আল-জাজিরার প্রতিবেদন

পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস বিক্রি ‘বিপজ্জনক’, বিজেপির কড়াকড়িতে পরিবর্তন আসছে খাদ্যাভ্যাসেও

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ট্যাংরা কসাইখানার উল্টোদিকে একটি দোকানে গরুর মাংস রান্না হচ্ছে, (ইনসেটে আল-জাজিরার প্রতিবেদন)। ছবি: আল-জাজিরা
ট্যাংরা কসাইখানার উল্টোদিকে একটি দোকানে গরুর মাংস রান্না হচ্ছে, (ইনসেটে আল-জাজিরার প্রতিবেদন)। ছবি: আল-জাজিরা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের সরবরাহ ও ব্যবসায় বড় সংকট তৈরি হয়েছে। রাজ্যটিতে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর গরু জবাইয়ের নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করেছে। ফলে কমেছে সরবরাহ, বেড়েছে দাম। এছাড়া ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নবায়নও আটকে আছে। এর প্রভাব পড়েছে কলকাতার রেস্তোরাঁ ও সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাসে।

কলকাতার ট্যাংরা এলাকায় শহরের একমাত্র গরু জবাইখানা এখন অনেকটাই নীরব। কলকাতা পৌর করপোরেশনের অধীনে থাকা ঔপনিবেশিক আমলের ভবনটির বিশাল লোহার ফটক ভেতর থেকে বন্ধ। ফটকের ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, খালি চত্বরে স্কুলপড়ুয়ারা খেলছে।

জবাইখানার বিপরীতে একটি খাবারের দোকানের ব্যবস্থাপক মেহমুদ আলম বলেন, মে মাসে জবাইখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই ছেলেরা দেয়াল টপকে সেখানে ঢুকে খেলছে। আগে যেখানে সব সময় ব্যস্ততা থাকত, এখন সেখানে নীরবতা। তার ধারণা, শিগগির জবাইখানাটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা কম।

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার গরু জবাই নিয়ে একটি নির্দেশনা জারি করে। এর চার দিন আগে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয়। এতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

নতুন নির্দেশনায় ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে কার্যকরের কথা বলা হয়। এতে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ ও উপযুক্ততার সনদ ছাড়া গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর ও নির্দিষ্ট ধরনের মহিষ জবাই করা যাবে না।

১৪ বছরের বেশি বয়সী, কাজ বা প্রজননের জন্য অনুপযুক্ত কিংবা বয়স, আঘাত, শারীরিক ত্রুটি বা নিরাময় অযোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম প্রাণীর ক্ষেত্রে সনদ দেওয়া যেতে পারে। সনদ পাওয়া প্রাণিও কেবল পৌরসভা বা নির্ধারিত জবাইখানায় জবাই করা যাবে। প্রকাশ্য স্থানে জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বেড়েছে দাম, কমেছে বিক্রি

মে মাসে ঈদের আগে নির্দেশনাটি জারি হওয়ায় এর প্রভাব দ্রুত দেখা যায়। কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন বাজার ও রেস্তোরাঁয় গরুর মাংসের সংকট তৈরি হয়। তিন মাসের বেশি সময় পরও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।

ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি সমস্যা হলো লাইসেন্স। গরুর মাংস বিক্রির জন্য প্রাণি জবাই-উপযোগী হওয়ার সনদের পাশাপাশি ব্যবসার লাইসেন্স প্রয়োজন। কিন্তু কলকাতা পৌর করপোরেশন ভেঙে দেওয়ার পর জুন থেকে এসব লাইসেন্স নবায়ন আটকে আছে। আগামী ডিসেম্বরে কলকাতার পরবর্তী পৌর নির্বাচন হওয়ার কথা।

মাংস ব্যবসায়ী মুশতাক বলেন, তার পরিবারের ছয় প্রজন্ম কলকাতায় গরুর মাংস সরবরাহের ব্যবসা করেছে। অতীতে কোনো সরকারের আমলেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। তিন মাসের বেশি সময় ধরে তিনি কোনো আয় করতে পারেননি।

সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। কলকাতায় মে মাসের আগে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ২০০ থেকে ২৫০ রুপি। এখন তা বেড়ে ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। এক প্লেট গরুর মাংসের ভুনার দামও ১০০ থেকে বেড়ে ১২০ রুপি হয়েছে।

তবে দাম বাড়লেও বিক্রি কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। মেহমুদ আলম বলেন, সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাংসের মান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্রেতা বিজেপি সরকারের আমলে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেতে দেখা যাওয়ার বিষয়েও ভয় পাচ্ছেন।

রেস্তোরাঁর মেনুতে প্রভাব

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার এবং ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শহুরে পরিবার গরু বা মহিষের মাংস খায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মুসলিম গরুর মাংস খান। খ্রিষ্টান, দলিত জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ এবং কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও এটি রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে কলকাতার রেস্তোরাঁগুলোতে গরুর মাংসের পদ কমে যাচ্ছে। অন্তত এক ডজন রেস্তোরাঁ গত তিন মাসে এসব পদ বিক্রি বন্ধ করেছে।

ঐতিহ্যবাহী জমজম রেস্তোরাঁর কলকাতার তিনটি শাখার মেনু থেকেও গরুর মাংসের পদ বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শাদমান ফাইজে বলেন, মানের সঙ্গে আপস করতে না চাওয়ায় তাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এতে প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে এবং কর্মীও ছাঁটাই করতে হয়েছে।

পার্ক স্ট্রিটের ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত অলিপাব গরুর মাংসের স্টেকের জন্য পরিচিত। এখন সেখানে নিয়মিত স্টেক পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবস্থাপনার এক সদস্য বলেন, পদটি মেনু থেকে বাদ দেওয়া হয়নি, তবে গরুর মাংসের নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় মাংস পাওয়া গেলেই শুধু স্টেক তৈরি করা হচ্ছে।

বাড়ছে অনিশ্চয়তা

কলকাতার ব্যবসায়ী আলফাজ লায়েক বলেন, তিনি আগেই পরিস্থিতির পরিবর্তন বুঝতে পেরেছিলেন। এপ্রিল মাসে নির্বাচন চলাকালে তিনি বর্ধমান জেলায় নিজের দুগ্ধ ব্যবসা বন্ধ করে দেন। বৃদ্ধ হওয়া গরুগুলো কসাই ও মাংস ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে বিক্রি করেন।

লায়েকের আশঙ্কা, একসময় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে গরুর মাংস হারিয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, এখন পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংস বহন করা মাদক বহনের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

ভারতের কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে এর আগেও গরু জবাই ও গরুর মাংসের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এসব বিধিনিষেধের পাশাপাশি গরু রক্ষার নামে মুসলিম ও দলিতদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কলকাতার বাইরে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে মে মাস থেকে সকাল ১১টার মধ্যেই বাজারে গরুর মাংস শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা সায়েদ সাইফুল্লাহ বলেন, আগে তাঁদের পরিবার প্রায় প্রতিদিন গরুর মাংস খেত। এখন সপ্তাহে এক বা দুই দিন খাওয়া হয়। অথচ তাঁদের সাপ্তাহিক খাদ্য ব্যয় ৫ হাজার রুপি থেকে বেড়ে ৭ হাজার রুপি হয়েছে।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মালদা জেলাতেও গরুর মাংসের সরবরাহ কমেছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, এখন পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে গোপনে গরুর মাংস সংগ্রহ করা হচ্ছে। গভীর রাতে গরু জবাই করে বাড়িতে মাংস পৌঁছে দেওয়া হয়।

তাঁর ভাষায়, গরুর মাংস নিয়ে ধরা পড়ার ভয় এখন প্রবল। তবে দরিদ্র মুসলিমদের জন্য এই মাংস ছেড়ে দেওয়া সহজ নয়। তাই অনেকে নিরাপত্তা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই গরুর মাংস খাওয়া চালিয়ে যাচ্ছেন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত