বার্লিনে বামদের জয়, সরকার গঠনে চ্যালেঞ্জ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ৩২
বাম দল ডি লিঙ্কে-এর প্রধান প্রার্থী এলিফ এরাল্প। ছবি: সংগৃহীত
বাম দল ডি লিঙ্কে-এর প্রধান প্রার্থী এলিফ এরাল্প। ছবি: সংগৃহীত

বার্লিনে প্রথমবারের মতো সবচেয়ে বড় দল হয়েছে বাম দল ডি লিঙ্কে। একই নির্বাচনে সিডিইউ ও এসপিডি-এর বড় পতন এবং এএফডি-এর উত্থান দেখিয়ে দিয়েছে, জার্মানির রাজধানীতেও প্রচলিত রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাচ্ছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর হওয়া রাজ্য সরকার নির্বাচনের ভোটে জয় পাওয়ার পর সরকার গঠনই এখন ডি লিঙ্কে-এর বড় পরীক্ষা।

শেষ দুই নির্বাচনের ভোটের চিত্র

নির্বাচনে বামপন্থী দল ডি লিঙ্কে ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে এক ঐতিহাসিক এবং চমকপ্রদ জয় লাভ করে। আগের নির্বাচনের তুলনায় সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছে তারা। বিপরীতে, বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী দলগুলো। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পেয়েছে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। গতবারের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট কম পেয়েছে তারা।

অন্যদিকে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (সিপিডি) পেয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভোট। এটি গতবারের চেয়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট কম। গ্রিনস ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে। যা গতবারের চেয়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ কম।

অন্যদিকে জনসমর্থন বেড়েছে ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি)। তারা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে নিজেদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী করেছে। এটি গতবারের চেয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোট বেশি।

ভোটের কেন্দ্রে ছিল বাড়িভাড়া

বাম দলের জয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বার্লিনের আবাসন সংকট। দলের প্রধান প্রার্থী এলিফ এরাল্প নির্বাচনী প্রচারে বাড়িভাড়া কমানো এবং সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

নির্বাচনের পর এরাল্প বলেন, বার্লিনে বাড়িভাড়ার পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এটি রাজধানীর সবচেয়ে বড় সামাজিক সমস্যাগুলোর একটি।

এরাল্পের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বাড়িভাড়ার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং বড় বেসরকারি আবাসন কোম্পানিগুলোর মালিকানাধীন বাড়ি অধিগ্রহণ করা। তিনি ২০২১ সালের একটি গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ওই গণভোটে ৫৮ শতাংশ ভোটার বড় আবাসন কোম্পানির মালিকানাধীন সম্পত্তি জাতীয়করণের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার আবাসন ইউনিট রাষ্ট্রীয় মালিকানায় যেতে পারে।

তবে এর খরচ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসপিডির সাধারণ সম্পাদক টিম ক্লুসেনডর্ফের হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় হতে পারে।

আবার এই নীতির পক্ষে জনসমর্থনও সর্বসম্মত নয়। ইনফ্রাটেস্ট ডিমাপের এক জরিপে মাত্র ৩৭ শতাংশ মানুষ আবাসন জাতীয়করণের পক্ষে মত দিয়েছেন।

এরাল্পের নতুন সম্ভাবনা

নির্বাচনের ফল এলিফ এরাল্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তার বাবা-মা তুরস্ক থেকে জার্মানিতে এসেছিলেন। ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের সময় পালিয়ে তারা জার্মানিতে আশ্রয় নেন।

নির্বাচনের পর সমর্থকদের উদ্দেশে এরাল্প বলেন, আজ থেকে আমরা একসঙ্গে বার্লিনকে পরিবর্তন করবো।

বাম দল সরকার গঠনের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। ফলে দলটির সামনে এখন জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সবকিছু ভালোভাবে এগোলে এরাল্প হতে পারেন বার্লিনের প্রথম বাম দলের রাজ্য সরকার প্রধান।

তার অভিবাসী পারিবারিক পটভূমিও এই নির্বাচনে বিশেষ মনোযোগ পেয়েছে। বার্লিনে অনেক তুর্কি ও আরব জনগোষ্ঠী রয়েছে। শহরের প্রায় অর্ধেক মানুষের কোনো না কোনো অভিবাসী ইতিহাস রয়েছে।

তরুণ ও অভিবাসীদের পছন্দ বাম দল

বাম দলের প্রচারে শুধু বাড়িভাড়া নয়, সামাজিক ব্যয়, গৃহহীন মানুষের সহায়তা এবং সংকটাপন্ন জনগোষ্ঠী জন্য সরকারি সেবার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নয়ক্যোলন এলাকার ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সুমেয়া স্কেভা এবার প্রথমবার ভোট দিয়েছেন। তার পছন্দ ছিল বাম দল। ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপ এবং সবার জন্য বেশি সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি তাকে আকৃষ্ট করেছে।

ওয়েডিং এলাকার ২৬ বছর বয়সী নিরাপত্তাকর্মী মাইকেল আকানও বাম দলকে ভোট দিয়েছেন। তার কাছে বাড়িভাড়া ও গ্যাসের দাম বড় সমস্যা। রাজ্য সরকার সরাসরি গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও বাম দলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতি জীবনযাত্রার চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করেন।

তরুণ ও অভিবাসী ভোটারদের এই সমর্থন বাম দলের নির্বাচনী সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে দলটির প্রচারের চিত্র থেকে বোঝা যায়।

চরম ডানপন্থী এএফডির সমর্থন বাড়ছে

বার্লিনের নির্বাচনে বাম দলের জয় যতটা আলোচিত, এএফডির ফলও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। দলটি ১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বার্লিনে এটি এএফডির ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফল।

একই দিনে মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্ন রাজ্যের নির্বাচনেও প্রথম হয়েছে এএফডি। এর আগে স্যাক্সনি-আনহাল্টেও দলটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল। ফলে জার্মানির পূর্বাঞ্চলে দলটির প্রভাব বাড়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এএফডি অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত। জার্মান অর্থনীতির দুরাবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো দলটির সমর্থন বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

তবে বার্লিনে একই ধরনের অসন্তোষের প্রকাশ ঘটেছে অন্যভাবে। সেখানে ভোটারদের একটি অংশ মূলধারার দলগুলোর বদলে বাম দলের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে একই অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।

জোট গঠনই এখন বড় পরীক্ষা

সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও বাম দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। তাদের জোটের প্রয়োজন হবে।

এসপিডি ও গ্রিনস বাম দলের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে মতপার্থক্যও রয়েছে। বিশেষ করে বড় আবাসন কোম্পানির বাড়ি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি আছে।

গ্রিনস নেতা ফেলিক্স বানাসজাক বলেছেন, বাম দলের কিছু অংশের বিরুদ্ধে ওঠা ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগের বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।

বাম দল অবশ্য ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির বক্তব্য, তারা ইহুদিবিদ্বেষ, বর্ণবাদসহ সব ধরনের গোষ্ঠীভিত্তিক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে।

ফলে জোট গঠনের আলোচনা শুধু আসনসংখ্যার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও দর-কষাকষি করতে হবে।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিতর্ক

বার্লিনের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে ফিলিস্তিন ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এরাল্প ইসরায়েলের গাজা নীতির বিরুদ্ধে আরও স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়া এবং ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে আরও পরিষ্কার নীতি প্রস্তাব না করায় সমালোচিত হয়েছেন।

তবে এরাল্প বারবার বলেছেন, তিনি ফিলিস্তিনিসহ অন্যান্য নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পাশে আছেন। তার সমর্থকদের একটি অংশ আশা করছেন, তার নেতৃত্বে বার্লিনে ফিলিস্তিনপন্থী মত প্রকাশের সুযোগ আরও বাড়বে।

নির্বাচনে জয়ের পর বাম দলের সামনে এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কঠিন পরীক্ষা। আবাসন জাতীয়করণের মতো বড় নীতি বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে জোটসঙ্গীদের সঙ্গে মতৈক্য তৈরি করাও সহজ হবে না।

সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, ট্রুথআউট

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত