মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার ‘পাতে টান’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ৪৫
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ইরান যুদ্ধের প্রভাব ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাজারে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপাল—এই চার দেশে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বসবাস, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের আগে থেকেই এই অঞ্চল আমদানী জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। এর বড় অংশই আসত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরিধি বাড়া এবং একের পর এক সরবরাহ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে।

উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর দক্ষিণ এশিয়ার নির্ভরতা

ভারত তাদের ব্যবহৃত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। যুদ্ধের আগে ইরাক, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো ছিল ভারতের প্রধান সরবরাহকারী। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ভারতের জ্বালানি সরবরাহের নেটওয়ার্ক অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। রাশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা থেকেও ভারতে তেল আসে।

পাকিস্তানও আমদানী জ্বালানির ওপর, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তাদের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী দেশ।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করলেও স্থানীয় চাহিদা মেটাতে আমদানীকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করছে।

নেপালের কোনো সমুদ্রবন্দর নেই। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তাদের কোনো সরাসরি অপরিশোধিত তেল বা এলএনজি আমদানির সুযোগ নেই। পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন এবং এলপিজিসহ প্রায় সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল দেশটি। ভারতের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বা খরচ বাড়লে তা সরাসরি নেপালের জ্বালানি বাজার ও দামের ওপর প্রভাব ফেলে।

পরিমাণের দিক থেকে ভারত সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হাতে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প খুব কম রয়েছে। নেপালের নির্ভরতা এক ধাপ পরোক্ষ হলেও ভারতের সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হলে তা দ্রুত নেপালের বাজারে প্রভাব ফেলে।

সব সময়ের মতো এবারও সংকটের মূল ধাক্কা সইতে হচ্ছে গরিব মানুষকে।

পরিবারে ছড়িয়ে পড়া অর্থনৈতিক চাপ

দুই সন্তানের মা আসমা বেগম ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। থালাবাসন মাজা ও ঘরের অন্য কাজ করে মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা পান। তিনি বলেন, ‘ধনী লোকেরাও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে আছেন। তারা গৃহকর্মী না রেখে নিজেরাই ঘরের কাজ সামলানোর চেষ্টা করছেন।’

আসমার মতে, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ার চাপ এক পরিবার থেকে অন্য পরিবারে ছড়িয়ে পড়ছে। বাড়তি খরচের মুখে পড়া পরিবারগুলো খরচ কমাচ্ছে। এর ফলে তাঁর মতো মানুষের আয়ের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘সবার একই সমস্যা। আমরা সবাই কাজ করেই বেঁচে আছি।’

‘পুরোপুরি অসহায় ’

৪৫ বছর বয়সী সাজিদা জিবরান পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী করাচিতে গৃহকর্মীর কাজ করেন।

জিবরান জানান, তাঁর বাড়ির ভাড়া ১৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি থেকে বেড়ে গত মাসে ২৫ হাজার রুপি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের আগে সবাই খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারত। আমি মাংস ও মুরগি কিনতে পারতাম। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শাকসবজির দামও এত বেড়ে গেছে যে কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

জিবরান আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আগে যা ১ হাজার ৫০০ রুপি আসত, এখন তা বেড়ে ৫ হাজার রুপিতে পৌঁছেছে। গ্যাসের বিলও সর্বনিম্ন ২ হাজার রুপি।’

তিনি বলেন, ‘ভাতের খরচ জোগাতে বাধ্য হয়ে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছে। তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পেরে যখন ঘরে বসে থাকে, রাতে আমার ঘুম হয় না।’

‘সবকিছু সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে’

বালেন্দ্র সিং ভারতের নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। ৬৭ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ নয়ডার একটি ছোট ঘরে পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে থাকেন। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর খরচ কমাতে পরিবারের কিছু সদস্যকে লখনৌয়ের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হন।

সিং বলেন, ‘বড় শহরে এতগুলো মানুষের খাওয়ার খরচ জোগানোর সামর্থ্য আমার নেই। মুদ্রাস্ফীতি আমাদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়ছে, অথচ আমাদের বেতন একই রয়ে গেছে।’

তিনি জানান, ‘রিকশার ভাড়াও বেড়েছে। ১০ টাকা বাড়লেও তা আমাদের জন্য বেশি। এতে কাজে আসা-যাওয়ায় মাসে প্রায় ৬০০ টাকা খরচ বেড়েছে।’

সিং জানান, যুদ্ধের শুরুতে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে তিনি ও তাঁর প্রতিবেশীরা পুরোনো কাঠভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহার শুরু করেছিলেন। ওই ধোঁয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেই বাধ্য হয়ে ব্যবহার করছেন।

সিং প্রশ্ন তোলেন, ‘আমার সন্তানেরা তো ইরানে আক্রমণ করেনি। আমরা এই যুদ্ধ সমর্থনও করি না। অথচ এই সংঘাতের বড় বোঝা আমাদের ঘাড়ে চেপেছে।’

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত