ভরা মৌসুমে লোডশেডিং, মৌলভীবাজারে চায়ের মান ও উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মৌলভীবাজার

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ১৭
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

চলছে চা উৎপাদনের ভরা মৌসুম। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানজুড়ে শ্রমিকদের কাঁচা চা পাতা সংগ্রহের ব্যস্ততা। কিন্তু কারখানায় পৌঁছানোর পরই শুরু হচ্ছে সংকট। লোডশেডিংয়ে সময়মতো প্রক্রিয়াজাত করা যাচ্ছে না কাঁচা পাতা। এতে উৎপাদিত চায়ের গুণগত মান কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পাতা।

মৌলভীবাজারের রাজনগর, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাগান সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভরা মৌসুমে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে জ্বালানি খরচ। এতে প্রতিদিন প্রতিটি বাগানে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে।

জেলার ছোট-বড় মিলিয়ে ৯৩টি চা বাগানেই কমবেশি এর প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চা বাগান সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় বেশিরভাগ বাগান গড়ে প্রায় ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে। এসময় কারখানা সচল রাখতে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বাগান কর্তৃপক্ষকে। বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি খরচ।

রাজনগর উপজেলার ইটা চা বাগানের কারখানা শ্রমিক রহিম মিয়া বলেন, ‘একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প প্রযুক্তিতে কারখানা চালু করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। এতে সময়ের অপচয় হয়। একই সঙ্গে কাঁচা পাতার গুণগত মানও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানের কারখানা শ্রমিক প্রদীপ পাল বলেন, ‘ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কারখানার যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি হয়। প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এ সময় কারখানা সচল রাখতে জেনারেটরে ১০০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে।’

চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে কাঁচা পাতা সংগ্রহের পর দ্রুত কারখানায় এনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত করা জরুরি। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সেই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। দীর্ঘ সময় ট্রাফ হাউজে (কাঁচা চা পাতা প্রক্রিয়াজাত করার জায়গা) পড়ে থাকায় পাতার স্বাভাবিক গুণগত বৈশিষ্ট্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

পাত্রখোলা চা বাগানের কারখানা প্রধান জামাল উদ্দিন বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে কারখানা অচল হয়ে পড়ে। এতে ট্রাফ হাউজে রাখা কাঁচা পাতার ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রতিদিন মৌলভীবাজারের বিভিন্ন বাগানে হাজার হাজার কেজি পাতা নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় এসব পাতা ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।’

বাগানসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচা চা পাতা অন্যান্য কৃষিপণ্যের মতো দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে রাখার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত করা না গেলে পাতার মান কমে যায়। ফলে একদিকে উৎপাদন কমে, অন্যদিকে উৎপাদিত চায়ের গ্রেড কমায় দাম কমে যায়।

রাজনগর উপজেলার করিমপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক ইফতেখার আহমদ বলেন, ‘সবুজ চা পাতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর উপকরণ। যথাসময়ে ম্যানুফ্যাকচারিং পর্যায়ে নিতে না পারলে পাতা নষ্ট হয়ে যায়। লোডশেডিং হলে সময় নষ্ট হয় এবং পাতার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।’

তার মতে, ভরা মৌসুমে একটানা কয়েক ঘণ্টা কারখানা বন্ধ থাকলে শুধু উৎপাদনই ব্যাহত হয় না, পুরো দিনের উৎপাদন পরিকল্পনাও এলোমেলো হয়ে যায়। জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।

ন্যাশন্যাল টি কোম্পানির মাধবপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক দিপন কুমার সিংহ বলেন, ‘বর্তমানে আমার বাগানে গড়ে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে চায়ের মান পড়ে যাচ্ছে।’ চা শিল্পকে ধরে রাখতে বাগানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিদিনই চা পাতা নষ্ট হচ্ছে বলে দাবি করেন ন্যাশন্যাল টি কোম্পানির ডিজিএম রফিকুল ইসলাম।

তবে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সব ধরনের গ্রাহক পর্যায়েই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।

মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সুজিত কুমার বিশ্বাস রোববার বিকেলে স্ট্রিমকে জানান, ‘মৌলভীবাজার জেলায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা কম। আমরা যতটুকু বিদ্যুৎ পাচ্ছি, ততটুকুই চাহিদা অনুযায়ী ভাগ করে সরবরাহ করছি।’

কমলগঞ্জ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রঞ্জন কুমার ঘোষ বলেন, ‘কমলগঞ্জে আমাদের ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে ১৬ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। এই বিদ্যুৎ বাণিজ্যিক ও আবাসিকসহ সব ধরনের গ্রাহকের মধ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। এখানে আলাদাভাবে কাউকে বিদ্যুৎ দেওয়ার সুযোগ নেই।’

চা-শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌলভীবাজার দেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদন অঞ্চল। চায়ের ভরা মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব সামগ্রিক চা উৎপাদন এবং বাজারব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত