিত করার পর ইরানে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলা।। খবর বিবিসি
৫ ঘণ্টা আগে