নীরব ঘাতক বজ্রপাত- শেষ পর্ব

অদূরদর্শিতায় গচ্চা শত কোটি টাকা, ‘একই ধারায়’ নতুন প্রকল্প

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ১২: ০৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার একাধিক প্রকল্পে ব্যয় করেছিল শত কোটি টাকা। কিন্তু লুটপাটের পাশাপাশি অবৈজ্ঞানিক ও অদূরদর্শী হওয়ায় সেই উদ্যোগের কোনোটিই প্রান্তিক মানুষের কাজে আসেনি। তালগাছ রোপণ, আগাম সতর্কবার্তার যন্ত্র বসানো বা বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন—সব প্রকল্পই ব্যর্থ হয়েছে।

দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু জ্যামিতিক হারে বাড়ায় বর্তমান সরকার নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের আমলারাই পুরোনো প্রকল্পগুলো কাটছাঁট করে নতুন নামে সামনে আনছেন, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো লুটপাট।

উপেক্ষিত হাইকোর্টের নির্দেশ

সংবিধান অনুযায়ী, মানুষের জীবন রক্ষা রাষ্ট্রের আইনি দায়িত্ব। বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে তাই ২০২৫ সালের ১৩ মে হাইকোর্টে রিট করেছিল মানবাধিকার সংগঠন ‘ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’।

ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত বছরের ১৯ মে বজ্রপাত বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপ মূল্যায়নে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে গঠিত ওই কমিটিকে ছয় মাসের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতেও বলা হয়। কিন্তু প্রায় এক বছরেও কোনো কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশ মানেনি।

রিটকারী আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব স্ট্রিমকে বলেন, ‘আদালত সুস্পষ্টভাবে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছিলেন। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত কোনো জবাব দেয়নি। আমরা শিগগির বিষয়টি আদালতের নজরে আনব এবং অবহেলার অভিযোগ দেব।’

১০০ কোটির তালগাছের খোঁজ নেই

বজ্রপাতকে ২০১৬ সালে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণার পরের বছর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সারা দেশে কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) ও টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পের আওতায় ৪০ লাখ তালগাছের চারা লাগানোর উদ্যোগ নেয়। প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ের ওই উদ্যোগের দুই বছর না যেতেই দেখা যায়– অযত্নে বেশির ভাগ গাছ মরে গেছে বা গবাদিপশু খেয়ে ফেলেছে। কোথাও কোথাও আবার চারা না লাগিয়েই টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (পরিকল্পনা) আব্দুস ছোবহান স্ট্রিমকে বলেন, ‘তালগাছ রোপণ সুনির্দিষ্ট কোনো বড় প্রকল্প ছিল না। এটি নিয়মিত কর্মসূচি টিআর ও কাবিখার অংশ হিসেবে করা হয়েছিল।’

অবশ্য ওই সময়ই তৎকালীন ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান প্রকল্পটি বিজ্ঞানসম্মত নয় বলে দায় স্বীকার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একটি তালগাছ বড় হতে ৩০-৪০ বছর সময় লাগে এবং বজ্রপাত ঠেকাতে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিতও নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।

ভুল জায়গায় বজ্র নিরোধক দণ্ড, অকেজো সেন্সর

তালগাছ প্রকল্প বাতিলের পর সরকার বজ্র নিরোধক দণ্ড (লাইটিং অ্যারেস্টার) বসানোর উদ্যোগ নেয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি বজ্রপাতপ্রবণ জেলায় ৩৩৬টি দণ্ড বসাতে সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া হাওর অঞ্চলে এক কিলোমিটার পরপর আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কথাও বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে হাওরের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে কৃষকের সুরক্ষার বদলে ব্যয়বহুল দণ্ডগুলো বসানো হয় ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও মুজিব পল্লীতে। ফসলের মাঠে সেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোও নির্মিত হয়নি।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুধু সুনামগঞ্জের ছয় উপজেলায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় ১৮টি বজ্র নিরোধক দণ্ড বসানো হয়। স্থানীয়দের দাবি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন বেশির ভাগই অকেজো।

একই চিত্র বগুড়াতেও। ২০২১ সালে জেলার ছয়টি উপজেলায় প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২১টি বজ্রনিরোধক যন্ত্র বসানো হলেও এখন ১৯টিই অচল। স্থানীয়দের অভিযোগ, যন্ত্র বসানোর নামে কেবল প্রকল্পের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, বজ্রপাতের আগাম সংকেত জানাতে আবহাওয়া অধিদপ্তর ২০১৮ সালে ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের আটটি স্থানে ‘লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর’ বসায়। উদ্দেশ্য ছিল, বজ্রপাতের ১০ থেকে ৩০ মিনিট আগে মানুষকে সতর্ক করা। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগের অভাবে এগুলোও এখন অকেজো।

আসছে নতুন প্রকল্প

পুরোনো প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার মধ্যেই বর্তমান সরকার বজ্রপাত নিরোধে নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে। চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। হাওরাঞ্চলে মেঘ জমলে কৃষকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সাইরেন স্থাপন এবং শক্তিশালী টাওয়ার নির্মাণের গবেষণা চলছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আব্দুস ছোবহান জানান, আগের উদ্যোগগুলো পর্যাপ্ত না হওয়ায় এবার নতুন করে কাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্রসহ লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনের জন্য উপজেলা পর্যায়ে জায়গা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের ধান মাড়াই বা শুকানোর জন্য একটি “থ্রেসিং ফ্লোর” থাকবে এবং এর ওপরে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হবে। জায়গা পেলেই প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।’

পরিকল্পনা কমিশনে এর আগে জমা দেওয়া বড় প্রকল্পটির বিষয়ে তিনি বলেন, ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিকল্পনা কমিশন এত বড় প্রকল্প না নিয়ে ছোট পরিসরে করতে বলেছে। সেজন্য আগের প্রকল্পেরই ধারাবাহিকতায় কম খরচের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে নতুন এই উদ্যোগ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘এর আগের প্রকল্পগুলো সব লুটপাটে ভেস্তে গেছে। এখন আবার নতুন করে যেসব প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোও আসলে লুটপাটেরই ছক। কারণ, সরকার বদলালেও আমলারা তো সেই পুরোনোই আছেন। তাঁরা সেই পুরোনো বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোই কাটছাঁট করে নতুন নামে সামনে আনছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে এখানেও লুটপাট হবে।’

বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের তাগিদ

বজ্রপাতে প্রাণহানি ঠেকাতে কেবল অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত উদ্যোগের সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং পলিসি গবেষণা সংস্থা ‘র‍্যাপিড’-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, আধুনিক স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে কৃষকদের মোবাইলে অন্তত ১৫-৩০ মিনিট আগে ‘সেল ব্রডকাস্ট’ সিস্টেমের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠাতে হবে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) হালনাগাদ করে সব ভবনে বজ্রপাত-নিরোধক ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করাও জরুরি।

হাসপাতালগুলোতে বজ্রপাতে দগ্ধ ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত রোগীর জন্য বিশেষ ইউনিটের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

এ ছাড়া বজ্রপাতে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে প্রান্তিক পরিবারগুলো যেন পথে না বসে, সেজন্য কৃষকদের ভর্তুকিভিত্তিক ‘ক্ষুদ্র-বীমা’ চালু করতে হবে।

এগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘ঢাকা থেকে প্রকল্প পাস করে গ্রামে পাঠিয়ে কোনো লাভ হবে না। মানুষকে বাঁচাতে হলে স্থানীয় সরকারকে (লোকাল গভর্মেন্ট) দায়িত্ব ও সরাসরি ফান্ড দিতে হবে। কোনো লোক মারা গেলে ইউনিয়ন পরিষদকে তার জবাবদিহি করতে হবে, তাহলে তারাই ঠিকমতো শেড বানাবে এবং মানুষকে রক্ষা করতে পারবে।’

সম্পর্কিত