সবার আগে ঢাকার প্রতিটি ভবনের ভূমিকম্প-টেস্ট বাধ্যতামূলক করা উচিত

মেহেদী আহমেদ আনসারী
মেহেদী আহমেদ আনসারী

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ভূমিকম্প বিষয়ক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি সাড়া ও সরকারের সার্বিক প্রস্তুতি জোরদার করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ সেল স্থাপন, উদ্ধার কাজের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করে তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার মতো বিষয়গুলো সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারের এই তৎপরতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

কিন্তু একজন প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে, সভার আলোচনায় সবচেয়ে জরুরি বিষয়টিই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। সেটি হলো—দুর্বল ভবন চিহ্নিত করা এবং সেগুলোকে শক্তিশালী করা। সভায় জরুরি সাড়া, স্বেচ্ছাসেবক তৈরি বা উদ্ধার অভিযান নিয়ে যে বিশদ আলোচনা হয়েছে, তা মূলত দুর্যোগের পর বেঁচে থাকা ১০ থেকে ২০ শতাংশ মানুষের জন্য।

রূঢ় বাস্তবতা হলো, ৭-৮ মাত্রার বড় ভূমিকম্প হলে ভবনের নিচে চাপা পড়ে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষেরই মৃত্যু হবে। ভবনগুলোকে যদি আমরা মজবুত করতে না পারি, তবে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি আর লাখো স্বেচ্ছাসেবক দিয়েও এই বিপুল প্রাণহানি ঠেকানো যাবে না। যারা ভবনের নিচে পিষ্ট হয়ে মারা যাবেন, তাদের জন্য এই উদ্ধার প্রস্তুতির কোনো অর্থ থাকবে না। তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে যারা প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন, তাদের উচিত ছিল ভবন মজবুত করার বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া।

গত ২৪ জুন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ৭ থেকে ৮ মাত্রার এক ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প। সরকারি হিসাবেই ৫৫০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন অন্তত ২০ হাজার। ১৯০টি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়াসহ অন্তত ৮৫৬টি ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সচেতন মানুষের মনে একটি প্রশ্ন জাগে—ঠিক একই মাত্রার একটি ভূমিকম্প যদি রাজধানী ঢাকায় আঘাত হানে, তবে আমাদের পরিণতি কী হবে?

ঢাকা শহরে গড়ে ওঠা হাজার হাজার ভবনে যে মানের কংক্রিট বা রড ব্যবহার করা হচ্ছে, তা যাচাই করার যেন কেউ নেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল কাগজে বা ইলেকট্রনিক সিস্টেমে একটি সিল মেরেই দায় সারে।

সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কেও আমরা ৭.৫ ও ৭.৬ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্প দেখেছি। সেখানে প্রায় ৮শ ভবন ধসে পড়ে এবং ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তুরস্কের সেই ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ইস্তাম্বুল বা আঙ্কারার মতো প্রধান শহরগুলো থেকে দূরে ছিল। এরপরও এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হই আমরা। কিন্তু ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস, তুরস্কের শহরগুলো এবং আমাদের ঢাকার মধ্যে একটি বড় ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তা হলো—জনঘনত্ব। তুরস্ক বা ভেনেজুয়েলার শহরগুলোর তুলনায় ঢাকার জনঘনত্ব অন্তত ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি।

ভেনেজুয়েলায় ১২৫ বছর পর এই বড় ভূমিকম্পটি আঘাত হেনেছে। একসময়ের তেলসমৃদ্ধ দেশটির অর্থনীতি এখন নাজুক। ভেনেজুয়েলার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মূল কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, সেখানে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কংক্রিট ও রডের চরম নিম্নমানই ভবন ধসের প্রধান কারণ। পাশাপাশি থাকা ১০টি ভবনের মধ্যে হয়তো ৮টি ধসে গেছে, বাকি ২টি দাঁড়িয়ে আছে। এর কারণ, দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলোর কংক্রিটের মান ভালো ছিল।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই জায়গায় ভেনেজুয়েলার সঙ্গে বাংলাদেশের এক ভয়াবহ মিল রয়েছে। ঢাকা শহরে গড়ে ওঠা হাজার হাজার ভবনে যে মানের কংক্রিট বা রড ব্যবহার করা হচ্ছে, তা যাচাই করার যেন কেউ নেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল কাগজে বা ইলেকট্রনিক সিস্টেমে একটি সিল মেরেই দায় সারে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই ভবনের নকশা মানা হচ্ছে কি না, রড-সিমেন্টের অনুপাত ঠিক আছে কি না—তা তদারকি করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রাজউকের নেই।

বর্তমানে ঢাকা শহরে চার তলার ওপরের ভবনের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। আর এক-দোতলা ও ছাপড়া ঘর মিলিয়ে মোট ভবন রয়েছে প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে ১০ তলার ওপরের বহুতল ভবন আছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার। সাধারণত ১০ তলার ওপরের ভবনগুলোতে বড় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ থাকে বলে তারা ভালো প্রকৌশলী দিয়ে গুণগত মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু মূল বিপদের জায়গাটি হলো ৪ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবনগুলো। এগুলোর নির্মাণেই সবচেয়ে বেশি গাফিলতি ও অনিয়ম হয়েছে।

২০০৯ সালে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক গবেষণায় আমি যুক্ত ছিলাম। তখন প্রাক্কলন করা হয়েছিল যে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। তখন ঢাকায় মোট ভবন ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার। ১৭ বছর পর ২০২৬ সালের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ভবনের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬ লাখ হয়েছে। জাইকার সাম্প্রতিক হিসাবগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ভবনের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ, বহুতল ভবনের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, ৭-৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় অন্তত ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের তাৎক্ষণিক প্রাণহানি হতে পারে। সরু রাস্তা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চালানো বা লজিস্টিক সাপোর্ট পৌঁছানোও তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

ভবন চেকিংয়ের জন্য সরকারের এক টাকাও খরচ করার প্রয়োজন নেই। সরকার কেবল রাজউকের মাধ্যমে একটি নির্দেশনা জারি করবে যে, নাগরিকদের নিজস্ব খরচে সরকার-নির্ধারিত থার্ড পার্টি কোম্পানির মাধ্যমে নিজ নিজ ভবনের ফিটনেস যাচাই করে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।

এই আসন্ন মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে আমাদের এখনই কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে অবিলম্বে নতুন ভবনগুলোর জন্য ‘বিল্ডিং কোড’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো নির্মাণকাজে ‘থার্ড পার্টি’ বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যমান ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহনশীলতা যাচাইয়ের কাজ আজই শুরু করা প্রয়োজন। অনেকেই ভাবতে পারেন, লাখ লাখ ভবনের ফিটনেস যাচাইয়ের এই বিশাল অর্থায়ন কে করবে? আমাদের সরকারগুলোর একটি প্রবণতা হলো, বড় বাজেটের যন্ত্রপাতি কেনার প্রজেক্ট নিতে তারা বেশি আগ্রহী হয়। কিন্তু ভবন চেকিংয়ের জন্য সরকারের এক টাকাও খরচ করার প্রয়োজন নেই। সরকার কেবল রাজউকের মাধ্যমে একটি নির্দেশনা জারি করবে যে, নাগরিকদের নিজস্ব খরচে সরকার-নির্ধারিত থার্ড পার্টি কোম্পানির মাধ্যমে নিজ নিজ ভবনের ফিটনেস যাচাই করে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। একটি ১০ ফ্ল্যাটের ভবনে এই চেকিং করতে ফ্ল্যাটপ্রতি হয়তো ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হবে। জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে মালিকদের এইটুকু বিনিয়োগ করতে বাধ্য করতে হবে।

তৃতীয়ত, সরকারের বড় অস্ত্র হতে পারে 'অকুপেন্সি সার্টিফিকেট' (বসবাসের ছাড়পত্র)। ঢাকায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৮০ থেকে ১০০টি ভবনের এই সার্টিফিকেট আছে! থার্ড পার্টি চেকিং বাধ্যতামূলক করা হলে সবার ডাটাবেস তৈরি হবে। রানা প্লাজা ধসের পর আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে এভাবেই থার্ড পার্টির মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন এসেছিল। প্রয়োজনে ভবন মজবুত করার (রেট্রোফিটিং) জন্য সরকার ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে দিতে পারে।

চতুর্থত, দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। আমাদের দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ প্রকৌশলী আছেন, তা এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য অপর্যাপ্ত। তাই নতুন গ্র্যাজুয়েটদের ৩ থেকে ৬ মাসের শর্ট কোর্স এবং প্র্যাকটিসিং ইঞ্জিনিয়ারদের ১-২ সপ্তাহের বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে।

পঞ্চমত, নেপাল বা ফিলিপাইনের মতো আমাদেরও জাতীয় বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ অর্থ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা করে রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রকৃতপক্ষে, এই সংকট মোকাবিলায় আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রীর চেয়েও বেশি প্রয়োজন জোরালো ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’। পশ্চিমা বিশ্ব বা প্রতিবেশী ভারতে কারিগরি বিষয়গুলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসেই সমাধান করে। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তারা যদি এখনই ভবনের মান যাচাই ও মজবুতিকরণের উদ্যোগ গ্রহণ না করে, তবে আমরা হয়তো বাঁচতে পারার শেষ সুযোগটিও হারাব।

সবসময় মনে রাখতে হবে—ভূমিকম্প নিজে মানুষ মারে না, মানুষ মারা যায় ত্রুটিপূর্ণ ভবন ধসে পড়ার কারণে। তাই সময় থাকতে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প আমাদের নেই।

  • মেহেদী আহমেদ আনসারী: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক
Ad 300x250

সম্পর্কিত