মানিকগঞ্জে ভেজাল সার বিক্রি, ৭ কোম্পানির পণ্য সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মানিকগঞ্জ

ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

সার নিয়ে আলোচনার মধ্যে মানিকগঞ্জের বাজারে বিভিন্ন রকম সারে ভেজাল পেয়েছে কৃষি বিভাগ। কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে বাজারের ১৬টি প্যাকেটজাত কৃষিপণ্যের (সার ও কীটনাশক) নমুনা পরীক্ষা করে ৭টি কোম্পানির সারে ভেজাল ধরা পড়েছে। এই সার জমিতে ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন বঞ্চিত হচ্ছেন চাষিরা।

জেলার সাটুরিয়া উপজেলা এবং এই অঞ্চলে ৩৭ হাজারেরও বেশি কৃষক ভেজাল সার ও কীটনাশক কোম্পানির প্রতারণার শিকার হয়েছে। এই অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও ডিলারদের বাজার থেকে আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে এসব পণ্য সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। সেই সঙ্গে প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা।

এদিকে চাষিদের অভিযোগ, সাটুরিয়ায় এসব প্যাকেটজাত ভেজাল সার বিক্রির জন্য কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করেছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা (ব্লক সুপারভাইজার)। এছাড়া সরকার নির্ধারিত সার ও ও কীটনাশকের দোকানগুলোতেও মিলছে ভুঁইফোঁড় কোম্পানির ভেজাল সার।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জমিতে সার দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফলন না পেয়ে উপজেলা কৃষি কার্যালয়ে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী একাধিক চাষি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর উপজেলার বিভিন্ন বাজার থেকে ১৬টি নমুনা সংগ্রহ করে কৃষি বিভাগ। উপজেলার চর তিল্লী গ্রাম, কুষ্টিয়া গ্রাম, চর সাটুরিয়া, বালিয়া বাজারসহ ১০টি দোকান থেকে এই নমুন সংগ্রহ করা হয়। পরে তা পরীক্ষার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্ট গবেষণা কেন্দ্রে পাঠানো হয়। চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার ফলাফল হাতে পায় কৃষি বিভাগ। এতে ৭টি কোম্পানির সারে স্পষ্ট ভেজাল পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেজাল সার উৎপাদনকারী কোম্পানি ও প্যাকেটজাত সারগুলোর মধ্যে আছে ব্যাবিলন এগ্রো অ্যান্ড ডেইরি লিমিটেডের ব্যাবিলন বোরন, ব্যাবিলন এগ্রিসাইন্সের ব্যাবিলন জিংক (জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট), নিড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের নিড সলুবোর, এগ্রো মাইন লিমিটেডের সলিড জিংক মনো, হোসেন এন্টারপ্রাইজের বিজয় জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট, ভেলকো এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের মনো জিংক (জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট), গ্রীন-বাংলা এগ্রোভেট লিমিটেডের জিবি জিংক (মনোহাইড্রেট)। দীর্ঘ গবেষণায় এসব পণ্যের কার্যকারিতা কম প্রমাণিত হওয়ায় ভেজাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

উপজেলার কামতা এলাকার চাষি রশিদ বলেন, আমি বেশ কয়েক বছর ধরে সবজি চাষ করছি। গত বছর কিছু প্যাকেটজাত সার ব্যবহার করায় খেতের ক্ষতি হয়। বাজারে চমকপ্রদ মোড়কে এ ধরনের সার পাওয়া যায়। যদিও ব্লক সুপারভাইজারসহ দোকানিরা এসব সার কিনতে উৎসাহ জোগান, তবে ওই সার ব্যবহারে কোনো লাভ হয় না।

হরগজ ইউনিয়নের চাষি নূরুল হক বলেন, এই ইউনিয়নে প্রথম দিক থেকেই আমি কপি চাষ করি। তখনকার সারগুলো ভালো কাজ করত। কিন্তু বর্তমানে বাজারের প্রচলিত সারগুলো কৃষকের কোনো উপকারে আসছে না। আমার দেখাদেখি কপি ও আলু চাষ করা অনেকে ভেজাল সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।

উপজেলার একাধিক এলাকার চাষিরা অভিযোগ করেন, সবজির ফলন ভালো করতে কোন সার ব্যবহার করা উচিত— এমন পরামর্শ চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্লক সুপারভাইজাররা নির্দিষ্ট কোনো দোকানে যাওয়ার কথা বলে দেন। কৃষকরা সরল বিশ্বাসে সেই দোকানে গেলে দোকানিরা প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির সারের পরিবর্তে নিম্নমানের সার ধরিয়ে দেন। ওই সার ব্যবহার করে ভালো ফলনের বদলে উল্টো বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এর সঙ্গে ব্লক সুপারভাইজার ও দোকানিরা জড়িত বলেও তারা মন্তব্য করেন।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে ধানকোড়া ইউনিয়নের ১ ও ২ নম্বর ব্লকের সুপারভাইজার আবুল কালাম আজাদ ও নাজমুল কামাল বলেন, নিম্নমানের সার ব্যবহারের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করার অভিযোগটি ভিত্তিহীন। তারা সব সময় নামিদামি কোম্পানির প্যাকেটজাত সার ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

গ্রীন-বাংলা এগ্রোভেট লিমিটেডের বাজারজাতকরণ কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, ফসল খারাপ হওয়ার ব্যাপারে কৃষকদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ পাননি। তবে প্রক্রিয়াজাতকরণে দেরি হলে বা দীর্ঘ সময় মজুত থাকলে জিংকের মাত্রা কিছুটা কমে যেতে পারে। তিনি দাবি করেন, এখনকার পণ্যগুলোতে এই মাত্রা ঠিক আছে। এছাড়া বাজার থেকে তাঁদের পণ্য প্রত্যাহারের কোনো চিঠি বা নোটিশ এখন পর্যন্ত পাননি।

আরেক প্রতিষ্ঠান নিড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিক্রয় ও বিপণন কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন মোবাইল ফোনে বলেন, সার জাতীয় পণ্যের পরিবহন বা প্যাকেটজাত করার কারণে ফসল উপাদান সামান্য কম হতে পারে। দীর্ঘদিন গুদামজাত বা খোলা অবস্থায় রাখলে কিছু ক্ষেত্রে মান কমতে পারে। তবে বর্তমানে আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট শতভাগ নিশ্চিত করেই খালাস করা হয়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া তাবাসুম বলেন, সার ব্যবস্থাপনা আইনে (২০০৬) ভেজাল সার এবং এ ধরনের কৃষিপণ্য মজুত বা ক্রয়-বিক্রয় করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ভেজাল প্রমাণিত হওয়ার পর অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়ে আজ বুধবার থেকে জরুরি ভিত্তিতে বাজারে তাদের পণ্য সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাটুরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম বলেন, কৃষকের সরলতার সুযোগ নিয়ে কোনো প্রতারণার সুযোগ নাই। কোনো ডিলার এই ভেজাল সার ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। কৃষকের স্বার্থকে সব সময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত