সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী, আগস্টে বড় ধাক্কার শঙ্কা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। হাসপাতালটিতে বর্তমানে দুটি বিশেষায়িত ওয়ার্ড ও একটি ডেঙ্গু কর্নার চালু থাকলেও আগস্টের শুরু থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অতিরিক্ত ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি রয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ডেঙ্গুর বড় ঢেউ এখনো শুরু হয়নি। সামনের দিনগুলোতে বড় ধাক্কা আসতে পারে।

হাসপালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২২ জুলাই পর্যন্ত মোট ৮৪০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ১৩৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালে মোট ১৪০টি শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এখনো রোগীদের ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। বর্তমানে দুটি ডেঙ্গু ওয়ার্ড ও একটি ডেঙ্গু কর্নার চালু আছে। প্রয়োজন হলে আরও বাড়ানো হবে।’

তিনি জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ রোগীই রাজধানীর বাসিন্দা। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার রোগীর সংখ্যাই বেশি। অন্যান্য জেলা থেকেও রোগী আসছেন, তবে সেই সংখ্যা তুলনামূলক কম।

সামনের দিনগুলোর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এখনো ডেঙ্গুর ঢেউ আসলে শুরু হয়নি। সামনে একটা বড় ধাক্কা আসবে বলে মনে হচ্ছে।’

সরেজমিনে হাসপাতালের একটি ডেঙ্গু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ৩০টি শয্যার মধ্যে ২০টিতে রোগী ভর্তি রয়েছেন। বাকি শয্যাগুলো নতুন রোগীদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স লাসমিনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের এই ওয়ার্ডে ৩০টি বেড আছে। আজকে ১০ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২০ জন রোগী ভর্তি আছেন।’

তিনি জানান, ডেঙ্গু রোগীরা শুধু নির্ধারিত ওয়ার্ডেই নন, হাসপাতালের অন্যান্য মেডিসিন ওয়ার্ডেও ভর্তি রয়েছেন। তবে সুযোগ পেলেই তাদের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘অন্যান্য রোগীদের সঙ্গে থাকলে অনেক সময় বেড সংকটের কারণে ফ্লোরে চিকিৎসা দিতে হয়। কিন্তু ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।’

রোগীদের আবাসস্থল সম্পর্কে জানতে চাইলে নোটবুক দেখে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভর্তি রোগীর প্রায় ৯৫ শতাংশই ঢাকার। সবচেয়ে বেশি রোগী আসছেন মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে।’

তিনি আরও জানান, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় কোনো ধরনের সরঞ্জামের সংকট নেই। প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসাসেবা যথাযথভাবে দেওয়া হচ্ছে।

ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা এলাকা থেকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন গৃহিণী রুমা আক্তার। তিনি জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরপরই বেড পেয়েছেন এবং চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট।

রুমা আক্তার বলেন, ‘আমি গতকাল ভর্তি হয়েই সিট পেয়েছি। এখানে ভালোই চিকিৎসা চলছে।’

তিনি আরও জানান, চার থেকে পাঁচ দিন আগে জ্বর আসে। পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কিন্তু গত দুই দিন ধরে কিছু খেতে না পারায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছেন।

আগস্টে আসতে পারে বড় প্রাদুর্ভাব

ডেঙ্গুর সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার।

তিনি বলেন, ‘আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা যাবে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। এবার রাজধানীর তুলনায় জেলা শহরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা যেতে পারে।’

তার মতে, সরকারি তদারকি, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ঘাটতির কারণেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৫৭০ জনে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১ হাজার ৩৮ জন রোগী।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন, মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। আর ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ এবং মারা যান ৪১৩ জন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত