অভ্যুত্থান-গৃহযুদ্ধের ১৫ বছর: লিবিয়ায় তারুণ্যের মেধা-দক্ষতার অপচয়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ২০: ১৩
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পেরিয়েছে। কিন্তু দেশটি এখনো তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ন করতে পারছে না।

আশা করা হয়েছিল, গাদ্দাফির পতনের পর বিদেশে থাকা লিবীয়রা দেশে ফিরে দেশ পুনর্গঠনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবেন। বাস্তবে তা হয়নি। উল্টো লিবিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন গাদ্দাফি আমলের চেয়েও বেকায়দায় পড়ে গেছে। ফলে সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় বিদেশমুখী হচ্ছেন লিবিয়ার তরুণেরা।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী লিবিয়ায় তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশার কথা উঠে এসেছে বিদেশে পাড়ি জমানো লিবীয় তরুণদের কণ্ঠে।

ত্রিপোলি যখন বিদ্রোহীদের দখলে যায়, সারা মিজরান তখন কিশোরী। আট বছর হলো তিনি ত্রিপোলি ছেড়ে যুক্তরাজ্যে এসেছেন। ৩২ বছর বয়সী এই স্থপতি বলেন, ‘তরুণ পেশাজীবীরা যখন দেশ ছাড়েন, তখন লিবিয়া কেবল তাদের দক্ষতাই হারায় না, বরং সম্ভাবনার নতুন দুয়ারও বন্ধ হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে তাদের দেশ ছাড়তেই হবে— এমন ভাবনা নিয়ে একটি প্রজন্ম বড় হয়েছে। এমন বাস্তবতা দেশের প্রতি তরুণদের আস্থা পুরোপুরি শেষ করে দেয়।’

গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ সারা মিজরানের মতো অসংখ্য তরুণের দেশত্যাগের যে সূচনা করেছিল, ১৫ বছর পরও তা চলছে।

সারা ভেবেছিলেন, যুক্তরাজ্যে উচ্চতর পড়াশোনা ও অর্জিত অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে সেগুলো কাজে লাগাবেন। কিন্তু লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে ফেরা ও সেখানে কাজ করা নিয়ে তাঁর যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

তিনি একা নন। লিবিয়ায় একসময় সফল ছিলেন এবং যুদ্ধের কারণে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, এমন অনেকের মধ্যেও একই ভাবনা রয়েছে। তাঁদের একজন ৩৬ বছর বয়সী নাদের এলগাদি। ত্রিপোলিতে তাঁর নিজের একটি মিডিয়া কোম্পানি ছিল। ২০১৪ সালের শেষ দিকে লিবিয়ায় দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তিনি নিজের ব্যবসা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে আসেন।

তিনি বলেন, ‘একদম নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়েছিল। প্রথম দুটি বছর সত্যিই ভীষণ কঠিন ছিল।’

আস্তে আস্তে এলগাদি সবকিছু মানিয়ে নেন। যুক্তরাজ্যে আসা এই লিবীয় তরুণ ২০১৮ সালে ‘লিবিয়া ইন দ্য ইউকে’ নামে একটি সাংস্কৃতিক দাতব্য সংস্থা গড়ে তোলেন। তিনি বলেন, ‘এটি গড়ার মূল লক্ষ্য ছিল, স্বৈরাচারের পতনের পর আমরা যেমন লিবিয়া গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, ঠিক তেমন একটি পরিবেশ তৈরি করা।’

সারা মিজরান ও নাদের এলগাদি বিদেশেই তাঁদের যাযাবর জীবন মেনে নিয়েছেন। সারা বলেন, ‘ঘর আজীবন ধরে রাখার মতো কিছু নয়, ঘর বারবার নতুন করে বানাতে হয়।’

তবে অনেক লিবীয় আবার বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলেন নতুন আশা নিয়ে। তাঁরা ভেবেছিলেন, গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবেন। তবে তাঁদের সেই আশাও অনেকাংশেই পূরণ হয়নি।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো তারেক মেগেরেসির কথায় উঠে এসেছে লিবিয়ার এমন আরেক বাস্তবতা।

তিনি বলেন, ‘গাদ্দাফির পতনের পর কয়েক হাজার দক্ষ তরুণ লিবিয়াকে নতুনভাবে গড়ার আশায় বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রশাসনের জ্যেষ্ঠরা এই তরুণদের কাজ করতে দেননি। তথাকথিত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিজেদের নিয়ে বেশ বাগাড়ম্বর করেছিলেন। বলেছিলেন, তাঁরাই দেশে গণতন্ত্র সুসংহত করবেন। যদিও তাঁরা মূলত গাদ্দাফি সরকারের মতোই আচরণ করেছেন।’

তিনি জানান, নানা মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি এমন এক স্থবির পরিবেশ তৈরি করেছে, যা ২০১১-পরবর্তী প্রজন্মের তরুণদের দেশত্যাগে বাধ্য করেছে।

মেগেরেসির মতে, ‘গাদ্দাফি আমলের শেষ দিকে লিবিয়া তুলনামূলকভাবে কিছুটা উন্মুক্ত হচ্ছিল। তখন কিছু তরুণ পেশাজীবী উচ্চতর যোগ্যতা ও কাজের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা থাকায় বেশ আশাবাদী ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, অভ্যুত্থান তাঁদের ক্যারিয়ারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই সব স্বপ্ন ও সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা আর স্থবিরতার কাদায় আটকে গেছে।’

তবে আশা হারাচ্ছেন না মেগেরেসি। তিনি বলেন, লিবিয়ার মেধাবী তরুণেরা দেশে ফেরার জন্য এখনো প্রস্তুত। তাঁর মতে, ‘সত্যিকারের, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো সুযোগ তৈরি হলে এই মেধাবীরা এক মুহূর্তেই দেশে ফিরে আসবেন।’ লিবিয়ার শাসনব্যবস্থার অবস্থা বোঝাতে তিনি কবি কাহলিল জিবরানের ‘পিটি দ্যা নেশন’ কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, ‘সেই দেশটির জন্য করুণা, যার দুটি সরকার আছে, কিন্তু শাসন করার বিষয়ে কারও আগ্রহ নেই।’

আলজাজিরা থেকে অনূদিত

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

অভ্যুত্থান-গৃহযুদ্ধের ১৫ বছর: লিবিয়ায় তারুণ্যের মেধা-দক্ষতার অপচয়