গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ধুঁকছে, বেড়েছে লোডশেডিং

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ২২: ১৯
এলএনজি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব আরও সপ্তাহখানেক চলতে পারে। স্ট্রিম গ্রাফিক

চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও, যার ফলে গেল সপ্তাহের তুলনায় লোডশেডিং বেড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে শিগগিরই সমাধানের আভাস না পাওয়ায় এ সংকটের নেতিবাচক প্রভাব আরও সপ্তাহখানেক চলতে পারে।

গত ২১ জুলাই কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি বন্ধ হওয়ার পর গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমতে থাকে। এখন দিনের বেলায় লোডশেডিং হচ্ছে তো বটেই, গভীর রাতে তা দেড় হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

সোমবার (২৭ জুলাই) সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বন্ধ টার্মিনালটির ত্রুটি মেরামতের কাজ চলছে। আগামী সপ্তাহে সক্ষমতার অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ করতে পারলেও এর পরের সপ্তাহে শতভাগ সরবরাহ সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি যে মানুষের কষ্ট হচ্ছে। জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে আমাদের দ্বিধা নেই।’

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত রোববার (২৬ জুলাই) দিবাগত রাত ১টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৭০৭ মেগাওয়াট। রাত ১২টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৫৪৩ মেগাওয়াট।

এলএনজি টার্মিনাল সচল থাকাকালে গত ১৯ জুলাই সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৪৪০ মেগাওয়াট। সপ্তাহ ব্যবধানের লোডশেডিংয়ের এই বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকেরা। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের জেলা ও গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

পিডিবির দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল ৯৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ার পর ২১ জুলাই গ্যাস সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ৮৫৮ এমএমসিএফডিতে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২৬ জুলাই দিবাগত রাত ১টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৭০৭ মেগাওয়াট। রাত ১২টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৫৪৩ মেগাওয়াট।

পিজিসিবির ঘণ্টাভিত্তিক উৎপাদন চিত্র অনুযায়ী, ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৫ হাজার ১৮৮ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার পর ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮২২ মেগাওয়াটে। ২৬ জুলাই সন্ধ্যায় তা ছিল ৩ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ গ্যাস সংকটের কারণে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় গ্রিডে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি কমেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের সংকটের কারণে দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে তো বটেই, কিছু কেন্দ্রের কোনো কোনো ইউনিট একেবারে বন্ধ রাখতে হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩ নম্বর ইউনিটটি গ্যাসের অভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গত ১৯ জুলাই এই ইউনিটটি ১২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল।

নারায়ণগঞ্জের মেঘনা নদী অববাহিকায় গড়ে ওঠা বিদ্যুৎ হাবে দেশের অন্যতম বৃহত্তম কয়েকটি বেসরকারি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার সবগুলোই এখন গ্যাস সংকটে ধুঁকছে। এর মধ্যে যৌথ মালিকানাধীন ৭১৮ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার মেঘনাঘাট (জেরা) বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার আগে (১৯ জুলাই) ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। কিন্তু এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ার পর গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এর উৎপাদন অর্ধেক কমে গেছে।

৫৮৩ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার মেঘনাঘাট সামিট কেন্দ্রটি আগে যেখানে ৪৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল, গ্যাস সংকটে এর উৎপাদন কমে ৩৫০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে। সামিটের মালিকানাধীন আরেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ৩৩৫ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার মেঘনাঘাট সিসিপিপির উৎপাদনও ২৯৯ মেগাওয়াট থেকে কমে দেড় শ মেগাওয়াটে ঠেকেছে। গ্যাসের সরবরাহ না পেয়ে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে ৫৮৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার ‘ইউনিক মেঘনাঘাট সিসিপিপি’ কেন্দ্রটি। ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রও গ্যাসের অভাবে প্রায় অচল হয়ে পড়ে আছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অতিরিক্ত সক্ষমতা বা রিজার্ভ নেই। আগে থেকেই জানা ছিল যে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলেই দেশে গ্যাস সংকট তীব্র হবে। ভবিষ্যতেও এমন ঝুঁকি থেকে যাবে।

গ্যাস সংকটের কারণে সৃষ্ট ঘাটতি মেটাতে পিডিবিকে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে। পাওয়ার গ্রিডের তথ্য বলছে, গত ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় তরল জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৮৭৮ মেগাওয়াট, যা ২৬ জুলাই সন্ধ্যায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৯৫ মেগাওয়াটে। তরল জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি গড় ব্যয় বেড়েছে।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে অন্যান্য রিসোর্স কাজে লাগানো হচ্ছে। আগে দৈনিক যত ব্যয় হতো, এখনো প্রায় একই পরিমাণ ব্যয় করা হচ্ছে, তবে উৎপাদন কম হচ্ছে। কারণ তরল জ্বালানি ব্যবহারে খরচ বেশি। সে কারণে লোডশেডিং বা কম উৎপাদন করে ব্যয় ম্যানেজমেন্ট করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গ্যাসভিত্তিক ছাড়া অন্য যে বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে সেগুলোর যথাসাধ্য ব্যবহার এখন করা হচ্ছে। এই কদিনে আমরা গ্যাসভিত্তিক ছাড়া অন্য কোনো পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ রাখিনি। কিছু গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন প্রায় শূন্য, একেবারে বন্ধ করলে কিছু সমস্যা হয়, তাই কম লোডে চালাচ্ছি।’

আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করছে এক্সিলারেট এনার্জি। আরেকটি সামিট গ্রুপ পরিচালনা করছে। বেশ কয়েক বছর ধরে দেশে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম। এই দুটি টার্মিনাল থেকে ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। দেশে প্রতিদিন সরবরাহ করা মোট গ্যাসের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে। স্বাভাবিকভাবেই এলএনজির সরবরাহ কমলে গ্যাস সংকট বেড়ে যায়।

গ্যাস সংকটের কারণে সৃষ্ট ঘাটতি মেটাতে পিডিবিকে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে।

এসব বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অতিরিক্ত সক্ষমতা বা রিজার্ভ নেই। আগে থেকেই জানা ছিল যে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলেই দেশে গ্যাস সংকট তীব্র হবে। ভবিষ্যতেও এমন ঝুঁকি থেকে যাবে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে ল্যান্ড বেইজড ও মহেশখালীতে ‘কুতুবজোম’ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে। সরকার পায়রা বন্দর এলাকায় আরও একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাব শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের ওপর পড়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি হলেও দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার পর্যায়ক্রমে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে নতুন গ্যাসকূপ খননের একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত