
১৮৭৮ সালের বার্লিন কংগ্রেসে জার্মান চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক আলবেনিয়াকে বলেছিলেন ‘জিওগ্রাফিক্যাল এক্সপ্রেশন’। এর মানে হলো ‘সেখানে কোনো আলবেনীয় জাতিসত্তা নেই’। তখন আলবেনীয় নেতারা নিজেদের অধিকারের দাবিতে লিগ অব প্রিজরেন গঠন করেন। কিন্তু ইউরোপের বড় শক্তিগুলো তাদের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি। পরে আলবেনীয় ভূখণ্ডের বিভিন্ন অংশ প্রতিবেশী সার্বিয়া, বুলগেরিয়া ও মন্টেনেগ্রোর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
এ ঘটনার প্রায় দেড়শ বছর পর আলবেনিয়ায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে— দেশটির ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আসলে কার?
এবার বিতর্কের কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। আলবেনিয়ার উপকূলে কুশনারের প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স-সংশ্লিষ্ট একটি কোম্পানি বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। প্রকল্পের একটি অংশ হওয়ার কথা সাযান দ্বীপে, আরেকটি দক্ষিণ আলবেনিয়ার জভেরনেচ এলাকায়।
এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে গত কয়েক মাসে আলবেনিয়ায় বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণ বেশি। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পরিবেশ রক্ষা, ভূমির মালিকানা ও জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে বিদেশি বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
কিছু বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত বলা হয়েছে। কমিউনিজমের পতনের পর আলবেনিয়ায় এটিকে অন্যতম বড় গণআন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিক্ষোভের নিশানায় প্রধানমন্ত্রী
আন্দোলনের বড় একটি অংশের ক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভকারীরা তার পদত্যাগ দাবি করছেন।
রামা আলবেনিয়ার সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রধান। ২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিরানার মেয়র থাকাকালে তিনি শহরের ধূসর কমিউনিস্ট আমলের ভবনগুলোর সম্মুখভাগ উজ্জ্বল রঙে রাঙানোর উদ্যোগ নেন। তিনি এটিকে গণতন্ত্রীকরণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
এখন তার সমালোচকেরা বলছেন, তার সরকার গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করছে। বিদেশি পুঁজি ও বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

কুশনারের প্রকল্প সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পরপরই আলবেনিয়ার সরকার আটলান্টিক ইনকিউবেশন পার্টনার্স-কে প্রকল্পটির জন্য ‘কৌশলগত বিনিয়োগকারী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কুশনারের অ্যাফিনিটি পার্টনার্সের সম্পর্ক রয়েছে।
অ্যাফিনিটি পার্টনার্সের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ), কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ। একই নেটওয়ার্ক ট্রাম্পের তথাকথিত বোর্ড অব পিসের সঙ্গেও যুক্ত। গাজা পুনর্গঠন নিয়ে এই উদ্যোগে আলবেনিয়া ও কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে রয়েছে। কুশনার এই বোর্ডের নির্বাহী সদস্য।
পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
প্রকল্পবিরোধীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ পরিবেশ নিয়ে।
জভেরনেচের প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্পটি ভজোসা-নার্তা লেগুনের কাছাকাছি এবং সুরক্ষিত এলাকার মধ্যে বিস্তৃত হওয়ার কথা। এই এলাকা পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এখানে প্রায় ৪০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে ডালমেশিয়ান পেলিক্যান এবং প্রায় ৩ হাজার ফ্লেমিঙ্গো।
তাই আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্লেমিঙ্গো রেভলিউশন’।
এ বছরের এপ্রিলে প্রকল্প এলাকায় বুলডোজার ও কাঁটাতারের বেড়া দেখা গেলে উত্তেজনা বাড়ে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারী ও বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
তবে প্রধানমন্ত্রী রামার বক্তব্য, প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব এখনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তার মতে, মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ অনুমানের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
উঠেছে আইনি প্রশ্ন
কুশনারের প্রকল্প নিয়ে শুধু পরিবেশ নয়, আইনগত প্রশ্নও রয়েছে।
আলবেনিয়ার স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা এসপিএকে সুরক্ষিত এলাকা-সংক্রান্ত আইনে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনা কিছু সংশোধনী নিয়ে তদন্ত করছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এসব সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পের পথে থাকা গুরুত্বপূর্ণ আইনি বাধা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সংশোধিত আইনে সুরক্ষিত এলাকার ব্যবস্থাপনায় ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ’-এর পাশাপাশি বিনিয়োগের সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ১৭ জুন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আলবেনিয়ার সুরক্ষিত এলাকা-সংক্রান্ত আইনের সংশোধনী বাতিল এবং ইইউর প্রকৃতি সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
সাযান দ্বীপের ইতিহাস
কুশনারের প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত অংশ সাযান দ্বীপ। আলবেনিয়ার জাতীয় ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই দ্বীপটির অত্যন্ত সংবেদনশীল।
বিংশ শতাব্দীর বড় একটি সময় সাধারণ আলবেনীয়দের জন্য দ্বীপটি ছিল নিষিদ্ধ। প্রথমে এটি অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ১৯১৪ সালে ইতালির নিয়ন্ত্রণে যায় এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইতালীয় নৌবাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে এটি সোভিয়েত নৌঘাঁটিতে পরিণত হয়।
১৯৬১ সালে চীন-সোভিয়েত বিরোধের সময় আলবেনিয়ার কমিউনিস্ট নেতা এনভার হোজা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এরপর সোভিয়েত ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরে সাযান দ্বীপে তৈরি করা হয় হাজার হাজার বাঙ্কার ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ। কমিউনিজমের পতনের পরও এটি সামরিক এলাকা হিসেবে থেকে যায়। সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত।
২০১৫ সাল থেকে বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকরা দ্বীপটি দেখতে শুরু করেন। ২০১৯ সালে নিয়মিত নৌভ্রমণও চালু হয়।
সম্প্রতি ইভাঙ্কা ট্রাম্পের একটি মন্তব্যও বিষয়টি আলোচনায় আনে। ব্রিটিশ অর্থদাতা ন্যাট রথশিল্ডের সঙ্গে ইয়টে ভ্রমণের সময় সাযান দ্বীপকে ‘আবিষ্কার’ করার কথা বলেন তিনি। সেই সফরেই রথশিল্ডের ইয়টে এদি রামার সঙ্গে কুশনার পরিবারের বৈঠক হয়।
সার্বিয়াতেও একই ধরনের বিরোধিতা
আলবেনিয়ায় কুশনারের প্রকল্প নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বলকানের আরেক দেশ সার্বিয়াতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
২০২৪ সালে কুশনারের অ্যাফিনিটি পার্টনার্স বেলগ্রেডে সাবেক যুগোস্লাভ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবন জেনারেলশতাব-এর ধ্বংসাবশেষের ওপর ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা করে। ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর বিমান হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে সুরক্ষিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল। প্রকল্প এগিয়ে নিতে এর সুরক্ষা মর্যাদা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ঘটনায় সার্বিয়ার সংস্কৃতিমন্ত্রী নিকোলা সেলাকোভিচ বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কিন্তু প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ, যুদ্ধের প্রবীণ, জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থিদের একটি বিস্তৃত জোট গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কুশনার প্রকল্পটি থেকে সরে দাঁড়ান।
অ্যাফিনিটি পার্টনার্স তখন জানায়, বড় প্রকল্পের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা, বিভক্ত করা নয়।
তরুণদের ক্ষোভ কোথায়?
আলবেনিয়া ও সার্বিয়ার সাম্প্রতিক আন্দোলনের মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট। তরুণদের একটি বড় অংশ শুধু ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধেই নয়, পুরো পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিচ্ছে।
আলবেনিয়ায় বিক্ষোভকারীরা ‘রামা জেলে, বেরিশা জেলে’ স্লোগান দিচ্ছেন। এখানে বিরোধী নেতা সাল্লি বেরিশার নামও রয়েছে। তিনি এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন দুর্নীতির অভিযোগে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। এ বছরের জুনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তার ‘নন গ্রাটা’ মর্যাদা তুলে নেয়।
সার্বিয়াতেও ২০২৪ সালের নভেম্বরে রেলস্টেশনের ছাদ ধসে প্রাণহানির পর শুরু হওয়া আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে নতুন ধরনের জনঅসন্তোষ তৈরি করেছে।
উন্নয়ন নাকি বিদেশি পুঁজির আধিপত্য
বলকানের এই আন্দোলনের পেছনে আরও বড় একটি প্রশ্ন রয়েছে— বিদেশি বিনিয়োগ ও বিলাসবহুল স্থাপনা কি সত্যিই উন্নয়নের মাপকাঠি?
গত তিন দশকে কমিউনিজম-পরবর্তী বলকান অঞ্চলে নদী, সমুদ্র ও শহরের পাশে বহু বিলাসবহুল প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এসব প্রকল্প আন্তর্জাতিক ধনী শ্রেণির জন্য তৈরি হলেও স্থানীয় মানুষের জীবনে তার সুফল কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আলবেনিয়াতেও তরুণদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দেশটির গড় মাসিক বেতন প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলার। এ বেতন বিলাসবহুল রিসোর্টে ছুটি কাটানো অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে।
প্রধানমন্ত্রী রামা অবশ্য প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দৃঢ়। তার বক্তব্য, প্রয়োজনীয় পরিবেশগত মূল্যায়ন সম্পন্ন হবে এবং এরপর প্রকল্পের কাজ এগোবে।
বিক্ষোভকারীরাও পিছু হটার ইঙ্গিত দিচ্ছেন না। তাদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
আলবেনিয়ার এই বিরোধ এখন শুধু একটি রিসোর্ট নির্মাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে পরিবেশ, ভূমি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, বিদেশি বিনিয়োগ এবং উন্নয়নের ধারণা।
সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল রিভিউ
.png)






