নেপাল-তিব্বতে বন্যা/সুড়ঙ্গে নিখোঁজ শ্রমিকদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে লড়াই

>> মৃত বেড়ে ৯৫৫, নিখোঁজ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার

>> জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিখোঁজ ৬৩৯ শ্রমিক

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০: ০১
ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে উদ্ধার অভিযানে নেপাল সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ৩১ আগস্ট, রাসুওয়া। ছবি: নেপাল সেনাবাহিনী
ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে উদ্ধার অভিযানে নেপাল সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ৩১ আগস্ট, রাসুওয়া। ছবি: নেপাল সেনাবাহিনী

নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ এলাকায় আটকা পড়েছেন শত শত শ্রমিক। তাঁদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে অভিযান। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে ভয়াবহ এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫৫ জনে দাঁড়িয়েছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৯৩৯ জন। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৯২৫ জন। তাঁদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। এখন পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ২৭৯ জন।

অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে মারা গেছেন অন্তত ১৬ জন। এখনও নিখোঁজ অন্তত ৫৪৬ জন। ফলে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজের মোট সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার।

উদ্ধারকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গ। সর্বশেষ যাচাই করা হিসাবে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৬৩৯ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপালের কতৃপক্ষ। আগের হিসাবে এই সংখ্যা ছিল ৯৩৩।

তবে নিখোঁজদের কতজন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পাঁচশর বেশি শ্রমিক ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও বন্ধ অংশে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নেপাল সেনাবাহিনীর সদস্যরা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে খননযন্ত্র, পাম্প ও ভারী যন্ত্রপাতি। কোথাও কোথাও সুড়ঙ্গের পথ খুলতে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেতের বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সুড়ঙ্গের ভেতরে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে। সুড়ঙ্গের মুখ খুলে নিখোঁজদের কাছে পৌঁছানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।

রাসুওয়া ও নুয়াকোট জেলার একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্ধার অভিযান চলছে। ত্রিশূলী-৩এ, ত্রিশূলী-৩বি, আপার ত্রিশূলী, চিলিমে, রাসুওয়াগাধী ও ল্যাংটাং প্রকল্পে নেপালি বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে ভারত ও চীনের উদ্ধারকারী দল।

এর আগে আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে শনিবার ও রোববার প্রায় ২৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অন্য প্রকল্পগুলোতে এখনো বহু শ্রমিকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। শুধু রাসুওয়াগাধী প্রকল্পেই নিখোঁজ রয়েছেন ৯৩ জন শ্রমিক।

তবে উদ্ধার অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, বিপুল কাদা ও ধ্বংসাবশেষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা। বন্যায় ৪০টির বেশি সেতু ধ্বংস হওয়ায় অনেক এলাকায়ই স্থলপথে পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের।

এছাড়া বন্যায় বিভিন্ন এলাকায় বদলে গেছে ত্রিশূলী নদীর গতিপথ। নতুন করে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় নদীর পানি বাড়ার পুর্ভাবাস দিয়েছে নেপালের আবহাওয়া অধিদপ্তর। এতে উদ্ধারকাজ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নুয়াকোট ও রাসুওয়া জেলার ২৭টি আশ্রয়শিবিরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ অবস্থান করছেন। কাঠমান্ডু, নুয়াকোট ও রাসুওয়ায় পাঁচটি কেন্দ্র থেকে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

এদিকে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপুলসংখ্যক মরদেহ শনাক্ত করা। বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া অনেক মরদেহ কয়েক দিন পর উদ্ধার হওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হচ্ছে। নিখোঁজদের স্বজনদের ডিএনএ নমুনা দিতে অনুরোধ করেছে নেপাল পুলিশ।

বন্যায় নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতের বড় অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন বন্ধ রয়েছে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন। যা দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ এই দুর্যোগকে ‘মারাত্মক ও বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ আখ্যা দিয়েছেন।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই বৃষ্টিতে কাঠমান্ডুর বিষ্ণুমতী নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন সুড়ঙ্গে নিখোঁজ শ্রমিকদের নিয়ে। দীর্ঘ সময় ধরে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে থাকায় তাঁদের জীবিত থাকার সম্ভাবনা কমে আসছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তারপরও সুড়ঙ্গের ভেতরে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।

গত বুধবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে আসে। এতে পাহাড়ি জনপদ, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সূত্র: রয়টার্স, এএফপি ও এনডিটিভি

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত