বাংলাদেশের আকাশ-শক্তি: সদিচ্ছা থাকলেও বাড়ছে সক্ষমতার ঘাটতি

লেখা:
লেখা:
আসিফ আল হাসান এবং মুহাম্মদ রওহান রশীদ

প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ২১: ৫০
স্ট্রিম গ্রাফিক

গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে বাংলাদেশ সামরিক প্রদর্শনী দর্শকদের মুগ্ধ করতে পারেনি। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানের বহর বেশ দুর্বল। আধুনিক যুদ্ধকৌশলের চাহিদার সঙ্গে বিমানবাহিনী তাল মেলাতে পারছে না। দর্শকদের মধ্যে এই নিয়ে স্পষ্ট হতাশা দেখা গেছে। অনলাইনে তরুণদের মধ্যে এই হতাশা ছিল আরও বেশি।

এই সমালোচনা নতুন নয়, অনেক আগে থেকেই এমন হতাশা তৈরি হচ্ছিল। স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ সেই ক্ষোভকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।

বাংলাদেশের আকাশ-শক্তি কখনোই বড় পরিসরে সাজানোর পরিকল্পনা হয়নি। ১৯৭১ সালের পর জরুরি প্রয়োজনে সীমিত সম্পদ নিয়ে এলোমেলোভাবে এর যাত্রা শুরু হয়। দেশের কৌশলগত সংস্কৃতিও সেভাবেই গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আকাশপথে আধিপত্য বিস্তার কখনোই কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিল না। স্বাধীনতার পর ঢাকার সামনে তাৎক্ষণিক পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ ছিল। তাই বিমানবাহিনীর বহরে কেবল ধীরগতির ও আংশিক উন্নয়ন হয়েছে।

পুরোনো যুদ্ধবিমান ও আধুনিকায়নের অভাব

আংশিক ও ধীরগতির উন্নয়নের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো উড়োজাহাজকে নির্ধারিত আয়ুর চেয়ে বেশি দিন ব্যবহার করলে তা অকার্যকর হতে থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বহরে বর্তমানে মাত্র ৪৪টি যুদ্ধবিমান আছে। এর মধ্যে ৩৬টি উড়োজাহাজই পুরোনো ও সেকেলে চেংদু এফ-৭ মডেলের। বাকি আটটি যুদ্ধবিমান পরীক্ষিত মিগ-২৯ মডেলের। অনেক আগেই এগুলো পুরোনো প্রজন্মের উড়োজাহাজে পরিণত হয়েছে। এসব যুদ্ধবিমান তাদের সেরা সময় পার করে এসেছে। এত অল্প সংখ্যক উড়োজাহাজ নিয়ে এখন আর পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরী স্কোয়াড্রনও সম্ভব নয়।

আধুনিক আকাশ-শক্তির সংজ্ঞার কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। এখন আকাশ-শক্তি কেবল যুদ্ধবিমানের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। একটি আধুনিক বিমানবাহিনীর প্রকৃত যুদ্ধক্ষমতা উড়োজাহাজের সংখ্যা দিয়ে মাপা হয় না। শক্তিশালী ইলেকট্রনিক সক্ষমতা এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়।

পাশাপাশি বৃহত্তর যৌথবাহিনীর কাঠামোতে কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতাও জরুরি। এই দিক দিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী কেবল পিছিয়েই নেই, বরং নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে রীতিমতো সংগ্রাম করছে।

উদাহরণস্বরূপ, বঙ্গোপসাগর ঢাকার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে এখন দ্রুতগতিতে আকাশ ও নৌবাহিনীর আনাগোনা বাড়ছে। কেবল আঞ্চলিক দেশগুলোই নয়, বাইরের পরাশক্তিগুলোও এখানে সক্রিয় হচ্ছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের স্বার্থ ক্রমশ বাড়ছে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রকাশ্যে বৈরী না হলেও আগের চেয়ে অবনতি হয়েছে। পূর্ব দিকে রয়েছে অস্থিতিশীল মিয়ানমার। দেশটি বারবার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে আকাশ-শক্তি ঢাকার জন্য কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কাগজে-কলমে বাংলাদেশ পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে বলে মনে হয়। 'ফোর্সেস গোল ২০৩০' শিরোনামে তাদের সামরিক আধুনিকায়নের রূপরেখা বহু বছর ধরেই রয়েছে। আধুনিক মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান কেনার চিন্তাভাবনাও একেবারেই নতুন কিছু নয়। পরিকল্পনা থাকলেও হতাশার বিষয় হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কাজের পরিস্থিতি। সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি এবং ঘোষণার পর শেষ পর্যন্ত কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।

ইউরোফাইটার টাইফুন এবং ভূ-রাজনৈতিক চাপ

ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার বিষয়টি এর বড় উদাহরণ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার জন্য একটি আগ্রহপত্র দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপ ঢাকার গুরুতর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। অনেকের ধারণা হয়েছিল বিমানবাহিনী হয়তো অবশেষে নিজেদের শক্তি জানান দিতে প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত এর কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় সেই গতি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। এমনকি ভবিষ্যৎ আলোচনার কোনো স্পষ্ট সময়রেখাও তৈরি করা হয়নি।

বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে বাইরের চাপ কাজ করছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে চীনের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ স্পষ্ট। বাংলাদেশকে অনিবার্যভাবেই এই ভূ-রাজনৈতিক চাপ বহন করতে হয়। ফলে অস্ত্র কেনার সিদ্ধান্ত শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। নয়াদিল্লি প্রায়শই ঢাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বাংলাদেশের সীমান্তে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কৌশল নেয়। ভারত চাপ প্রয়োগের জন্য কূটনৈতিক চ্যানেলও ব্যবহার করে। এসব বিষয় শেষ পর্যন্ত অস্ত্র সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। এতে আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব ঘটে। ঢাকার নীতিনির্ধারকদের জন্য তখন খুব সীমিত বিকল্প অবশিষ্ট থাকে।

বাংলাদেশ মাঝে মাঝে এই সমস্যা পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত বাংলাদেশকে হ্যাল তেজাস যুদ্ধবিমান কেনার জন্য চাপ দিয়েছিল। ঢাকা সেই চাপ উপেক্ষা করে রাশিয়ার তৈরি ইয়াক-১৩০ ট্রেইনার বিমান কেনে। তুরস্কের বায়রাখতার টিবি২ আক্রমণকারী ড্রোন সংগ্রহ করে। পাশাপাশি চীনা সরবরাহকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। এসব পদক্ষেপ অস্ত্র সংগ্রহে বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টাকেই নির্দেশ করে। এ ছাড়া জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে সম্প্রতি আলোচনা হয়েছে। চীন ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা কৌশলী দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ দেয়।

বাস্তবে বাংলাদেশের এই প্রচেষ্টাগুলো বেশ খণ্ডিত। প্ল্যাটফর্ম এবং সিস্টেমগুলোর মধ্যে সঠিক সমন্বয় ছাড়া শুধু বৈচিত্র্য আনলে ভালো ফল পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খল জোড়াতালির ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। আর এখানেই প্রকৃত উদ্বেগের জায়গা লুকিয়ে আছে। এই অঞ্চলের অন্যান্য বিমানবাহিনী এখন অনেক বেশি নেটওয়ার্কযুক্ত। তারা সমন্বিত যুদ্ধরীতির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ এমন সব সরঞ্জাম নিয়ে পড়ে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি কাজ করতে পারে না।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের শূন্যতা পূরণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যেখানে আধুনিকায়নে বিলম্বের মাশুল দিতে হবে। শুধু সদিচ্ছা নয়, বিএনপি প্রশাসন এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ইচ্ছুক কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

দ্রুত এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা জরুরি। অন্যথায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী কেবল কাগুজে বাঘে পরিণত হবে।

লেখক: আসিফ আল হাসান নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্পেনের কর্ডোবা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিলিজিয়াস ডাইভারসিটি ইন অ্যা গ্লোবালাইজড ওয়ার্ল্ড প্রোগ্রামের একজন ইরাসমাস মুন্ডুস মাস্টার্স স্কলার।

মুহাম্মদ রওহান রশীদ গ্রোনিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্ডোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত রেড গ্লোবাল প্রোগ্রামের একজন ইরাসমাস মুন্ডুস মাস্টার্স স্কলার।

ওয়াশিংটনভিত্তিক নিউজ ম্যাগাজিন দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনূদিত

সম্পর্কিত