রাঙামাটি-কক্সবাজার

পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস, নির্বিকার প্রশাসন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাঙামাটি ও কক্সবাজার

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩: ৩৪
কক্সবাজারের পেকুয়ায় টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধস। সংগৃহীত ছবি

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাহাড়ধসে মৃত্যু বেড়েছে। রোবারবার রাতে পাহাড়ধসে কক্সবাজারের পৃথক তিন দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। এরই মধ্যে রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের শঙ্কায় খোলা হয়েছে শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র। কিন্তু এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থেমে নেই বাড়ি বানানো।

২০১৭ সালর ১৩ জুন অতিবষ্টিতে পাহাড় ধসের ঘটনায় রাঙামাটির শহরর ভেদভেদীর যুব উনয়ন এলাকা, মুসলিম পাড়া, শিমুলতলী, রপনগর, সাপছড়ি, মগবান, বালুখালী এলাকায় এবং জুরাছড়ি, কাপ্তাই, কাউখালী ও বিলাইছড়ি এলাকায় ১২০ জনর মত্যু হয়। শহরের উপকণ্ঠ মানিকছড়িতে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ওপর থেকে মাটির সরাতে গিয়ে ৫ সেনাসদস্য পাহাড় ধসে মাটি চাপায় পড়ে মারা যান।

২০১৮ সালে নানিয়ারচর উপজলায় পাহাড় ধসে দুই শিশুসহ ১১ জন এবং ২০১৯ সালের কাপ্তাইয়ে ৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। এত মৃত্যুর পরও একই স্থানে পুনরায় ঘরবাড়ি নির্মাণ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন লোকজন।

তবে ঝুঁকিত থাকা এসব লোকজনকে আজও কোনো পুর্নবাসন করা হয়নি। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই জেলা প্রশাসন থেকে ঝুঁকিপুর্ণস্থানে বসবাসকারী লোকজনদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মাইকিং ও ঝুঁকিপুর্ণ স্থাপনা নির্মাণ করতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এ ছাড়া তেমন কোনো ভূমিকা দেখা যায় না। তবে প্রশাসনের দাবি, ঝুকিপূর্ণ স্থানে থাকা বসবাসকারীদর সাময়িকভাবে সরালেও পরে আবারও বসবাস শুরু করেন।

রাঙামাটি পৌরসভার ৯ ওয়ার্ডের মধ্যে শিমুলতলী, রূপনগর, লোকমন্দির পাড়া, পোস্ট কলোনি এলাকা, নতুনপাড়া, সিলেটি পাড়াসহ অন্তত পক্ষে ২৯টি ঝুঁকিপুর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া নানিয়ারচর, কাউখালী উপজেলাসহ কয়েকটি উপজলায় বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন ২০ হাজারের অধিক লোকজন।

সম্প্রতি পাহাড় ধসের ট্রাজেডির ঘটনাস্থল রূপনগর, শিমুলতলী, নতুন পাড়ায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়র পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাস করছেন লোকজন। নিত্যনতুন ঘর নির্মাণ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে তারা।

নতুন পাড়ার সুমন পারভেজ, মো. হারুন জানান, বৃষ্টিবাদল এলেও জীবনর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। যেহেতু তারা দরিদ্র তাই অল্প টাকা দিয়ে যে জায়গা কিনতে পেরেছেন, সেই জায়গাত বসবাস করছেন।

রূপনগরর লতিফা খাতুন, মনি আক্তার চম্পা, জহেরা বেগম জানান, ২০১৭ সালের ১৩ জুনের কথা মনে পড়লে গা শিউরে উঠে। কী আর করার আছে, আমাদের অন্যত্র যাওয়ার জায়গা নেই, তাই বাধ্য হয়ে এখানে থাকি। বৃষ্টি হলে ছেলেমেয়ে চিন্তায় থাকত হয়।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরণের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। জেলাজুড়ে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, রেড ক্রিসেন্টসহ সকল নিয়ে যৌথভাবে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, রাঙামাটি জেলায় বসবাসযোগ্য ভূমির পরিমাণ কম। তারপরও আমরা যখন ঝুকিপূর্ণ স্থান থেকে সরিয়ে ফেলি, তখন দেখা যায় শুষ্ক মৌসুমে আবার সেখান তারা চলে আসে। তবে ভূমিহীনদের যদি ভূমি বন্দোবস্ত দিয়ে অন্যত্র কোথাও পূর্নবাসন করানো যায় কিনা, প্রশাসন এ বিষয় কাজ করছে। এখানে জনসচেতনতাই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য সবাইকে সহযাগিতা করতে হবে।

কক্সবাজারে বন-পাহার দখল করে বসতি, মৃত্যুঝুঁকি

কক্সবাজার শহর, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, কলাতলী থেকে মেরিন ড্রাইভ ও কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের দুই পাশে পাহাড়ের পাদদেশ দখল করে তৈরি হয়েছে বাড়ি-ঘর ও স্থাপনা।

দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা এসব বসতি দিনদিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে কক্সবাজার শহর, উখিয়া, টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসহ জেলার ৮ উপজেলায় পাহাড়ে ফাটল ও ধস দেখা দিচ্ছে।

গত রোববার দিবাগত রাত থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত পাহাড় ধসে উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবির, কক্সবাজার শহর ও পেকুয়ায় ১২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। জেলা প্রশাসন, বনবিভাগ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সূত্র বলছে, জেলা সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া ও মহেশখালীতে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে। সাগর ও নদী ভাঙনের শিকার হয়ে লোকজন সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে বসতি গড়ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, বর্ষা এলেই স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে সরে যেতে মাইকিং করে। এ ছাড়া কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।

জেলায় পাহাড়ে অবৈধ বসতি ও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বন বিভাগের সূত্র মতে, জেলার কুতুবদিয়া ছাড়া বাকি আট উপজেলার এক-তৃতীয়াংশ বনভূমি। এক সময়ে জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে খ্যাত কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ বনভূমির বড় অংশ গত দুই দশকে দখল হয়ে গেছে।

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের তথ্যমতে, গত দেড় দশকে এই বিভাগের ১৩ হাজার ৩৪৭ একর বনভূমি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের ৭৬ হাজার ৪৫৭ একর বনভূমির মধ্যে ব্যক্তিপর্যায়ে দখলে গেছে ১২ হাজার ৬০৫ একর।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ১ লাখ ২০ হাজার ৫৮৩ একর বনভূমির বড় অংশই দখল হয়ে গেছে। প্রায় ১৫ হাজার একর বনভূমিজুড়ে রয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। এসব আশ্রয়শিবিরের আশপাশের পাহাড়ও স্থানীয় বাসিন্দা ও এনজিও সংস্থার দখলে। এসব জায়গায়ও গড়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজারে সংরক্ষিত বন দখল ও পাহাড় কাটার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর ফলে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনাও বাড়ছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার জানান, তিন দিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে বাসিন্দাদের সরে আসার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। এখন প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে সরিয়ে আনা হবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার কাজ চলছে। বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত