ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

প্রতিবছর ১৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস’। বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক সংকটে যেসব নির্ভীক ও আত্মত্যাগী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ান, তাঁদের অসামান্য অবদানকে শ্রদ্ধা জানাতেই এই বিশেষ দিনটির অবতারণা।
২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরাকের বাগদাদে জাতিসংঘ কার্যালয়ে (ক্যানেল হোটেল) এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী বোমা হামলায় জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি সার্জিও ভিয়েরা দ্য মেলোসহ ২২ জন মানবতাবাদী কর্মী প্রাণ হারান। এই মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি ধারণ করে এবং বিশ্বব্যাপী মানবিক কার্যক্রমকে বেগবান করার প্রত্যয়ে ২০০৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯ আগস্টকে 'বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এই দিবসের তাৎপর্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও গভীর।
এবছর বিশ্ব মানবতাবাদী দিবসের আন্তর্জাতিক প্রচারণায় জাতিসংঘ (ইউএন ওসিএইচএ) ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর ঘোষিত মূল স্লোগান বা প্রতিপাদ্য হলো: "#ActForHumanity" (মানবতার পক্ষে দাঁড়ান)। এর মূল ক্যাম্পেইন থিম বা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: "নিহত মানবতাবাদী কর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের বর্ধিত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের আহ্বান"। এর মূল লক্ষ্য কেবল সংকটে পড়া সাধারণ মানুষকে সহায়তা করা নয়, বরং যেসব মানবতাবাদী কর্মী, স্বাস্থ্যসেবক ও ত্রাণকর্মী নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধবিধ্বস্ত বা দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় পরিষেবা দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের সুরক্ষা ও মানবাধিকার সুনিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান ল্) অনুযায়ী সেবা প্রদানকারীরা সর্বাবস্থায় সুরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় তাঁদের ওপর সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
যুদ্ধক্ষেত্র বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো চরম সংকটে যখন লাখ লাখ নিরীহ মানুষের মৌলিক জীবনধারণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন কেবল নিবেদিত প্রাণ মানবতাবাদী ত্রাণকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবকরাই জীবন বাজি রেখে তাদের বেঁচে থাকার আশা হয়ে দাঁড়ান। তাই এসব নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা কেবল নীতিগত বাধ্যবাধকতা নয়, বরং পুরো মানবজাতির অস্তিত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রধান পূর্বশর্ত। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী ত্রাণ শিবির, হাসপাতাল ও সাহায্যকর্মীরা যেকোনো সংঘাতের ঊর্ধ্বে থাকার কথা থাকলেও, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের ওপর ধারাবাহিক হামলা, নির্যাতন ও প্রাণহানি এক ভয়াবহ ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
সেবা প্রদানকারীরা নিজেরা সুরক্ষিত না থাকলে অবরুদ্ধ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানোর পুরো বিশ্বজনীন ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়বে। এর চরম খেসারত দিতে হবে কোটি কোটি নিরীহ মানুষকে। একারণেই 'মানবতার রক্ষকদের সুরক্ষা' নিশ্চিত করাই আজ আন্তর্জাতিক বিবেক ও সভ্যতার টিকে থাকার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মানবিক সংকট এখন চরম রূপ নিয়েছে। গাজা, সুদান, ইউক্রেন, কিংবা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোসহ বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবিক কর্মীদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী রেকর্ডসংখ্যক ত্রাণকর্মী ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস-রেড ক্রিসেন্ট সদস্য হামলায় নিহত ও আহত হয়েছেন। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়ে উদ্ধারকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে। আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে চিকিৎসালয়, অ্যাম্বুলেন্স ও ত্রাণ শিবিরের ওপর হামলা সার্বিক মানবতাবোধকে এক চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশে বিশ্ব মানবতাবাদী দিবসের আবেদন অত্যন্ত সুসংহত ও জীবনঘনিষ্ঠ। নদীমাতৃক ও জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা এ দেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙন নিত্যদিনের সঙ্গী। এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সিপিপি (সিভিল প্রোটেকশন ও রেড ক্রিসেন্ট)-র হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় তরুণ প্রাণ বাজি রেখে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দেন। পাশাপাশি কক্সবাজার ও ভাসানচরে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মানবিক সহায়তা প্রদানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মীরা যে ধৈর্য ও একাগ্রতার পরিচয় দিয়ে আসছেন, তা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত। আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ এবং এনজিওগুলো যেকোনো সংকটে প্রথম সাড়া প্রদানকারী হিসেবে কাজ করে মানবতাবোধের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এক অভূতপূর্ব ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বজুড়ে প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংঘাতের কারণে মানবিক সাহায্য আজ আর কেবল জীবনের সুরক্ষা বা সুনির্দিষ্ট মানবিক তাগিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং বহু ক্ষেত্রে এটি কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রভাবশালী দেশগুলোর সরাসরি সামরিক ও রাজনৈতিক মদদের কারণে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো নিরপেক্ষভাবে খাদ্য, ওষুধ বা উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনায় চরম বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক স্বার্থকে মানবিক কর্মকাণ্ডের ওপরে স্থান দেওয়ার এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে অবরুদ্ধ ও নিপীড়িত বেসামরিক কোটি মানুষের মৌলিক বেঁচে থাকার অধিকারকেই এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সশস্ত্র সংঘাতের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্বব্যাপী মানবিক সংকটকে আরও বেশি বহুমুখী ও জটিল করে তুলেছে। খরা, দাবানল, আকস্মিক বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে 'জলবায়ু শরণার্থী'তে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এই অনিয়মিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং চলমান অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির কারণে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মানবিক সহায়তার চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অথচ সে অনুপাতে বৈশ্বিক মানবিক সাহায্য তহবিল পর্যাপ্ত নয়। একইসঙ্গে জলবায়ু দুর্যোগ ও সামরিক সংঘাত একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন কমানোর পাশাপাশি সংঘাত নিরসনে বিশ্ব নেতাদের অবিলম্বে যৌথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই সুকঠিন মানবিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং মানবতাবাদী কর্মীদের সার্বিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বা জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক মানবিক তহবিলের বৈষম্য দূর করে স্থানীয় মানবিক সংস্থাগুলোকে সরাসরি অর্থায়ন ও ক্ষমতায়ন করতে হবে, যেন তারা প্রান্তিক পর্যায়ে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারে। চূড়ান্তভাবে, সংঘাত ও চরম দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় কাজ করা কর্মীদের জন্য শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ দায়িত্ব।
মানবিকতা কোনো দয়া বা করুণা নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও বৈশ্বিক অঙ্গীকার। বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস ২০২৬ কেবল উদযাপনের কোনো প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বিশ্বের বিবেককে জাগ্রত করার একটি সুনির্দিষ্ট আহ্বান। যুদ্ধ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—প্রতিটি বিষাদময় মুহূর্তে যে মানুষগুলো নিজের ঘর-সংসার ও জীবনের মায়া ত্যাগ করে পরম মমতায় অন্যের সাহায্যে হাত বাড়ান, তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া পুরো মানবজাতির সম্মিলিত দায়িত্ব। বিশ্বব্যাপী বিভাজন ও সহিংসতার প্রাচীর ভেঙে কেবল সদিচ্ছা, মমতা ও সুরক্ষার হাত বাড়িয়েই আমরা গঠন করতে পারি একটি টেকসই, নিরাপদ ও মানবিক বিশ্ব।

প্রতিবছর ১৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস’। বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক সংকটে যেসব নির্ভীক ও আত্মত্যাগী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ান, তাঁদের অসামান্য অবদানকে শ্রদ্ধা জানাতেই এই বিশেষ দিনটির অবতারণা।
২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরাকের বাগদাদে জাতিসংঘ কার্যালয়ে (ক্যানেল হোটেল) এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী বোমা হামলায় জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি সার্জিও ভিয়েরা দ্য মেলোসহ ২২ জন মানবতাবাদী কর্মী প্রাণ হারান। এই মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি ধারণ করে এবং বিশ্বব্যাপী মানবিক কার্যক্রমকে বেগবান করার প্রত্যয়ে ২০০৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯ আগস্টকে 'বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এই দিবসের তাৎপর্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও গভীর।
এবছর বিশ্ব মানবতাবাদী দিবসের আন্তর্জাতিক প্রচারণায় জাতিসংঘ (ইউএন ওসিএইচএ) ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর ঘোষিত মূল স্লোগান বা প্রতিপাদ্য হলো: "#ActForHumanity" (মানবতার পক্ষে দাঁড়ান)। এর মূল ক্যাম্পেইন থিম বা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: "নিহত মানবতাবাদী কর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের বর্ধিত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের আহ্বান"। এর মূল লক্ষ্য কেবল সংকটে পড়া সাধারণ মানুষকে সহায়তা করা নয়, বরং যেসব মানবতাবাদী কর্মী, স্বাস্থ্যসেবক ও ত্রাণকর্মী নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধবিধ্বস্ত বা দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় পরিষেবা দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের সুরক্ষা ও মানবাধিকার সুনিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান ল্) অনুযায়ী সেবা প্রদানকারীরা সর্বাবস্থায় সুরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় তাঁদের ওপর সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
যুদ্ধক্ষেত্র বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো চরম সংকটে যখন লাখ লাখ নিরীহ মানুষের মৌলিক জীবনধারণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন কেবল নিবেদিত প্রাণ মানবতাবাদী ত্রাণকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবকরাই জীবন বাজি রেখে তাদের বেঁচে থাকার আশা হয়ে দাঁড়ান। তাই এসব নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা কেবল নীতিগত বাধ্যবাধকতা নয়, বরং পুরো মানবজাতির অস্তিত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রধান পূর্বশর্ত। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী ত্রাণ শিবির, হাসপাতাল ও সাহায্যকর্মীরা যেকোনো সংঘাতের ঊর্ধ্বে থাকার কথা থাকলেও, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের ওপর ধারাবাহিক হামলা, নির্যাতন ও প্রাণহানি এক ভয়াবহ ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
সেবা প্রদানকারীরা নিজেরা সুরক্ষিত না থাকলে অবরুদ্ধ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানোর পুরো বিশ্বজনীন ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়বে। এর চরম খেসারত দিতে হবে কোটি কোটি নিরীহ মানুষকে। একারণেই 'মানবতার রক্ষকদের সুরক্ষা' নিশ্চিত করাই আজ আন্তর্জাতিক বিবেক ও সভ্যতার টিকে থাকার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মানবিক সংকট এখন চরম রূপ নিয়েছে। গাজা, সুদান, ইউক্রেন, কিংবা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোসহ বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবিক কর্মীদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী রেকর্ডসংখ্যক ত্রাণকর্মী ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস-রেড ক্রিসেন্ট সদস্য হামলায় নিহত ও আহত হয়েছেন। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়ে উদ্ধারকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে। আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে চিকিৎসালয়, অ্যাম্বুলেন্স ও ত্রাণ শিবিরের ওপর হামলা সার্বিক মানবতাবোধকে এক চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশে বিশ্ব মানবতাবাদী দিবসের আবেদন অত্যন্ত সুসংহত ও জীবনঘনিষ্ঠ। নদীমাতৃক ও জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা এ দেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙন নিত্যদিনের সঙ্গী। এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সিপিপি (সিভিল প্রোটেকশন ও রেড ক্রিসেন্ট)-র হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় তরুণ প্রাণ বাজি রেখে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দেন। পাশাপাশি কক্সবাজার ও ভাসানচরে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মানবিক সহায়তা প্রদানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মীরা যে ধৈর্য ও একাগ্রতার পরিচয় দিয়ে আসছেন, তা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত। আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ এবং এনজিওগুলো যেকোনো সংকটে প্রথম সাড়া প্রদানকারী হিসেবে কাজ করে মানবতাবোধের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এক অভূতপূর্ব ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বজুড়ে প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংঘাতের কারণে মানবিক সাহায্য আজ আর কেবল জীবনের সুরক্ষা বা সুনির্দিষ্ট মানবিক তাগিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং বহু ক্ষেত্রে এটি কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রভাবশালী দেশগুলোর সরাসরি সামরিক ও রাজনৈতিক মদদের কারণে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো নিরপেক্ষভাবে খাদ্য, ওষুধ বা উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনায় চরম বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক স্বার্থকে মানবিক কর্মকাণ্ডের ওপরে স্থান দেওয়ার এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে অবরুদ্ধ ও নিপীড়িত বেসামরিক কোটি মানুষের মৌলিক বেঁচে থাকার অধিকারকেই এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সশস্ত্র সংঘাতের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্বব্যাপী মানবিক সংকটকে আরও বেশি বহুমুখী ও জটিল করে তুলেছে। খরা, দাবানল, আকস্মিক বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে 'জলবায়ু শরণার্থী'তে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এই অনিয়মিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং চলমান অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির কারণে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মানবিক সহায়তার চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অথচ সে অনুপাতে বৈশ্বিক মানবিক সাহায্য তহবিল পর্যাপ্ত নয়। একইসঙ্গে জলবায়ু দুর্যোগ ও সামরিক সংঘাত একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন কমানোর পাশাপাশি সংঘাত নিরসনে বিশ্ব নেতাদের অবিলম্বে যৌথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই সুকঠিন মানবিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং মানবতাবাদী কর্মীদের সার্বিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বা জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক মানবিক তহবিলের বৈষম্য দূর করে স্থানীয় মানবিক সংস্থাগুলোকে সরাসরি অর্থায়ন ও ক্ষমতায়ন করতে হবে, যেন তারা প্রান্তিক পর্যায়ে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারে। চূড়ান্তভাবে, সংঘাত ও চরম দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় কাজ করা কর্মীদের জন্য শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ দায়িত্ব।
মানবিকতা কোনো দয়া বা করুণা নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও বৈশ্বিক অঙ্গীকার। বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস ২০২৬ কেবল উদযাপনের কোনো প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বিশ্বের বিবেককে জাগ্রত করার একটি সুনির্দিষ্ট আহ্বান। যুদ্ধ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—প্রতিটি বিষাদময় মুহূর্তে যে মানুষগুলো নিজের ঘর-সংসার ও জীবনের মায়া ত্যাগ করে পরম মমতায় অন্যের সাহায্যে হাত বাড়ান, তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া পুরো মানবজাতির সম্মিলিত দায়িত্ব। বিশ্বব্যাপী বিভাজন ও সহিংসতার প্রাচীর ভেঙে কেবল সদিচ্ছা, মমতা ও সুরক্ষার হাত বাড়িয়েই আমরা গঠন করতে পারি একটি টেকসই, নিরাপদ ও মানবিক বিশ্ব।
.png)

বাংলাদেশের সরকারি অর্থব্যবস্থাপনায় আসছে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা ১ জুলাই–৩০ জুন অর্থবছরের পরিবর্তে সরকার ২০২৮–২৯ অর্থবছর থেকে ১ এপ্রিল–৩১ মার্চ সময়কালকে নতুন অর্থবছর হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন এই সময় কার্যকর করতে ২০২৭–২৮ অর্থবছরকে অন্তর্বর্তী অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করা
৮ মিনিট আগে
তারেক রহমানের সরকার নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে বাসে নারীদের হয়রানি, অস্বস্তি ও অনিরাপত্তার অভিজ্ঞতা খুবই বাস্তব। তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।