হরমুজে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ‘ডার্ক ট্রানজিট’, ব‌শে তে‌লের বাজার

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ইরানের রাজধানী তেহরানের ভানাক স্কয়ারে একটি ভবনের গায়ে হরমুজ প্রণালির ছবি-সংবলিত বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন মানুষ। বিলবোর্ডে ফারসি ভাষায় লেখা, ‘চিরকাল ইরানের হাতে’। ছবি: এএফপি
ইরানের রাজধানী তেহরানের ভানাক স্কয়ারে একটি ভবনের গায়ে হরমুজ প্রণালির ছবি-সংবলিত বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন মানুষ। বিলবোর্ডে ফারসি ভাষায় লেখা, ‘চিরকাল ইরানের হাতে’। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত হামলা ও হুমকির জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল করে রেখেছে ইরান। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হওয়া কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার কথা। তবে নৌপথটি কার্যত বন্ধ থাকলেও তেলের সরবরাহ সচল রাখার নতুন কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা। এতে ইরানের চাপ অনেকটাই সামলে উঠেছে বিশ্ব তেলের বাজার।

মার্কিন নৌবাহিনীর সহায়তায় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো এখন ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে কঠোর গোপনীয়তায়, রাতের অন্ধকারে তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি পার করছে। ইরানের ড্রোন হামলা এড়াতে এসব জাহাজ ‘ডার্ক ট্রানজিট’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে। হরমুজ পেরিয়ে ওমান উপসাগরে পৌঁছানোর পর সেখানে অপেক্ষমাণ অন্য ট্যাংকারে এসব জাহাজ থেকে তেল তুলে দেওয়া হচ্ছে।

গত ২৫ জুলাই বিকেলে কাতারের মেসাইয়িদ তেল রপ্তানি টার্মিনালে ভিড়ে গ্রিসের মালিকানাধীন সুপারট্যাংকার কিকু। চার দিন পর অপরিশোধিত তেল ভর্তি করে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে ছিল জাহাজটি। এক হাজার ফুটের চেয়েও দীর্ঘ ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) শ্রেণির জাহাজটি তখন ঘণ্টায় ১৩ নট গতিতে এগোচ্ছিল।

৩১ জুলাই দুপুর ২টার পরপরই দুবাই উপকূলের কাছে হঠাৎ জাহাজটির এআইএস ট্রান্সপন্ডার থেকে সংকেত আসা বন্ধ হয়ে যায়। জাহাজের পরিচয়, গতি, গতিপথ ও অবস্থান সম্পর্কে সংকেত পাঠায় এই যন্ত্র। ফলে বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সেবাগুলোর কাছে হঠাৎই অদৃশ্য হয়ে যায় কিকু।

প্রায় ২০ ঘণ্টা পর, ১ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে হরমুজ প্রণালির অন্য পাশে ওমান উপসাগরে আবারও ট্রান্সপন্ডার চালু হয় কিকুর। অর্থাৎ মাঝের এই সময়ে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে রাতের আঁধারে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে গেছে জাহাজটি।

কিকুর এই গোপন যাত্রার মাসখানেক আগেই ইরানের একটি ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্ত হয়েছিল জাহাজটি। ওই হামলায় ড্রোনটি জাহাজে আঘাত হানলেও বিস্ফোরিত হয়নি। এরপর ইরানের হামলার ঝুঁকি এড়াতে তেলবাহী জাহাজগুলো নতুন এই কৌশল নিতে শুরু করেছে।

ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে রাতে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার এই কৌশলই এখন তেল বাণিজ্যে ‘ডার্ক ট্রানজিট’ নামে পরিচিত। মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় এমনভাবে ট্যাংকারগুলোকে পার করা হচ্ছে, যাতে ইরানের ড্রোন ও অন্যান্য হামলার ঝুঁকি কমানো যায়।

মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এই কৌশলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে। ট্রান্সপন্ডারের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা জাহাজ চলাচলের বিভিন্ন হিসাবের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। সংঘাতের কারণে কিছু এলাকায় জিপিএস জ্যামিং থাকায় জাহাজ চলাচলের প্রকৃত চিত্রও পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজের প্রায় ৮০ শতাংশই এভাবে ‘ডার্ক’ অবস্থায় চলাচল করেছে। তবে জিপিএস জ্যামিংয়ের কারণে এই হিসাবেও কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন দুই দিনে ওমান উপসাগরে এক ডজনের বেশি জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর পর্যবেক্ষণ করেছে। এসব তেলবাহী জাহাজ পরে চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের দিকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

কিকুর ক্ষেত্রেও এর একটি উদাহরণ দেখা গেছে। ট্রান্সপন্ডার চালু হওয়ার পর ফুজাইরাহর কাছে গ্রিসের মালিকানাধীন আরেক সুপারট্যাংকার ‘নেভ ইলেকট্রন’-এর পাশে নোঙর করে কিকু। নেভ ইলেকট্রন জাহাজটি একদিন আগে ওমান উপসাগরে পৌঁছেছিল। দুই জাহাজ এক সপ্তাহ পাশাপাশি থেকে তেল স্থানান্তর করে। ৮ আগস্ট আলাদা হওয়ার পর নেভ ইলেকট্রন তেল নিয়ে চীনের নিংবো বন্দরের দিকে রওনা হয়ে যায়। কিকু তখন ফুজাইরাহর কাছেই ছিল। ১৪ আগস্ট জাহাজটি আবার ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে। পরদিন সেটির সংকেত পাওয়া যায় পারস্য উপসাগরে, কাতারের দিকে যাওয়ার সময়।

স্যাটেলাইটের ছবিতেও এই গোপন তেল পরিবহনের প্রমাণ মিলেছে। ১৪ আগস্টের ছবিতে ওমানের উপকূল ঘেঁষে হরমুজ প্রণালি পার হওয়া জাহাজের সারি দেখা যায়। কিন্তু জাহাজগুলোর ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকায় একই সময়ের জাহাজ ট্র্যাকিংয়ের তথ্যের সঙ্গে সেগুলোর কোনো মিল পায়নি সিএনএন।

বিকল্প পথেও তেল সরাচ্ছে মিত্ররা

হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথও ব্যবহার করছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। সৌদি আরব প্রতিদিন ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছে। অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশও প্রতিদিন আরও প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে বাজারে পাঠাচ্ছে।

এদিকে হরমুজের অচলাবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ কমেছে। এই ঘাটতিতে বাজার ধরতে তেল উৎপাদন বাড়িয়েছে অনেক দেশ। ব্রাজিল, গায়ানা ও ভেনেজুয়েলা মিলিয়ে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি অতিরিক্ত তেল উৎপাদন করছে। প্রতিদিন কয়েক লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল বাজারে ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রও।

অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কৌশলগত মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নিজেদের বিশাল তেলের মজুত ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়া ঠেকাচ্ছে চীনও। উচ্চ দামের কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের চাহিদাও কমেছে। ফলে সরবরাহ সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

তবে এই কৌশল স্থায়ী সমাধান নয়। যুদ্ধের সময়ে বিশ্বের তেল মজুত সর্বোচ্চ ১৯০ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত কমেছে। বাজারে ভারসাম্য ফিরলে এসব মজুত আবার পূরণ করতে হবে। তা না হলে একসময় মজুত এতটাই কমে যেতে পারে যে, সংকট সামাল দিতে সেগুলোর ওপর আর নির্ভর করা যাবে না।

এসব কারণে জ্বালানি বাজারেও চাপ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি কমে যাওয়া এবং চীনের পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করার কারণে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে গ্যাস, বিশেষ করে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম অপরিশোধিত তেলের দামের তুলনায়ও বেশি বেড়ে গেছে।

বিশ্বের চারটি বড় জ্বালানি পরিশোধন কেন্দ্রের মধ্যে তিনটিই এখন তীব্র সংকটে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে পরিশোধন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক চাহিদার বড় চাপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলোর ওপর পড়ছে। তবে এসব শোধনাগারও অনির্দিষ্টকাল সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চলতে পারবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক মাস ধরে আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনার কথা বলে তেলের দাম কম রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সম্প্রতি সেই কৌশল বদলেছে। ইরানের বন্দরগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধের মাধ্যমে দেশটির ওপর ‘ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর প্রভাবে কয়েক সপ্তাহ ধরে তেলের দাম বাড়ছে। সম্প্রতি ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে তেলের দাম। তবে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিকল্প পথ ও ‘ডার্ক ট্রানজিট’সহ নানা কৌশলের কারণে দাম এখনো ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকটের’ আশঙ্কা করা মাত্রায় ওঠেনি।

সূত্র: সিএনএন

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

হরমুজে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ‘ডার্ক ট্রানজিট’, ব‌শে তে‌লের বাজার