বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য

আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, পরিস্থিতি আরও জটিল

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ২০: ১০
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ও গতি দৃশ্যমানভাবেই শ্লথ হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতিও সন্তোষজনক নয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মতো দু-একটি সূচক হয়তো কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে, কিন্তু অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ একেবারেই স্থবির। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রবৃদ্ধির মাত্রা এবং যে ধরনের প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া জরুরি—তা হচ্ছে না। কর্মসংস্থান-নিবিড় খাতগুলো একপ্রকার স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২৬ সালের মধ্যে ১৭ লাখ মানুষের দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ নানা কারণে এ বছর হয়তো মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্য অবস্থা কাটাতে পারবে। বাকি ১২ লাখ মানুষ পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে না। পিপিআরসি’র গবেষণা ও আমাদের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অবশ্য বলছে, পরিস্থিতি আরও জটিল। দারিদ্র্য কমা তো দূরের কথা, বরং তা বাড়ার আশঙ্কা। প্রবৃদ্ধির সংখ্যাগত মাত্রা যাই থাকুক না কেন, তা দারিদ্র্য বিমোচন ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

অর্থনীতির স্থবিরতার পেছনে বৈশ্বিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাও সমানভাবে দায়ী। আমাদের জ্বালানি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা বড় সংকট তৈরি করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রাষ্ট্রকে দূরদর্শী ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। জোড়াতালি দিয়ে এই খাত চলতে পারে না।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এ বছর ছয় লাখ মানুষের কাজ হারানোর শঙ্কার কথা বলা হয়েছে। আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া নতুন কর্মসংস্থানের ১০টির মধ্যে সাতটিই তৈরি হয়েছে কম উৎপাদনশীল কৃষি খাতে। কর্মসংস্থানের জায়গায় পরিসংখ্যান ও আমাদের দেখা বাস্তব চিত্রও এমনই। শিল্প খাতে কর্মসংস্থান আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। সেবা খাতে কম উৎপাদনশীল সেকশনই বেড়েছে। কৃষি খাতে শ্রমশক্তির যে বিন্যাস আমরা দেখছি, তা মূলত একধরনের ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী’ বা টিকে থাকার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এটি কোনো কাঠামোগত অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়।

অর্থনীতির এই স্থবিরতার পেছনে বৈশ্বিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাও সমানভাবে দায়ী। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে—এটি সত্য। কিন্তু আমাদের জ্বালানি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এর চেয়েও বড় সংকট তৈরি করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রাষ্ট্রকে দূরদর্শী ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। জোড়াতালি দিয়ে এই খাত চলতে পারে না।

সম্প্রতি আমরা উত্তরবঙ্গের রংপুর, বগুড়া, নওগাঁ ও রাজশাহী অঞ্চল ঘুরে দেখেছি। ঢাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আলোচনার সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার বিস্তর ফারাক। তৃণমূলের উদ্যমী মানুষেরা নানা ধরনের উদ্ভাবনী পরিকল্পনা নিয়ে বসে আছেন, কিন্তু তারা পদে পদে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার তো আছেই, তার চেয়ে বড় বাধা হলো ‘প্রসেস বার্ডেন’ বা প্রক্রিয়াগত হয়রানি। উচ্চ সুদহার ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির জোড়া ধাক্কায় তৃণমূলের উদ্যোগগুলো থমকে যাচ্ছে। তার ওপর গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট তো রয়েছেই।

সরকারের অনুৎপাদনশীল ব্যয় বিশাল আকার ধারণ করেছে। সরকারের আকার কমানো এখন সময়ের দাবি। এমন অনেক সরকারি দপ্তর রয়েছে, যেগুলোর কোনো কার্যকারিতা নেই। প্রতিবছর সাধারণ প্রশাসনিক ক্যাডারে জনবল বেড়ে চলেছে, অথচ স্বাস্থ্য খাতে ডাক্তারের তীব্র সংকট; শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।

বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মাথাব্যথা হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। টানা কয়েক বছর ধরে দেশে ৯ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এর চেয়েও বড় সংকট হলো মানুষের আয় না বাড়া। আমাদের প্রকৃত মজুরি চরমভাবে স্থবির, বরং তা ক্রমশ নিম্নমুখী। আয়ের এই স্থবিরতা মূল্যস্ফীতির বোঝাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও অসহনীয় করে তুলছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো জাদুর কাঠি নেই। এর জন্য বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। পরিবহন খাতসহ সাপ্লাই চেইনে চাঁদাবাজির মতো অ-অর্থনৈতিক যে বাধাগুলো রয়েছে, সেগুলো কঠোরভাবে দমন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের মানি সাপ্লাই বা ব্যয় নীতির দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

সরকারের অনুৎপাদনশীল ব্যয় বিশাল আকার ধারণ করেছে। সরকারের আকার কমানো এখন সময়ের দাবি। এমন অনেক সরকারি দপ্তর রয়েছে, যেগুলোর কোনো কার্যকারিতা নেই। প্রতিবছর সাধারণ প্রশাসনিক ক্যাডারে জনবল বেড়ে চলেছে, অথচ স্বাস্থ্য খাতে ডাক্তারের তীব্র সংকট; শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, ১৩৭টির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা রয়েছে, যার মধ্যে অল্প কিছু সংখ্যক লাভজনক। বাকিগুলো বছরের পর বছর লোকসান গুনে রাষ্ট্রের ‘শ্বেতহস্তী’তে পরিণত হয়েছে। যেমন, একসময় রাজশাহীতে রেশম শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও এখন ‘সেরিকালচার বোর্ড’ কঠিন সময় পার করছে। হাওর উন্নয়ন বোর্ডসহ এমন অনেক অনুৎপাদনশীল খাতে রাষ্ট্রের বিপুল ব্যয় হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে হলে এই অনুৎপাদনশীল ব্যয় অবশ্যই কমাতে হবে।

তৃণমূলের উদ্যমী মানুষেরা নানা ধরনের উদ্ভাবনী পরিকল্পনা নিয়ে বসে আছেন, কিন্তু তারা পদে পদে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার তো আছেই, তার চেয়ে বড় বাধা হলো ‘প্রসেস বার্ডেন’ বা প্রক্রিয়াগত হয়রানি। উচ্চ সুদহার ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির জোড়া ধাক্কায় তৃণমূলের উদ্যোগগুলো থমকে যাচ্ছে।

সরকারকে এখন স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল ঢেলে সাজাতে হবে। কথায় ও কাজে মিল থাকাটা জরুরি। আমরা প্রায়ই দেখি, নীতিনির্ধারকদের অতিকথন আছে, কিন্তু কাজের বেলায় ‘ফলোআপ’ বা বাস্তবায়ন নেই।

দরিদ্র মানুষের সুরক্ষায় সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ যেসব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে, সেগুলোর কার্যকারিতা মাঠপর্যায়ে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এসব কর্মসূচির নকশা কতটা শক্তিশালী এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, তা যাচাই করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে বেরিয়ে এসে নির্মোহভাবে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করতে হবে। অর্থনীতির কাঠামোগত সংকট ও দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে বহুমুখী ও জরুরি পদক্ষেপ দরকার।

  • ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত