এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর: ক্যালেন্ডার বদল, নাকি আর্থিক সংস্কারের সুযোগ

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের সরকারি অর্থব্যবস্থাপনায় আসছে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা ১ জুলাই–৩০ জুন অর্থবছরের পরিবর্তে সরকার ২০২৮–২৯ অর্থবছর থেকে ১ এপ্রিল–৩১ মার্চ সময়কালকে নতুন অর্থবছর হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন এই সময় কার্যকর করতে ২০২৭–২৮ অর্থবছরকে অন্তর্বর্তী অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসেই ওই অর্থবছর শেষ হবে। ১৭ আগস্ট ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৭তম বৈঠকে অর্থ বিভাগের প্রস্তাব অনুমোদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজেট ও সরকারি হিসাব ব্যবস্থায় এ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অর্থবছর কেবল বাজেটের শুরু ও শেষের সময় নির্ধারণ করে না; এর সঙ্গে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, ঋণ ব্যবস্থাপনা, সরকারি ক্রয়, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা এবং আর্থিক জবাবদিহির পুরো কাঠামো যুক্ত। ফলে জুলাই–জুন থেকে এপ্রিল–মার্চে যাওয়া মানে রাষ্ট্রের আর্থিক কার্যক্রমের সময়সূচিকেও নতুনভাবে সাজানো। তবে মূল প্রশ্ন হলো, অর্থবছরের সময় বদলালেই কি বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়বে? উন্নয়ন ব্যয়ের মান উন্নত হবে? বছরের শেষদিকে তাড়াহুড়া করে বরাদ্দ শেষ করার প্রবণতা কমবে?

এপ্রিল–মার্চ ব্যবস্থা বাংলাদেশের আবহাওয়া ও উন্নয়ন বাস্তবতার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদন, অর্থছাড়, সরকারি ক্রয়, রাজস্ব সংগ্রহ এবং ব্যয়ের জবাবদিহিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার না এলে শুধু তারিখ বদলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তাই এই সিদ্ধান্তকে একক কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার হিসেবে না দেখে বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের একটি সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিসঙ্গত। ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামগ্রিক ব্যবস্থপনাও বদলাতে হবে।

অর্থবছর কী, কেন প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের জুলাই–জুন কাঠামোর ইতিহাস

সহজভাবে বললে, অর্থবছর হলো সরকারের আর্থিক পরিকল্পনা ও হিসাবের বার্ষিক সময়সীমা, যার ভিত্তিতে বাজেট তৈরি, বাস্তবায়ন এবং সরকারি আয়–ব্যয়ের মূল্যায়ন করা হয়।

কোন মাসে অর্থবছর শুরু হবে তা শুধু তারিখের উপরই নির্ভর করে না। একটি দেশের আবহাওয়া, কৃষি ও উৎপাদন মৌসুম, কর আদায়ের প্রবণতা, সরকারি কার্যক্রম এবং উন্নয়নকাজের সময়সূচির সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকে। এ কারণেই বিশ্বের সব দেশ একই অর্থবছর অনুসরণ করে না।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, সংস্থাটির অধিকাংশ সদস্যদেশ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্যালেন্ডার বছরকেই অর্থবছর হিসেবে অনুসরণ করে। অন্যদিকে ভারত, কানাডা, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশে অর্থবছর এপ্রিল থেকে মার্চ আবার পাকিস্তানসহ কিছু দেশে জুলাই থেকে জুন আর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থবছর অক্টোবর থেকে সেপ্টেম্বর।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে অর্থবছর ছিল এপ্রিল থেকে মার্চ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান প্রথমদিকে একই ব্যবস্থা বজায় রাখে। পরে আইয়ুব খান সরকারের সময় ১৯৬০–৬১ সাল থেকে জুলাই–জুন অর্থবছর চালু হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও সেই কাঠামো অনুসরণ করে আসছে। সে অর্থে প্রায় সাত দশক পর এপ্রিল–মার্চে ফেরার সিদ্ধান্তটি শুধু নতুন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ নয়। উপমহাদেশের পুরোনো অর্থবছরের কাঠামোয় এক ধরনের প্রত্যাবর্তনও বলা যায়।

বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ ও ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টে অর্থবছর জুলাই থেকে শুরু হয় ফলে এপ্রিল–মার্চ ব্যবস্থা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি, বাজেট প্রণয়ন, হিসাবরক্ষণ এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থাৎ, অর্থবছরের তারিখ বদলানো সহজ শোনালেও বাস্তবে এটি রাষ্ট্রের পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে নতুন সময়সূচির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন।

এত বছর পর কেন বদলাচ্ছে অর্থবছর

বর্তমানে নতুন অর্থবছর শুরু হয় জুলাইয়ে অর্থাৎ বর্ষার মধ্যে। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন সাধারণত অর্থবছরের প্রথম দিকে ধীর থাকে এবং শেষদিকে এসে দ্রুত বাড়ে। ফলে অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসে যখন প্রকল্প শেষ করা ও বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের চাপ বাড়ে তখনই শুরু হয় প্রাক্-বর্ষা ও বর্ষার বৃষ্টি। আবার জুলাই–আগস্টে নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার পরও বর্ষা চলতে থাকে। সড়ক, সেতু, বাঁধ, ড্রেনেজ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য এই সময়টি স্বাভাবিকভাবেই প্রতিকূল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, বর্ষার মধ্যে উন্নয়নকাজ চলায় প্রকল্প দীর্ঘায়িত হয়ে কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ে।

এর সঙ্গে রয়েছে সরকারি ব্যয়ের আরেকটি পুরোনো সমস্যা—বছরের শেষ দিকে তাড়াহুড়া করে অর্থ ব্যয় করার প্রবণতা। বছরের প্রথমদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থব্যয় ধীর থাকলেও শেষ কয়েক মাসে বরাদ্দ ব্যবহারের চাপ বেড়ে যায়। জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা, ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা কিংবা বরাদ্দ শেষ করার তাগিদ অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পিত ব্যয়ের বদলে তড়িঘড়ি ব্যয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর চালু হলে জানুয়ারি থেকে মার্চ হবে অর্থবছরের শেষ তিন মাস। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমের সুবিধা নিয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ বর্ষার আগেই এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ যুক্তি নতুনও নয়। ২০১৮ সালে প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক কলামে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ লিখেছিলেন, অর্থবছর বদলালেই অর্থনীতির মূল চরিত্র পাল্টাবে না, তবে সময়সূচির ভালো সমন্বয় হলে জনদুর্ভোগ এবং কিছু অপচয়ের সুযোগ কমতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এপ্রিল–মার্চে যাওয়ার যুক্তি বেশ ইতিবাচক। উন্নয়ন ব্যয়ের শেষ পর্যায়কে বর্ষা থেকে শুষ্ক মৌসুমে সরিয়ে আনা গেলে নির্মাণকাজের জন্য তুলনামূলক অনুকূল সময় পাওয়া যাবে।

তবে উল্টো যুক্তিটিও আছে। জুলাই–জুন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক, হিসাব ও বাজেট কাঠামোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত; সেটি বদলানোরও একটি অর্থনৈতিক মূল্য আছে। নতুন ব্যবস্থার সম্ভাব্য সুফল যদি রূপান্তর ব্যয় ও সাময়িক প্রশাসনিক জটিলতাকে ছাড়িয়ে না যায়, তবে অর্থবছর বদলের প্রকৃত লাভ কতটা সেই প্রশ্নও থেকে যায়।

জুনের তাড়াহুড়া কি মার্চে চলে যাবে

বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ শুধু আবহাওয়া নয়। প্রকল্প অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র, অর্থছাড়, ঠিকাদার নিয়োগ থেকে শুরু করে কাজ মাঠে গড়ানো পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। অনেক প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে, সঙ্গে বাড়ে ব্যয়ও। এসব ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা অপরিবর্তিত রেখে শুধু জুলাই–জুনের জায়গায় এপ্রিল–মার্চ বসালে পরিস্থিতি আমূল বদলে যাবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। সমস্যা যদি ক্যালেন্ডারে না থেকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় থাকে, তাহলে জুনের সংকট কেবল মার্চে স্থানান্তরিত হবে।

বর্তমানে অর্থবছরের শেষদিকে বরাদ্দ শেষ করার যে চাপ দেখা যায়, নতুন ব্যবস্থায় সেটি যেন মার্চের ‘শেষ মুহূর্তের ব্যয়’-এ রূপ না নেয়- সেখানেই বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ১ এপ্রিল নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার আগেই প্রকল্পগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র, অর্থায়ন, ঠিকাদার নির্বাচন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন যদি এপ্রিলের পরও চলতে থাকে, তাহলে বর্ষার আগের অনুকূল সময়টুকু আবারও প্রস্তুতির পেছনেই চলে যাবে। তাতে অর্থবছর পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই দুর্বল হয়ে পড়বে অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের আসল চ্যালেঞ্জ ১ এপ্রিলের পর নয় শুরু হবে ১ এপ্রিলের আগেই।

কোথায় বাস্তব সুফল পাওয়া যেতে পারে

প্রথমত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয়ের শেষ পর্যায়কে বর্ষা থেকে শুষ্ক মৌসুমে আনা সম্ভব হবে। এতে সড়ক, সেতু, বাঁধ, ড্রেনেজসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজের সময় নির্বাচন তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বরাদ্দ ব্যয়ের চাপ কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কিছু সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। অনুকূল মৌসুমে কাজ সম্পন্ন করা গেলে নির্মাণে অপ্রত্যাশিত বিলম্ব এবং আবহাওয়াজনিত অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। অর্থনীতির হিসাবে সরকারি অর্থেরও সময়মূল্য আছে। একটি প্রকল্প এক বছর দেরিতে শেষ হওয়া মানে শুধু ব্যয় বাড়া নয়; সেই এক বছর মানুষ তার সেবা থেকেও বঞ্চিত থাকে। মূল্যস্ফীতির সময়ে বিলম্বিত ব্যয় আরও ব্যয়বহুল হয়—অর্থাৎ দেরিরও একটি অর্থনৈতিক মূল্য আছে।

তৃতীয়ত, কৃষি, সেচ, খাদ্য সংগ্রহ, কৃষিঋণ এবং মৌসুমভিত্তিক সরকারি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বাজেট পরিকল্পনার সমন্বয় তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অংশ আগের তুলনায় কমলেও খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয়ের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক এখনো গভীর।

তবে এপ্রিল–মার্চ অর্থবছরকে কৃষিখাতের জন্য স্বয়ংক্রিয় সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন ফসলের মৌসুম ভিন্ন। বাস্তব সুফল পেতে হলে কৃষি মৌসুম, বাজেট পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের সময়সূচিকে সমন্বিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন সরকারি ব্যয়ের মূল্যায়নে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই কোনো মন্ত্রণালয় বা প্রকল্প কত শতাংশ বরাদ্দ ব্যয় করতে পেরেছে, সেটিই সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে ওঠে। কিন্তু শতভাগ অর্থ ব্যয় করাই সফলতার নিশ্চয়তা নয়। বরং দেখতে হবে সেই অর্থে কতটা বাস্তব কাজ হয়েছে এবং মানুষ কতটা সুফল পেয়েছে।

নতুন সময়সূচিকে যদি এই ধরনের ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায় তাহলে অর্থবছর পরিবর্তন সরকারি অর্থের আরও কার্যকর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

৯ মাসের অর্থবছর: হিসাব মিলবে কীভাবে

নতুন ব্যবস্থায় যাওয়ার সবচেয়ে জটিল ধাপ হতে পারে ২০২৭–২৮ সালের ৯ মাসের অন্তর্বর্তী অর্থবছর। জুলাই ২০২৭ থেকে মার্চ ২০২৮ পর্যন্ত এই সময়ের রাজস্ব, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন ব্যয়, বাজেট ঘাটতি, ঋণ, ভর্তুকি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তথ্য আগের ১২ মাসের অর্থবছরের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে বিভ্রান্তিকর চিত্র তৈরি হতে পারে। আবার ৯ মাসের তথ্যকে সরলভাবে ১২ মাসে রূপান্তর করাও যথাযথ হবে না। কারণ রাজস্ব আদায় এবং সরকারি ব্যয় বছরের প্রতিটি মাসে সমান হারে ঘটে না। ৯ মাসের হিসাবকে বারো মাসের ছকে ফেললে অর্থনীতির প্রকৃত ছবিই আড়াল হয়ে যেতে পারে।

তাই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে তুলনাযোগ্য তথ্য প্রকাশের একটি স্পষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করা জরুরি। নয় মাসের প্রকৃত তথ্যের পাশাপাশি আগের অর্থবছরের একই ৯ মাসের তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকের ১২ মাসভিত্তিক ধারাবাহিক হিসাবও রাখা প্রয়োজন, যাতে সময়সীমা বদলের কারণে অর্থনীতির প্রকৃত প্রবণতা অস্পষ্ট না হয়।

একইসঙ্গে বাজেট প্রণয়নের সময়সূচিও নতুন করে সাজাতে হবে। অর্থবছর ১ এপ্রিল শুরু হলে তার আগেই বাজেট উপস্থাপন, পর্যালোচনা ও অনুমোদনের কাজ শেষ করতে হবে। ফলে রাজস্ব পূর্বাভাস, মন্ত্রণালয়ের ব্যয়সীমা, উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসও আগের তুলনায় এগিয়ে আনতে হবে।

বেসরকারি খাতের ওপর কী প্রভাব পড়বে

অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সরকারি দপ্তরে সীমাবদ্ধ না থেকে বেসরকারি খাতকেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হতে পারে। বিশেষ করে কর হিসাব, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, ব্যাংকিং প্রতিবেদন, সরকারি চুক্তি এবং দরপত্রের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো হিসাবরক্ষণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে। প্রয়োজন হলে এসব ব্যবস্থাও নতুন সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে, যা শুরুতে বাড়তি ব্যয় ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে সরকারের অর্থবছর পরিবর্তন মানেই সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে একই হিসাববর্ষ অনুসরণ করবে, এমন নয়। সেটি নির্ভর করবে কর আইন, কোম্পানি আইন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক বিধানে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হয় তার ওপর।ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভ-লোকসানের মৌলিক চিত্র বদলানোর চেয়ে,হিসাব ও প্রতিবেদন তৈরির সময়সূচিতে পরিবর্তনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব পড়বে

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অর্থবছর পরিবর্তনের তাৎক্ষণিক প্রভাব খুব বড় হওয়ার কথা নয়। তবে করদাতাদের জন্য এর প্রভাব কিছুটা বেশি দৃশ্যমান হতে পারে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ক্ষেত্রে করবর্ষ বা আয়কর রিটার্নের সময়সূচি নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় করা হলে আয় গণনা, রিটার্ন দাখিল এবং বিভিন্ন কর-সুবিধা গ্রহণের সময় পরিবর্তিত হতে পারে।বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতসহ সময়সীমাভিত্তিক বিভিন্ন সুবিধার হিসাবও নতুন সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য করার প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য পরিবর্তনটি মূলত করের হার বা আয়ের পরিমাণ বদলের বিষয় নয়; বরং কোন সময়ের আয় কোন করবর্ষে গণনা হবে এবং কখন রিটার্ন দিতে হবে- সেই সময়সূচির পরিবর্তনই বেশি দৃশ্যমান হবে।

অর্থবছর বদলাবে, ব্যবস্থাপনা কি বদলাবে

সবকিছু মিলিয়ে এপ্রিল–মার্চ অর্থবছরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে যৌক্তিকতা আছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া, উন্নয়নকাজের মৌসুমি বাস্তবতা এবং বছরের শেষদিকে ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নতুন সময়সূচি কিছু বাস্তব সুবিধা দিতে পারে। তবে অর্থবছর পরিবর্তনকে নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সংস্কার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রকল্প প্রস্তুতি, অর্থছাড় ও জবাবদিহির কাঠামো সংস্কার না হলে নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য সুফল সীমিত থাকবে; তাই প্রকল্পগুলোকে এপ্রিলের আগেই বাস্তবায়ন-উপযোগী করতে হবে।যুক্তিসংগত ক্ষেত্রে অব্যবহৃত বরাদ্দের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগ রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে কেবল হিসাবের খাতা বন্ধ করার জন্য নিম্নমানের কাজে অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি না হয়। একই সঙ্গে ৯ মাসের অন্তর্বর্তী অর্থবছরের তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করতে হবে; তুলনাযোগ্য পরিসংখ্যান, স্বচ্ছ হিসাবপদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রতিবেদন না থাকলে প্রথম বছরেই অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই কয়েক বছর পর এই সিদ্ধান্তের সাফল্য বিচার করার সময় প্রশ্নটি শুধু এমন হওয়া উচিত নয়- বাংলাদেশ জুলাই–জুন থেকে এপ্রিল–মার্চে যেতে পেরেছে কি না? প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রকল্প কি আগের তুলনায় সময়মতো শেষ হচ্ছে? ব্যয় বৃদ্ধি কমছে? কাজের মান উন্নত হচ্ছে? রাজস্ব পূর্বাভাস আরও বাস্তবসম্মত হচ্ছে? সরকারি অর্থের অপচয় কমছে? একই করদাতার অর্থে মানুষ আগের তুলনায় বেশি ও উন্নত সরকারি সেবা পাচ্ছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হলেই অর্থবছর পরিবর্তনকে সফল সংস্কার বলা যাবে।

  • সামিয়া জাহান: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর: ক্যালেন্ডার বদল, নাকি আর্থিক সংস্কারের সুযোগ