সেউতা সংকটের আগুনে যেভাবে ঘি ঢালে ‘গুজব’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ০৬
সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টাকালে অন্তত ৬৭ জন নিহত হন। তাদের অনেকে সমুদ্রে ডুবে; অনেকে ভিড়ে পদদলনে মারা গেছেন। স্ট্রিম গ্রাফিক

গুজবেও হরেদরে প্রাণ যেতে পারে, তার উদাহরণ সেউতা। স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট অভিবাসন নিয়ে এক রায়ে বলেন, ‘সমুদ্রপথে সেউতা কিংবা মেলিইয়ায় আসা অভিবাসীদের আটকের পর মরক্কো ফেরত পাঠানো যাবে না। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে’। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে রায় নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে– সমুদ্রপথে কেউ স্পেনে পৌঁছালে, তাঁকে ফেরত পাঠানো হবে না।

এরপরই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল নামে উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতায়। মরক্কো উপকূলের সাড়ে ১৮ বর্গকিলোমিটারের এই শহর থেকে জিব্রাল্টার প্রণালি পেরোলেই ইউরোপের মূল ভূখণ্ড। সামাজিক মাধ্যমের গুজবের কারণে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বিশৃঙ্খল ও ঝুঁকিপূর্ণ এই সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। এতে শহরের সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়ে। অভিবাসনপ্রত্যাশীর সংখ্যা সেউতার স্বাভাবিক জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ছিল, যাতে বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দেয়।

স্পেন সরকারের তথ্যে, সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টাকালে অন্তত ৬৭ জন নিহত হন। তাদের অনেকে সমুদ্রে ডুবে; অনেকে সীমান্তের ভিড়ে পদদলনে মারা গেছেন।

কেন এই সংকট, বাস্তবতা কী

সুপ্রিম কোর্টের রায় ছাড়াও গত এপ্রিলের মাঝামাঝি স্পেন সরকার অভিবাসীদের জন্য একটি বিশেষ নিয়মিতকরণ কর্মসূচি চালু করেছিল। এর আওতায় যাঁরা নথিভুক্ত নন, তাঁরা দেশটিতে বসবাসের জন্য আবেদনের সুযোগ পাবেন। কিন্তু এই কর্মসূচি ঘিরেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন, এখন স্পেনে গেলেই বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ পাওয়া যাবে।

মানবপাচারকারী চক্র এবং অনলাইনের ভুল ধারণাগুলো শক্তিশালী হয়। হাজারো মানুষ মনে করেন, এটাই ইউরোপে প্রবেশের সবচেয়ে সহজ উপায়। টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে একাধিক ভিডিও এবং পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে আলোচিত ছিল ‘Spain is Open’ স্লোগান। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, মানুষ সমুদ্রে ঝাঁপ দিচ্ছেন। কেউ সাঁতরে সীমান্ত পার হচ্ছেন। কেউ আবার সেউতার ভেতরে দাঁড়িয়ে ভিডিও করে অন্যদের আসার আহ্বান জানাচ্ছেন।

কিছু ভিডিওতে তরুণদের ওয়েটস্যুট ও সাঁতারের ফ্লিপার পরে সমুদ্রে নামতে দেখা যায়। আবার কেউ সাঁতার কাটতে কাটতে ভিডিও ধারণ করছেন। এসব ভিডিওতে এমন ধারণা দেওয়া হয়, সীমান্ত অতিক্রম এখন ডালভাত।

সামাজিক মাধ্যমের অনেক পোস্টে বলা হয়, একবার সেউতায় পৌঁছালেই সহজে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যাওয়া যাবে। দ্রুত কাজের অনুমতি ও বৈধ কাগজপত্র মিলবে। ইউরোপে উচ্চ আয় ও উন্নত জীবনের স্বপ্নও এসব প্রচারে বড় ভূমিকা রাখে।

তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। স্পেন সরকারের নিয়মিতকরণ কর্মসূচির আবেদন গ্রহণ জুনেই বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ হাজারো মানুষ যখন সীমান্তে ভিড় করেন, তখন নতুন আবেদনের সুযোগ ছিল না।

সরকার প্রাথমিকভাবে পাঁচ লাখ আবেদন আসবে ধারণা করলেও, দুই মাসের কম সময়ে জমা পড়ে প্রায় ১২ লাখ। তাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক আবেদনকারী এক বছরের নবায়নযোগ্য রেসিডেন্স পারমিট পেয়েছেন। বেশির ভাগ আবেদন যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মানে, সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে গুজব ছড়িয়েছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই।

সামাজিক মাধ্যমের গুজবের কারণে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বিশৃঙ্খল ও ঝুঁকিপূর্ণ এই সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। এতে শহরের সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়ে। অভিবাসনপ্রত্যাশীর সংখ্যা সেউতার স্বাভাবিক জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ছিল, যাতে বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দেয়।

মরক্কোর সীমান্ত শহর ফনিদেকে ফিরে আসা অভিবাসীরা জানান, সেউতায় গিয়ে তারা খাবার, পানি ও আশ্রয়ের তীব্র সংকটে পড়েন। তাদের ভাষায়, সেউতা যেন একটি কারাগার। করার মতো কিছুই ছিল না। সবকিছু বন্ধ ছিল। কেউ কেউ দাবি করেন, স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন। অভিবাসীদের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত মরক্কো ফিরে যেতে বাধ্য হন।

স্পেন সরকার যা বলছে

সেউতা সংকটে শুরু থেকেই স্পেন সরকার বলে আসছে, সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, মানবপাচারকারী চক্র ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন। এতে মানুষের ধারণা পোক্ত হয়েছে, সমুদ্রপথে স্পেন পৌঁছালেই ইউরোপে থাকার সুযোগ নিশ্চিত।

সরকারের ভাষ্য, শেনজেন অঞ্চলের অংশ নয় সেউতা। তাই সেউতা পৌঁছানো মানেই ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে অবাধ প্রবেশের সুযোগ নয়। তাছাড়া আইনি প্রক্রিয়ায় অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিধান বহাল রয়েছে।

সেউতা সংকটে ক্ষমতাসীনরা দেশটির কট্টরপন্থীদের তীব্র সমালোচনা মুখে পড়েছেন। পরে সরকার জানিয়েছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য নতুন করে এই ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকানো। এজন্য সমুদ্রের দিকে সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে। জেটির পাশে দীর্ঘ সারিতে কমলা রঙের ভাসমান বয়া স্থাপন এবং সেখানে নিয়মিত নৌ টহল থাকবে, যাতে কেউ সাঁতরে সীমান্ত পার হতে না পারেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত