প্রেমের নাটক-সিনেমা বন্ধে রিট: নৈতিকতার পাহারাদার কে

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ৫৩
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে। সমাজে মূল্যবোধের সংকট আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই উদ্বেগ থেকে দেশের নাটক-সিনেমা থেকে প্রেমের গল্প বাদ দেওয়ার দাবি উঠলে প্রশ্নটি আর শুধু একটি রিটের থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে—প্রেমের গল্প কি সত্যিই তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ? আর কোনো কনটেন্টকে ‘নৈতিক’ বা ‘অনৈতিক’ বলে নির্ধারণ করার ক্ষমতা কার?

প্রেমের নাটক বা সিনেমা দেখে তরুণরা পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমন দাবির পেছনে কী গবেষণা আছে? কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য কি আছে, যা প্রমাণ করে প্রেমের গল্পই তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রধান কারণ? যদি এমন প্রমাণ না থাকে, তাহলে এত বড় একটি সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার ভিত্তি কী?

একজন তরুণ প্রেমের গল্প দেখে প্রেমে পড়তে পারে। কিন্তু সে কীভাবে জীবনকে দেখবে, কী সিদ্ধান্ত নেবে, তার পেছনে শুধু একটি নাটক বা সিনেমা কাজ করে না। পরিবার, শিক্ষা, বন্ধুবান্ধব, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধ—সবকিছু মিলেই একজন মানুষের চিন্তা ও আচরণ তৈরি হয়। তাই কোনো একটি বিনোদনমাধ্যমকে তরুণদের নৈতিক আচরণের প্রধান নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন সরলীকরণ, তেমনি তার ভিত্তিতে সব প্রেমের নাটক-সিনেমা বন্ধের দাবি আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।

এই সরলীকরণের আরেকটি উদাহরণ পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে সিনেমায় দেখানোর বিষয়টি। কোনো সিনেমায় এমন সম্পর্ক দেখানো হলেই যে সিনেমাটি সেই সম্পর্ককে বৈধতা দিচ্ছে, এমন সমীকরণ করা যায় না। সিনেমা মানুষের জীবনের ভালো-মন্দ, নৈতিকতা-অনৈতিকতা, আকাঙ্ক্ষা ও তার পরিণতি—সবই দেখাতে পারে। একজন খুনি চরিত্র সিনেমায় থাকলে সিনেমা খুনকে সমর্থন করে না। দুর্নীতিবাজ চরিত্র থাকলেও সেটি দুর্নীতির বৈধতা দেয় না। বরং অনেক সময় এসব গল্পের মধ্য দিয়েই সমাজের অসংগতি ও মানুষের আচরণের পরিণতি সামনে আসে।

তাহলে প্রেমের গল্প কেন বাদ দিতে হবে? প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি, কনটেন্ট মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলে—এ নিয়ে গবেষণার ফলও এত সরল নয়। কিছু গবেষণায় সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ইতিবাচক সামাজিক আচরণ তুলে ধরা কনটেন্টের সঙ্গে মানুষের সহযোগিতামূলক আচরণ ও সহমর্মিতা বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ কনটেন্টের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে হলে শুধু ‘প্রেম আছে কি নেই’ তা নয়, কনটেন্টটি কী ধরনের আচরণ ও মূল্যবোধ তুলে ধরছে, সেটিও দেখতে হবে।

বর্তমান পৃথিবীর বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। চারদিকে যুদ্ধ, সংঘাত, সহিংসতা, হানাহানি, ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার খবর। এমন সময়ে মানুষের জীবনে প্রেম, ভালোবাসা, সম্পর্ক, মমতা ও সহমর্মিতার গল্পের প্রয়োজনকে নিছক নৈতিক অবক্ষয়ের উৎস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিনোদনের ভেতর দিয়ে কীভাবে মানবিকতা ও ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করা যায়।

এখানেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি আসে। কে ঠিক করবেন কোন গল্প ‘নৈতিক’ এবং কোন গল্প ‘অনৈতিক’?

আজ একজনের কাছে প্রেমের গল্প সমাজের জন্য ক্ষতিকর মনে হতে পারে। ধরি আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ করে প্রেমভিত্তিক নাটক-সিনেমা বন্ধ করার নির্দেশ দিল। আগামী দিনে অন্য কেউ অন্য কোনো কনটেন্টকে ‘নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকর’ দাবি করে আদালতে যেতে পারেন। তখন রাজনৈতিক গল্প, ধর্মীয় গল্প, সামাজিক ব্যঙ্গ, যৌনতা, বিবাহ, বিচ্ছেদ কিংবা কোনো নির্দিষ্ট জীবনযাপন নিয়েও নিষেধাজ্ঞার দাবি উঠতে পারে।

এমন নজির তৈরি হওয়ার বিষয়টি তাই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ প্রশ্নটি শুধু প্রেমের সিনেমা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি কোনো নির্দিষ্ট নৈতিকতার সংজ্ঞা ধরে শিল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে?

তরুণদের জন্য বিজ্ঞান, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ বা শিক্ষামূলক সিনেমা চাইলে সেগুলোর জন্য বিনিয়োগ ও প্রণোদনা বাড়ানো যেতে পারে। নতুন নির্মাতাদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। শিশু-কিশোরদের জন্য মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি করা যেতে পারে। ভালো কনটেন্ট তৈরি করার জন্য অন্য কনটেন্ট নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। একটি বিষয় পছন্দ হচ্ছে বলে অন্য একটি বিষয়কে নিষিদ্ধ করার দাবি সুস্থ সাংস্কৃতিক চিন্তার পরিচয় হতে পারে না।

বরং আমাদের তরুণদের এতটা অসহায় ভাবা উচিত নয় যে প্রেমের নাটক দেখলেই তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে। তরুণদের হাতে কী তুলে দিতে হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর সেন্সরশিপ নয়। এর জন্য দরকার শিক্ষা, সচেতনতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং ভালো বিকল্প তৈরি করা।

অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট নাটক বা সিনেমায় আইনবিরোধী কিছু থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। অশ্লীলতা, শিশুদের জন্য অনুপযুক্ত কনটেন্ট বা অন্য কোনো আইন লঙ্ঘনের বিষয় থাকলে সেটি নির্দিষ্টভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু ‘প্রেমকে’ সমস্যার মূল হিসেবে চিহ্নিত করে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া একেবারেই ভিন্ন বিষয়। সেখানে একটি নির্দিষ্ট আইনভঙ্গের প্রশ্ন নেই; আছে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক পছন্দকে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

আর এই রিটের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, ব্যক্তিগত পছন্দ আর জনস্বার্থের মধ্যে সীমারেখাটি কোথায়?

সংশ্লিষ্ট আইনজীবী নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোমান্টিক সিনেমা দেখা বা সেগুলো নিয়ে ইতিবাচক পোস্ট করেছেন—এমন তথ্য সামনে এসেছে। এটি তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার বিষয় নয়। বরং প্রশ্নটি নীতির সামঞ্জস্যের। একজন মানুষ নিজের জন্য যে স্বাধীনতাকে স্বাভাবিক মনে করেন, অন্যদের জন্য সেই একই স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার দাবি করলে তাঁর অবস্থানের নৈতিক সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ আদালতে গিয়ে কোনো কনটেন্ট বন্ধের দাবি করা মানে শুধু নিজের অপছন্দ প্রকাশ করা নয়। এর অর্থ হলো অন্য মানুষের দেখার অধিকার, নির্মাতার সৃষ্টিশীল স্বাধীনতা এবং একটি শিল্পমাধ্যমের বিষয়বস্তু নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের দাবি তোলা।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। শুধু ব্যক্তিগত নৈতিক পছন্দকে জনস্বার্থের প্রশ্নে পরিণত করার জায়গা আদালত নয়। সেখানে বাস্তব, প্রমাণযোগ্য ক্ষতি এবং তার আইনগত ভিত্তি থাকতে হয়। কোনো কনটেন্ট ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করা আর সেটিকে মানুষের জন্য নিষিদ্ধ করার মতো ক্ষতিকর হিসেবে প্রমাণ করা এক কথা নয়।

বাংলাদেশের নাটক-সিনেমায় প্রেম থাকবে, রাজনীতি থাকবে, ইতিহাস থাকবে, যুদ্ধ থাকবে, পরিবার থাকবে, অপরাধ থাকবে, মানুষের সুখ-দুঃখ থাকবে। এগুলোই মানুষের জীবন। শিল্পকে সমাজের একটি নির্দিষ্ট নৈতিক ছাঁচে ঢুকিয়ে দিলে শিল্প আর সমাজের আয়না থাকে না। হয়ে যায় কোন নৈতিকতার প্রচার।

কোন গল্প মানুষ দেখবে, কোন গল্প দেখবে না—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত দর্শকেরও থাকা উচিত। রাষ্ট্রের কাজ মানুষের হয়ে সব গল্পের নৈতিকতা নির্ধারণ করা নয়। তার কাজ নাগরিকের অধিকার, আইনের শাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও যোগাযোগ পেশাজীবী

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত