উত্তরবঙ্গে প্রথম গ্যাসক্ষেত্রের আশায় বাপেক্সের মিশন ‘মোবারকপুর ডিপ-‌১’

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ০২
মোবারকপুর ডিপ-১ এর জন্য অধিগ্রহণ করা এলাকায় চলছে পাইলিং ও নিরাপত্তা দেয়াল নির্মাণের কাজ। ছবি: সংগৃহীত
মোবারকপুর ডিপ-১ এর জন্য অধিগ্রহণ করা এলাকায় চলছে পাইলিং ও নিরাপত্তা দেয়াল নির্মাণের কাজ। ছবি: সংগৃহীত

দেশে এ পর্যন্ত সফলভাবে খনন করা গ্যাসকূপগুলোর অধিকাংশ চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে। এবার দেশের উত্তরাঞ্চলেও গ্যাসকূপ খননে সফল হতে জোর চেষ্টা শুরু করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে পাবনার মোবারকপুরে নতুন করে গভীর কূপ খননের প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)।

‘মোবারকপুর ডিপ-১’ নামের এই প্রকল্প সফল হলে এটি হবে উত্তরবঙ্গের বুকে প্রথম কোনো প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। এর আগে সেখানে কূপ খননের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। এবার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সফলভাবে কূপ খননে বাপেক্স চীনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

বর্তমানে পাবনার সুজানগর উপজেলার আহম্মদপুর ইউনিয়নের কুড়িপাড়া গ্রামে অধিগ্রহণ করা ৬ একর জমিতে প্রকল্পের উন্নয়নকাজ চলছে। তবে মূল খননকাজ শুরু হবে ২০২৮ সালের মাঝামাঝি।

বাপেক্সের প্রাক্কলন অনুযায়ী, মোবারকপুর ডিপ-১ কূপটি সফল হলে এখান থেকে টানা ২০ বছর ধরে প্রতিদিন অন্তত ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব।

মেগা প্রকল্প পাস একনেকে

প্রকল্প সূত্র জানায়, সারাদেশে তিনটি এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস প্রাপ্তির জোরালো সম্ভাবনা থাকায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১ হাজার ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর অধীনে পাবনার মোবারকপুর ডিপ-১ ছাড়াও কুমিল্লা শ্রীকাইল ডিপ-১ ও সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১ খনন করা হবে।

সরকার ঋণ হিসেবে ৯০৯ কোটি টাকা দিচ্ছে এবং বাপেক্স নিজস্ব অর্থায়ন থেকে যোগাচ্ছে ২২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

খননে চীনা প্রতিষ্ঠান

মোবারকপুর ও শ্রীকাইল ডিপ-১ প্রকল্পের জন্য চীনের ‘সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড’ (সিসিডিসি)-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে বাপেক্স। এই দুই প্রকল্প এলাকায় ভূগর্ভের উচ্চচাপ মোকাবিলা এবং ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে খননের কারিগরি দক্ষতার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে ১৪ মে বাপেক্সের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

চীনা এই প্রতিষ্ঠানটি রিগ ফাউন্ডেশন নির্মাণ ও মূল খননের কাজ করবে। সিসিডিসি বর্তমানে কুমিল্লার শ্রীকাইল ডিপ-১ এ কাজ চালাচ্ছে, সেখান থেকেই রিগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাবনায় স্থানান্তর করা হবে।

পুরনো সম্ভাবনায় নতুন আশার আলো

বাপেক্স কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাবনার সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার সীমান্তবর্তী মোবারকপুর এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনার কথা জানা যায় কয়েক দশক আগেই।

১৯৮০-৮১ সালে পেট্রোবাংলা প্রথম জরিপ চালায়। পরে ১৯৮৩-৮৪ সালে একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান এবং ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে বাপেক্স আরও কয়েক দফা ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে সম্ভাবনার তথ্য নিশ্চিত হয়।

পরবর্তীতে ২০১৪ সালে মোবারকপুরে ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার গভীরতায় কূপ খনন শুরু করা হয়। তবে ভূগর্ভের অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির অভাবে প্রকল্পটি স্থগিত করতে বাধ্য হয় বাপেক্স।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ‘২০১৪ সালে নির্দিষ্ট গভীরতায় পৌঁছানোর পর তীব্র চাপের কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। কারণ এত চাপে কাজ করার মতো প্রযুক্তি তখন দেশের হাতে ছিল না।’

বাপেক্স জানিয়েছে, আগের অনুসন্ধানস্থল ও পরিত্যক্ত কূপ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে এবার মোবারকপুর ডিপ-১ কূপে কাজ করা হচ্ছে।

পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানান, ‘চলতি বছরের মার্চে আহম্মদপুর মৌজার অধিগ্রহণ করা ৬ একর জমি বাপেক্সের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। মোবারকপুর ডিপ-১ সফল হলে পাবনাসহ পুরো উত্তরবঙ্গের গ্যাসসংকট কাটার পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত হবে।’

বাপেক্সের উপসহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম জানান, ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইলিং ও নিরাপত্তা দেয়াল নির্মাণের কাজ ২৭ জুলাই শুরু হয়েছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। এরপর চীনা প্রতিষ্ঠানটি রিগ খননের কাজ শুরু করবে।

মোবারকপুর ডিপ-১ এর প্রকল্প পরিচালক ও বাপেক্সের উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) এস এ এম মেরাজুল আলম জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে কূপে মূল ড্রিলিং শুরু হবে। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের শেষ দিকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা সম্ভব হতে পারে।

পাবনা প্রেসক্লাব সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকেই মোবারকপুরে গ্যাসের সম্ভাবনার কথা শুনে আসছি। আগের চেষ্টাগুলো ব্যর্থ হলেও আশা করি এবার আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে। মোবারকপুর থেকে গ্যাস পাওয়া গেলে এটি পাবনাবাসীর জন্য অনেক বড় সুসংবাদ বয়ে আনবে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত