হাসান মামুন

ঈদুল ফিতর ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আসলে শুরু হয় রোজা শুরুর আগেই। আমদানিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে বেসরকারি খাত। খাদ্যসহ কিছু পণ্যসামগ্রী আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয় আরও আগে। সরকার প্রয়োজনে কর-শুল্ক ছাড় দেয় ওইসব পণ্যের বাজার শান্ত রাখতে। আমদানিতে জড়িয়ে পড়ে ব্যাংক খাত। এ খাতে ব্যবসা বাড়ে প্রবাসী আয় বেশি করে আসতে থাকার কারণেও।
ইরান যুদ্ধে নিকট ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়বে, বলা মুশকিল। তবে এবারও ঈদ সামনে রেখে ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানো প্রবাসী আয় বিপুলভাবে বেড়ে যেতে দেখা গেল। ঈদের আগ দিয়ে অবশ্য উপসাগরীয় দেশগুলোয় যাওয়া আমাদের ভাইদের যুদ্ধের শিকার হওয়া এবং তাদের কারও কারও লাশ দেশে আসার বেদনাদায়ক খবর রয়েছে।
রোজার ঈদ সামনে রেখে বিভিন্ন খাতে অর্থের লেনদেন বিপুলভাবে বাড়ার একটা বড় কারণ প্রবাসী আয়ের প্রবাহ হঠাৎ বেড়ে যাওয়া। দেশের ভেতরকার বর্ধিত আয়, বিশেষত বোনাসের অর্থও আসে পণ্যবাজারে। আমাদের সিংহভাগ কর্মী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বলে অবশ্য গোটা জনশক্তির বেতন-বোনাস পাওয়ার চিত্রটি স্পষ্ট নয়।
প্রতি ঈদের আগে প্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টিই বেশি করে সামনে আসে। তাতে অনেকখানি চাপা পড়ে যায় অন্যান্য খাতের খবর। সংগঠিত বেসরকারি খাতেও অবশ্য ব্যবসা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। দীর্ঘ সময়ে বিনিয়োগ বাড়েনি; বিদ্যমান সক্ষমতার সদ্ব্যবহারও হতে পারছে না। তারপরও তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের তরফ থেকে বলা হয়েছে, তাদের সমিতিভুক্ত প্রায় শতভাগ প্রতিষ্ঠান বেতন-বোনাস দিয়েছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান নাকি চলতি মাসের বেতনের একাংশও দিয়েছে সদিচ্ছাস্বরূপ। আমরা অবশ্য জানতে চাইব সব খাতে কর্মরত সবার খবর। ঈদের পরও যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এটা জানাতে পারে।
প্রবাসী আয় ও ঈদের বোনাসের প্রায় পুরোটা যায় ভোগ্যপণ্য কেনায়। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্যপণ্য, পোশাক ও জুতার মতো সামগ্রী, ইলেকট্রনিকস ও ফার্নিচার। যাতায়াত আর ভ্রমণেও বিপুল অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। ঈদে যাত্রী পরিবহন নিয়ে প্রতিবার অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সীমিত পরিবহন অবকাঠামোর ওপর বিপুলভাবে বেড়ে ওঠা চাপ এটাকে প্রায় অনিবার্য করে তোলে। সড়ক ও নৌপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শেষতক এবারও রোধ করা যায়নি। অতিরিক্ত ভাড়া বাবদ কত অর্থ মানুষের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে, তার হিসাব কে করবে? এ অর্থ অবশ্য ঘুরেফিরে পণ্যবাজারকেই চাঙ্গা করবে। ঈদের বাজারে চাঁদাবাজি কি কম হয়েছে এবার? পুলিশকেও এসবে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
একটি নির্বাচিত সরকার সদ্য এসেছে বলে এবারকার পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন। আইন-শৃঙ্খলারও বড় অবনতি হয়নি। রেল, সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা পরিস্থিতি সহনীয় থাকে কিনা, সেটা অবশ্য দেখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও লোকে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে না ঈদের সময়টায়। মানুষও বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলে। রওনা দেয় এমনকি বাইকে, ট্রাকে। এ চিত্র কীভাবে বদলাবে, সেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মত নিতে পারে নতুন সরকার।
শহর-বন্দর তথা ‘গ্রোথ সেন্টার’গুলো থেকে কত মানুষ ঈদের সময় আপন গন্তব্যে যাত্রা করে, তার সঠিক তথ্য এখনও অজানা। কোরবানি ঈদে অবশ্য গ্রামাঞ্চল থেকেও অনেকে শহর-বন্দরে আসে পশু নিয়ে এবং মাংস কাটাকাটির কাজে যোগ দিতে। সেই ঈদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চিত্রটি কিছুটা ভিন্নও বটে। যেমন, পরিবহন খাতে তখন আমরা দেখি দ্বিমুখি চলাচল। পণ্যবাহী ট্রাকগুলো কোরবানির পশু পরিবহন করেও তখন অনেক আয় করে।
পরিবহন খাতে এবার অবশ্য কিছুটা আতংক ছড়িয়েছিল ইরান যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট। ঠিক ‘সংকট’ নয়; নতুন সরকার আসলে কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল আর তাতেই ছড়ায় আতংক। ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের ভিড় বাড়ে এবং বাড়ে অরাজকতা। সে কারণে রোজার শেষদিকে ভোগ্যপণ্য পরিবহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডিমসহ কিছু পণ্যের দাম বাড়ে প্রধানত পরিবহন সংকটে। পোলাওর চাল, গরু ও মুরগির মাংসের দামও ঈদের আগ দিয়ে বেড়ে গেছে। সেটা কতটা চাহিদার চাপে, বলা মুশকিল।
একটা সময় পর্যন্ত রোজার ঈদকে ‘সেমাই খাওয়ার ঈদ’ বলা হতো। ঈদের নামাজ পড়ে পরস্পরের বাসায় গিয়ে সেমাই খাওয়াটাই ছিল মুখ্য। নতুন পোশাকও সবার পক্ষে কেনা সম্ভবপর হয়ে উঠতো না। আর এখন শুধু পোশাক কেনা বাবদ কত অর্থের লেনদেন হয়, সেটা আলাদা করে বলা হচ্ছে। তবে এর বিশ্বাসযোগ্য হিসাবায়ন হয়নি।
ঈদের অর্থনীতি দ্রুত বড় হতে থাকলেও এ নিয়ে গবেষণা কম। ঈদে কত জাকাত-ফেতরা দেওয়া হয়, সে বিষয়েও ধারণামূলক বক্তব্যই কেবল দেওয়া হচ্ছে। বকশিস হিসেবেও হচ্ছে বিপুল অর্থের লেনদেন। পোশাকসহ পণ্যসামগ্রীর রূপেও বকশিস দেওয়া হচ্ছে।
ঈদে বিকশিত হচ্ছে গিফট সংস্কৃতি। অনলাইনেও গিফটের সামগ্রী জোগাড় করা হচ্ছে। বিত্তশালীদের অনেকে এ ক্ষেত্রে পাইকারি কেনাকাটাও করে থাকেন। নতুন এমপিদের অনেকে আশা করা যায় এবার সেটি বেশি করে করছেন। তাদের হয়ে করার লোকও কম থাকবে না। কেনাকাটার জন্য ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন নিশ্চয়ই বেড়ে গিয়েছিল। ‘তারল্য সংকট’ ছিল বলে অবশ্য খবর মেলেনি।
ঈদে ভালো ব্যবসা করা গ্রাহকরা টাকাপয়সা জমাও করেছেন ব্যাংকে। উৎসবে বিকাশসহ মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসে লেনদেনও বেড়ে যায়। খরচ বেশি হলেও হাতের কাছে রয়েছে বলে এ ধরনের লেনদেন ক্রমবর্ধমান। এভাবে লেনদেনকৃত অর্থও শেষতক গেছে পণ্যবাজারে।
কোনো কোনো পণ্যের সারা বছরের বিক্রির ৪০-৬০ শতাংশই নাকি হয়ে থাকে রোজার ঈদে। এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক ও জুতার কথা বলা যেতে পারে। এ কারণেই বছরের বাকি সময়ে অনেক শপিং মলে কেনাকাটা কম হতে দেখা যায়। তৈরি পোশাকের মতো পণ্যের বিরাট ব্যবসা অবশ্য রয়েছে ফুটপাতসহ দেশজুড়ে গড়ে ওঠা ছোট ছোট বাজারে। সেখানে ব্যবসার খরচ কম; পণ্যের দামও। উৎসবে স্বল্প আয়ের মানুষদের ভরসা এসব দোকানপাট। ঈদের আগ দিয়ে ঝড়-বাদলে এ ধরনের কেনাকাটা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কে জানে!
গ্রামের দিকে যাতায়াতেও ভোগান্তি বেড়েছে হয়তো। কিছু সড়কপথে শেষ সময়ে বেড়েছে ঈদের গতানুগতিক যানজট। লম্বা ছুটিতেও এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সুফল তেমন মিলছে না। সবাই যে গ্রামের বাড়িতেই যাচ্ছেন, তা অবশ্য নয়। একটা অংশ ছুটি কাটাতে ট্যুরিস্ট স্পটেও যাচ্ছে। রোজার সময়টায় ঝিমিয়ে পড়া এসব স্পট চাঙ্গা হয় ঈদের ছুটি শুরু হলে। এ খাতের উদ্যোক্তা ও কর্মীদের জন্য বিশেষত রোজার ঈদ বয়ে আনে সুখবর। ইরান যুদ্ধ ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতায় এবার বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কম। রয়েছে ভিসা জটিলতা; উড়োজাহাজে ভাড়াও অনেক বেড়েছে। এতে এক দিক দিয়ে ভালোই হলো। দেশে পর্যটন বাড়বে। দেশের টাকা দেশে থাকবে।
দেশের টাকা দেশে আরও বেশি করে থাকতো, যদি ঈদের অর্থনীতিকে আমরা কম আমদানিনির্ভর করতে পারতাম। এ সময়ে যেসব পণ্যের ব্যবসা অনেক বাড়ে, তার অনেকখানিই তো করতে হয় আমদানি। চাল, সবজি, পোল্ট্রি, গবাদিপশু ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বিপুলভাবে আমদানিনির্ভর। এটা আরও বাড়ে রোজায় এবং এর সুফল পান বিদেশি উৎপাদকরা।
পোশাক, জুতাসহ অনেক পণ্যসামগ্রীও এ সময়ে আসে বিদেশ থেকে। ঈদে নারী ও শিশুদের পছন্দসই পণ্যের বাজার এখনও বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণে। হালে পাকিস্তানি পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। পোশাক খাতে দেশীয় উৎপাদকরা অবশ্য এগিয়ে এসেছেন। ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে তুলেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। এদের কারও কারও আছে তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় অভিজ্ঞতা।
‘লোকাল গার্মেন্টস’ বলে পরিচিত অজস্র উদ্যোগও অবশ্য ঈদের বাজারে বেশি করে ভাগ বসাচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও কাঁচামালের জন্য বিদেশনির্ভরতা কাটছে না। চেষ্টা থাকতে হবে সব ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন বাড়ানোর। তাতে কাজের সুযোগ বাড়বে। বাড়বে ঈদে বেতন-বোনাস প্রাপ্তি। সে অর্থ ‘অনুৎপাদনশীল’ ভোগে ব্যয় হলেও ওইসব পণ্য উৎপাদন খাতে আবার বাড়বে কর্মসংস্থান। আমদানি বাড়লেও এর সঙ্গে যুক্তদের কাজের সুযোগ ও আয় বাড়ে।
ঈদের ছুটিতে কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে হলেও এই যে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামের দিকে যায়, তাতে অর্থও প্রবাহিত হয় শহর থেকে গ্রামে। প্রবাসী আয়ও এসে মূলত জমা হয় রাজধানী ও বন্দর নগরীর বাইরে থাকা জনপদে। এতে করে ঈদে বেশি করে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে ঝিমিয়ে থাকা গ্রামগুলো। স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি সঞ্চার হয়। প্রবাসী আয় বিপুলভাবে বদলে দিয়েছে অনেক গ্রামীণ জনপদকে। এতে কৃষি কতটা লাভবান হয়েছে, সেটা অবশ্য বলা কঠিন। ঈদের আগে এবার সাড়ে ৩৭ হাজার পরিবারে জোগানো হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। প্রতি মাসে আড়াই হাজার করে টাকা তারা পাবেন। ঈদের আগে সরকারি তহবিল থেকে এটা তাদের জন্য এক প্রকার বোনাস।
কোরবানি ঈদ আসার আগে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিরও সূচনা হয়ে যাবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের খবরও পৌঁছে গেছে সংশ্লিষ্টদের কাছে। মৎস্য আর পশুপালন খাতও এর আওতাভুক্ত। ঈদের আগে এগুলো নতুন সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরছে। এসব কাজে সরকারের ব্যয় বাড়লেও উপকার পাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী।
ঈদে বৈষম্য হ্রাস এবং সম্প্রীতি ও সংহতি বাড়ানোর বার্তা যত বেশি দেওয়া যায়, ততই তো ভালো।
হাসান মামুন : সাংবাদিক, কলাম লেখক

ঈদুল ফিতর ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আসলে শুরু হয় রোজা শুরুর আগেই। আমদানিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে বেসরকারি খাত। খাদ্যসহ কিছু পণ্যসামগ্রী আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয় আরও আগে। সরকার প্রয়োজনে কর-শুল্ক ছাড় দেয় ওইসব পণ্যের বাজার শান্ত রাখতে। আমদানিতে জড়িয়ে পড়ে ব্যাংক খাত। এ খাতে ব্যবসা বাড়ে প্রবাসী আয় বেশি করে আসতে থাকার কারণেও।
ইরান যুদ্ধে নিকট ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়বে, বলা মুশকিল। তবে এবারও ঈদ সামনে রেখে ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানো প্রবাসী আয় বিপুলভাবে বেড়ে যেতে দেখা গেল। ঈদের আগ দিয়ে অবশ্য উপসাগরীয় দেশগুলোয় যাওয়া আমাদের ভাইদের যুদ্ধের শিকার হওয়া এবং তাদের কারও কারও লাশ দেশে আসার বেদনাদায়ক খবর রয়েছে।
রোজার ঈদ সামনে রেখে বিভিন্ন খাতে অর্থের লেনদেন বিপুলভাবে বাড়ার একটা বড় কারণ প্রবাসী আয়ের প্রবাহ হঠাৎ বেড়ে যাওয়া। দেশের ভেতরকার বর্ধিত আয়, বিশেষত বোনাসের অর্থও আসে পণ্যবাজারে। আমাদের সিংহভাগ কর্মী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বলে অবশ্য গোটা জনশক্তির বেতন-বোনাস পাওয়ার চিত্রটি স্পষ্ট নয়।
প্রতি ঈদের আগে প্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টিই বেশি করে সামনে আসে। তাতে অনেকখানি চাপা পড়ে যায় অন্যান্য খাতের খবর। সংগঠিত বেসরকারি খাতেও অবশ্য ব্যবসা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। দীর্ঘ সময়ে বিনিয়োগ বাড়েনি; বিদ্যমান সক্ষমতার সদ্ব্যবহারও হতে পারছে না। তারপরও তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের তরফ থেকে বলা হয়েছে, তাদের সমিতিভুক্ত প্রায় শতভাগ প্রতিষ্ঠান বেতন-বোনাস দিয়েছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান নাকি চলতি মাসের বেতনের একাংশও দিয়েছে সদিচ্ছাস্বরূপ। আমরা অবশ্য জানতে চাইব সব খাতে কর্মরত সবার খবর। ঈদের পরও যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এটা জানাতে পারে।
প্রবাসী আয় ও ঈদের বোনাসের প্রায় পুরোটা যায় ভোগ্যপণ্য কেনায়। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্যপণ্য, পোশাক ও জুতার মতো সামগ্রী, ইলেকট্রনিকস ও ফার্নিচার। যাতায়াত আর ভ্রমণেও বিপুল অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। ঈদে যাত্রী পরিবহন নিয়ে প্রতিবার অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সীমিত পরিবহন অবকাঠামোর ওপর বিপুলভাবে বেড়ে ওঠা চাপ এটাকে প্রায় অনিবার্য করে তোলে। সড়ক ও নৌপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শেষতক এবারও রোধ করা যায়নি। অতিরিক্ত ভাড়া বাবদ কত অর্থ মানুষের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে, তার হিসাব কে করবে? এ অর্থ অবশ্য ঘুরেফিরে পণ্যবাজারকেই চাঙ্গা করবে। ঈদের বাজারে চাঁদাবাজি কি কম হয়েছে এবার? পুলিশকেও এসবে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
একটি নির্বাচিত সরকার সদ্য এসেছে বলে এবারকার পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন। আইন-শৃঙ্খলারও বড় অবনতি হয়নি। রেল, সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা পরিস্থিতি সহনীয় থাকে কিনা, সেটা অবশ্য দেখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও লোকে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে না ঈদের সময়টায়। মানুষও বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলে। রওনা দেয় এমনকি বাইকে, ট্রাকে। এ চিত্র কীভাবে বদলাবে, সেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মত নিতে পারে নতুন সরকার।
শহর-বন্দর তথা ‘গ্রোথ সেন্টার’গুলো থেকে কত মানুষ ঈদের সময় আপন গন্তব্যে যাত্রা করে, তার সঠিক তথ্য এখনও অজানা। কোরবানি ঈদে অবশ্য গ্রামাঞ্চল থেকেও অনেকে শহর-বন্দরে আসে পশু নিয়ে এবং মাংস কাটাকাটির কাজে যোগ দিতে। সেই ঈদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চিত্রটি কিছুটা ভিন্নও বটে। যেমন, পরিবহন খাতে তখন আমরা দেখি দ্বিমুখি চলাচল। পণ্যবাহী ট্রাকগুলো কোরবানির পশু পরিবহন করেও তখন অনেক আয় করে।
পরিবহন খাতে এবার অবশ্য কিছুটা আতংক ছড়িয়েছিল ইরান যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট। ঠিক ‘সংকট’ নয়; নতুন সরকার আসলে কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল আর তাতেই ছড়ায় আতংক। ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের ভিড় বাড়ে এবং বাড়ে অরাজকতা। সে কারণে রোজার শেষদিকে ভোগ্যপণ্য পরিবহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডিমসহ কিছু পণ্যের দাম বাড়ে প্রধানত পরিবহন সংকটে। পোলাওর চাল, গরু ও মুরগির মাংসের দামও ঈদের আগ দিয়ে বেড়ে গেছে। সেটা কতটা চাহিদার চাপে, বলা মুশকিল।
একটা সময় পর্যন্ত রোজার ঈদকে ‘সেমাই খাওয়ার ঈদ’ বলা হতো। ঈদের নামাজ পড়ে পরস্পরের বাসায় গিয়ে সেমাই খাওয়াটাই ছিল মুখ্য। নতুন পোশাকও সবার পক্ষে কেনা সম্ভবপর হয়ে উঠতো না। আর এখন শুধু পোশাক কেনা বাবদ কত অর্থের লেনদেন হয়, সেটা আলাদা করে বলা হচ্ছে। তবে এর বিশ্বাসযোগ্য হিসাবায়ন হয়নি।
ঈদের অর্থনীতি দ্রুত বড় হতে থাকলেও এ নিয়ে গবেষণা কম। ঈদে কত জাকাত-ফেতরা দেওয়া হয়, সে বিষয়েও ধারণামূলক বক্তব্যই কেবল দেওয়া হচ্ছে। বকশিস হিসেবেও হচ্ছে বিপুল অর্থের লেনদেন। পোশাকসহ পণ্যসামগ্রীর রূপেও বকশিস দেওয়া হচ্ছে।
ঈদে বিকশিত হচ্ছে গিফট সংস্কৃতি। অনলাইনেও গিফটের সামগ্রী জোগাড় করা হচ্ছে। বিত্তশালীদের অনেকে এ ক্ষেত্রে পাইকারি কেনাকাটাও করে থাকেন। নতুন এমপিদের অনেকে আশা করা যায় এবার সেটি বেশি করে করছেন। তাদের হয়ে করার লোকও কম থাকবে না। কেনাকাটার জন্য ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন নিশ্চয়ই বেড়ে গিয়েছিল। ‘তারল্য সংকট’ ছিল বলে অবশ্য খবর মেলেনি।
ঈদে ভালো ব্যবসা করা গ্রাহকরা টাকাপয়সা জমাও করেছেন ব্যাংকে। উৎসবে বিকাশসহ মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসে লেনদেনও বেড়ে যায়। খরচ বেশি হলেও হাতের কাছে রয়েছে বলে এ ধরনের লেনদেন ক্রমবর্ধমান। এভাবে লেনদেনকৃত অর্থও শেষতক গেছে পণ্যবাজারে।
কোনো কোনো পণ্যের সারা বছরের বিক্রির ৪০-৬০ শতাংশই নাকি হয়ে থাকে রোজার ঈদে। এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক ও জুতার কথা বলা যেতে পারে। এ কারণেই বছরের বাকি সময়ে অনেক শপিং মলে কেনাকাটা কম হতে দেখা যায়। তৈরি পোশাকের মতো পণ্যের বিরাট ব্যবসা অবশ্য রয়েছে ফুটপাতসহ দেশজুড়ে গড়ে ওঠা ছোট ছোট বাজারে। সেখানে ব্যবসার খরচ কম; পণ্যের দামও। উৎসবে স্বল্প আয়ের মানুষদের ভরসা এসব দোকানপাট। ঈদের আগ দিয়ে ঝড়-বাদলে এ ধরনের কেনাকাটা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কে জানে!
গ্রামের দিকে যাতায়াতেও ভোগান্তি বেড়েছে হয়তো। কিছু সড়কপথে শেষ সময়ে বেড়েছে ঈদের গতানুগতিক যানজট। লম্বা ছুটিতেও এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সুফল তেমন মিলছে না। সবাই যে গ্রামের বাড়িতেই যাচ্ছেন, তা অবশ্য নয়। একটা অংশ ছুটি কাটাতে ট্যুরিস্ট স্পটেও যাচ্ছে। রোজার সময়টায় ঝিমিয়ে পড়া এসব স্পট চাঙ্গা হয় ঈদের ছুটি শুরু হলে। এ খাতের উদ্যোক্তা ও কর্মীদের জন্য বিশেষত রোজার ঈদ বয়ে আনে সুখবর। ইরান যুদ্ধ ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতায় এবার বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কম। রয়েছে ভিসা জটিলতা; উড়োজাহাজে ভাড়াও অনেক বেড়েছে। এতে এক দিক দিয়ে ভালোই হলো। দেশে পর্যটন বাড়বে। দেশের টাকা দেশে থাকবে।
দেশের টাকা দেশে আরও বেশি করে থাকতো, যদি ঈদের অর্থনীতিকে আমরা কম আমদানিনির্ভর করতে পারতাম। এ সময়ে যেসব পণ্যের ব্যবসা অনেক বাড়ে, তার অনেকখানিই তো করতে হয় আমদানি। চাল, সবজি, পোল্ট্রি, গবাদিপশু ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বিপুলভাবে আমদানিনির্ভর। এটা আরও বাড়ে রোজায় এবং এর সুফল পান বিদেশি উৎপাদকরা।
পোশাক, জুতাসহ অনেক পণ্যসামগ্রীও এ সময়ে আসে বিদেশ থেকে। ঈদে নারী ও শিশুদের পছন্দসই পণ্যের বাজার এখনও বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণে। হালে পাকিস্তানি পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। পোশাক খাতে দেশীয় উৎপাদকরা অবশ্য এগিয়ে এসেছেন। ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে তুলেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। এদের কারও কারও আছে তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় অভিজ্ঞতা।
‘লোকাল গার্মেন্টস’ বলে পরিচিত অজস্র উদ্যোগও অবশ্য ঈদের বাজারে বেশি করে ভাগ বসাচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও কাঁচামালের জন্য বিদেশনির্ভরতা কাটছে না। চেষ্টা থাকতে হবে সব ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন বাড়ানোর। তাতে কাজের সুযোগ বাড়বে। বাড়বে ঈদে বেতন-বোনাস প্রাপ্তি। সে অর্থ ‘অনুৎপাদনশীল’ ভোগে ব্যয় হলেও ওইসব পণ্য উৎপাদন খাতে আবার বাড়বে কর্মসংস্থান। আমদানি বাড়লেও এর সঙ্গে যুক্তদের কাজের সুযোগ ও আয় বাড়ে।
ঈদের ছুটিতে কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে হলেও এই যে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামের দিকে যায়, তাতে অর্থও প্রবাহিত হয় শহর থেকে গ্রামে। প্রবাসী আয়ও এসে মূলত জমা হয় রাজধানী ও বন্দর নগরীর বাইরে থাকা জনপদে। এতে করে ঈদে বেশি করে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে ঝিমিয়ে থাকা গ্রামগুলো। স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি সঞ্চার হয়। প্রবাসী আয় বিপুলভাবে বদলে দিয়েছে অনেক গ্রামীণ জনপদকে। এতে কৃষি কতটা লাভবান হয়েছে, সেটা অবশ্য বলা কঠিন। ঈদের আগে এবার সাড়ে ৩৭ হাজার পরিবারে জোগানো হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। প্রতি মাসে আড়াই হাজার করে টাকা তারা পাবেন। ঈদের আগে সরকারি তহবিল থেকে এটা তাদের জন্য এক প্রকার বোনাস।
কোরবানি ঈদ আসার আগে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিরও সূচনা হয়ে যাবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের খবরও পৌঁছে গেছে সংশ্লিষ্টদের কাছে। মৎস্য আর পশুপালন খাতও এর আওতাভুক্ত। ঈদের আগে এগুলো নতুন সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরছে। এসব কাজে সরকারের ব্যয় বাড়লেও উপকার পাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী।
ঈদে বৈষম্য হ্রাস এবং সম্প্রীতি ও সংহতি বাড়ানোর বার্তা যত বেশি দেওয়া যায়, ততই তো ভালো।
হাসান মামুন : সাংবাদিক, কলাম লেখক

কোরবানি ঈদের আগ দিয়ে বাজারে কিছু সুখবর আছে। যেমন, বেড়ে যাওয়া ডিমের দাম কমে এসেছে। ব্রয়লার আর সোনালি মুরগির দামও। দাম আগের জায়গায় আসার ‘প্রত্যাশা’ থাকলেও সেটা কমই ঘটে। কারণ বাজারে সক্রিয় থাকে দাম বৃদ্ধির উপাদানগুলো। এরই মধ্যে তো ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাতে রাতারাতি বেড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যয়। হালে ডি
২ ঘণ্টা আগে
দেশজুড়ে যেন শিশু মৃত্যুর এক নীরব মিছিল নেমেছে—যে মিছিল প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অথচ এই ভয়াবহ পরিস্থিতিও আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের মধ্যে তেমন কোনো বড় আলোড়ন তুলতে পারেনি। সংক্রমণ শুরুর দুই মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো সর্বাত্মক উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না
৩ ঘণ্টা আগে
শিশু ধর্ষণ এতকাল ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু হালে তা রূপ পেয়েছে ‘নিরবচ্ছিন্ন ঘটনায়’। অনেক ক্ষেত্রে ঘটছে আবার দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। এমনকি কখনও কখনও ওই ধর্ষণের নৃশংসতা ‘হত্যা’ পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এই যেমন, গত চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষিত হয়। গত দুই সপ্তাহে ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে
২১ ঘণ্টা আগে
কোরবানির ঈদের সকাল মানে একটা বিশেষ আলো। মসজিদ বা ঈদগাহ থেকে ফেরার পথে মানুষের মুখে হাসি, কোলাকুলি, ছোটদের নতুন জামা, উঠানে-পার্কিংয়ে-রাস্তায় পশু বাঁধা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গন্ধ। এই দিনটার জন্য বছর ধরে অপেক্ষা করে সবাই। বিশেষ করে যারা দূরে থাকে, যারা পরিবার ছেড়ে শহরে বা বোর্ডিংয়ে আছে, তাদের কাছে
১ দিন আগে