রাতুল আল আহমেদ

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সব সময়ই একধরনের টানাপোড়েন রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বারবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছে, একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। আর এটিই হবে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।
গত শনিবার (২৩ আগস্ট) পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘১৯৭১ সালের বিষয়টি ইতিমধ্যেই মীমাংসা হয়ে গেছে।’ তিনি দাবি করেন, ১৯৭৪ সালের ‘দিল্লি চুক্তি’র মাধ্যমে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ এ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিল এবং পাকিস্তান নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাও চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ওই চুক্তির ভাষা একেবারেই অন্যরকম কিছু ইঙ্গিত দেয়।
পাকিস্তান কি কখনো ১৯৭১ সালের জন্য ক্ষমা চেয়েছে
দিল্লি চুক্তির ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, পাকিস্তান যদি ‘কোনো ধরনের অপরাধ’ করে থাকে, তবে তারা সে অপরাধের জন্য নিন্দা ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে। কিন্তু চুক্তিতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা অনেকাংশেই ভাষাগত কৌশলে ১৯৭১ সালের জেনোসাইডের পুরো ব্যাপারটিকে এড়িয়ে গেছে। এই চুক্তিতে আসলে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সেই স্বীকৃতি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি বাংলাদেশের একমাত্র দাবি ছিল না। বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং ১৯৭১-এর আগে যৌথ সম্পদের ন্যায্য অংশও বাংলাদেশের দাবি ছিল।
১৯৭৪ সালের চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, আদি বাসস্থান যেখানেই হোক না কেন ১৯৭১ সালে বা তার পরে পাকিস্তানকে নিজেদের দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছিল এমন সমস্ত উর্দুভাষী অ-বাংলাভাষীদের পাকিস্তান নিজ দেশে ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু পাকিস্তান সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি। কিছুসংখ্যক মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও, আজও বিপুলসংখ্যক লোক বাংলাদেশেই রয়ে গেছেন।
আটকে পড়া বিহারিদের কী হলো
২০০৪ সালের জানুয়ারিতে লাহোর হাইকোর্ট রায় দেয়, বিহারিরা পাকিস্তানের নয় বরং বাংলাদেশের নাগরিক। পাকিস্তানের আদালত বলেছিল, ‘কোনো দেশের প্রতি ভালোবাসা, স্নেহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক নাগরিকত্ব পাওয়ার ভিত্তি হতে পারে না।’
অন্যদিকে বাংলাদেশের হাইকোর্ট ২০০৩ এবং ২০০৮ সালে রায় দিয়ে উর্দুভাষী বাসিন্দাদের আইনি স্বীকৃতি দেয়, তাদের ভোটাধিকার ও জাতীয় পরিচয়পত্রের অধিকার নিশ্চিত করে। বাস্তবে, পাকিস্তান যা অবহেলায় ফেলে রেখেছিল, সেই সমস্যার সমাধান করেছে বাংলাদেশ।
১৯৭১ সালের বিষয় নিষ্পত্তি হয়ে গেছে—যদি ইসহাক দারের এই দাবি সত্য হতো তবে এসব আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজন পড়ত না। পাকিস্তান শুধু বাংলাদেশের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই করেনি, বরং মুক্তির আশায় পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করা সেই সব উর্দুভাষী মানুষগুলোকেও প্রতারিত করেছে। ইসলামাবাদ কেবল তখনই বিহারিদের দুর্দশার কথা তোলে, যখন ঢাকা ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো উত্থাপন করে। যেন এগুলো কেবল দর-কষাকষির হাতিয়ার।
বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের কত ঋণ রয়েছে
বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, ১৯৭১-এর আগে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এবং বিদেশি ঋণের দায়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রায় ২৫ বছরের যৌথ ইতিহাস রয়েছে। পাট ও চা রপ্তানির কারণে পূর্ব পাকিস্তান ছিল রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের রিজার্ভ ছিল প্রায় ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার একটি বড় অংশের ওপর বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার ছিল।
এছাড়াও বিদেশি সাহায্য অপব্যবহারের অভিযোগও ছিল। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের ভোলায় প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষ মারা যায়। এরপর বিদেশি দাতারা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা পাঠিয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে মডার্ন এশিয়ান স্টাডিজ-এ প্রকাশিত বিশ্বাস ও ডালির গবেষণায় জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সহায়তা পৌঁছায়নি, বরং এই অর্থ যুদ্ধকালীন সময়ে লাহোরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ এই টাকার দাবি তোলে।
১৯৭৪ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা সফরে এলে, বাংলাদেশ ৪ বিলিয়ন ডলার দাবি করে। ভুট্টো পাল্টা যুক্তি দেন, বাংলাদেশকেও পাকিস্তানের ১৯৭১-এর আগের বিদেশি ঋণের একটি অংশ বহন করতে হবে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঢাকা প্রায় ৩৬০ মিলিয়ন ডলারের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়। অর্থাৎ পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা ছিল ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। কিন্তু পাকিস্তান সেই পাওনা কখনোই পরিশোধ করেনি।
জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৭৮ সালে আবার এই দাবি তোলা হলেও পাকিস্তান নীরব থাকে।
কেন ১৯৭৪ সালের দিল্লি চুক্তি ব্যর্থ হলো
পাকিস্তান নিজস্ব ক্ষতির প্রসঙ্গে কখনো নীরব থাকেনি। তারা ওই সময়ে বিহারিদের হত্যার প্রসঙ্গ তোলে। তা ছাড়া পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে তাদের জাতীয়করণ করা সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ দাবিও করেছিল। গত কয়েক দশকে ঢাকা যখনই ন্যায়বিচার, সম্পদ বা ক্ষমাপ্রার্থনার দাবি তুলেছে, পাকিস্তান হয় আলোচনার কেন্দ্র সরিয়ে নিয়েছে তাদের নিজের ক্ষতির দিকে, নয়তো বলেছে অতীত ভুলে এগিয়ে যেতে হবে।
চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতার আগের ৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার পাওনা দাবি করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান গভীর অর্থনৈতিক সংকট বিবেচনা করলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়া খুবই অনিশ্চিত।
বরং ইসহাক দার ঢাকাকে উপদেশ দিয়ে বললেন, বাংলাদেশকে ‘হৃদয় পরিষ্কার করতে হবে’ এবং ‘আমরা একটি পরিবার, তাই পরিবারের মতো আচরণ করতে হবে।’ এ ধরনের দাদাগিরি নতুন নয়। বাংলাদেশের সর্বশেষ শেখ হাসিনা সরকারের ফ্যাসিবাদের সময়ে ভারতও এমন সুরে কথা বলত।
দারের মন্তব্যের পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সম্পর্কের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য ঐতিহাসিক বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান কি সত্য প্রকাশ ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারবে
কিন্তু প্রকৃত মীমাংসা বা স্বাভাবিক সম্পর্ক শুধু মিষ্টি কথায় সম্ভব নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা এখানে শক্তিশালী শিক্ষা দেয়। বর্ণবাদোত্তর দক্ষিণ আফ্রিকায় আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন বলেছিল, প্রথমে অপরাধীদের সত্য বলতে হবে। ক্ষমা কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নয়; ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার চাইলে ক্ষমা দেবে, চাইলে বিচার চাইবে। এরপরেই পুনর্মিলন অর্থবহ হতে পারে।
দারের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে। যে দেশ গণহত্যার অভিযোগের মুখে, তারা সত্য স্বীকার না করে কেবল পুনর্মিলনের কথা বলতে পারে না।
বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে চাইছে, তখন মনে হচ্ছে তারা আবার সেই অমীমাংসিত প্রশ্নের বাক্স খুলে ফেলছে। আসল প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি সত্যের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত, নাকি কেবল কথার আড়ালে বাস্তবতাকে ঢেকে যাবে।
লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সব সময়ই একধরনের টানাপোড়েন রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বারবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছে, একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। আর এটিই হবে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।
গত শনিবার (২৩ আগস্ট) পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘১৯৭১ সালের বিষয়টি ইতিমধ্যেই মীমাংসা হয়ে গেছে।’ তিনি দাবি করেন, ১৯৭৪ সালের ‘দিল্লি চুক্তি’র মাধ্যমে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ এ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিল এবং পাকিস্তান নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাও চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ওই চুক্তির ভাষা একেবারেই অন্যরকম কিছু ইঙ্গিত দেয়।
পাকিস্তান কি কখনো ১৯৭১ সালের জন্য ক্ষমা চেয়েছে
দিল্লি চুক্তির ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, পাকিস্তান যদি ‘কোনো ধরনের অপরাধ’ করে থাকে, তবে তারা সে অপরাধের জন্য নিন্দা ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে। কিন্তু চুক্তিতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা অনেকাংশেই ভাষাগত কৌশলে ১৯৭১ সালের জেনোসাইডের পুরো ব্যাপারটিকে এড়িয়ে গেছে। এই চুক্তিতে আসলে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সেই স্বীকৃতি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি বাংলাদেশের একমাত্র দাবি ছিল না। বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং ১৯৭১-এর আগে যৌথ সম্পদের ন্যায্য অংশও বাংলাদেশের দাবি ছিল।
১৯৭৪ সালের চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, আদি বাসস্থান যেখানেই হোক না কেন ১৯৭১ সালে বা তার পরে পাকিস্তানকে নিজেদের দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছিল এমন সমস্ত উর্দুভাষী অ-বাংলাভাষীদের পাকিস্তান নিজ দেশে ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু পাকিস্তান সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি। কিছুসংখ্যক মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও, আজও বিপুলসংখ্যক লোক বাংলাদেশেই রয়ে গেছেন।
আটকে পড়া বিহারিদের কী হলো
২০০৪ সালের জানুয়ারিতে লাহোর হাইকোর্ট রায় দেয়, বিহারিরা পাকিস্তানের নয় বরং বাংলাদেশের নাগরিক। পাকিস্তানের আদালত বলেছিল, ‘কোনো দেশের প্রতি ভালোবাসা, স্নেহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক নাগরিকত্ব পাওয়ার ভিত্তি হতে পারে না।’
অন্যদিকে বাংলাদেশের হাইকোর্ট ২০০৩ এবং ২০০৮ সালে রায় দিয়ে উর্দুভাষী বাসিন্দাদের আইনি স্বীকৃতি দেয়, তাদের ভোটাধিকার ও জাতীয় পরিচয়পত্রের অধিকার নিশ্চিত করে। বাস্তবে, পাকিস্তান যা অবহেলায় ফেলে রেখেছিল, সেই সমস্যার সমাধান করেছে বাংলাদেশ।
১৯৭১ সালের বিষয় নিষ্পত্তি হয়ে গেছে—যদি ইসহাক দারের এই দাবি সত্য হতো তবে এসব আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজন পড়ত না। পাকিস্তান শুধু বাংলাদেশের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই করেনি, বরং মুক্তির আশায় পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করা সেই সব উর্দুভাষী মানুষগুলোকেও প্রতারিত করেছে। ইসলামাবাদ কেবল তখনই বিহারিদের দুর্দশার কথা তোলে, যখন ঢাকা ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো উত্থাপন করে। যেন এগুলো কেবল দর-কষাকষির হাতিয়ার।
বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের কত ঋণ রয়েছে
বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, ১৯৭১-এর আগে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এবং বিদেশি ঋণের দায়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রায় ২৫ বছরের যৌথ ইতিহাস রয়েছে। পাট ও চা রপ্তানির কারণে পূর্ব পাকিস্তান ছিল রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের রিজার্ভ ছিল প্রায় ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার একটি বড় অংশের ওপর বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার ছিল।
এছাড়াও বিদেশি সাহায্য অপব্যবহারের অভিযোগও ছিল। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের ভোলায় প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষ মারা যায়। এরপর বিদেশি দাতারা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা পাঠিয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে মডার্ন এশিয়ান স্টাডিজ-এ প্রকাশিত বিশ্বাস ও ডালির গবেষণায় জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সহায়তা পৌঁছায়নি, বরং এই অর্থ যুদ্ধকালীন সময়ে লাহোরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ এই টাকার দাবি তোলে।
১৯৭৪ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা সফরে এলে, বাংলাদেশ ৪ বিলিয়ন ডলার দাবি করে। ভুট্টো পাল্টা যুক্তি দেন, বাংলাদেশকেও পাকিস্তানের ১৯৭১-এর আগের বিদেশি ঋণের একটি অংশ বহন করতে হবে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঢাকা প্রায় ৩৬০ মিলিয়ন ডলারের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়। অর্থাৎ পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা ছিল ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। কিন্তু পাকিস্তান সেই পাওনা কখনোই পরিশোধ করেনি।
জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৭৮ সালে আবার এই দাবি তোলা হলেও পাকিস্তান নীরব থাকে।
কেন ১৯৭৪ সালের দিল্লি চুক্তি ব্যর্থ হলো
পাকিস্তান নিজস্ব ক্ষতির প্রসঙ্গে কখনো নীরব থাকেনি। তারা ওই সময়ে বিহারিদের হত্যার প্রসঙ্গ তোলে। তা ছাড়া পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে তাদের জাতীয়করণ করা সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ দাবিও করেছিল। গত কয়েক দশকে ঢাকা যখনই ন্যায়বিচার, সম্পদ বা ক্ষমাপ্রার্থনার দাবি তুলেছে, পাকিস্তান হয় আলোচনার কেন্দ্র সরিয়ে নিয়েছে তাদের নিজের ক্ষতির দিকে, নয়তো বলেছে অতীত ভুলে এগিয়ে যেতে হবে।
চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতার আগের ৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার পাওনা দাবি করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান গভীর অর্থনৈতিক সংকট বিবেচনা করলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়া খুবই অনিশ্চিত।
বরং ইসহাক দার ঢাকাকে উপদেশ দিয়ে বললেন, বাংলাদেশকে ‘হৃদয় পরিষ্কার করতে হবে’ এবং ‘আমরা একটি পরিবার, তাই পরিবারের মতো আচরণ করতে হবে।’ এ ধরনের দাদাগিরি নতুন নয়। বাংলাদেশের সর্বশেষ শেখ হাসিনা সরকারের ফ্যাসিবাদের সময়ে ভারতও এমন সুরে কথা বলত।
দারের মন্তব্যের পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সম্পর্কের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য ঐতিহাসিক বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান কি সত্য প্রকাশ ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারবে
কিন্তু প্রকৃত মীমাংসা বা স্বাভাবিক সম্পর্ক শুধু মিষ্টি কথায় সম্ভব নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা এখানে শক্তিশালী শিক্ষা দেয়। বর্ণবাদোত্তর দক্ষিণ আফ্রিকায় আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন বলেছিল, প্রথমে অপরাধীদের সত্য বলতে হবে। ক্ষমা কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নয়; ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার চাইলে ক্ষমা দেবে, চাইলে বিচার চাইবে। এরপরেই পুনর্মিলন অর্থবহ হতে পারে।
দারের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে। যে দেশ গণহত্যার অভিযোগের মুখে, তারা সত্য স্বীকার না করে কেবল পুনর্মিলনের কথা বলতে পারে না।
বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে চাইছে, তখন মনে হচ্ছে তারা আবার সেই অমীমাংসিত প্রশ্নের বাক্স খুলে ফেলছে। আসল প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি সত্যের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত, নাকি কেবল কথার আড়ালে বাস্তবতাকে ঢেকে যাবে।
লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার-বিরোধী মিথস্ক্রিয়া অপরিহার্য, যা আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণে বিতর্ক ও সমালোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তের গুণগত মান বাড়ায়।
১২ মিনিট আগে
ইরানে হয়তো সরকার পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু এই যুদ্ধ থামাতে হলে আসলে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের বেপরোয়া সরকারগুলোর পতন হওয়া জরুরি। ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের মানুষ যুদ্ধ-উন্মাদনায় ভুগছে। তারা নেতানিয়াহুকে অন্ধভাবে সমর্থন দিচ্ছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
সংসদ সদস্যদের স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে হবে যে তাদের মূল দায়িত্ব দুটি—আইন প্রণয়ন এবং সরকারের কাজের তদারকি করা। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সংসদ সদস্যদের কাজ নয়।। সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন, নিজের ব্যবসা বা ক্যারিয়ারের দিকে মনোযোগ না দিয়ে তাদের সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বেশি সময় দিতে হবে। নয়তো সংসদ তার কার্যকারিতা হারাবে।
১৭ ঘণ্টা আগে
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে যদি ফ্যামিলি কার্ডকে দেশের প্রত্যেক দরিদ্র নাগরিকের জন্য সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্রে রূপান্তর করা যায় এবং বাজেট ও সম্পদের ব্যবহার সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারবে।
২০ ঘণ্টা আগে