বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ বাড়লেও তথৈবচ গবেষণাখাত

দেশ ও জনকল্যাণমুখী গবেষণার স্বার্থেই বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। স্ট্রিম গ্রাফিক

জাতীয় বাজেটে এবার শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বেড়েছে। প্রভাব পড়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলেও। তবে বরাবরের মতোই উপেক্ষিত গবেষণাখাত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যেখানে প্রায় ১৩ শতাংশ বরাদ্দ বেড়েছে, সেখানে গবেষণাখাতে কমেছে প্রায় দশমিক ২০ শতাংশ।

শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার গবেষণায় জোর দিচ্ছে। অথচ মানসম্মত গবেষণার জন্য যে বরাদ্দ দরকার, তা দিচ্ছে না। ফলে কার্যকর গবেষণা সম্ভব হচ্ছে না। দেশ ও জনকল্যাণমুখী গবেষণার স্বার্থেই বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ দেন তাঁরা।

সংসদে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপনের সময় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ব্রেইন ড্রেইন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখেন, যা গত অর্থবছরে ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি বরাদ্দের চেয়ে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেশি।

এদিকে, গত ১১ জুন ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ হাজার ১ কোটি ৮২ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন দেয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেটে গবেষণার বরাদ্দও যুক্ত থাকত। তবে এবার ইউজিসি শুধু গবেষণাখাতে আলাদা ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।

ইউজিসির তথ্যে, গত বছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেট ছিল ১০ হাজার ৮০২ কোটি ২১ লাখ টাকা। এর মধ্যে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ১৯৪ কোটি টাকা। এ বছর গবেষণার বরাদ্দ যোগ করলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ১২ হাজার ২০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সে হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ বেড়েছে ১ হাজার ৩৯৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।

ইউজিসির নিজস্ব গবেষণা বরাদ্দ ২৬ কোটির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২০০ কোটি যুক্ত হয়ে এই খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ২২৬ কোটি টাকা। শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের যে উল্লম্ফন ঘটেছে, তার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার এই গবেষণা বরাদ্দের চিত্র বেশ বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

মূল বাজেট বাড়লেও গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থের অনুপাত এবার কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল মূল বাজেটের ১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এবার তা ১ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, গবেষণায় প্রায় দশমিক ২০ শতাংশ বরাদ্দ কমেছে।

ইউজিসি সূত্র জানায়, গবেষণার বরাদ্দ ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যে ১২ হাজার ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে ৭ হাজার ৪২৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা পরিচালন ব্যয় এবং ৪৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুকূলে ৪ হাজার ৫৭৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়, গবেষণা খাতে দ্বৈততা পরিহারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং ইউজিসির গবেষণা খাত একীভূত করা হবে। এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের গবেষণা খাতের ২০০ কোটি টাকা সরাসরি ইউজিসির বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

বাজেট সরকার নির্ধারণ করে। আমরা বিভিন্ন ফোরামে বলে আসছি, গবেষণা খাতে বরাদ্দ অপ্রতুল। আশা করছি, সামনে গবেষণাসহ পুরো শিক্ষা খাতেই সরকার বরাদ্দ বৃদ্ধি করবে। অধ্যাপক সাইদুর রহমান, ইউজিসির সদস্য

ইউজিসির নিজস্ব গবেষণা বরাদ্দ ২৬ কোটির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২০০ কোটি যুক্ত হয়ে এই খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ২২৬ কোটি টাকা। শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের যে উল্লম্ফন ঘটেছে, তার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার এই গবেষণা বরাদ্দের চিত্র বেশ বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, সরকার একদিকে গবেষণায় জোর দেওয়ার কথা বলছে। অন্যদিকে, মানসম্মত গবেষণার জন্য যে বরাদ্দ দরকার, সেটি দিচ্ছে না। দেশ ও জনকল্যাণমুখী গবেষণার জন্য নিশ্চিতভাবেই বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে মানসম্মত গবেষণার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, গবেষণার মান বাড়ানোর সঙ্গে বরাদ্দ বৃদ্ধির কো-রিলেশন আছে। এখানে অনেক বিনিয়োগের প্রয়োজন, টিম ওয়ার্ক দরকার। অথচ আমরা নিজস্ব তহবিলে কাজ করছি। বিদেশে কিন্তু গবেষণা খাতে ভালো তহবিল দেওয়া হয়। আমাদের দেশে গবেষণার জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা বাস্তবতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। এজন্য কার্যকরী (ইমপ্যাক্টফুল) গবেষণা সম্ভব হচ্ছে না।

জানতে চাইলে ইউজিসির রিসার্চ গ্রান্টস অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ড ডিভিশন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক সাইদুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাজেট সরকার নির্ধারণ করে। ইউজিসির এখানে কোনো ভূমিকা নেই। আমরা বিভিন্ন ফোরামে বলে আসছি, গবেষণা খাতে বরাদ্দ অপ্রতুল। আশা করছি, সামনে গবেষণাসহ পুরো শিক্ষা খাতেই সরকার বরাদ্দ বৃদ্ধি করবে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত