ফারাক্কা বাঁধ, ভারতের পানি আগ্রাসনের রাজনীতি ও বিপন্ন বাংলাদেশ

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশ মূলত একটি বদ্বীপ, যার ধমনী ও উপশিরাজুড়ে রয়েছে শত শত জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদী। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে এ দেশের ভূখণ্ডটি উজান থেকে আসা পানির প্রবাহের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টিই এসেছে ভারতের ওপর দিয়ে। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এই জলসম্পদের ওপর ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে ন্যায্য অধিকার রয়েছে, তা দীর্ঘকাল ধরে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে উপেক্ষিত হয়ে আসছে। এই বঞ্চনা ও অস্তিত্বগত সংকটের সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান প্রতীক হলো গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ বা ফারাক্কা বাঁধ।

১৯৭০-এর দশকে চালু হওয়া এই বাঁধকে কেন্দ্র করে উজান ও ভাটির দেশের মধ্যে যে পানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা আজ কেবল পরিবেশগত বা প্রযুক্তিগত কূটনীতির অংশ নয়; বরং তা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি এবং সার্বভৌমত্বের সাথে জড়িয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কার সবকটি কপাট বন্ধ করে বাংলাদেশকে পানিশূন্য করা এবং বর্ষাকালে হঠাৎ কপাট খুলে দিয়ে প্লাবিত করার যে অনাকাঙ্ক্ষিত চক্র, তা সমকালীন ভূ-রাজনীতির এক নির্মম বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্টভাবেই বলা যায় যে, ফারাক্কা বাঁধ কেবল একটি সাধারণ প্রকৌশলগত নদী-স্থাপনা নয়। এটি মূলত ভারতের দীর্ঘমেয়াদি ‘পানি আগ্রাসনের রাজনীতি’র একটি অন্যতম বড় হাতিয়ার এবং ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের চিরস্থায়ী অস্তিত্বগত ও বাস্তুসংস্থানিক সংকটের প্রধান অনুঘটক।

ফারাক্কা বাঁধের প্রেক্ষাপট ও ভারতের পানি রাজনীতি

ফারাক্কা বাঁধের ইতিহাস ও এর পেছনের রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ফিরে যেতে হবে। ভারত সরকার কলকাতার হুগলি নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং কলকাতা বন্দরকে পলি জমে অচল হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচানোর অজুহাত দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায়, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে এই বাঁধ নির্মাণ করে। ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করার সময় ভারতকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সীমিত পানি প্রত্যাহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পরীক্ষামূলক চালুর পর থেকে ভারত একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার শুরু করে, যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।

ভারতের চলমান পানি আগ্রাসনের রাজনীতি কেবল ফারাক্কা বাঁধের একক সীমাবদ্ধতায় থমকে থাকেনি; বরং তা এখন আরও বড় ও সুদূরপ্রসারী রূপ নিয়েছে দেশটির বিতর্কিত 'আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প' এর মাধ্যমে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ভারতের ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার মতো আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উদ্বৃত্ত পানি বিশাল কৃত্রিম খালের মাধ্যমে দেশটির অভ্যন্তরীণ খরাপ্রবণ পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে স্থানান্তর করা। ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা নদী যৌথভাবে বাংলাদেশের মোট উপরিভাগের পানির প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে। ফলে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধের চেয়েও বহুগুণ বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং তা সরাসরি দেশের পরিবেশ নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলবে।

আন্তর্জাতিক নদী আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, একটি আন্তর্জাতিক নদীর ওপর অববাহিকাভুক্ত সকল দেশের সমান অধিকার রয়েছে। ১৯৬৬ সালের ‘হেলসিঙ্কি নিয়মাবলী’ এবং পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ‘জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন’ উভয় আইনি কাঠামোতেই স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, কোনো রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য কোনো রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারবে না এবং পানি বণ্টন হতে হবে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে। ভারত এই আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলোর তোয়াক্কা না করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের সম্মতি ছাড়াই একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে আসছে, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ভারতের এই পদক্ষেপকে ‘হাইড্রো-হেজিমনি’ বা ‘পানি-আধিপত্যবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত নিজেকে একটি আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। আর এই আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম প্রধান এবং সস্তা হাতিয়ার হলো ‘পানি রাজনীতি’। প্রাকৃতিকভাবে নদীর উৎসের দিকে বা উজানে থাকার ভৌগোলিক সুবিধাকে ভারত একটি কৌশলগত রাজনৈতিক তাস হিসেবে ব্যবহার করে। শুষ্ক মৌসুমে ভাটির দেশকে পানি থেকে বঞ্চিত করে তাদের কৃষি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রাজনৈতিকভাবে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করার এই যে প্রচ্ছন্ন চাপ, একেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা ‘পানি আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেন। ফারাক্কা বাঁধ এই পানি আগ্রাসনের রাজনীতির প্রথম এবং সবচেয়ে সফল পরীক্ষাগার।

বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া

ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারতের এই একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ একদম শুরু থেকেই তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানিয়ে আসছে। এই প্রতিবাদের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় অধ্যায় হলো ১৯৭৬ সালের মে মাসে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘ফারাক্কা লং মার্চ’। রাজশাহী থেকে শুরু হয়ে কুষ্টিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের এই দীর্ঘ পদযাত্রা কেবল একটি প্রতিবাদ ছিল না, এটি ছিল ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রথম সংগঠিত জাতীয় ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ। মওলানা ভাসানীর এই লং মার্চ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফারাক্কা সংকটের ভয়াবহতা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছিল এবং দেশের মানুষের মধ্যে নদী ও জীবন রক্ষার এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি করেছিল।

রাজনৈতিক ও সামাজিক এই আন্দোলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার কূটনৈতিক প্রয়াসও চালায়। ১৯৭৬ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশ ফারাক্কা সমস্যাটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করে। এর ফলে জাতিসংঘ একটি সাধারণ প্রস্তাব বা ‘কনসেনসাস স্টেটমেন্ট’ গ্রহণ করে, যেখানে উভয় পক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এটি ছিল ফারাক্কা সংকটকে আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি বড় কূটনৈতিক পদক্ষেপ।

শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কার সবকটি কপাট বন্ধ করে বাংলাদেশকে পানিশূন্য করা এবং বর্ষাকালে হঠাৎ কপাট খুলে দিয়ে প্লাবিত করার যে অনাকাঙ্ক্ষিত চক্র, তা সমকালীন ভূ-রাজনীতির এক নির্মম বাস্তবতা।

পরবর্তীতে দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদী ‘গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে মে) উভয় দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি ফর্মুলা অনুযায়ী বণ্টন করা। তবে বিগত তিন দশকে এই চুক্তির ঐতিহাসিক কার্যকারিতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চুক্তিটি বাংলাদেশের সংকট পুরোপুরি নিরসন করতে পারেনি। চুক্তিতে কাগজে-কলমে যে পরিমাণ পানির হিস্যা বাংলাদেশের পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমের চরম দিনগুলোতে (বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে) বাংলাদেশ বাস্তবে সেই পরিমাণ পানি পায় না। ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনে উজানে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে গঙ্গার মূল প্রবাহ থেকে বিপুল পরিমাণ পানি সরিয়ে নেওয়ার কারণে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির মোট প্রবাহই আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ফলে চুক্তির শর্ত বজায় রেখেও বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা এই চুক্তির একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা।

সমসাময়িক সময়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, নদী গবেষক, পরিবেশবাদী এবং সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্রে ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব-নিকাশ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত ভারতের এই একমুখী জল-নীতির সমালোচনা করছে এবং চুক্তি নবায়নের প্রাক্কালে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

বাংলাদেশের ওপর ফারাক্কা বাঁধের নেতিবাচক প্রভাব

ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ওপর যে বহুমুখী এবং দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা দেশের মানচিত্র ও পরিবেশকে চিরতরে বদলে দিচ্ছে। এটি একটি সমন্বিত পরিবেশগত ও সামাজিক বিপর্যয়ের সূচনা করেছে।

পরিবেশ ও মরুকরণ

ফারাক্কা বাঁধের সবচেয়ে মারাত্মক আঘাত এসেছে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের ওপর। বিশেষ করে বৃহত্তর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, পাবনা এবং যশোর অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে এক ধরনের কৃত্রিম মরুকরণ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছে। গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় নদী অববাহিকার মাটির আর্দ্রতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর নিচে নেমে যাচ্ছে। একসময় যেসব এলাকায় সামান্য গভীরতায় পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে গভীর নলকূপ দিয়েও পানি তুলতে বেগ পেতে হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের সামগ্রিক ইকোসিস্টেমকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

নাব্যতা সংকট

পদ্মা নদী আজ তার প্রাচীন যৌবন ও নাব্যতা হারিয়ে একটি মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হয়েছে। ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মা এবং এর প্রধান শাখা নদীগুলো যেমন গড়াই ও মধুমতি তীব্র নাব্যতা সংকটে ভুগছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির গতিবেগ কমে যাওয়ায় নদীর বুকে মাইলের পর মাইল জুড়ে বিশাল চড় বা বালুচর জেগে উঠছে। নদীগুলো তাদের ধারণক্ষমতা হারানোর ফলে বর্ষাকালে যখন ভারত ফারাক্কার কপাটগুলো একসাথে খুলে দেয়, তখন সেই অতিরিক্ত পানি বহনের ক্ষমতা বাংলাদেশের নদীগুলোর থাকে না। এর ফলে বর্ষায় দেখা দেয় আকস্মিক ও বিধ্বংসী বন্যা, আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র খরা ও পানিশূন্যতা।

কৃষি ও অর্থনীতি

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং এর একটি বিশাল অংশের সেচ ব্যবস্থা পদ্মা ও তার শাখা নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফারাক্কার কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় দেশের দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ হেক্টর জমির সেচ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জিকে প্রজেক্ট (গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প) পানির অভাবে বছরের পর বছর ধরে অচল বা আংশিক সচল অবস্থায় রয়েছে। পানির অভাবে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যার ফলে দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং কৃষকেরা তাদের জীবিকা হারিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে।

সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য

উজান থেকে আসা মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর। মিঠাপানির চাপ কম থাকায় বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করছে। এই ব্যাপক লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সামগ্রিক বাস্তুসংস্থান আজ চরমভাবে বিপন্ন। সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী 'সুন্দরী' গাছসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ দিন দিন 'টপ ডাইং' বা আগামরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। বনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী ইকোসিস্টেম আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

মৎস্য ও শিল্প খাত

নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে গঙ্গার মিঠাপানির বিখ্যাত মাছ এবং ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন ও মাইগ্রেশন রুট ব্যাহত হচ্ছে। অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে। এছাড়া দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পাঞ্চলগুলোতে (যেমন খুলনা ও নোয়াপাড়া) কলকারখানার বয়লার ও শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মিঠাপানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা শিল্প উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

লোকসংস্কৃতি ও নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্যের অপমৃত্যু

ফারাক্কা বাঁধ কেবল বাংলাদেশের অর্থনীতি বা প্রকৃতিকেই ধ্বংস করেনি, এটি হাজার বছরের নদীকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বের ওপরও গভীর আঘাত হেনেছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে বাঙালির প্রাণের সুর—ভাটিয়ালি, শারি বা মুর্শিদি গানের মতো লোকসংগীত আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে; কারণ নদী থেকে ‘নৌকা’ ও ‘মাঝি’—উভয়ই হারিয়ে যাচ্ছে। বর্ষায় নদীর প্রমত্তা রূপ না থাকায় গ্রামীণ জনপদের অন্যতম বড় উৎসব 'নৌকাবাইচ' তার আদি জৌলুস হারিয়েছে। এছাড়া, নদীতে মাছের আকাল হওয়ায় 'জেলে' সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা ও লোকজ সংস্কৃতি ছেড়ে অন্য পেশায় স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। এভাবে নদী শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি জীবন্ত সংস্কৃতিরও মরুকরণ ঘটছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের চ্যালেঞ্জ

২০২৬ সালে এসে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া এবং এর নবায়নের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক অধ্যায়। এই চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের ভূমিকা সবসময়ই বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসায় এই চুক্তি নবায়নের সমীকরণে বেশ কিছু নতুন রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অতীতে ১৯৯৬ সালে যখন গঙ্গা চুক্তি হয়েছিল বা ২০১১ ও ২০১৫ সালে যখন তিস্তা চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে আটকে গিয়েছিল, তখন দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার এবং কলকাতার রাজ্য সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শগত বড় অমিল ছিল। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রে এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে একই দল (বিজেপি) ক্ষমতায় থাকায় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক ধরনের 'রাজনৈতিক একমুখীনতা' তৈরি হয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জলসম্পদের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যকার বিরোধ চুক্তি প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে দেয়। এখন একই দল দুই জায়গায় থাকায় দিল্লি চাইলে রাজ্য সরকারকে বুঝিয়ে বা চাপ দিয়ে যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে আসতে পারবে, যা অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে সম্ভব ছিল না।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্রে ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব-নিকাশ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত ভারতের এই একমুখী জল-নীতির সমালোচনা করছে এবং চুক্তি নবায়নের প্রাক্কালে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

অন্যদিকে, বিজেপির রাজনৈতিক আদর্শ মূলত তীব্র জাতীয়তাবাদ এবং 'আগে নিজেদের স্বার্থ' নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাজ্য স্তরে নিজেদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে তারা এই চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর আরও কঠিন শর্ত আরোপ করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে যাতে মালদহ, মুর্শিদাবাদ বা নদীয়া অঞ্চলের কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করে তবেই বাংলাদেশকে পানি দেওয়া হয়। এছাড়া, ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য বাংলাদেশের ট্রানজিট সুবিধা, বন্দর ব্যবহার বা সীমান্ত নিরাপত্তার মতো ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে এই গঙ্গা চুক্তি নবায়নের সাথে জড়িয়ে এক ধরনের 'কঠিন দরকষাকষি'র নীতি অবলম্বন করতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইশতেহার ও প্রচারণার ইস্যু হলো ‘অনুপ্রবেশ’ বা ‘অবৈধ অভিবাসন’। গঙ্গা পানি চুক্তির আলোচনার টেবিলে এই রাজনৈতিক এজেন্ডাটি প্রভাব ফেলতে পারে। বিজেপি নেতৃত্ব পানি বণ্টনের বিষয়টি সুরাহা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও পুশব্যাকের মতো অসংলগ্ন বিষয়গুলোকে আলোচনার অংশ বানানোর চেষ্টা করতে পারে, যা চুক্তির মূল পরিবেশগত ও মানবিক চেতনাকে রাজনৈতিক রূপ দেবে।

সমাধানের পথ ও আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতি

ফারাক্কা বাঁধের এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হলে প্রচলিত ও নিষ্ক্রিয় দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক নদী আইন ও কনভেনশনগুলোর আলোকে নিজের অধিকার আদায়ের দাবি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কেবল দুটি দেশের মধ্যে আলোচনার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নদী ব্যবস্থাপনাকে 'অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা' এ রূপান্তর করতে হবে। গঙ্গা নদী যেহেতু একক কোনো দেশের নয়, তাই এর সামগ্রিক অববাহিকাকে একটি একক ইউনিট ধরে এর পানি বণ্টন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে উপ-আঞ্চলিক পানি কূটনীতি জোরদার করতে হবে। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উজানে অবস্থিত নেপাল এবং ভুটানকে এই পানি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নেপালের হিমালয় অঞ্চলে বড় বড় জলাধার নির্মাণ করে বর্ষার পানি ধরে রাখা এবং শুষ্ক মৌসুমে তা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুষম বণ্টনের যে প্রস্তাব রয়েছে, তা বাস্তবায়নে নেপাল ও ভারতের সাথে ত্রিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিতে হবে।

তৃতীয়ত, ভারতের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল না থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দেশের নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং’ বা নদী খনন করতে হবে। বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার জন্য দেশের ভেতরেই বড় বড় কৃত্রিম জলাধার ও ব্যারেজ (যেমন পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প) নির্মাণ করার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। এছাড়া, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উপরিভাগের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা জরুরি।

পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক এবং দূরদর্শী কূটনীতির পরিচয় দিতে হবে। বিগত ৩০ বছরে ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের কী পরিমাণ অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে এবং ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ বাস্তবে কতটুকু পানি কম পেয়েছে, তার নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ও টেকনিক্যাল ডেটা আলোচনার টেবিলে উপস্থাপন করতে হবে। বিজেপিকে বোঝাতে হবে যে, পানি কোনো রাজনৈতিক দান বা উপহার নয়, এটি আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী ভাটির দেশের প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত অধিকার। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ কনভেনশনের ধারাগুলোর যৌক্তিকতা ভারতের কেন্দ্রীয় থিংক-ট্যাংকগুলোর কাছে তুলে ধরতে হবে। ভারত যদি এই চুক্তি নিয়ে অনড় অবস্থান নেয়, তবে বাংলাদেশও ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর করিডোর বা ট্রানজিট সুবিধার মতো কৌশলগত বিষয়গুলোকে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

ফারাক্কা বাঁধের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব কেবল বাংলাদেশের পরিবেশকে ধূসর করেনি, বরং দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির ভিত্তিমূলেও আঘাত হেনেছে। বিগত কয়েক দশক ধরে ভারত কর্তৃক একতরফা পানি প্রত্যাহারের এই রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য এক অলিখিত বাস্তুসংস্থানিক আগ্রাসন। এই সংকটকে কেবল দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার সাধারণ কোনো সীমান্ত বা পানিবণ্টন সমস্যা হিসেবে দেখার আর কোনো সুযোগ নেই। এটি মূলত বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের বেঁচে থাকার, সার্বভৌমত্ব রক্ষার এবং একটি বদ্বীপের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জীবন-মরণ লড়াই।

তবে সংকটের গভীরতা যতই হোক না কেন, সঠিক ও দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং উপ-আঞ্চলিক কূটনীতির সফল ব্যবহারের মাধ্যমে এই জল-আগ্রাসনের মোকাবেলা করা সম্ভব। নদীকে কোনো রাজনৈতিক সীমানার ফ্রেমে বন্দী না করে, তাকে তার স্বাভাবিক গতিতে বইতে দেওয়াই প্রকৃতির নিয়ম। বাংলাদেশ যদি নিজের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে তার ন্যায্য অধিকারের পক্ষে একটি অবিচল ও আপসহীন অবস্থান তৈরি করতে পারে, তবে পদ্মার বুকে আবারও পানির কলতান ফিরে আসবে। প্রকৃতির অধিকার এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের টিকে থাকার লড়াই কখনোই ব্যর্থ হতে পারে না; অবরুদ্ধ নদীর মুক্তির মাঝেই নিহিত রয়েছে বিপন্ন বাংলাদেশের টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ।

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

সম্পর্কিত