আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস

পাহাড়ে মাতৃভাষার বই আছে, নেই প্রশিক্ষিত শিক্ষক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বান্দারবান

মাতৃভাষায় বই হাতে বান্দরবানের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা। স্ট্রিম ছবি

প্রায় এক দশক পর পাহাড়ের শিশুদের হাতে পৌঁছেছে মাতৃভাষার বই। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর মতো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। ফলে মাতৃভাষার বই হাতে নিয়েও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের পড়তে হচ্ছে অন্য ভাষায়। বই ছাপানো ও বিতরণের বাইরে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে কয়েকটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় রয়েছে ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরই বসতি। ফলে পাহাড়ের অন্যান্য জেলার তুলনায় বান্দরবানে মাতৃভাষায় শিক্ষার পরিসর ও চ্যালেঞ্জ দুটিই বেশি।

সরকারের সর্বশেষ প্রাথমিক শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ভাষা, দুর্গমতা, সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা ও অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে এসব শিশুর মানসম্মত শিক্ষার বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০১৭ সালে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের উদ্যোগ নেয় সরকার। প্রথম ধাপে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি এই পাঁচ ভাষায় পাঠ্যবই বিতরণ শুরু হয়। পরে পর্যায়ক্রমে প্রাথমিকের বিভিন্ন শ্রেণির বইও এসব ভাষায় প্রণয়ন ও বিতরণ করা হয়েছে।

কিন্তু বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, বই পৌঁছালেও বই পড়ানোর মতো শিক্ষক তৈরি হয়নি। কোথাও স্থানীয় ভাষা জানা শিক্ষক থাকলেও মাতৃভাষায় পাঠদানের প্রশিক্ষণ নেই, আবার কোথাও সংশ্লিষ্ট ভাষায় দক্ষ শিক্ষকই নেই।

দুর্গম পাহাড়ি বিদ্যালয়ে সমস্যাটি আরও প্রকট। একই বিদ্যালয়ে একাধিক জনগোষ্ঠীর শিশু পড়াশোনা করায় একজন শিক্ষকের পক্ষে একাধিক ভাষায় পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও মারমা, ত্রিপুরা ও চাকমা শিক্ষার্থী একই শ্রেণিকক্ষে পড়ছে, অথচ তাদের মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য আলাদা প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। ফলে শিশুর হাতে মাতৃভাষার বই থাকলেও শ্রেণিকক্ষে তাকে বাংলা কিংবা অন্য প্রচলিত ভাষায় পাঠ নিতে হচ্ছে।

মাতৃভাষায় বই হাতে বান্দরবানের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা। স্ট্রিম ছবি
মাতৃভাষায় বই হাতে বান্দরবানের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা। স্ট্রিম ছবি

ডনবস্কো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পুলুসু মারমা বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে সিলেবাসেও আছে, রুটিনেও আছে। আমরা প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াচ্ছি। ছেলে-মেয়েরাও পড়তে পারে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি নিয়মিত পড়াতে। তবে মারমা ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়ে কম।’

বিক্রিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বসন্ত কুমার চাকমা বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে ৯৯ ভাগ শিক্ষার্থী মারমা সম্প্রদায়ের। কিন্তু এখানে প্রশিক্ষিত একজন শিক্ষকও না থাকার কারণে আমরা পাঠদান করতে পারি না। আর চাকমা ভাষায় কোথায় কোন স্কুলে পড়ানো হয়, সে বিষয়েও আমরা কিছু জানি না।’

কচ্ছপতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা ছাত্রছাত্রী বেশি। আমরা বইও পেয়েছি। কিন্তু মারমা ও ত্রিপুরা শিক্ষক থাকলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান করতে পারছি না। আমি ত্রিপুরা ভাষায় প্রশিক্ষণ পেয়েছি, কিন্তু কাজের চাপে পড়ানোর সময়ও পাই না।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান জেলায় মোট ৪৩৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চাকমা ভাষায় ৫৫৪, মারমা ভাষায় ৫ হাজার ৫২১ এবং ত্রিপুরা ভাষায় ১ হাজার ৭৫৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে বই বিতরণ করা হয়েছে। তিনটি ভাষা মিলিয়ে মোট ৭ হাজার ৮৩১ জন শিক্ষার্থী মাতৃভাষার পাঠ্যবই পেয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত এসব শিক্ষার্থীর জন্য বিতরণ করা হয়েছে মোট ১৭ হাজার ৮৭৫টি মাতৃভাষার পাঠ্যবই।

জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা জানান, ২০২৬ সালে মাতৃভাষায় পাঠদান কার্যক্রম জোরদার করতে ভাষাভিত্তিক শিক্ষকদের সরকারি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বান্দরবান পিটিআইয়ে মারমা ভাষার শিক্ষক, রাঙামাটিতে চাকমা ভাষার শিক্ষক এবং খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা ভাষার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, চলতি বছর বান্দরবান জেলা থেকে তিন ভাষায় মোট ৬০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মারমা ভাষায় ৩৫, চাকমা ভাষায় ৯ এবং ত্রিপুরা ভাষায় ১৬ শিক্ষক রয়েছেন। পর্যায়ক্রমে আরও শিক্ষককে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত