শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

ব্রাজিল নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল। অনেকে হয়তো একে ভাগ্যের খেলা বলে সান্ত্বনা খুঁজবেন। আমি সেটা মানতে রাজি নই। এটা কোনো নিয়তি নয়, বরং দিনের পর দিন একই ভুলের পুনরাবৃত্তির অবধারিত ফল। সেলেসাওরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছে ঠিকই, আর পেনাল্টি মিস হওয়াটাও ফুটবলেরই অংশ, তাই ব্রুনো গুইমারেসকে এককভাবে দোষ দেওয়ার পক্ষে আমি নই। কিন্তু আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। দিনের পর দিন উন্নতির কথা বললেও ব্রাজিল কেন বারবার একই বৃত্তে আটকে থাকছে, সেই জবাব খোঁজা দরকার। প্রতিটা বিশ্বকাপের আগে আমরা শুনি নতুন প্রজন্মের কথা, নতুন দর্শনের কথা, অথচ নকআউট পর্বে এসে সেই একই পুরোনো ছবি ফিরে আসে। আজকের হারও তার ব্যতিক্রম নয়।
নরওয়ে মাঠে নেমেছিল স্পষ্ট একটা পরিকল্পনা নিয়ে, আর সেটাই আমার কাছে আজকের ম্যাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। মাঝমাঠে জমাট একটা ব্লক তৈরি করে তারা ব্রাজিলের বল পজেশনকে অকেজো বানিয়ে দিয়েছিল। বল পায়ে থাকলেও ফাইনাল থার্ডে গিয়ে সেটা কোনো কাজে লাগেনি। আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য এটাই, বল দখলে রাখা মানেই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখা নয়। এই ভুল ধারণাটা লাতিন আমেরিকার ফুটবল সংস্কৃতিতে এখনো গভীরভাবে গেঁথে আছে বলেই আমার মনে হয়। বল পায়ে রেখে সুন্দর ফুটবল খেলার প্রদর্শনী যতটা আত্মতৃপ্তি দেয়, ততটা পয়েন্ট এনে দেয় না। আর্লিং হালান্ডের প্রথম গোলটাও আমার চোখে নেহাত দুর্ভাগ্য নয়, বরং ব্রাজিলের উঁচু ডিফেন্সিভ লাইন আর আকাশপথের লড়াইয়ে দুর্বলতার সরাসরি খেসারত। এই দুর্বলতা নতুন নয়, বহুদিন ধরেই বিশ্লেষকরা এই বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন, অথচ কোচিং স্টাফ তার সমাধান খুঁজে পাননি। প্রথমার্ধে গুইমারেসের পেনাল্টি নিলান্ড ঠেকানোর পর দল যে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল, সেটা মাঠেই স্পষ্ট বোঝা গেছে। পাসের গতি কমে গিয়েছিল, খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। নেইমার শেষদিকে এক গোল শোধ করলেও তা যথেষ্ট ছিল না, বরং সেটা যেন শুধু পরিসংখ্যানের স্বার্থে পাওয়া একটা সান্ত্বনা গোল।
একটা পরিসংখ্যান আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। ব্রাজিল ইতিহাসে কখনো নরওয়েকে হারাতে পারেনি। আজও সেই রেকর্ড অক্ষত থাকল। এটা কাকতালীয় নয় বলেই আমার বিশ্বাস, এর পেছনে একটা কাঠামোগত দুর্বলতা কাজ করছে। ক্যাসেমিরো বয়সের কারণে আগের গতি হারিয়েছেন, লুকাস পাকেতা ইনজুরিতে না থাকায় গুইমারেসকে একাই মাঝমাঠ সামলাতে হয়েছে, আর ফলে রক্ষণ থেকে আক্রমণে ওঠার ধারাটাই ভেঙে পড়েছে। এই একটা জায়গাতেই আমি মনে করি ব্রাজিলের গোটা সমস্যার মূল লুকিয়ে আছে। মাঝমাঠে ভারসাম্যহীনতা থাকলে যত ভালো আক্রমণভাগ বা রক্ষণভাগই থাকুক না কেন, দলটা কখনোই স্বস্তিতে খেলতে পারে না।
মাত্র পঁয়ত্রিশ শতাংশ বল দখল নিয়ে খেলা একটা দলের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করাও বোধহয় অন্যায়। নতুন প্রজন্ম পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় আনচেলোত্তি বাধ্য হয়েছেন অভিজ্ঞদের ওপর ভরসা রাখতে, অথচ ক্যাসেমিরো, দানিলো, মারকিনিওস কিংবা নেইমার কেউই এই টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরা ফর্মে ছিলেন না। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন হলেও সত্য এটাই যে, একটা প্রজন্মের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে, অথচ পরবর্তী প্রজন্ম এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি। এই জায়গাতেই হালান্ড পার্থক্য গড়ে দিলেন। নুসার নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে প্রথম গোল, আর দ্বিতীয়টা বক্সের বাইরে থেকে ঠান্ডা মাথায় নেওয়া নিচু শট। এই জোড়া গোলে তিনি মেসির সঙ্গে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে উঠে এলেন। একজন খেলোয়াড় কীভাবে একটা গোটা ম্যাচের ভাগ্য একাই নির্ধারণ করে দিতে পারেন, হালান্ড আজ তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
আনচেলোত্তিকে নিয়ে এখন যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তার সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না। রিয়াল মাদ্রিদে পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা একজন কোচ যখন ইউরোপের সবচেয়ে নিরাপদ চাকরি ছেড়ে একটা ভাঙাচোরা দলের দায়িত্ব নেন, সেটাকে আমি সাহস বলেই দেখি। এই সিদ্ধান্তটা আর্থিকভাবে বা পেশাগত নিরাপত্তার দিক থেকে মোটেও সহজ ছিল না, তবু তিনি সেটা নিয়েছেন, আর সেই সাহসের মূল্যায়ন হওয়া উচিত আলাদাভাবে। তার কোচিং দর্শনের মূল শক্তি হলো, তিনি খেলোয়াড়দের ওপর জোর করে কোনো সিস্টেম চাপান না, বরং হাতে যা আছে তা দিয়েই সিস্টেম সাজান। কিন্তু ব্রাজিলের সমস্যাটা ঠিক এখানেই। রিয়ালে তার হাতে ছিল বেনজেমার মতো সম্পূর্ণ একজন নাম্বার নাইন, ভিনিসিয়াসের মতো উইঙ্গার। ব্রাজিলে সেই মানের বিকল্প নেই। এন্দ্রিক এখনো কাঁচা, তাই কুনিয়াকে ফলস নাইন হিসেবে খেলাতে হয়েছে, যা তার নিজের আক্রমণাত্মক দর্শনের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
আজকের আসল নায়ক হালান্ড, এটা স্বীকার করতেই হবে। প্রথম গোলে পজিশনিং নিখুঁত, চিতাবাঘের মতো লাফিয়ে হেডে বল জালে জড়ালেন। দ্বিতীয়টায় মাথা ঠান্ডা রেখে বক্সের বাইরে থেকে গোলকিপারের এক কোণে বল পাঠালেন। গোলের পর বাড়াবাড়ি উদযাপন নেই, ডিগবাজি নেই, এটাই তার পরিণত হয়ে ওঠার লক্ষণ বলে আমার মনে হয়। একটা সময় ছিল যখন হালান্ডকে শুধু বক্সের ভেতরের একজন গোলমেশিন হিসেবে দেখা হতো, অথচ আজকের পারফরম্যান্স দেখিয়ে দিল তার খেলায় এখন পরিণতি আর ধৈর্যও যোগ হয়েছে। গার্দিওলা এমনি এমনি তাকে সিটিতে আনেননি, একজন প্রকৃত জহুরি ঠিকই রত্ন চিনে নেন।
ফুটবল যেভাবে বদলাচ্ছে, তাতে লাতিন আমেরিকার কিছু দল নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করেছে, আর সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা। চিলি অনেক আগে থেকেই পাওয়ার ফুটবল আর হাই-প্রেসিং রপ্ত করার চেষ্টা করছে। কলম্বিয়া এখনো তাদের চিরচেনা পজেশন ফুটবল খেলে, তবে তাদের খেলায়ও এখন ইউরোপীয় ধাঁচের লং বল আর দ্রুত প্রান্ত বদলের ছাপ স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় চমক আমার কাছে প্যারাগুয়ে। কনমেবল বাছাইপর্বে সবচেয়ে কম পাস খেলা আর সবচেয়ে বেশি ট্যাকল করা এই দলটা শুধু শারীরিক দৃঢ়তা আর নিখুঁত লো-ব্লক দিয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে টাইব্রেকারে বিদায় করে দিল। এই ঘটনাটা আমার কাছে প্রতীকী মনে হয়। শৈল্পিকতা ছাড়াও কীভাবে শৃঙ্খলা আর পরিশ্রম দিয়ে বড় দলকে হারানো যায়, প্যারাগুয়ে সেটা দেখিয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিও প্যারাগুয়েকে হারাতে সুন্দর ফুটবলের বাইরে গিয়ে রীতিমতো শারীরিক লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচনা হয়েছে। অথচ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা এখনো সেই পুরোনো জোগো বোনিতো বা রোমান্টিক ফুটবলের মোহ কাটিয়ে উঠতে পারছে না। এই মোহ থেকে বেরিয়ে না আসতে পারলে আগামী দিনগুলোতেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখতে হবে বলে আমার আশঙ্কা। আধুনিক গতি আর প্রেসিংয়ের সঙ্গে এই রোমান্টিকতার মিল না ঘটাতে পারলে লাতিন ফুটবল আরও পিছিয়ে পড়বে।
তবে এত অন্ধকারের মধ্যেও আমি আশার আলো দেখি ব্রাজিলের তরুণ প্রজন্মে। এস্তেভাও উইলিয়ানকে নেইমারের পর সবচেয়ে প্রতিভাবান মনে করা হচ্ছে, চেলসিতে তিনি নিজের জাত চিনিয়ে চলেছেন। লুইস গিলহার্মি ওয়েস্ট হ্যামে ধারাবাহিক, আন্দ্রেই সান্তোস মাঝমাঠে গতি যোগ করছেন, ইগর থিয়াগো প্রিমিয়ার লিগে ভালো খেলছেন। এই তরুণদের মধ্যে যে সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তা যদি সঠিকভাবে লালন করা যায়, তাহলে আগামী চক্রে ব্রাজিল অনেক শক্তিশালী একটা দল হয়ে উঠতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। আনচেলোত্তির জন্য আগামী চার বছরের কাজ হবে এই তরুণদের ঘিরে একটা টেকসই কাঠামো তৈরি করা, যেখানে ব্যক্তিগত শিল্পের সঙ্গে আধুনিক সাংগঠনিক শৃঙ্খলার মিল ঘটবে। সিবিএফ যদি তাকে যথেষ্ট সময় আর স্বাধীনতা দেয়, তবেই তার ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। তাড়াহুড়ো করে কোচ বদল করলে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং একই বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ার ইতিহাস আরও দীর্ঘ হবে।
দিনশেষে আমার কথা একটাই। কেবল পুরোনো লাতিন শিল্পের গর্ব করে আধুনিক ফুটবল জেতা যায় না। প্যারাগুয়ে এই টুর্নামেন্টে যা দেখিয়ে দিল, সেটাই এখনকার ফুটবলের ভাষা। আনচেলোত্তির মতো একজন সফল কোচকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে আমাদের বোঝা দরকার, সমস্যাটা কাঠামোয়, কোনো একজন মানুষের মাথায় নয়। যতদিন এই সত্যটা মেনে নেওয়া না হবে, ততদিন প্রতিটা বিশ্বকাপের পর একই আলোচনা ফিরে আসতে থাকবে। ব্রাজিলের জন্য পুনর্বিন্যাসের শুভকামনা রইল। তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার জন্যও সামনের রাউন্ডে একই কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে বলে আমার ধারণা। এই নির্মম সত্যটা লাতিন পরাশক্তিরা যত দ্রুত মেনে নেবে, তাদের জন্য ততই মঙ্গল।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ব্রাজিল নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল। অনেকে হয়তো একে ভাগ্যের খেলা বলে সান্ত্বনা খুঁজবেন। আমি সেটা মানতে রাজি নই। এটা কোনো নিয়তি নয়, বরং দিনের পর দিন একই ভুলের পুনরাবৃত্তির অবধারিত ফল। সেলেসাওরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছে ঠিকই, আর পেনাল্টি মিস হওয়াটাও ফুটবলেরই অংশ, তাই ব্রুনো গুইমারেসকে এককভাবে দোষ দেওয়ার পক্ষে আমি নই। কিন্তু আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। দিনের পর দিন উন্নতির কথা বললেও ব্রাজিল কেন বারবার একই বৃত্তে আটকে থাকছে, সেই জবাব খোঁজা দরকার। প্রতিটা বিশ্বকাপের আগে আমরা শুনি নতুন প্রজন্মের কথা, নতুন দর্শনের কথা, অথচ নকআউট পর্বে এসে সেই একই পুরোনো ছবি ফিরে আসে। আজকের হারও তার ব্যতিক্রম নয়।
নরওয়ে মাঠে নেমেছিল স্পষ্ট একটা পরিকল্পনা নিয়ে, আর সেটাই আমার কাছে আজকের ম্যাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। মাঝমাঠে জমাট একটা ব্লক তৈরি করে তারা ব্রাজিলের বল পজেশনকে অকেজো বানিয়ে দিয়েছিল। বল পায়ে থাকলেও ফাইনাল থার্ডে গিয়ে সেটা কোনো কাজে লাগেনি। আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য এটাই, বল দখলে রাখা মানেই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখা নয়। এই ভুল ধারণাটা লাতিন আমেরিকার ফুটবল সংস্কৃতিতে এখনো গভীরভাবে গেঁথে আছে বলেই আমার মনে হয়। বল পায়ে রেখে সুন্দর ফুটবল খেলার প্রদর্শনী যতটা আত্মতৃপ্তি দেয়, ততটা পয়েন্ট এনে দেয় না। আর্লিং হালান্ডের প্রথম গোলটাও আমার চোখে নেহাত দুর্ভাগ্য নয়, বরং ব্রাজিলের উঁচু ডিফেন্সিভ লাইন আর আকাশপথের লড়াইয়ে দুর্বলতার সরাসরি খেসারত। এই দুর্বলতা নতুন নয়, বহুদিন ধরেই বিশ্লেষকরা এই বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন, অথচ কোচিং স্টাফ তার সমাধান খুঁজে পাননি। প্রথমার্ধে গুইমারেসের পেনাল্টি নিলান্ড ঠেকানোর পর দল যে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল, সেটা মাঠেই স্পষ্ট বোঝা গেছে। পাসের গতি কমে গিয়েছিল, খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। নেইমার শেষদিকে এক গোল শোধ করলেও তা যথেষ্ট ছিল না, বরং সেটা যেন শুধু পরিসংখ্যানের স্বার্থে পাওয়া একটা সান্ত্বনা গোল।
একটা পরিসংখ্যান আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। ব্রাজিল ইতিহাসে কখনো নরওয়েকে হারাতে পারেনি। আজও সেই রেকর্ড অক্ষত থাকল। এটা কাকতালীয় নয় বলেই আমার বিশ্বাস, এর পেছনে একটা কাঠামোগত দুর্বলতা কাজ করছে। ক্যাসেমিরো বয়সের কারণে আগের গতি হারিয়েছেন, লুকাস পাকেতা ইনজুরিতে না থাকায় গুইমারেসকে একাই মাঝমাঠ সামলাতে হয়েছে, আর ফলে রক্ষণ থেকে আক্রমণে ওঠার ধারাটাই ভেঙে পড়েছে। এই একটা জায়গাতেই আমি মনে করি ব্রাজিলের গোটা সমস্যার মূল লুকিয়ে আছে। মাঝমাঠে ভারসাম্যহীনতা থাকলে যত ভালো আক্রমণভাগ বা রক্ষণভাগই থাকুক না কেন, দলটা কখনোই স্বস্তিতে খেলতে পারে না।
মাত্র পঁয়ত্রিশ শতাংশ বল দখল নিয়ে খেলা একটা দলের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করাও বোধহয় অন্যায়। নতুন প্রজন্ম পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় আনচেলোত্তি বাধ্য হয়েছেন অভিজ্ঞদের ওপর ভরসা রাখতে, অথচ ক্যাসেমিরো, দানিলো, মারকিনিওস কিংবা নেইমার কেউই এই টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরা ফর্মে ছিলেন না। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন হলেও সত্য এটাই যে, একটা প্রজন্মের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে, অথচ পরবর্তী প্রজন্ম এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি। এই জায়গাতেই হালান্ড পার্থক্য গড়ে দিলেন। নুসার নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে প্রথম গোল, আর দ্বিতীয়টা বক্সের বাইরে থেকে ঠান্ডা মাথায় নেওয়া নিচু শট। এই জোড়া গোলে তিনি মেসির সঙ্গে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে উঠে এলেন। একজন খেলোয়াড় কীভাবে একটা গোটা ম্যাচের ভাগ্য একাই নির্ধারণ করে দিতে পারেন, হালান্ড আজ তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
আনচেলোত্তিকে নিয়ে এখন যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তার সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না। রিয়াল মাদ্রিদে পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা একজন কোচ যখন ইউরোপের সবচেয়ে নিরাপদ চাকরি ছেড়ে একটা ভাঙাচোরা দলের দায়িত্ব নেন, সেটাকে আমি সাহস বলেই দেখি। এই সিদ্ধান্তটা আর্থিকভাবে বা পেশাগত নিরাপত্তার দিক থেকে মোটেও সহজ ছিল না, তবু তিনি সেটা নিয়েছেন, আর সেই সাহসের মূল্যায়ন হওয়া উচিত আলাদাভাবে। তার কোচিং দর্শনের মূল শক্তি হলো, তিনি খেলোয়াড়দের ওপর জোর করে কোনো সিস্টেম চাপান না, বরং হাতে যা আছে তা দিয়েই সিস্টেম সাজান। কিন্তু ব্রাজিলের সমস্যাটা ঠিক এখানেই। রিয়ালে তার হাতে ছিল বেনজেমার মতো সম্পূর্ণ একজন নাম্বার নাইন, ভিনিসিয়াসের মতো উইঙ্গার। ব্রাজিলে সেই মানের বিকল্প নেই। এন্দ্রিক এখনো কাঁচা, তাই কুনিয়াকে ফলস নাইন হিসেবে খেলাতে হয়েছে, যা তার নিজের আক্রমণাত্মক দর্শনের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
আজকের আসল নায়ক হালান্ড, এটা স্বীকার করতেই হবে। প্রথম গোলে পজিশনিং নিখুঁত, চিতাবাঘের মতো লাফিয়ে হেডে বল জালে জড়ালেন। দ্বিতীয়টায় মাথা ঠান্ডা রেখে বক্সের বাইরে থেকে গোলকিপারের এক কোণে বল পাঠালেন। গোলের পর বাড়াবাড়ি উদযাপন নেই, ডিগবাজি নেই, এটাই তার পরিণত হয়ে ওঠার লক্ষণ বলে আমার মনে হয়। একটা সময় ছিল যখন হালান্ডকে শুধু বক্সের ভেতরের একজন গোলমেশিন হিসেবে দেখা হতো, অথচ আজকের পারফরম্যান্স দেখিয়ে দিল তার খেলায় এখন পরিণতি আর ধৈর্যও যোগ হয়েছে। গার্দিওলা এমনি এমনি তাকে সিটিতে আনেননি, একজন প্রকৃত জহুরি ঠিকই রত্ন চিনে নেন।
ফুটবল যেভাবে বদলাচ্ছে, তাতে লাতিন আমেরিকার কিছু দল নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করেছে, আর সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা। চিলি অনেক আগে থেকেই পাওয়ার ফুটবল আর হাই-প্রেসিং রপ্ত করার চেষ্টা করছে। কলম্বিয়া এখনো তাদের চিরচেনা পজেশন ফুটবল খেলে, তবে তাদের খেলায়ও এখন ইউরোপীয় ধাঁচের লং বল আর দ্রুত প্রান্ত বদলের ছাপ স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় চমক আমার কাছে প্যারাগুয়ে। কনমেবল বাছাইপর্বে সবচেয়ে কম পাস খেলা আর সবচেয়ে বেশি ট্যাকল করা এই দলটা শুধু শারীরিক দৃঢ়তা আর নিখুঁত লো-ব্লক দিয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে টাইব্রেকারে বিদায় করে দিল। এই ঘটনাটা আমার কাছে প্রতীকী মনে হয়। শৈল্পিকতা ছাড়াও কীভাবে শৃঙ্খলা আর পরিশ্রম দিয়ে বড় দলকে হারানো যায়, প্যারাগুয়ে সেটা দেখিয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিও প্যারাগুয়েকে হারাতে সুন্দর ফুটবলের বাইরে গিয়ে রীতিমতো শারীরিক লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচনা হয়েছে। অথচ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা এখনো সেই পুরোনো জোগো বোনিতো বা রোমান্টিক ফুটবলের মোহ কাটিয়ে উঠতে পারছে না। এই মোহ থেকে বেরিয়ে না আসতে পারলে আগামী দিনগুলোতেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখতে হবে বলে আমার আশঙ্কা। আধুনিক গতি আর প্রেসিংয়ের সঙ্গে এই রোমান্টিকতার মিল না ঘটাতে পারলে লাতিন ফুটবল আরও পিছিয়ে পড়বে।
তবে এত অন্ধকারের মধ্যেও আমি আশার আলো দেখি ব্রাজিলের তরুণ প্রজন্মে। এস্তেভাও উইলিয়ানকে নেইমারের পর সবচেয়ে প্রতিভাবান মনে করা হচ্ছে, চেলসিতে তিনি নিজের জাত চিনিয়ে চলেছেন। লুইস গিলহার্মি ওয়েস্ট হ্যামে ধারাবাহিক, আন্দ্রেই সান্তোস মাঝমাঠে গতি যোগ করছেন, ইগর থিয়াগো প্রিমিয়ার লিগে ভালো খেলছেন। এই তরুণদের মধ্যে যে সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তা যদি সঠিকভাবে লালন করা যায়, তাহলে আগামী চক্রে ব্রাজিল অনেক শক্তিশালী একটা দল হয়ে উঠতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। আনচেলোত্তির জন্য আগামী চার বছরের কাজ হবে এই তরুণদের ঘিরে একটা টেকসই কাঠামো তৈরি করা, যেখানে ব্যক্তিগত শিল্পের সঙ্গে আধুনিক সাংগঠনিক শৃঙ্খলার মিল ঘটবে। সিবিএফ যদি তাকে যথেষ্ট সময় আর স্বাধীনতা দেয়, তবেই তার ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। তাড়াহুড়ো করে কোচ বদল করলে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং একই বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ার ইতিহাস আরও দীর্ঘ হবে।
দিনশেষে আমার কথা একটাই। কেবল পুরোনো লাতিন শিল্পের গর্ব করে আধুনিক ফুটবল জেতা যায় না। প্যারাগুয়ে এই টুর্নামেন্টে যা দেখিয়ে দিল, সেটাই এখনকার ফুটবলের ভাষা। আনচেলোত্তির মতো একজন সফল কোচকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে আমাদের বোঝা দরকার, সমস্যাটা কাঠামোয়, কোনো একজন মানুষের মাথায় নয়। যতদিন এই সত্যটা মেনে নেওয়া না হবে, ততদিন প্রতিটা বিশ্বকাপের পর একই আলোচনা ফিরে আসতে থাকবে। ব্রাজিলের জন্য পুনর্বিন্যাসের শুভকামনা রইল। তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার জন্যও সামনের রাউন্ডে একই কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে বলে আমার ধারণা। এই নির্মম সত্যটা লাতিন পরাশক্তিরা যত দ্রুত মেনে নেবে, তাদের জন্য ততই মঙ্গল।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
.png)

কক্সবাজারের উখিয়ায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা বেদনাদায়ক বললেও কম বলা হয়। এক রাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও শহরে মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে রয়েছে তিন, পাঁচ ও সাত বছরের শিশু। ভারি বৃষ্টির রাতে ঘুমের মধ্যে মাটিচাপা পড়ে মৃত্যু—এর চেয়ে করুণ আর কী হতে পারে?
৪ ঘণ্টা আগে
বর্তমানে এই ধসে পড়া ভবনের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার হতে পারে। অর্থাৎ, বহুতল ভবনের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভবনই ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে ঢাকায় অন্তত ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে।
৪ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিশীল প্রেক্ষাপটে কোনো চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র থাকে না, থাকে কেবল চিরস্থায়ী জাতীয় স্বার্থ—এই ধ্রুব সত্যটিই আজ ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের টানাপোড়েনে চরমভাবে বাস্তব রূপ নিয়েছে।
৭ ঘণ্টা আগে
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলা একাডেমিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি প্রায়ই একাডেমিতে আসতেন এবং আমাদের বহু অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতেন। সুতরাং বলতেই হয়, একজন বুদ্ধিজীবী ও লেখক হিসেবে তিনি যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি জনসংযোগও বেশ পছন্দ করতেন। তাঁর কাছে প্রচুর মানুষের যাতায়াত ছিল।
০৫ জুলাই ২০২৬