গত ১৬ জুলাই দৈনিক প্রথম আলোর ‘অভ্যুত্থানের অন্দরে’ শীর্ষক বিশেষ সংখ্যায় ‘চব্বিশের কাঠগড়ায় প্রগতিশীল রাজনীতি’ শিরোনামে লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক ফিরোজ আহমেদের একটি লেখা প্রকাশিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় লেখক এই নিবন্ধটি লিখেছেন।
ফিরোজ আহমেদ

কোক-পেপসি যেহেতু আলাদা বোতলে একই বস্তু, ফলে বর্জনীয়—কল্লোল মোস্তফার এই যুক্তিটা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় লেগেছে। আপদ-বিপদ তত্ত্ব শুনেছি আগে, জ্বলন্ত চুলা-ফুটন্ত কড়াই ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। কিন্তু এটা আমার কাছেও নতুন একভাবে উপস্থাপন। এই উপমাটা আগে শুনিনি, ফলে ভালো লেগেছে।
তবে প্রসঙ্গক্রমে কয়েকটা কথা বলি।
উপমা তখনই কার্যকর, যখন তা বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করে। উপমা যেন বাস্তবকে অদৃশ্য করে না দেয়। মুখস্থ প্রবাদবাক্য তোতাপাখিকে বাস্তবতা বিশ্লেষণে কোনো শক্তি জোগায় না।
উপমা, মুখস্থ বাক্য তাই বিপজ্জনক। বিশেষ করে যখন গুরুতর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আগে আমরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বসি।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যের শক্তিটা জুগিয়েছিল সমাজতন্ত্রী আর জাতীয়তাবাদী—এ দুই শিবিরকে এগারো দফার একটা একক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে পারার বিচক্ষণতা।
ওই সময়ের প্রগতিশীল আর জাতীয়তাবাদী ধারা—সকলেই উপলব্ধি করতে থাকেন যে, আইয়ূবের হাত থেকে নিষ্কৃতির একটাই উপায় ন্যূনতম গণতান্ত্রিক মনোবৃত্তির সকলের ঐক্য।
কেননা আইয়ুবের পতনের পর আমাদের সকলের নিজ নিজ পথ ও মত বেছে নেয়ার সুযোগ থাকবে। কিন্তু আইয়ূব যত কাল আছে কিংবা তার সামরিক জান্তা, সমাজতন্ত্রী বা পুঁজিবাদী—নির্বাচন, প্রতিনিধিত্ব, জনগণের অধিকার চাওয়া কেউই নিস্তার পাবে না তার দমন থেকে।
ফলে ঊনসত্তর সফল হয়েছিল। ঊনসত্তরের উত্তুঙ্গ শক্তি অর্জনের পেছনে ভাসানী আর কারাবন্দি মুজিবের এই ঐক্যের ভূমিকা বিষয়ে বহু মানুষের স্মৃতিকথা মিলবে।
একাত্তরেও এমনই এক ঐক্যের ডাক এসেছিল। গোটা জাতি যখন ভয়াবহ গণহত্যার মুখোমুখি, বিকল্প কোনো পথ জনগণের সামনে ছিল না।
একাত্তরে আমরা দেখব, আওয়ামী লিগের একটা অংশের চেষ্টা ছিল সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীদের নিকেশ করার। সমাজতন্ত্রীদেরও একটা অংশের চেষ্টা ছিল আওয়ামী লীগকে নিকেশ করার।
কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য, তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটা মধ্য স্রোত যথাসম্ভব একটা জাতীয় ঐক্যের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, বহু রকম সীমাবদ্ধতা নিয়েই। ভাসানী আর তার অনুসারীদের বড় অংশের সমর্থনও পেয়েছিলেন তারা। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এই জাতীয় ঐক্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব অত্যন্ত জরুরি ছিল।
বিশেষ করে বাকশাল পরবর্তী শেখ মুজিবুর রহমানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও এমন একটা জাতীয় ঐক্যের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। তেমন উদ্যোগ বেশ কয়েকবার নেওয়াও হয়েছিল। সফল হয়নি। সেই খুঁটিনাটি আলোচনায় যাব না; সবাই সবাইকে এই ব্যর্থতার দায়ে দোষারোপ করেন।
কিন্তু তেমন একটা ঐক্য অনিবার্য হয়ে উঠছিল। কোন সন্দেহ নেই, দ্রুতই তেমন একটা ঐক্য তৈরি হয়েই যেত, তিনি মর্মান্তিকভাবে সপরিবারে নিহত না হলে। কিংবা তেমন একটা রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হলে এই ভয়াবহ রক্তপাত ঘটত না।
জনগণ তার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎখাত করলে বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। কিন্তু ওই রাজনৈতিক বিলম্বের ফল ছিল সামরিক অভ্যুত্থানে তার উৎখাত হওয়া।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বিবরণেও বোঝা যায়, শেখ মুজিবুর রহমানের উচ্ছেদের পক্ষে জনসমর্থন সকল অর্থেই তৈরি হয়েছিল। আনিসুজ্জামানও বর্ণনা করেছেন, দেশজুড়ে তেমন কোনো শোক তিনি দেখতে পাননি।
কিন্তু আমার এবং বহু মানুষেরই সর্বদা মনে হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের উৎখাত হওয়াটা জনগণের হাত দিয়ে হলে এই নৃশংস রক্তপাত ঘটতো না; সামরিক শাসনের বদলে গণতন্ত্র আসতো। মৌলবাদের উত্থানও ঘটত না। যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার শেখ মুজিব করেননি, সেটা সম্ভব হতো এবং বাংলাদেশে সকল মত ও দলের মানুষ রাজনীতি করার সুযোগ পেতেন।
সেটা ঘটতে পারেনি, কারণ রাজনৈতিক নেতারা যথাসময়ে ঐক্য গড়তে পারেননি, অথচ গণতন্ত্রের দাবিতে ন্যূনতম ঐক্য তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল।
কোক-পেপসি একই হতে পারে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য, কিন্তু রাজনীতিসচেতন মানুষের জন্য ঘটনা প্রবাহ অত সরল নয়।
বিশ্ব ইতিহাসেও এমন অজস্র নমুনা আছে। জার্মান যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে রাশিয়া, বৃটেন এক না হলে হয়তো জিততেই পারত না। কোক-পেপসির আপদ-বিপদ বাণী প্রদান করে তখনকার কোনো কল্লোল মুস্তফা যদি চার্চিলের সাথে স্তালিনের ঐক্য বন্ধ করতে পারতেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল আরেক রকম হয়ে যেতেও পারত।
চীনেও একই বিষয়। চিয়াং কাইশেকের সাথেও মাও ঐক্য গড়েছিলেন জাপবিরোধী সংগ্রামে।
স্পেনে জেনারেল ফ্রাঙ্কো-বিরোধী সকল পক্ষের গণতান্ত্রিক ঐকফ্রন্ট গড়ে উঠেছিল এই ভাবনা থেকেই।
এই রকম ঐক্য কখন লাগে, তার কিছু শর্ত আছে।
শত্রু যদি হয় এমন যে, সে আপনাকে আর কোনো গণতান্ত্রিক পরিসর দেবে না। আপনি কোনো বৈধ উপায়ে তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবেন না। সে আপনার সঙ্গে কোনো ফলপ্রসূ সংলাপে আসবে না। সমাজে কোনো গণতান্ত্রিক পরিসর আর অবশিষ্ট থাকবে না। বিচার-পুলিশ-আমলাতন্ত্র সব তার হাতের মুঠোয় থাকবে; কোথাও কোনো ইনসাফ আর মিলবে না। শত্রু ইতিহাস ও ভবিষ্যতের ওপরও দখল কায়েম করবে। রাজনীতি না শুধু, ইতিহাস চর্চাও ফৌজদারি অপরাধের বিষয় হয়ে যাবে। আরও থাকবে আইনের বাইরের গুম-খুনের মহামারি।
তখন বড় ছোট কেউই আর নিজের শক্তিতে শত্রুকে পরাজিত করতে পারে না।
এই রকম পরিস্থিতিই ঐক্যের শর্ত তৈরি করে। আপনি তখন অনন্যোপায়।
দুনিয়ার কোথাও এই রকম সর্বগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া জয়লাভ করা যায় না। ঐক্য হলেও যে জিততে পারবেন, তেমন নিশ্চয়তা নেই, এটাও সত্যি। কিন্তু ঐক্য ছাড়া অস্তিত্ব রক্ষাও মুশকিলের হবে।
খেয়াল করবেন, হাসিনা বিভাজন করেই তার শাসন কায়েম করেছিল: তার পক্ষের সকলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, তার বিপক্ষের সকলে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। শুধু তাই না, বিপক্ষের সকলে উগ্রপন্থী, জিহাদী, জঙ্গি।
রাষ্ট্রীয় সকল বাহিনী, সকল প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ—সকল কিছুকে করায়ত্ত করেই সে কায়েম করেছির ফ্যাসিবাদ। সাথে ছিল মোসাহেব বুদ্ধিজীবীকূল, যারা হাসিনার বয়ানকেই রাতদিন পুনরুৎপাদন করে যাচ্ছিলেন।
নিজেই রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে যাওয়া হাসিনার পেছনে আরও ছিল প্রবল বহিঃস্থ শক্তির মদদ।
এই রকম সর্বগ্রাসী একটা পরিস্থিতিতে সাফল্যের একমাত্র উপায় ছিল ঐক্য। কেবল গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর একটা ঐক্যই ভেঙে দিতে পারত হাসিনার বয়ান, যেটা অনুযাযী বিরোধীরা সকলে নাকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী!
ওই সময়ে কোক-পেপসির তত্ত্ব তাই হাসিনার প্রিয় তত্ত্বই হবার কথা।
কারণ ওই তত্ত্ব দেশকে আরও বিভাজিতই করছিল।
কল্লোল মোস্তফার লেখার সমালোচনা করতে গিয়ে কাউকে কাউকে দেখছি ব্যক্তিগত বিরূপতা প্রকাশ করছেন। এটা অন্যায়। আমার লেখার সমর্থন করতে গিয়ে এমনটা যারা করছেন, তাদের সকলকেই অনুরোধ করবো, আলোচনা-পর্যালোচনার জন্য যা প্রয়োজন, তার বাইরে কোনো বিরূপতা বা বিদ্বেষ না তৈরি করতে।
বরং আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণে রাখি, কল্লোলের দীর্ঘ ইতিহাস আছে ক্ষমতার বিরুদ্ধ যাপনের। তার গুরুত্বপূর্ণ সব গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত বহুভাবে বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির সহায়ক হয়েছে; ভবিষ্যতেও যে তা হবে, সেটা যখন নিশ্চিতভাবেই জানি, সচেতনভাবেই বিরূপতা পরিহার করা কর্তব্য। জনগণের বিপক্ষের কোনো মানুষ তিনি নন। আওয়ামী লীগের আমলেও তিনি শাসকদের যে সমালোচনা করেছেন ধারাবাহিকভাবে, খুব কম বিপ্লবীও ততটা সাহস দেখিয়েছেন। তার এই ধারাবাহিকতা শ্রদ্ধেয়।
কল্লোল কোনো সুবিধা নেওয়ার জন্য হাসিনাবিরোধী জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর এই ঐক্যের বিরোধিতা করেননি; দৃশ্যমানভাবে সেটা করেছেন প্রযুক্তিবিদসুলভ চিন্তাধারার রাজনৈতিক প্রয়োগ থেকে।
কল্লোল তার প্রকৌশলী মন দিয়ে সৎভাবে যা দেখতে পান, সেটাই সাহসের সাথে এবং পরিষ্কার করে বলেছেন। তার এই স্পষ্ট ঘোষণা বরং একই ভুল করা রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে বলতে সাহস করেনি; বরং সেই প্রশ্নটাকে তারা বরাবর এড়িয়ে গেছে। প্রশ্নটা হলো: হাসিনাকে হঠাবার প্রয়োজনে জনগণের বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজন ছিল কি না।
আমার বিশ্বাস, কল্লোল যেটা করেছেন যান্ত্রিক অথচ সৎ একটা ভাবনা থেকে, সেটাই এখানকার একটা বড় অংশের প্রগতিশীল নেতাদেরও ধরন। পাশাপাশি এটাও বলে রাখা উচিত, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে যারা একই চিন্তার অনুসারী ছিলেন, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এটা কোনো যান্ত্রিক চিন্তা থেকে নয়, সচেতন মতাদর্শিক হিসাব-নিকাশ থেকেই করেছেন।
আদতে এই অংশটা সচেতনভাবেই, জেনেশুনেই হাসিনার দেশকে বিভাজনের কৌশলকে প্রগতিশীল মোড়কে হাজির করেছেন আপদ-বিপদের তত্ত্ব দিয়ে।
আমার দ্বিতীয় লেখাটায় সম্ভবত শেষের দিকে বলে রাখা ছিল, এই আলোচনাটা শুধু ইতিহাসের পর্যালোচনার প্রয়োজনে। অর্থাৎ আজকের দিনে, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ তার উদ্দেশ্য না। যেমন, ঊনসত্তর বা একাত্তরের পরও তারা আর যুদ্ধকালীন ঐক্যের শর্তে বাঁধা থাকে না। কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে মিত্ররা প্রত্যেকে নিজের মতো করে নিজের কর্মসূচি ও যাত্রাপথ নির্ধারণ করবে, অপরের সমালোচনা করবে।
এই কথাটার একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। আমি একটু বিষাদের সাথেই উপলব্ধি করেছি যে, আমার লেখায় ইতিহাসের পর্যালোচনার চাইতে সমালোচকদের কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আমার কথিত অভিসন্ধি।
অথচ ইতিহাস বিষয়ে একটা লেখাকে ইতিহাসের ঘটনাগুলোর সাপেক্ষেই প্রথমে বিচার করা উচিত। আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ খুব সামান্যই এখানে আছে, বরং ব্যক্তিগত দুঃখ আছে অনেকখানি।
এককথায়, বিষয়টাকে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দুঃখ এভাবেও বলা যেতে পারে।
ইতিহাসের অর্থেই আমি মনে করি, যদি প্রগতিশীলরা আপদ-বিপদের তত্ত্বে আটকে না থেকে জনগণের বৃহত্তর ঐক্যের একটা প্রস্তাবে রাজি হতেন, আঠারো সাল থেকেই তারাই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সম্মুখভাগে থাকতেন। তাদের সকলের আকৃতি, পরিসর, প্রভাব বৃদ্ধি পেতো। স্থানীয় পর্যায়ে তাদের বহু নেতৃত্ব তৈরি হতো। এমনকি শ্রেণি সংগঠনগুলোকেও তারা আরও শক্তিশালী করতে পারতেন—পোশাক শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনেও অনায়াসে হাসিনাবিরোধী রণধ্বনি তুলতে পারতেন।
হাসিনার পতনকে যেভাবে বাংলাদেশের ডানপন্থীদের বিজয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে—আদতে দেশের জনগণ যদিও ডানপন্থী নন—সেইটা তখন থাকতো না। অন্তবর্তী সরকারে প্রগতিশীলদের ভূমিকা আরও প্রবল হতো এবং অন্তবর্তী আমলেই শ্রমিক-কৃষকের-পরিবেশ আন্দোলনের-নারীদের বহু রকম দাবি আদায় করা সম্ভব হতো। যে ভীতিকর নারীবিদ্বেষী পরিবেশ আমরা অন্তর্বর্তী আমলে দেখেছি, সেটা হতো না।
খুবই সম্ভব যে, সমাজের একটা প্রগতিশীল উত্থানই ঘটতো।
রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কী রকমের বয়ান তৈরিতে ব্যর্থ একটা দল, সেটা আমরা সকলেই দেখেছি। বরাবরই এটা সত্যি। এই কারণেই তার ফ্যাসিবাদী হয়ে যাবার সামর্থ্য কম। কিন্তু এই বাস্তবতাতেই, ঐক্যবদ্ধ একটা সংগ্রামে বয়ানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রগতিশীলদের হাতেই থাকতো।
এটা আমার বা আমার রাজনৈতিক দলের না, সামগ্রিকভাবে সকল প্রগতিশীলেরই প্রভাব ও গুরুত্ব বৃদ্ধি করতো।
কল্লোল এবং আরও কেউ কেউ দাবি করেছেন, সংখ্যায় প্রগতিশীলরা খুব কম ছিল বলেই তারা গণঅভ্যুত্থানে এর চাইতে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেননি।
আমি বরং বলতে চাই, ভূমিকা রাখার সঙ্গে সংখ্যার সম্পর্ক ছিল খুব কম। বরং আঠারোর কোটা আন্দোলনে কম সংখ্যা নিয়েই নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তাদের ছিল। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আখ্যা দিয়ে তাদের সকলেই সেটাকে পরিত্যাগ করেছেন, একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ছাত্র ফেডারেশন। আঠারোর রাতের ভোটের সময় থেকেই জাতীয় ঐক্যের মতাদর্শিক কাণ্ডারী প্রগতিশীলরা হতে পারতেন; সেটাও তারা কোক-পেপসির বিপদ-আপদ বলে এড়িয়েছেন।
ফলে সংখ্যা যে কম, সেটার কারণও এখানেই নিহিত। বরং দেখতে পাবেন, চোদ্দ ও আঠারো সালের একতরফা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ইনু-মেননের কারণে বাকি প্রগতিশীলরা যে বিরূপতার শিকার হয়েছেন সমাজে; একইভাবে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ঐক্য গড়ায় বড় অংশটির নিষ্ক্রিয় ভূমিকার ফলে তেমন উদ্যোগ গ্রহণ করা দলগুলোও যথাযথভাবে অগ্রসর হতে পারেনি; তারাও অন্যদের বদনাম বহন করেছে। সত্যি বলতে, আমিও বহুবার ‘প্রগতিশীল’ বন্ধুদের কাছ থেকে রীতিমতো হয়রানির শিকার হয়েছি এই কারণে। শক্তিক্ষয়, অযথা সময়ের অপচয় হয়েছে বিপুল।
ফলে সংখ্যায় কম থাকাটা যুক্তি না, বরং সংখ্যার কমটা কাটাবার একমাত্র উপায় ছিল জনগণের মাঝে যে একমাত্র কর্মসূচিটা আশা জোগাতে পারতো, সেইরকম ঐক্যের কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
রাজনৈতিক দল তো ক্ষমতাই চায়, তাই না? তারা তো ‘বিশুদ্ধ’, ‘অপাপবিদ্ধ’ ঋষিতুল্য হবার সাধনা করে না! সেই রকম সাধনা করা ব্যক্তিরাও সর্বদাই সমাজে থাকবেন, তারা নমস্য। তাদের ভিন্ন গুরুত্ব আছে। তাদের শ্রদ্ধা করতে পারা, ভালোবাসতে পারা রাজনৈতিক কর্মীর কর্তব্য। তাদেরকে শত্রুজ্ঞান করাটা নিতান্তই ভুল।
কারণ ক্ষমতা সদা দূষণ, দুর্নীতি ও পক্ষপাতের প্রজননক্ষেত্র।
একই কারণে সত্যিকারের সাধুরা দরবার এড়িয়ে চলতেন। দরবার মানেই তো ক্ষমতা।
বহু দরবেশ, ক্যাথলিক কিংবা সাধু ব্যক্তি যেমন এই কারণেই যৌনতা এড়িয়ে চলেন। সেখান থেকেই যাবতীয় ইহজাগতিক আবেষ্টনের সূচনা। কিন্তু গেরস্থ লোকের তো একে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই।
একই রকমভাবে রাজনৈতিক দল তার নিজের মতাদর্শের বাস্তবায়ন সমাজে চায়, শক্তিবৃদ্ধি করতে চায়। এই কাজে সে ভুল করবেই। ভুল করতে করতে শিখবেও। নিয়ত ঠিক থাকলে সে ভুল শোধরাতে পারবে; নিয়তে গোলমাল থাকলে বিলীন হবে, হারিয়ে যাবে।
কিন্তু রাজনৈতিক দল কখনোই নিজের ভুল বুঝতে পারবে না সমাজের এই ‘দরবেশতুল্য’ মানুষগুলোকে বুঝতে না পারলে, তাদের উদ্বেগগুলোকে গুরুত্ব না দিলে এবং এমনকি ক্ষমতাত্যাগী এই মানুষগুলোর মাঝেও সমর্থক তৈরি করতে না পারলে। সর্বদা বোঝাপড়া হয়তো মিলবে না, কিন্তু তাদের কথা শোনা ও তাদের কথায় যেখানে যেখানে সারবত্তা আছে, সেখানে সেটা আত্মীকৃত করার চেষ্টাটা করে যেতেই হবে।
‘মিথ্যা’ কথা বলার অভিযোগ এনেছেন কল্লোল মোস্তফা। এই বিষয়টা প্রথমে আমাকে ক্ষুব্ধ করলেও অনেকক্ষণ ভেবে বুঝতে পারলাম, কল্লোলের এই বিষোদগারটা তো আসলে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতের সমস্যা; যেখান থেকে যা তিনি দেখতে পারছেন না, তাকেই অসত্য বলে বিভ্রম হচ্ছে।
মোটা দাগের একটা উদাহরণ দেই, মৌমাছি অতি বেগুনি ও নীল রঙ দেখতে পায়, ফুলে ফুলে মধু সংগ্রহের জন্য লাগে। যে পতঙ্গ নীল দেখতে পায় না, ফেসবুকে লিখতে পারলে সেও হয়তো মৌমাছিকে মিথ্যা তথ্য ছড়াবার দায়ে অভিযুক্ত করবে। কিন্তু এটা সে বুঝতে পারবে না, ভিন্নভাবে দেখতে অভ্যস্ত ও প্রশিক্ষিত মনের পক্ষে একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন বিচার সম্ভব।
আমি আগেও লিখেছি, আবারও লিখছি, কোটা সংস্কার আন্দোলন ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আলোড়নে প্রগতিশীল দলগুলোর ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি’ ‘প্রায়’ ছিল না। বরং এখন আরও বুঝতে পারছি, এটা আসলে বিবৃতি বা মিছিলের সংখ্যা গুনে যে বোঝা যাবে না; সেটাও রাজনীতিহীন সাধু সমালোচকের পক্ষে বোঝা কঠিন। বরং যিনি সেটা বুঝতে পারবেন, তিনি তা কেবল পারবেন জাতির হৃদয় জুড়ে তৈরি হওয়া ওই ঐক্যের যে চাহিদা, তার সাপেক্ষে। বুঝতে পারবেন হাসিনার হাত থেকে মুক্তির সম্ভাব্য একমাত্র পথটাকে কোক-পেপসি ঢেলে আড়াল করার ভুলটার সাপেক্ষে। বুঝতে পারবেন হাসিনার বিভাজনের সূত্রটাকে দীর্ঘায়িত করার সাপেক্ষে।
সেটা বুঝলেই তিনি দেখবেন, অধিকাংশ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিগুলোকে সরকার আসলে ততটা গুরুত্ব বা পাত্তাই দেয়নি। তারা এই গুরুতর সময়েও অনিরাপদ থাকেনি। তাদের অধিকাংশ নেতা ওই সময়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নীরব থেকেছেন। অনেকেই বরং হাসিনা উৎখাতের প্রয়াসে রাজাকারদের তৎপরতা দেখেছেন, প্রচারও করেছেন।
ফলে মাঠে জনগণের পাশে দাঁড়ানো কর্মীদের মার খাওয়া, বিপুল প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গের আত্মত্যাগ সত্ত্বেও আমার এই কথাটি রাজনৈতিক প্রেক্ষিত থেকে খুবই সত্য।
কিন্তু তর্ক এড়াবার জন্যই আলোচনার এই অংশকে আপাত স্থগিত রেখেও কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলায় উদ্যোগহীনতা বিষয়ক পর্যালোচনাকে পাঠ করেও কিছু ফল লাভ সম্ভব। এই ‘তর্কযোগ্য’ অংশটাকে বাদ দিলেও আমার বিশ্বাস, বাকিটুকুও সেই রাজনৈতিক চোখটার উন্মেষ ঘটতে পারে, যেখান থেকে প্রগতিশীলদের ভূমিকাকে পুনরায় আরেকটা দিক থেকে পর্যালোচনা করা যাবে।
মন থেকেই এই কথাটা বলি, আমার আগ্রহটা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অভ্যুত্থানের ইতিহাসের সাপেক্ষে কী করলে কী হতে পারতো, শুধুমাত্র সেটাই। গণসংহতি আন্দোলনের বিএনপির সাথে ঐক্যে যাওয়া, মন্ত্রিত্ব গ্রহণ ইত্যাদি একদমই ভিন্ন প্রসঙ্গ। এর পক্ষে যুক্তি প্রদান করা এর লক্ষ্য না। এই দুটো প্রসঙ্গে আলোচনা-সমালোচনা, সমর্থন, নিন্দা আলাদা আলাদাভাবে হলেই দু্টো প্রসঙ্গের প্রতি সুবিচার করা হবে।
বিশেষত আমার মনে হয়, অন্তত ইতিহাস পর্যালোচনটা স্বাধীনভাবে এবং খোলা মন নিয়ে না করলে এটা ভবিষ্যতেও যে প্রবল সংকটে প্রগতিশীলদের ফেলবে, সেই আশঙ্কাটা থেকেই যায়।
কি সেই আশঙ্কা?
ক্ষমতা নিয়ে নিরাসক্ত এই দরবেশদের চোখের সামনেই প্রতিবেশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভুত্বের মতাদর্শ বাংলাদেশে প্রগতিশীলতা ও বাঙালিত্বের ছদ্মবেশে ধীরে ধীরে জেঁকে বসবে আবারও, যে প্রগতিশীলতা ও বাঙালিত্ব তার দেশজ চেহারা ও শেকড়ে বরং আমাদের জাতিকে এখনও এগিয়ে যাবার অঢেল রসদের জোগান দিতে সক্ষম।
আমার সমকালীন বাকী বিল্লাহকে—যিনি খুব ঘনিষ্ঠভাবে এই পুরো প্রক্রিয়া দেখেছেন ভেতর থেকে, যার সাম্প্রতিক একটি স্মৃতিচারণ বিষয়ে আমার মত এই যে, ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা চব্বিশের বাস্তবতার বিবরণে তাকে উদ্ধৃত করতে থাকবেন—নিজের মতো করে উদ্ধৃত করি।
সম্প্রতি একটা আলোচনায় তিনি বলেছেন, ৫ অগাস্ট একটি নির্ধারক বামপন্থী দলের কর্মীরা যখন নিচে জনতার সাথে উল্লাস করছেন হাসিনার পতনের পর; নেতারা তখন প্রধান কার্যালয়ে দরজা নামিয়ে, ভেতর থেকে তালা দিয়ে ভয়ে কাঁপছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরেকজন প্রগতিশীল সংগঠক মেঘমল্লার বসু কোটা সংস্কার আন্দোলন বিষয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, যেটা আমার পর্যালোচনাকেই সমর্থন করে।
এই বাস্তবতার কারণ অনুসন্ধান আমরা আদৌ করব না?
আমি নিশ্চিত জানি, কল্লোলের বিষোদগারের পেছনে একটা সরল সাধুতা রয়েছে। কিন্তু কোক-পেপসির বাণী হাজির করা ওই রাজনৈতিক নেতাদের বহুজনই আনুগত্যের এমন সব ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা আছেন যে, রাজনৈতিক ও মতাদর্শিকভাবেই তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ভবিষ্যতের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের করতে হবে।
এই রাজনৈতিক কর্মীদের দলে টানার আহবান বা চেষ্টা আমি করছি না। আমার একমাত্র চেষ্টা, যে প্রগতিশীল ঐতিহ্যের আমিও একজন বলে নিজেকে মনে করি, তাকে রক্ষা, শোধন করা এবং পরের ধাপে নিয়ে যাওয়া। এই নিয়ে যাওয়ার কাজটা ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে হতে পারে; পরস্পরের সমালোচনা ও পর্যালোচনাও সেখানে জরুরি।
কিন্তু ন্যূনতম কিছু বিষয়ে আমাদের নিশ্চিতভাবেই একতম হওয়া দরকার। চব্বিশ যেন বাংলাদেশের বিকাশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো মতাদর্শিক আধিপত্য থেকে প্রগতিশীল রাজনীতিকে মুক্ত করে; যেন আমাদের চিন্তা ও কাজের স্বাধীন বিকাশ ঘটবার, আমাদের নিজস্ব পথটা খুঁজে পাবার সুযোগ তৈরি হয়।
এই ক্লান্তিকর অভিযোগও বারবার শুনেছি, ডানপন্থীরা উপকৃত হবে আমার লেখাগুলো থেকে। অথচ কার্যক্ষেত্রে আমার এই বিষয়ক কোনো লেখাই ডানপন্থীরা সোৎসাহে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেনি। কারণ আমাদের প্রগতিশীল বন্ধুরা এই আলোচনাকে এড়িয়ে যাবার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও এবং আড়াল করলেও ডানপন্থীরা কোনো লেখার মাঝেই এমন কিছু পাননি, যা তাদের মতাদর্শকে পুষ্টি জোগাবে।
বরং কৌতুককর হলেও সত্যি, আমি নিজে অনেকগুলো ফোরামে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছি এই বিষয়গুলো নিয়ে সামনাসামনি আলাপ, বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ তৈরি করবার জন্য। এমনকি দিনব্যাপী কর্মশালাও করা সম্ভব, যেখানে সকলেই তার মতামত যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারবেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো সাড়া পাইনি। আমার প্রতি বিষোদগারকে নিয়মে পরিণত করা অন্তর্জালের সংবাদমাধ্যমটিও চাইলে এই বিষয়ে আমাকে ডাকতে পারত তাদের পর্যালোচনার জবাবে আমার মতামত পাবার জন্য। সেটারও ন্যূনতম চেষ্টা তারা করেননি।
অন্ধত্ব খুব বিপজ্জনক। যে আশঙ্কার কথা বলেছি উপরে, সেই কূয়োর দিকে যেন আমরা আবার অনেকে মিলে একসাথে না পতিত হই।

কোক-পেপসি যেহেতু আলাদা বোতলে একই বস্তু, ফলে বর্জনীয়—কল্লোল মোস্তফার এই যুক্তিটা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় লেগেছে। আপদ-বিপদ তত্ত্ব শুনেছি আগে, জ্বলন্ত চুলা-ফুটন্ত কড়াই ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। কিন্তু এটা আমার কাছেও নতুন একভাবে উপস্থাপন। এই উপমাটা আগে শুনিনি, ফলে ভালো লেগেছে।
তবে প্রসঙ্গক্রমে কয়েকটা কথা বলি।
উপমা তখনই কার্যকর, যখন তা বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করে। উপমা যেন বাস্তবকে অদৃশ্য করে না দেয়। মুখস্থ প্রবাদবাক্য তোতাপাখিকে বাস্তবতা বিশ্লেষণে কোনো শক্তি জোগায় না।
উপমা, মুখস্থ বাক্য তাই বিপজ্জনক। বিশেষ করে যখন গুরুতর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আগে আমরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বসি।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যের শক্তিটা জুগিয়েছিল সমাজতন্ত্রী আর জাতীয়তাবাদী—এ দুই শিবিরকে এগারো দফার একটা একক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে পারার বিচক্ষণতা।
ওই সময়ের প্রগতিশীল আর জাতীয়তাবাদী ধারা—সকলেই উপলব্ধি করতে থাকেন যে, আইয়ূবের হাত থেকে নিষ্কৃতির একটাই উপায় ন্যূনতম গণতান্ত্রিক মনোবৃত্তির সকলের ঐক্য।
কেননা আইয়ুবের পতনের পর আমাদের সকলের নিজ নিজ পথ ও মত বেছে নেয়ার সুযোগ থাকবে। কিন্তু আইয়ূব যত কাল আছে কিংবা তার সামরিক জান্তা, সমাজতন্ত্রী বা পুঁজিবাদী—নির্বাচন, প্রতিনিধিত্ব, জনগণের অধিকার চাওয়া কেউই নিস্তার পাবে না তার দমন থেকে।
ফলে ঊনসত্তর সফল হয়েছিল। ঊনসত্তরের উত্তুঙ্গ শক্তি অর্জনের পেছনে ভাসানী আর কারাবন্দি মুজিবের এই ঐক্যের ভূমিকা বিষয়ে বহু মানুষের স্মৃতিকথা মিলবে।
একাত্তরেও এমনই এক ঐক্যের ডাক এসেছিল। গোটা জাতি যখন ভয়াবহ গণহত্যার মুখোমুখি, বিকল্প কোনো পথ জনগণের সামনে ছিল না।
একাত্তরে আমরা দেখব, আওয়ামী লিগের একটা অংশের চেষ্টা ছিল সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীদের নিকেশ করার। সমাজতন্ত্রীদেরও একটা অংশের চেষ্টা ছিল আওয়ামী লীগকে নিকেশ করার।
কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য, তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটা মধ্য স্রোত যথাসম্ভব একটা জাতীয় ঐক্যের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, বহু রকম সীমাবদ্ধতা নিয়েই। ভাসানী আর তার অনুসারীদের বড় অংশের সমর্থনও পেয়েছিলেন তারা। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এই জাতীয় ঐক্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব অত্যন্ত জরুরি ছিল।
বিশেষ করে বাকশাল পরবর্তী শেখ মুজিবুর রহমানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও এমন একটা জাতীয় ঐক্যের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। তেমন উদ্যোগ বেশ কয়েকবার নেওয়াও হয়েছিল। সফল হয়নি। সেই খুঁটিনাটি আলোচনায় যাব না; সবাই সবাইকে এই ব্যর্থতার দায়ে দোষারোপ করেন।
কিন্তু তেমন একটা ঐক্য অনিবার্য হয়ে উঠছিল। কোন সন্দেহ নেই, দ্রুতই তেমন একটা ঐক্য তৈরি হয়েই যেত, তিনি মর্মান্তিকভাবে সপরিবারে নিহত না হলে। কিংবা তেমন একটা রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হলে এই ভয়াবহ রক্তপাত ঘটত না।
জনগণ তার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎখাত করলে বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। কিন্তু ওই রাজনৈতিক বিলম্বের ফল ছিল সামরিক অভ্যুত্থানে তার উৎখাত হওয়া।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বিবরণেও বোঝা যায়, শেখ মুজিবুর রহমানের উচ্ছেদের পক্ষে জনসমর্থন সকল অর্থেই তৈরি হয়েছিল। আনিসুজ্জামানও বর্ণনা করেছেন, দেশজুড়ে তেমন কোনো শোক তিনি দেখতে পাননি।
কিন্তু আমার এবং বহু মানুষেরই সর্বদা মনে হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের উৎখাত হওয়াটা জনগণের হাত দিয়ে হলে এই নৃশংস রক্তপাত ঘটতো না; সামরিক শাসনের বদলে গণতন্ত্র আসতো। মৌলবাদের উত্থানও ঘটত না। যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার শেখ মুজিব করেননি, সেটা সম্ভব হতো এবং বাংলাদেশে সকল মত ও দলের মানুষ রাজনীতি করার সুযোগ পেতেন।
সেটা ঘটতে পারেনি, কারণ রাজনৈতিক নেতারা যথাসময়ে ঐক্য গড়তে পারেননি, অথচ গণতন্ত্রের দাবিতে ন্যূনতম ঐক্য তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল।
কোক-পেপসি একই হতে পারে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য, কিন্তু রাজনীতিসচেতন মানুষের জন্য ঘটনা প্রবাহ অত সরল নয়।
বিশ্ব ইতিহাসেও এমন অজস্র নমুনা আছে। জার্মান যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে রাশিয়া, বৃটেন এক না হলে হয়তো জিততেই পারত না। কোক-পেপসির আপদ-বিপদ বাণী প্রদান করে তখনকার কোনো কল্লোল মুস্তফা যদি চার্চিলের সাথে স্তালিনের ঐক্য বন্ধ করতে পারতেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল আরেক রকম হয়ে যেতেও পারত।
চীনেও একই বিষয়। চিয়াং কাইশেকের সাথেও মাও ঐক্য গড়েছিলেন জাপবিরোধী সংগ্রামে।
স্পেনে জেনারেল ফ্রাঙ্কো-বিরোধী সকল পক্ষের গণতান্ত্রিক ঐকফ্রন্ট গড়ে উঠেছিল এই ভাবনা থেকেই।
এই রকম ঐক্য কখন লাগে, তার কিছু শর্ত আছে।
শত্রু যদি হয় এমন যে, সে আপনাকে আর কোনো গণতান্ত্রিক পরিসর দেবে না। আপনি কোনো বৈধ উপায়ে তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবেন না। সে আপনার সঙ্গে কোনো ফলপ্রসূ সংলাপে আসবে না। সমাজে কোনো গণতান্ত্রিক পরিসর আর অবশিষ্ট থাকবে না। বিচার-পুলিশ-আমলাতন্ত্র সব তার হাতের মুঠোয় থাকবে; কোথাও কোনো ইনসাফ আর মিলবে না। শত্রু ইতিহাস ও ভবিষ্যতের ওপরও দখল কায়েম করবে। রাজনীতি না শুধু, ইতিহাস চর্চাও ফৌজদারি অপরাধের বিষয় হয়ে যাবে। আরও থাকবে আইনের বাইরের গুম-খুনের মহামারি।
তখন বড় ছোট কেউই আর নিজের শক্তিতে শত্রুকে পরাজিত করতে পারে না।
এই রকম পরিস্থিতিই ঐক্যের শর্ত তৈরি করে। আপনি তখন অনন্যোপায়।
দুনিয়ার কোথাও এই রকম সর্বগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া জয়লাভ করা যায় না। ঐক্য হলেও যে জিততে পারবেন, তেমন নিশ্চয়তা নেই, এটাও সত্যি। কিন্তু ঐক্য ছাড়া অস্তিত্ব রক্ষাও মুশকিলের হবে।
খেয়াল করবেন, হাসিনা বিভাজন করেই তার শাসন কায়েম করেছিল: তার পক্ষের সকলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, তার বিপক্ষের সকলে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। শুধু তাই না, বিপক্ষের সকলে উগ্রপন্থী, জিহাদী, জঙ্গি।
রাষ্ট্রীয় সকল বাহিনী, সকল প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ—সকল কিছুকে করায়ত্ত করেই সে কায়েম করেছির ফ্যাসিবাদ। সাথে ছিল মোসাহেব বুদ্ধিজীবীকূল, যারা হাসিনার বয়ানকেই রাতদিন পুনরুৎপাদন করে যাচ্ছিলেন।
নিজেই রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে যাওয়া হাসিনার পেছনে আরও ছিল প্রবল বহিঃস্থ শক্তির মদদ।
এই রকম সর্বগ্রাসী একটা পরিস্থিতিতে সাফল্যের একমাত্র উপায় ছিল ঐক্য। কেবল গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর একটা ঐক্যই ভেঙে দিতে পারত হাসিনার বয়ান, যেটা অনুযাযী বিরোধীরা সকলে নাকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী!
ওই সময়ে কোক-পেপসির তত্ত্ব তাই হাসিনার প্রিয় তত্ত্বই হবার কথা।
কারণ ওই তত্ত্ব দেশকে আরও বিভাজিতই করছিল।
কল্লোল মোস্তফার লেখার সমালোচনা করতে গিয়ে কাউকে কাউকে দেখছি ব্যক্তিগত বিরূপতা প্রকাশ করছেন। এটা অন্যায়। আমার লেখার সমর্থন করতে গিয়ে এমনটা যারা করছেন, তাদের সকলকেই অনুরোধ করবো, আলোচনা-পর্যালোচনার জন্য যা প্রয়োজন, তার বাইরে কোনো বিরূপতা বা বিদ্বেষ না তৈরি করতে।
বরং আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণে রাখি, কল্লোলের দীর্ঘ ইতিহাস আছে ক্ষমতার বিরুদ্ধ যাপনের। তার গুরুত্বপূর্ণ সব গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত বহুভাবে বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির সহায়ক হয়েছে; ভবিষ্যতেও যে তা হবে, সেটা যখন নিশ্চিতভাবেই জানি, সচেতনভাবেই বিরূপতা পরিহার করা কর্তব্য। জনগণের বিপক্ষের কোনো মানুষ তিনি নন। আওয়ামী লীগের আমলেও তিনি শাসকদের যে সমালোচনা করেছেন ধারাবাহিকভাবে, খুব কম বিপ্লবীও ততটা সাহস দেখিয়েছেন। তার এই ধারাবাহিকতা শ্রদ্ধেয়।
কল্লোল কোনো সুবিধা নেওয়ার জন্য হাসিনাবিরোধী জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর এই ঐক্যের বিরোধিতা করেননি; দৃশ্যমানভাবে সেটা করেছেন প্রযুক্তিবিদসুলভ চিন্তাধারার রাজনৈতিক প্রয়োগ থেকে।
কল্লোল তার প্রকৌশলী মন দিয়ে সৎভাবে যা দেখতে পান, সেটাই সাহসের সাথে এবং পরিষ্কার করে বলেছেন। তার এই স্পষ্ট ঘোষণা বরং একই ভুল করা রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে বলতে সাহস করেনি; বরং সেই প্রশ্নটাকে তারা বরাবর এড়িয়ে গেছে। প্রশ্নটা হলো: হাসিনাকে হঠাবার প্রয়োজনে জনগণের বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজন ছিল কি না।
আমার বিশ্বাস, কল্লোল যেটা করেছেন যান্ত্রিক অথচ সৎ একটা ভাবনা থেকে, সেটাই এখানকার একটা বড় অংশের প্রগতিশীল নেতাদেরও ধরন। পাশাপাশি এটাও বলে রাখা উচিত, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে যারা একই চিন্তার অনুসারী ছিলেন, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এটা কোনো যান্ত্রিক চিন্তা থেকে নয়, সচেতন মতাদর্শিক হিসাব-নিকাশ থেকেই করেছেন।
আদতে এই অংশটা সচেতনভাবেই, জেনেশুনেই হাসিনার দেশকে বিভাজনের কৌশলকে প্রগতিশীল মোড়কে হাজির করেছেন আপদ-বিপদের তত্ত্ব দিয়ে।
আমার দ্বিতীয় লেখাটায় সম্ভবত শেষের দিকে বলে রাখা ছিল, এই আলোচনাটা শুধু ইতিহাসের পর্যালোচনার প্রয়োজনে। অর্থাৎ আজকের দিনে, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ তার উদ্দেশ্য না। যেমন, ঊনসত্তর বা একাত্তরের পরও তারা আর যুদ্ধকালীন ঐক্যের শর্তে বাঁধা থাকে না। কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে মিত্ররা প্রত্যেকে নিজের মতো করে নিজের কর্মসূচি ও যাত্রাপথ নির্ধারণ করবে, অপরের সমালোচনা করবে।
এই কথাটার একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। আমি একটু বিষাদের সাথেই উপলব্ধি করেছি যে, আমার লেখায় ইতিহাসের পর্যালোচনার চাইতে সমালোচকদের কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আমার কথিত অভিসন্ধি।
অথচ ইতিহাস বিষয়ে একটা লেখাকে ইতিহাসের ঘটনাগুলোর সাপেক্ষেই প্রথমে বিচার করা উচিত। আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ খুব সামান্যই এখানে আছে, বরং ব্যক্তিগত দুঃখ আছে অনেকখানি।
এককথায়, বিষয়টাকে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দুঃখ এভাবেও বলা যেতে পারে।
ইতিহাসের অর্থেই আমি মনে করি, যদি প্রগতিশীলরা আপদ-বিপদের তত্ত্বে আটকে না থেকে জনগণের বৃহত্তর ঐক্যের একটা প্রস্তাবে রাজি হতেন, আঠারো সাল থেকেই তারাই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সম্মুখভাগে থাকতেন। তাদের সকলের আকৃতি, পরিসর, প্রভাব বৃদ্ধি পেতো। স্থানীয় পর্যায়ে তাদের বহু নেতৃত্ব তৈরি হতো। এমনকি শ্রেণি সংগঠনগুলোকেও তারা আরও শক্তিশালী করতে পারতেন—পোশাক শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনেও অনায়াসে হাসিনাবিরোধী রণধ্বনি তুলতে পারতেন।
হাসিনার পতনকে যেভাবে বাংলাদেশের ডানপন্থীদের বিজয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে—আদতে দেশের জনগণ যদিও ডানপন্থী নন—সেইটা তখন থাকতো না। অন্তবর্তী সরকারে প্রগতিশীলদের ভূমিকা আরও প্রবল হতো এবং অন্তবর্তী আমলেই শ্রমিক-কৃষকের-পরিবেশ আন্দোলনের-নারীদের বহু রকম দাবি আদায় করা সম্ভব হতো। যে ভীতিকর নারীবিদ্বেষী পরিবেশ আমরা অন্তর্বর্তী আমলে দেখেছি, সেটা হতো না।
খুবই সম্ভব যে, সমাজের একটা প্রগতিশীল উত্থানই ঘটতো।
রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কী রকমের বয়ান তৈরিতে ব্যর্থ একটা দল, সেটা আমরা সকলেই দেখেছি। বরাবরই এটা সত্যি। এই কারণেই তার ফ্যাসিবাদী হয়ে যাবার সামর্থ্য কম। কিন্তু এই বাস্তবতাতেই, ঐক্যবদ্ধ একটা সংগ্রামে বয়ানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রগতিশীলদের হাতেই থাকতো।
এটা আমার বা আমার রাজনৈতিক দলের না, সামগ্রিকভাবে সকল প্রগতিশীলেরই প্রভাব ও গুরুত্ব বৃদ্ধি করতো।
কল্লোল এবং আরও কেউ কেউ দাবি করেছেন, সংখ্যায় প্রগতিশীলরা খুব কম ছিল বলেই তারা গণঅভ্যুত্থানে এর চাইতে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেননি।
আমি বরং বলতে চাই, ভূমিকা রাখার সঙ্গে সংখ্যার সম্পর্ক ছিল খুব কম। বরং আঠারোর কোটা আন্দোলনে কম সংখ্যা নিয়েই নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তাদের ছিল। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আখ্যা দিয়ে তাদের সকলেই সেটাকে পরিত্যাগ করেছেন, একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ছাত্র ফেডারেশন। আঠারোর রাতের ভোটের সময় থেকেই জাতীয় ঐক্যের মতাদর্শিক কাণ্ডারী প্রগতিশীলরা হতে পারতেন; সেটাও তারা কোক-পেপসির বিপদ-আপদ বলে এড়িয়েছেন।
ফলে সংখ্যা যে কম, সেটার কারণও এখানেই নিহিত। বরং দেখতে পাবেন, চোদ্দ ও আঠারো সালের একতরফা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ইনু-মেননের কারণে বাকি প্রগতিশীলরা যে বিরূপতার শিকার হয়েছেন সমাজে; একইভাবে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ঐক্য গড়ায় বড় অংশটির নিষ্ক্রিয় ভূমিকার ফলে তেমন উদ্যোগ গ্রহণ করা দলগুলোও যথাযথভাবে অগ্রসর হতে পারেনি; তারাও অন্যদের বদনাম বহন করেছে। সত্যি বলতে, আমিও বহুবার ‘প্রগতিশীল’ বন্ধুদের কাছ থেকে রীতিমতো হয়রানির শিকার হয়েছি এই কারণে। শক্তিক্ষয়, অযথা সময়ের অপচয় হয়েছে বিপুল।
ফলে সংখ্যায় কম থাকাটা যুক্তি না, বরং সংখ্যার কমটা কাটাবার একমাত্র উপায় ছিল জনগণের মাঝে যে একমাত্র কর্মসূচিটা আশা জোগাতে পারতো, সেইরকম ঐক্যের কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
রাজনৈতিক দল তো ক্ষমতাই চায়, তাই না? তারা তো ‘বিশুদ্ধ’, ‘অপাপবিদ্ধ’ ঋষিতুল্য হবার সাধনা করে না! সেই রকম সাধনা করা ব্যক্তিরাও সর্বদাই সমাজে থাকবেন, তারা নমস্য। তাদের ভিন্ন গুরুত্ব আছে। তাদের শ্রদ্ধা করতে পারা, ভালোবাসতে পারা রাজনৈতিক কর্মীর কর্তব্য। তাদেরকে শত্রুজ্ঞান করাটা নিতান্তই ভুল।
কারণ ক্ষমতা সদা দূষণ, দুর্নীতি ও পক্ষপাতের প্রজননক্ষেত্র।
একই কারণে সত্যিকারের সাধুরা দরবার এড়িয়ে চলতেন। দরবার মানেই তো ক্ষমতা।
বহু দরবেশ, ক্যাথলিক কিংবা সাধু ব্যক্তি যেমন এই কারণেই যৌনতা এড়িয়ে চলেন। সেখান থেকেই যাবতীয় ইহজাগতিক আবেষ্টনের সূচনা। কিন্তু গেরস্থ লোকের তো একে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই।
একই রকমভাবে রাজনৈতিক দল তার নিজের মতাদর্শের বাস্তবায়ন সমাজে চায়, শক্তিবৃদ্ধি করতে চায়। এই কাজে সে ভুল করবেই। ভুল করতে করতে শিখবেও। নিয়ত ঠিক থাকলে সে ভুল শোধরাতে পারবে; নিয়তে গোলমাল থাকলে বিলীন হবে, হারিয়ে যাবে।
কিন্তু রাজনৈতিক দল কখনোই নিজের ভুল বুঝতে পারবে না সমাজের এই ‘দরবেশতুল্য’ মানুষগুলোকে বুঝতে না পারলে, তাদের উদ্বেগগুলোকে গুরুত্ব না দিলে এবং এমনকি ক্ষমতাত্যাগী এই মানুষগুলোর মাঝেও সমর্থক তৈরি করতে না পারলে। সর্বদা বোঝাপড়া হয়তো মিলবে না, কিন্তু তাদের কথা শোনা ও তাদের কথায় যেখানে যেখানে সারবত্তা আছে, সেখানে সেটা আত্মীকৃত করার চেষ্টাটা করে যেতেই হবে।
‘মিথ্যা’ কথা বলার অভিযোগ এনেছেন কল্লোল মোস্তফা। এই বিষয়টা প্রথমে আমাকে ক্ষুব্ধ করলেও অনেকক্ষণ ভেবে বুঝতে পারলাম, কল্লোলের এই বিষোদগারটা তো আসলে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতের সমস্যা; যেখান থেকে যা তিনি দেখতে পারছেন না, তাকেই অসত্য বলে বিভ্রম হচ্ছে।
মোটা দাগের একটা উদাহরণ দেই, মৌমাছি অতি বেগুনি ও নীল রঙ দেখতে পায়, ফুলে ফুলে মধু সংগ্রহের জন্য লাগে। যে পতঙ্গ নীল দেখতে পায় না, ফেসবুকে লিখতে পারলে সেও হয়তো মৌমাছিকে মিথ্যা তথ্য ছড়াবার দায়ে অভিযুক্ত করবে। কিন্তু এটা সে বুঝতে পারবে না, ভিন্নভাবে দেখতে অভ্যস্ত ও প্রশিক্ষিত মনের পক্ষে একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন বিচার সম্ভব।
আমি আগেও লিখেছি, আবারও লিখছি, কোটা সংস্কার আন্দোলন ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আলোড়নে প্রগতিশীল দলগুলোর ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি’ ‘প্রায়’ ছিল না। বরং এখন আরও বুঝতে পারছি, এটা আসলে বিবৃতি বা মিছিলের সংখ্যা গুনে যে বোঝা যাবে না; সেটাও রাজনীতিহীন সাধু সমালোচকের পক্ষে বোঝা কঠিন। বরং যিনি সেটা বুঝতে পারবেন, তিনি তা কেবল পারবেন জাতির হৃদয় জুড়ে তৈরি হওয়া ওই ঐক্যের যে চাহিদা, তার সাপেক্ষে। বুঝতে পারবেন হাসিনার হাত থেকে মুক্তির সম্ভাব্য একমাত্র পথটাকে কোক-পেপসি ঢেলে আড়াল করার ভুলটার সাপেক্ষে। বুঝতে পারবেন হাসিনার বিভাজনের সূত্রটাকে দীর্ঘায়িত করার সাপেক্ষে।
সেটা বুঝলেই তিনি দেখবেন, অধিকাংশ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিগুলোকে সরকার আসলে ততটা গুরুত্ব বা পাত্তাই দেয়নি। তারা এই গুরুতর সময়েও অনিরাপদ থাকেনি। তাদের অধিকাংশ নেতা ওই সময়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নীরব থেকেছেন। অনেকেই বরং হাসিনা উৎখাতের প্রয়াসে রাজাকারদের তৎপরতা দেখেছেন, প্রচারও করেছেন।
ফলে মাঠে জনগণের পাশে দাঁড়ানো কর্মীদের মার খাওয়া, বিপুল প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গের আত্মত্যাগ সত্ত্বেও আমার এই কথাটি রাজনৈতিক প্রেক্ষিত থেকে খুবই সত্য।
কিন্তু তর্ক এড়াবার জন্যই আলোচনার এই অংশকে আপাত স্থগিত রেখেও কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলায় উদ্যোগহীনতা বিষয়ক পর্যালোচনাকে পাঠ করেও কিছু ফল লাভ সম্ভব। এই ‘তর্কযোগ্য’ অংশটাকে বাদ দিলেও আমার বিশ্বাস, বাকিটুকুও সেই রাজনৈতিক চোখটার উন্মেষ ঘটতে পারে, যেখান থেকে প্রগতিশীলদের ভূমিকাকে পুনরায় আরেকটা দিক থেকে পর্যালোচনা করা যাবে।
মন থেকেই এই কথাটা বলি, আমার আগ্রহটা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অভ্যুত্থানের ইতিহাসের সাপেক্ষে কী করলে কী হতে পারতো, শুধুমাত্র সেটাই। গণসংহতি আন্দোলনের বিএনপির সাথে ঐক্যে যাওয়া, মন্ত্রিত্ব গ্রহণ ইত্যাদি একদমই ভিন্ন প্রসঙ্গ। এর পক্ষে যুক্তি প্রদান করা এর লক্ষ্য না। এই দুটো প্রসঙ্গে আলোচনা-সমালোচনা, সমর্থন, নিন্দা আলাদা আলাদাভাবে হলেই দু্টো প্রসঙ্গের প্রতি সুবিচার করা হবে।
বিশেষত আমার মনে হয়, অন্তত ইতিহাস পর্যালোচনটা স্বাধীনভাবে এবং খোলা মন নিয়ে না করলে এটা ভবিষ্যতেও যে প্রবল সংকটে প্রগতিশীলদের ফেলবে, সেই আশঙ্কাটা থেকেই যায়।
কি সেই আশঙ্কা?
ক্ষমতা নিয়ে নিরাসক্ত এই দরবেশদের চোখের সামনেই প্রতিবেশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভুত্বের মতাদর্শ বাংলাদেশে প্রগতিশীলতা ও বাঙালিত্বের ছদ্মবেশে ধীরে ধীরে জেঁকে বসবে আবারও, যে প্রগতিশীলতা ও বাঙালিত্ব তার দেশজ চেহারা ও শেকড়ে বরং আমাদের জাতিকে এখনও এগিয়ে যাবার অঢেল রসদের জোগান দিতে সক্ষম।
আমার সমকালীন বাকী বিল্লাহকে—যিনি খুব ঘনিষ্ঠভাবে এই পুরো প্রক্রিয়া দেখেছেন ভেতর থেকে, যার সাম্প্রতিক একটি স্মৃতিচারণ বিষয়ে আমার মত এই যে, ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা চব্বিশের বাস্তবতার বিবরণে তাকে উদ্ধৃত করতে থাকবেন—নিজের মতো করে উদ্ধৃত করি।
সম্প্রতি একটা আলোচনায় তিনি বলেছেন, ৫ অগাস্ট একটি নির্ধারক বামপন্থী দলের কর্মীরা যখন নিচে জনতার সাথে উল্লাস করছেন হাসিনার পতনের পর; নেতারা তখন প্রধান কার্যালয়ে দরজা নামিয়ে, ভেতর থেকে তালা দিয়ে ভয়ে কাঁপছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরেকজন প্রগতিশীল সংগঠক মেঘমল্লার বসু কোটা সংস্কার আন্দোলন বিষয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, যেটা আমার পর্যালোচনাকেই সমর্থন করে।
এই বাস্তবতার কারণ অনুসন্ধান আমরা আদৌ করব না?
আমি নিশ্চিত জানি, কল্লোলের বিষোদগারের পেছনে একটা সরল সাধুতা রয়েছে। কিন্তু কোক-পেপসির বাণী হাজির করা ওই রাজনৈতিক নেতাদের বহুজনই আনুগত্যের এমন সব ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা আছেন যে, রাজনৈতিক ও মতাদর্শিকভাবেই তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ভবিষ্যতের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের করতে হবে।
এই রাজনৈতিক কর্মীদের দলে টানার আহবান বা চেষ্টা আমি করছি না। আমার একমাত্র চেষ্টা, যে প্রগতিশীল ঐতিহ্যের আমিও একজন বলে নিজেকে মনে করি, তাকে রক্ষা, শোধন করা এবং পরের ধাপে নিয়ে যাওয়া। এই নিয়ে যাওয়ার কাজটা ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে হতে পারে; পরস্পরের সমালোচনা ও পর্যালোচনাও সেখানে জরুরি।
কিন্তু ন্যূনতম কিছু বিষয়ে আমাদের নিশ্চিতভাবেই একতম হওয়া দরকার। চব্বিশ যেন বাংলাদেশের বিকাশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো মতাদর্শিক আধিপত্য থেকে প্রগতিশীল রাজনীতিকে মুক্ত করে; যেন আমাদের চিন্তা ও কাজের স্বাধীন বিকাশ ঘটবার, আমাদের নিজস্ব পথটা খুঁজে পাবার সুযোগ তৈরি হয়।
এই ক্লান্তিকর অভিযোগও বারবার শুনেছি, ডানপন্থীরা উপকৃত হবে আমার লেখাগুলো থেকে। অথচ কার্যক্ষেত্রে আমার এই বিষয়ক কোনো লেখাই ডানপন্থীরা সোৎসাহে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেনি। কারণ আমাদের প্রগতিশীল বন্ধুরা এই আলোচনাকে এড়িয়ে যাবার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও এবং আড়াল করলেও ডানপন্থীরা কোনো লেখার মাঝেই এমন কিছু পাননি, যা তাদের মতাদর্শকে পুষ্টি জোগাবে।
বরং কৌতুককর হলেও সত্যি, আমি নিজে অনেকগুলো ফোরামে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছি এই বিষয়গুলো নিয়ে সামনাসামনি আলাপ, বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ তৈরি করবার জন্য। এমনকি দিনব্যাপী কর্মশালাও করা সম্ভব, যেখানে সকলেই তার মতামত যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারবেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো সাড়া পাইনি। আমার প্রতি বিষোদগারকে নিয়মে পরিণত করা অন্তর্জালের সংবাদমাধ্যমটিও চাইলে এই বিষয়ে আমাকে ডাকতে পারত তাদের পর্যালোচনার জবাবে আমার মতামত পাবার জন্য। সেটারও ন্যূনতম চেষ্টা তারা করেননি।
অন্ধত্ব খুব বিপজ্জনক। যে আশঙ্কার কথা বলেছি উপরে, সেই কূয়োর দিকে যেন আমরা আবার অনেকে মিলে একসাথে না পতিত হই।
.png)

কিশোরগঞ্জের একটি খবর পড়ে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। একটি কনসার্ট বন্ধের দাবি জানিয়ে প্রশাসনের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, গান-বাজনা ইসলামী শরিয়াহবিরোধী। পরে প্রশাসনিক অনুমতি বা লাইসেন্স না থাকার কথাও বলা হয়েছে।
১৯ আগস্ট ২০২৬
শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল সপরিবারে। সেই রাতে আরও একাধিক বাসভবনে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। এর মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব নেতৃত্বাধীন স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে ওই ধরনের হত্যাকাণ্ডই একমাত্র উপায় ছিল কিনা, তা
১৬ আগস্ট ২০২৬
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং বেশ কয়েকজনের আহত হওয়ার ঘটনাটি দেশের শ্রম খাতের এক ভয়াবহ ও রূঢ় বাস্তবতাকে আবারও আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে।
১৬ আগস্ট ২০২৬
ময়মনসিংহের ত্রিশালের একটি বালুমহাল। সেখানকার অস্থায়ী টিনের কার্যালয়ে বসে কাজ করছিলেন ইজারাদারের এক কর্মচারী। হঠাৎ সেখানে দলবল নিয়ে প্রবেশ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য। সরকারি কর্মকর্তাদের এমন আকস্মিক প্রবেশে কিছুটা ভড়কে যান ওই কর্মচারী।
১৩ আগস্ট ২০২৬