৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা: তাকাতে হবে সৃজনশীল নতুনদের দিকে

স্ট্রিম গ্রাফিক

স্থবির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ‘বেসরকারি খাত উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। ওই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প-কারখানা ও সেবাপ্রতিষ্ঠানের পুনরুজ্জীবন, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, কৃষি, তৈরি পোশাক, সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সিএমএসএমই ইত্যাদি খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান। প্রথম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, কর্মসূচির শিরোনামটি উৎসাহব্যঞ্জক এবং এর আওতাধীন তহবিলের পরিমাণও যথেষ্ট বলা যায়। কিন্তু কর্মসূচিটিকে ভেতর থেকে দেখতে গেলে সহজেই চোখে পড়বে, এতে এমন অনেক অসঙ্গতি, যুক্তিহীনতা এবং রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত পক্ষপাত লুকিয়ে আছে, যেগুলো বহাল থাকায় শেষ পর্যন্ত এ কর্মসূচি স্থবির অর্থনীতিকে কতোটা সচল করে তুলতে পারবে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায়।

এর তহবিল ঘিরে অস্বচ্ছতার শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না, যার ইঙ্গিত খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যেই পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, ‘অতীতে প্রণোদনার টাকা নয়ছয়ের বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এবার তা ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা চিন্তা করা হচ্ছে।’ স্বীকারই করে নেয়া হলো, এ ধরনের কর্মসূচিতে নয়ছয় ঘটে থাকে। নিকট ভবিষ্যতেও নয়ছয় ঘটার শঙ্কা যথেষ্টই রয়েছে। সে কারণেই সতর্কতা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে বলতে হচ্ছে, সম্ভাব্য নয়ছয় ঠেকাতে তারা নানা পদক্ষেপের কথা ভাবছেন। শেষ পর্যন্ত তা কতোটা ঠেকানো যাবে, সেটিই প্রশ্ন। খেয়াল রাখা দরকার, সম্পদ ঘাটতির দেশে ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো তহবিল যদি নয়ছয়ের শিকার হয়, তাহলে এর প্রতিক্রিয়া যে অর্থনীতিকে যথেষ্টই ভোগাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এমনি পরিস্থিতিতে প্রণোদনা তহবিল ঘিরে সৃষ্ট শঙ্কার দিকগুলো নিয়ে খানিকটা আলোকপাতের চেষ্টা করা হলো।

এক. উল্লিখিত ৬০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে যা যা করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে উৎপাদন বৃদ্ধির আয়োজন সামান্য। বরং এ অর্থ দিয়ে মুনাফা বৃদ্ধি ও ব্যক্তিগত লাভালাভের চেষ্টাই বেশি। উল্লিখিত অর্থ কী কী কাজে ব্যবহৃত হবে, সে সংক্রান্ত নির্দেশনায় কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিকের মজুরি ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কাঁচামাল আমদানি ছাড়া বাদ বাকি কাজের সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। সত্যি বলতে, এ কর্মসূচির আওতায় মূলধনী যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, নতুন প্রযুক্তি আহরণ, নয়া উৎপাদন পদ্ধতি সংযোজন ইত্যাদির মতো উৎপাদন বৃদ্ধিমূলক কাজের প্রতি বিশেষ কোনো আগ্রহ দেখানো হয়নি। অথচ স্থবির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সেগুলোই হওয়া উচিৎ ছিল অগ্রাধিকার।

দুই. বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও এর উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সামর্থ্যের বিবেচনায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বড় অংক বটে। একটি হয়রানিমুক্ত ও গতিশীল ঋণদান ব্যবস্থায় এ পরিমাণ পুঁজি দিয়ে অনেক নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। তা করার জন্য অনেক উদোক্তা বছর দুয়েক যাবৎ একটি ব্যবসাবান্ধব পরিস্থিতির অপেক্ষায় দিন গুণছেনও বটে। তাদের আশা ছিল, নির্বাচিত সরকার এলে তারা হয়তো কার্যকর বিনিয়োগ নিয়ে মাঠে নামতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণায় স্টার্টআপের গুটিকতক ক্ষুদে উদ্যোক্তা ছাড়া নতুন উদোক্তাদের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে তেমন কিছুই নেই। এমনকি বিএমআরই’র মাধ্যমে নতুন উৎপাদন-ক্ষমতা সংযোজন বিষয়েও কিছু বলা হয়নি। সুযোগ-সুবিধা যা কিছু রাখা হয়েছে, সবই বিদ্যমান উদ্যোক্তাকে কৌশলে একচ্ছত্র মুনাফা ও নগদ সুবিধাদানের জন্য। তাহলে উক্ত ঘোষণায় অর্থনীতি সচল করার যে কথা বলা হলো, সেটি কিভাবে সম্ভব হবে? এ প্রক্রিয়ায় প্রস্তাবিত প্রণোদনা ভোগকারী উদ্যোক্তাদের লাভালাভে স্ফীতি ঘটলেও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আনার সুযোগ খুবই সীমিত।

তিন. নিম্ন-উৎপাদনশীলতা নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় রুগ্ন হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানা পুনরুজ্জীবনে সরকার ১৯৯০-এর গোড়াতেও এ ধরনের প্রণোদনা কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু উপর্যুপরি বরাদ্দ ও ভর্তুকি প্রদান সত্ত্বেও সে কর্মসূচি সফল হয়নি। তালিকাভুক্ত রুগ্ন কারখানার কোনোটিই শেষ পর্যন্ত রোগমুক্ত হতে পারেনি। মাঝখান থেকে প্রণোদনার নাম করে ওইসব রুগ্নশিল্পের মালিকের হাতে এত বড় অংকের অর্থ তুলে দেয়া হয়েছিল যে, সেজন্য জনগণের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো ছাড়া বিকল্প ছিল না। বর্তমান ঘোষণার ধরন দেখেও শঙ্কা হচ্ছে, রুগ্ন ও বন্ধ কারখানা এবং সেবাপ্রতিষ্ঠান সচল করার নামে আবারও ১৯৯০-এর দশকের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না তো?

চার. রুগ্ন শিল্প পুনরুজ্জীবন কর্মসূচিতে ১৯৯০-এর দশকে শুধু শিল্প-কারখানাই অন্তর্ভুক্ত ছিল। গত ২৩ মে’র ঘোষণায় শিল্পের সাথে যোগ হয়েছে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও। এর মানে, অর্থের সম্ভাব্য অপচয় শুধু শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা সেবা খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর শিল্পনীতির ত্রুটির কারণে সেবার তুলনায় উৎপাদন খাত আগে থেকেই যেখানে অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে ধুকছিল; নতুন সিদ্ধান্তের ফলে তার সেই বিপদের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পাবে বলেই আশঙ্কা।

অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে এই মুহূর্তে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেবার তুলনায় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে অধিক মনোযোগী হওয়া, বিদ্যমান উদ্যোক্তার পাশাপাশি অধিক সংখ্যায় নতুন উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগে যুক্ত করা, এসএমই খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান এবং কায়েমী স্বার্থবাদী চতুর উদ্যোক্তার অন্যায্য স্বার্থের পাহারায় ব্যস্ত না থেকে নতুন প্রজন্মের সৎ ও পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করা।

পাঁচ. ৬ শতাংশ ভর্তুকিযুক্ত প্রণোদনা তহবিলের ৬০ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করতে যেয়ে সরকারকে এখন বাধ্য হয়েই জনগণের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপাতে হবে। এতে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়বে মূল্যস্ফীতি। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে শুরু করেছে। মে’তে এসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসে সর্বোচ্চ। এ অবস্থায় ঘোষিত প্রণোদনা তহবিলের ৬০ হাজার কোটি টাকা বাজারে আসতে থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে বৈকি!

ছয়. প্রণোদনা তহবিলের আওতায় ২৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যা যা করলে নয়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তার কোনো সংযোজনই এ তহবিলাধীন কার্যক্রমের আওতায় নেই। চমক সৃষ্টিকারী প্রকৃত হিসাব-নিকাশহীন এ ধরনের তথ্য পরিহার না করলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনায় দিনে দিনে বিভ্রান্তি ও দিক-নির্দেশহীনতাই শুধু বাড়বে।

সাত. রুগ্ন ও বন্ধ কারখানা এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসহ প্রণোদনা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা কাদের দ্বারা, কিভাবে ও কোন মানদণ্ডে বাছাই করা হবে, সে বিষয়ে এতে কোনো নির্দেশনা নেই। অতীতে রুগ্ন শিল্পের তালিকা তৈরি করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। কিন্তু ২৩ মে’র ঘোষণার বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় অবহিত বলে মনে হচ্ছে না। কাজটি অবশ্য ব্যাংকও করতে পারে। কিন্তু কোন মানদণ্ডে, কোন পদ্ধতিতে এটি করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। তাছাড়া এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে যোগ্যতানুযায়ী প্রাপ্যতার অগ্রাধিকারক্রম তৈরি করা না হলে সেখানে রাজনৈতিক প্রভাবে অনুপযুক্ত প্রতিষ্ঠান ঢুকে যাওয়ার শঙ্কা থাকবে।

আট. খেলাধুলা, নাটক, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ইত্যাদি একটি রাষ্ট্রের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু এগুলো উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের সাথে কিভাবে যুক্ত, তা স্পষ্ট নয়। ফলে বিনিয়োগ খাতের জন্য ঘোষিত উক্ত প্রণোদনা তহবিলের আওতায় এগুলো কিভাবে এলো, তা বোধগম্য নয়। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে উল্লিখিতদের অনুদান হিসেবে অর্থ প্রদান করা হবে। গণমাধ্যমে আসা তথ্য থেকে জানা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল অস্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। তাহলে এটিও কি সে ধারার নতুনতর সম্প্রসারণ হবে?

সব মিলিয়ে বলব, উপরোক্ত প্রণোদনা তহবিল ঘিরে এমনি আরো অসঙ্গতিই হয়তো ক্রমান্বয়ে চোখে পড়বে। সে তালিকা দীর্ঘ না করে শুধু এটুকু বলব, স্থবির অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ব্যাংকঋণের প্রবাহ অবশ্যই বাড়াতে হবে; কিন্তু তাই বলে বিতর্কিত রুগ্ন শিল্পের পুনর্বাসন সেখানে কেনোভাবেই প্রধান অগ্রাধিকার হতে পারে না। অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে এই মুহূর্তে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেবার তুলনায় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে অধিক মনোযোগী হওয়া, বিদ্যমান উদ্যোক্তার পাশাপাশি অধিক সংখ্যায় নতুন উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগে যুক্ত করা, এসএমই খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান এবং কায়েমী স্বার্থবাদী চতুর উদ্যোক্তার অন্যায্য স্বার্থের পাহারায় ব্যস্ত না থেকে নতুন প্রজন্মের সৎ ও পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করা। বিপুল রাজস্ব ঘাটতির অর্থনীতিতে ৬ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে প্রণোদনা তহবিল প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা জনপ্রিয় রাজনৈতিক ধারণা হলেও হতে পারে; কিন্তু তা কোনোভাবেই অর্থনৈতিক পেশাদারিত্বমূলক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। উক্ত প্রণোদনা তহবিলের আওতায় সুদ-ভর্তুকি কোনোভাবেই ২ থেকে ৩ শতাংশের বেশি করা সমীচীন হবে না। আর সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ও লড়াকু মানসিকতা না থাকায় অতীতে যারা নিজেদের শিল্প ও ব্যবসাকে রুগ্নতা থেকে বাঁচাতে পারেননি, তাদের পেছনে সময় ও সম্পদ ব্যয় না করে সরকারের উচিৎ হবে সৎ, পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান উদ্যোক্তাদের দিকে তাকানো। তাহলেই কেবল ভঙ্গুর অর্থনীতি নতুন করে গতি, মান, প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা ইত্যাদি খুঁজে পাবে।

  • আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত