বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্প: স্বনির্ভরতা, সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ০৮
সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা ও নিরাপত্তা সুসংহত রাখতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। ছবি: উইকিপিডিয়া
সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা ও নিরাপত্তা সুসংহত রাখতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। ছবি: উইকিপিডিয়া

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা ও নিরাপত্তা সুসংহত রাখতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। সামরিক শক্তিমত্তা গড়ে ওঠে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দেশীয় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে সমরাস্ত্র কেনাকাটায় বাংলাদেশ আমদানিকারক হিসেবে বিবেচিত হলেও, একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজের ভাবমূর্তি আমূল পাল্টে ফেলার পথে হাঁটছে ঢাকা।

২০০৯ সালে প্রবর্তিত দীর্ঘমেয়াদী সামরিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর মূল লক্ষ্য কেবল বাহিনীর অবকাঠামোগত বিস্তার বা সরঞ্জাম কেনায় আবদ্ধ নয়। এর অন্যতম মূল ভিত্তি হলো বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প পুনর্গঠন ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করা। এই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের (জেটিএমএল) ৫৪ দশমিক ৯৯ একর জমি বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরী (বিওএফ) সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এই জমি হস্তান্তর চুক্তি কেবল একটি সরকারি প্রশাসনিক বা ভূমি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ঘটনা নয়; বরং এটি দেশের একমাত্র জাতীয় সমরাস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিওএফ-এর উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের স্পষ্ট প্রতিফলন। দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যাওয়ার এই সময়ে বাংলাদেশের কৌশলগত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী।

জমি হস্তান্তর চুক্তি: ঘটনা ও প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা

২৭ আগস্ট চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে অনুষ্ঠিত এই হস্তান্তর অনুষ্ঠানটি ছিল সামরিক ও অসামরিক প্রশাসনের এক অভূতপূর্ব সমন্বয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লে. জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম; বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এবং সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীসহ উভয় খাতের উচ্চপদস্থ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তারা।

অনুষ্ঠানে বিটিএমসির পক্ষে চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম জাহিদ হাসান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে মিলিটারি এস্টেট অফিসার (ইস্টার্ন সার্কেল, চট্টগ্রাম) সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।

উৎপাদন ক্ষমতার বিস্তার: বিওএফ-এর আওতাভুক্ত এলাকা বিস্তারের ফলে মাঝারি ও ভারী আধুনিক গোলাবারুদ এবং ক্ষুদ্র সমরাস্ত্রের নতুন উৎপাদন লাইন চালু করা সহজ হবে। বর্তমানে বিওএফ টাইপ-৫৬ অ্যাসল্ট রাইফেল বা ৯ মিমি পিস্তলের মতো কিছু স্মল আর্মস এবং কিছু নির্দিষ্ট ক্যালিবারের গোলা উৎপাদনে সক্ষম। নতুন জমি ও অবকাঠামো পাওয়ার ফলে এখন ১২০ মিমি আর্টলারি শেল, ১০৫ মিমি ট্যাংকের গোলা, ৮১/১২০ মিমি মর্টার শেল কিংবা ড্রোন-নির্ভর প্রিসিশন গাইডেড গোলাবারুদের মতো জটিল ও ভারী সামরিক সরঞ্জামের জন্য পৃথক এবং আধুনিক অ্যাসেম্বলি লাইন স্থাপন করা সম্ভব হবে।

আমদানিনির্ভরতা হ্রাস: জাতীয় নিরাপত্তার সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রস্তুতকৃত পণ্যের মাধ্যমে চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনী বা পুলিশ ও আনসারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য মাঝারি ক্যালিবারের গোলাবারুদ, নাইট ভিশন ইকুইপমেন্ট কিংবা টিয়ার গ্যাস শেলের জন্য চীন, রাশিয়া বা অন্যকোন দেশের সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিওএফ-এর সম্প্রসারণের ফলে এসব গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সামগ্রী নিজস্ব কারখানাতেই পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হবে, যার ফলে যুদ্ধকালীন বা জরুরি সংকটে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটলেও দেশের সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

জাতীয় স্বার্থে অব্যবহৃত সম্পদের পুনর্ব্যবহার: বিটিএমসির বন্ধ থাকা শিল্প জমিকে জাতীয় নিরাপত্তার মতো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে স্থানান্তর করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে। এর আগেও চরম লোকসানে থাকা এবং বন্ধের উপক্রম হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ‘খুলনা শিপইয়ার্ড’ সংস্থাটিকে ১৯৯৯ সালে অনুরূপভাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। অব্যবহৃত ও অকার্যকর এই সম্পদটি হস্তান্তরের পর এটি কেবল লাভজনক প্রতিষ্ঠানেই পরিণত হয়নি, বরং বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্যাট্রোল ভেসেল, লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট এবং বাণিজ্যিক জাহাজের সফল নির্মাতা হিসেবে কাজ করছে। একই কথা চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড, ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস নারায়ণগঞ্জ এবং বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট লিমিটেড-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এসব প্রতিষ্ঠানে দেশীয় প্রযুক্তিতে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ ও ফ্রিগেট নির্মাণসহ মেকানিক্যাল স্পেয়ার পার্টস, ডাই-মোল্ড, কনসার্টিনা ওয়্যার, ইরিগেশন পাইপসহ বিভিন্ন শিল্প ও সামরিক প্রকৌশল পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে।

একটি উদীয়মান কৌশলগত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্প খাতকে কিছু প্রাচীন ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। টেকসই সামরিক উৎপাদনে উন্নীত হতে হলে নিচের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত ও নিরসন করা জরুরি:

অতিরিক্ত বৈদেশিক নির্ভরতা

আমাদের সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘকাল ধরে চীন, রাশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য বৈদেশিক সরবরাহকারীদের ওপর সরাসরি আমদানির জন্য নির্ভরশীল। মাঝারি ও ভারী আর্টিলারি, আধুনিক ট্যাংক, সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভর করে। এই অতি-নির্ভরশীলতা সংকটকালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

প্রযুক্তি ও উচ্চতর গবেষণার ঘাটতি

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ডাইনামিক ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার ওয়ারফেয়ার, গাইডেন্স সিস্টেম ও এভিয়েশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু আমাদের সামরিক খাতে উচ্চতর প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণার সংস্কৃতি এখনও শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি স্থানান্তরের নমনীয় শর্ত ছাড়া স্বনির্ভরতা অর্জন কঠিন।

অবকাঠামোগত ও উৎপাদন ক্ষমতার সীমা

গাজীপুরস্থ বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরী দেশের একমাত্র সমরাস্ত্র কারখানা হওয়ায় দেশের ক্রমবর্ধমান স্থল ও নৌ বাহিনীর সামগ্রিক চাহিদা একা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রায় ২৯৪ একর জমির উপরে স্থাপিত এই কারাখানাটি পর্যাপ্ত স্থান ও অবকাঠামোর অভাবে এতদিন আধুনিক নতুন উৎপাদন ইউনিট চালুর সুযোগ পাচ্ছিল না।

বাংলাদেশের প্রচলিত আমদানি-রপ্তানি নীতিমালা এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত সংবিধি (যেমন: ডিফেন্স প্রকিউরমেন্ট রুলস) মূলত বিদেশি সামরিক সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর কেনাকাটাকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি। বিদ্যমান ‘রপ্তানি নীতি’র সংবেদনশীল ও সংরক্ষিত (নিষিদ্ধ) পণ্যের তালিকায় প্রতিরক্ষা খাত বা সমরাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত থাকায় দেশীয় সামরিক সরঞ্জাম অবাধে আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যের সুযোগ পাচ্ছে না। যদিও ১৯৮৪ সালে ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাংলাদেশ থেকে সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ রপ্তানি করে প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্জিত হয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী, স্থায়ী ও উদার রপ্তানি নীতিমালার অভাবে সেই আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এরফলে দেশীয় বেসরকারি খাতের যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ যেমন রুদ্ধ হয়েছে, তেমনি দেশীয় চাহিদার অতিরিক্ত সমরাস্ত্র বিদেশে বিক্রি করে বৈশ্বিক সামরিক বাণিজ্যে প্রবেশের পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখের অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান তাঁর বক্তব্যে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে বহির্বিশ্বে প্রসারিত করা এবং সামরিক-বাণিজ্যিক স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী ও উদার ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি নীতিমালা’ প্রণয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে বিওএফ-এর জমি হস্তান্তর কেবল ভূমি ব্যবস্থাপনার সাধারণ কোনো সিদ্ধান্ত নয়; এটি ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর সাথে এই ধরনের সম্প্রসারণমূলক উদ্যোগের সমন্বয় দেশকে একটি আধুনিক, চৌকস ও পরনির্ভরতাহীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। বাণিজ্যিক নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কার, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের সৃজনশীলতাকে সামরিক শিল্পে যুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ অচিরেই সরঞ্জাম ক্রেতার ভূমিকা থেকে বের হয়ে আসবে।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত