নারায়ণগঞ্জে যুবককে পিটিয়ে হত্যায় মামলা, আসামি ওলামা দলের নেতাসহ ২১

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জে যুবককে পিটিয়ে হত্যাকাণ্ডে করা মামলার আসামি। সংগৃহীত ছবি

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ‘ছিনতাইকারী’ অভিযোগ দিয়ে খুঁটিতে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। নিহত মো. সিজানের মা শিল্পী বেগম ফতুল্লা মডেল থানায় মামলাটি করেন।

ওসি মাহবুব আলম জানান, সোমবার (৬ জুলাই) সকালে ফতুল্লা মডেল থানায় হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এতে স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম, জাতীয়তাবাদী ওলামা দল, খেলাফত মজলিসের নেতাসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার সম্ভব হয়নি।

শনিবার (৪ জুলাই) রাতে মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগে সিজানকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে নারায়ণগঞ্জের খানপুর ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

আসামিরা হলেন, সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইরের আল ফালাহ জামে মসজিদের ইমাম ও খেলাফত মজলিসের সদর থানা শাখার সাবেক সহসভাপতি মুফতি কাউছার আহাম্মেদ কাসেমী (৪০), জেলা কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক আব্দুল গনি (৫০), জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের ফতুল্লা থানার আহ্বায়ক জিলানী ফকির (৫৫), একই এলাকার বাসিন্দা আজহার রাজমিস্ত্রি (৫৫), সাইদুল (৪২) ও মো. আলম (৩৮)। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয়ের অন্তত ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়, শনিবার বিকেলে পশ্চিম মাসদাইরের আল ফালাহ সমাজ কল্যাণ সংগঠনের কার্যালয়ের সামনে অনিক (২৮) নামে এক যুবককে মোবাইল ফোন চুরির অপবাদে মারধর করছিল অভিযুক্তরা। পরে বিকেল ৪টার দিকে সিজানকে তাঁর বাসার সামনে থেকে ধরে নিয়ে যায়। দু’জনকে রাস্তার পাশের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বেঁধে স্টিলের পাইপ দিয়ে পেটাতে থাকে। এতে সিজান চিৎকার করলে তার মুখে কালো কাপড় বেঁধে পেটানো হয়।

রোববার বিকেলে সাংবাদিকদের ডেকে বক্তব্য দেন কাউছার কাসেমী ও জালানী ফকির। স্ট্রিম ছবি
রোববার বিকেলে সাংবাদিকদের ডেকে বক্তব্য দেন কাউছার কাসেমী ও জালানী ফকির। স্ট্রিম ছবি

এজাহারে শিল্পী বেগম বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি সেখানে গিয়ে তাদের অনেক অনুনয়-বিনয় করি। কিন্তু তারা আমার সামনেই ছেলেকে পেটাতে থাকে। সন্ধ্যা সাতটার দিকে অচেতন অবস্থায় ছেলেকে আমার জিম্মায় দেয়।’ ওই অবস্থায় সিজানকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়।

স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তরা পশ্চিম মাসদাইর এলাকার বাসিন্দা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি তারা স্থানীয় আল ফালাহ সমাজ কল্যাণ সংগঠনের সদস্য। গঠনের নামে তারা প্রায়ই এলাকায় ‘মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী’ নামে অভিযান চালান। এর আগেও এ সংগঠনের নামে তারা একাধিক ব্যক্তিকে ধরে এনে কার্যালয়ের সামনে মারধর করেছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

এদিকে সংগঠনের নামে চালানো এসব কার্যক্রমের কয়েকটি ভিডিও মুফতি কাউছার কাসেমীর নিজস্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শনিবার সংগঠনের কার্যালয়ের সামনে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে সিজান ও অনিককে পেটানোর ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। তবে পরে তা সরিয়েও ফেলা হয়েছে।

সিজান হত্যাকাণ্ডের রাতে একটি ভিডিওতে স্থানীয় লোকজনের উদ্দেশে কাউছার কাসেমীকে বলতে শোনা যায়, ‘কোনো পরাশক্তি আমাদের পরাজিত করতে পারবে না, ইনশাল্লাহ। খুব খেয়াল করে শুনবেন কথাটা, জানাজা হয়ে মাটি হওয়ার আগ পর্যন্ত সবাই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আমরা এই কমিটি করেছি কেন? মানুষের শান্তির জন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনো কমিটি মারছে ওরে? কোনো ব্যক্তি মারছে? মারছে জনগণ। পাবলিক যদি কোনো কুত্তারে মেরে ফেলে, তার কোনো অন্যায় হবে? তার কোনো মামলা হবে? তো ইনশাল্লাহ, কোনো মামলা-মোকদ্দমা কিচ্ছু হবে না।’

এদিকে ওই ঘটনার পরদিন রোববার (৫ জুলাই) বিকেলে এলাকায় সাংবাদিকদের ডেকে দেওয়া এক বক্তব্যে কাউছার কাসেমী দাবি করেন, সিজান ছিল মাদকাসক্ত ও ছিনতাইকারী। শনিবার সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ আগে বিক্ষুব্ধ জনতা সিজানকে ধরে তাদের কাছে নিয়ে আসে। এ সময় তারা নামাজ শেষে বিষয়টি দেখার কথা জানিয়ে মসজিদে গেলে উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করে। সিজানকে পেটানোর ঘটনায় তাদের সংগঠনের কেউ জড়িত নয় বলেও দাবি করেন সংগঠনের উপদেষ্টা ও ওলামা দল নেতা জিলানী ফকির।

তবে নিহতের মা শিল্পী বেগম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে সুস্থ অবস্থায় বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গেছে। বলছিল— তোরে জিজ্ঞাসা করে পাঠাই দিমু। তাকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেছে। আমি পেছনে পেছনে গেছি। কিন্তু আমার বাবারে আমি আনতে পারি নাই। ওরা আমার বাবারে চোখের সামনে মারছে। পরে অজ্ঞান অবস্থায় তার হাতে কালি দিয়ে টিপসই নিয়ে তারা আমার ছেলেকে একটি অটোরিকশায় তুলে দেয়।’

এদিকে মামলা বিষয়ে জানতে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউছার কাসেমী ও জিলানী ফকিরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করে বন্ধ পাওয়ায় তাদের বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত