আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস/যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের মান ৫০ বছরে সর্বনিম্নে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র তলানিতে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র তলানিতে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রধান সূচকগুলো গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বিশ্বজুড়ে আইনের শাসনকে দুর্বল করে দিয়েছে। একইসঙ্গে সারা বিশ্বে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে।

স্টকহোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স’ (ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া)-এর গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির বার্ষিক ‘গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি’ রিপোর্টকে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পর্যালোচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে বিশ্বের ১৭৪ দেশের গণতান্ত্রিক অবস্থান পরিমাপ করে আসছে সংস্থাটি।

তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায়, যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের পতন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। তবে এই পতনকে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের সামগ্রিক অবনতির অংশ হিসেবেই দেখছে সংস্থাটি। গণতন্ত্রের সূচকে উন্নতির চেয়ে অবনতি হওয়া দেশের সংখ্যা ২০২৫ সালেও বেশি ছিল। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড অনুযায়ী, টানা ১১ বছর ধরে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে, যা তাদের ইতিহাসে দীর্ঘতম পতনের রেকর্ড।

গবেষকেরা দাবি করেছেন, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই আরও কঠিন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন। নিজের ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণ এবং বিরোধীদের দমন করতে তিনি এই ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। এসব পদক্ষেপের কারণে দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইনের শাসন বড় ধাক্কা খেয়েছে। বহু বছরের পুরোনো আন্তর্জাতিক মিত্রতা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাও ভেঙে পড়ছে।’

গণতন্ত্রের পতন ঘটলে যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে সতর্ক করেছেন সংস্থাটির মহাসচিব কেভিন কাসাস-সামোরা। তিনি বলেন, ‘যেকোনো দেশের নিরাপত্তানীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত গণতন্ত্র। কিন্তু গণতন্ত্রের অবনতি কীভাবে সংঘাত বাড়াচ্ছে, তা নীতিনির্ধারক ও জনগণের আলোচনার বাইরেই চলে যাচ্ছে।’

সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত ‘উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রাম’ এর প্রমাণ দিয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৬-এর পর ২০২৫ সালেই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সহিংস সংঘাত ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ হয়েছে।

এই সংকটের মাঝেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেছে প্রতিবেদনটি। অস্ট্রেলিয়ায় বর্ণবাদবিরোধী কৌশল এবং শিশুদের অনলাইন সুরক্ষার নীতিতে নাগরিক সমাজকে যুক্ত করা হয়েছে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটেছে।

বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কায় তরুণদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানে শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। তবে স্বল্প সময়ে টেকসই সংস্কার আনা কঠিন কাজ বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কায় তরুণদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানে শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। তবে স্বল্প সময়ে টেকসই সংস্কার আনা কঠিন কাজ বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের ঘটনা অন্যান্য দেশে সরাসরি প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন মহাসচিব কাসাস-সামোরা। ২০১৯ সাল থেকে অবনতি শুরু হওয়ায় ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথম ‘গণতান্ত্রিকভাবে পেছানো’ (ব্যাকস্লাইডিং) দেশের তালিকায় যুক্ত করেছিল ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া।

বিগত ৫০ বছরের গণতান্ত্রিক সূচকের ওপর ভিত্তি করে দেশগুলোকে পূর্ণ গণতন্ত্র, মিশ্র শাসনব্যবস্থা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন—এই তিনটি ভাগে মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি।

২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে আইনের শাসনের অভাবই গণতন্ত্রের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ৭১টি দেশে আইনের শাসন অত্যন্ত দুর্বল। এই সংখ্যা মোট দেশের প্রায় ৪১ শতাংশ।

কাসাস-সামোরা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যা ঘটে, সারা বিশ্বে তা ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতা এখন মহামারির রূপ নিয়েছে। হোয়াইট হাউসের বর্তমান বাসিন্দাই (ট্রাম্প) এই রোগের মূল উৎস।’

গণতন্ত্রের এই পতনকে চিরস্থায়ী মানতে রাজি নন কাসাস-সামোরা। তিনি বিশ্বাস করেন, এই ধারা ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমরা চরম অস্থির পৃথিবীতে বাস করছি। যেকোনো সময় সাধারণ মানুষের আন্দোলন, বিক্ষোভ নতুন রাজনীতিতে ইতিবাচক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।’

নেপাল বা বাংলাদেশের মতো কিছু দেশে আশা দেখা গেলেও সামগ্রিক বৈশ্বিক চিত্র বেশ অন্ধকার। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘মানুষ অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। নাগরিক সমাজের কাজের পরিধি দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা মামলা, বিদেশি সহায়তা বন্ধের আইন এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশি বাধার কারণে নাগরিক অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

(দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত