লিবিয়ায় গেমঘরে নির্যাতনে মাদারীপুরের ২ যুবক নিহত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মাদারীপুর

নির্যাতনে নিহত ফারুক হাওলাদার ও ইলিয়াস হাওলাদার। ছবি: সংগৃহীত

লিবিয়ায় বন্দিশালায় (গেমঘর) দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরের দুই যুবক নিহত হয়েছেন। সপ্তাহখানেক আগে মৃত্যু হলেও তা পরিবারের কাছে গোপন রাখা হয়।

নিহতরা হলেন– মাদারীপুরের কালকিনির দক্ষিণ জনারদন্দি এলাকার কালাম হাওলাদারের ছেলে ইলিয়াস হাওলাদার (২৫) ও ডাসারের গোপালপুর ইউনিয়নের বিনতিলুক এলাকার মৃত সেকেন হাওলাদারের ছেলে ফারুক হাওলাদার (৩৫)। তাদের লাশ দ্রুত দেশে আনার দাবি জানিয়েছে পরিবার।

সরেজমিন ইলিয়াসের বাড়িতে দেখা যায়, বড় ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা কালাম হাওলাদার ও মা রানু বেগম। ইলিয়াসের দুই বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে। বাবা আর কখনো ফিরবে না, তা বুঝতে পারছে না অবুঝ শিশু। ছেলেকে কোলে নিয়ে কাঁদছেন ইলিয়াসের স্ত্রী বীথি আক্তার।

কালাম হাওলাদার বলেন, আমার দুই ছেলে, তারা কাতার থাকত। ওখানেই ভালো ছিল। বড় ছেলে ইলিয়াস আমাদের কাউকে কিছু না জানিয়ে ইতালির উদ্দেশে লিবিয়া যায়। পরে আমরা জানতে পারি। ছেলের মুখের দিকে চেয়ে আমি অনেক কষ্টে দালাল হাবিব মাস্টারকে ২০ লাখ টাকা দিয়েছি। তবুও আমার ছেলেডা মরে গেল।

তিনি বলেন, জানাজানির পরে শুক্রবার ঢাকায় দালাল আমাদের নিয়ে বসেন। তিনি আমার ছেলের লাশ দেশে আনার আশ্বাস দিয়েছেন। একইসঙ্গে ক্ষতিপূরণও দেবে বলেছেন।

ইলিয়াসের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীকে ওরা নির্যাতন করে হত্যা করেছে। এই হত্যার বিচার কী কোনো দিন পাব? দুধের শিশুকে নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচব? সরকারের কাছে অনুরোধ, আমার স্বামীর লাশটা যেন দেশে এনে দেয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উন্নত জীবনের আশায় তিন বছর আগে কাতারে যান ইলিয়াস। সেখান থেকে বাংলাদেশি এক দালালের খপ্পরে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে গত বছরের আগস্টের শুরুতে কাতার থেকে দালালের সহযোগিতায় লিবিয়া পৌঁছান ইলিয়াস। সেখানে একটি বন্দিশালায় ইলিয়াসকে আটরে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কয়েক দফায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। গত ২৩ মার্চ বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান ইলিয়াস। চার দিন পরে গত বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে ইলিয়াসের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাবিব মাস্টার ওরফে হাবিবুর রহমান খন্দকারের বাড়ি ডাসারের দক্ষিণ গোপালপুরে। তিনি একটি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষক। বাংলাদেশে থেকে লিবিয়ার মানবপাচার চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছেন তিনি।

এ ব্যাপারে হাবিবুর রহমানের মোবাইল নম্বরে কল দিলে রিসিভ হয়নি। বাড়িতে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

অন্যদিকে, ডাসারের বিনতিলুক এলাকার ফারুক হাওলাদার লিবিয়ার বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মারা গেছেন গত ১৮ মার্চ। পরিবার তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়েছে ২৫ মার্চ। দেশে ফারুক রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। উন্নত জীবনের আশায় চার মাস আগে দালাল হাবিবুর রহমানের মাধ্যমে সৌদি আরব হয়ে লিবিয়া পৌঁছান তিনি।

এরপর সেখানে ফারুককে একটি বন্দিশালায় আটক রেখে পরিবারের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা আদায় করে দালাল চক্র। নির্যাতনে ফারুকের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। রোববার বিকেলে ফারুকের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, একটি ভাঙাচোরা টিনশেড ঘরে মা মালেকা বেগম, স্ত্রী লাবণী আক্তার ছাড়াও তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে বসবাস করছে।

মা বলেন, ‘গেম ঘরে (বন্দিশালা) কী থেকে কী হইছে জানি না। আমার ছেলেডা আর বাঁইচা নাই। ওরে ছাড়া ক্যামনে বাঁচমু? ওর ছোট্ট দুই ছেলেমেয়ে, ওরাও অবুঝ। ওগের কী হবে? কে দ্যাখব? আমরা গরিব মানুষ।’

ফারুকের স্ত্রী লাবণী আক্তার বলেন, আমার স্বামীকে নির্যাতন করে লিবিয়ার গেমঘরে হত্যা করা হয়েছে। আমি স্বামীর লাশটা দেখতে চাই। তাঁকে এই দেশের মাটিতে রাখতে চাই। সরকার আমার স্বামীর লাশটা যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করে।

পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, লিবিয়ার বন্দিশালায় দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি। অভিযোগ দিলে মামলা নেওয়া হবে। তবে দালালদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সম্পর্কিত